প্রশ্নঃ সনাতন ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে জানতে চাই!



(শেয়ার করে সংগ্রহে রাখুন)
উত্তরঃ ধর্ম শাসন, মনু আদি প্রণীত ধর্ম প্রতিপাদক গ্রন্থভেদ, স্মৃতি শাস্ত্র, যাতে ধর্ম ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে ধর্মশাস্ত্র বলে। যেমন-
মনুর্যমো বশিষ্ঠোহত্রিঃ দক্ষো বিষ্ণুস্তথাঙ্গিরা।
উশনা বাক্‌পতির্ব্যাস আপস্তম্বোহথ গৌতমঃ॥
কাত্যায়নো নারদশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পরাশরঃ।
সংবর্ত্তশ্চৈব শঙ্খশ্চ হারীতো লিখিত স্তথা॥
ততৈর্যানি প্রণীতানি ধর্মশাস্ত্রাণি বৈ পুরা॥
মনু, যম, বশিষ্ঠ, অত্রি, দক্ষ, বিষ্ণু, অঙ্গিরা, উশনা, বৃহস্পতি, ব্যাস, আপস্তম্ব, গৌতম, কাত্যায়ন, নারদ, যাজ্ঞবল্ক্য, পরাশর, সংবর্ত্ত, শঙ্খ, হারীত ও লিখিত। এই সকল ঋষি যে সকল গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন, তাকে ধর্মশাস্ত্র বলে। এগুলি আচার, ব্যবহার ও প্রায়শ্চিত্ত প্রধানতঃ এই তিনভাগে বিভক্ত। যাজ্ঞবল্ক্য ধর্মশাস্ত্রের প্রযোজক এই কয়েকজনের নাম নির্দেশ করেছেন-

মম্বত্রিবিষ্ণুহারীত যাজ্ঞবল্ক্যোশনোহঙ্গিরা।
যমাপস্তম্বসংবর্ত্তাঃ কাত্যায়নবৃহস্পতী॥
পরাশরব্যাসশঙ্খলিখিতা দক্ষগৌতমৌ।
শাতাতপো বশিষ্ঠশ্চ ধৰ্ম্মশাস্ত্র প্রযোজকাঃ॥
-যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা ১৫।
অর্থাৎ, মনু, অত্রি, বিষ্ণূ, হারীত, যাজ্ঞবল্ক্য, উশনা, অঙ্গিরা, যম, আপস্তম্ব, সংবর্ত্ত, কাত্যায়ন, বৃহস্পতি, পরাশর, ব্যাস, শঙ্খ, লিখিত, দক্ষ, গোতম, শাতাতপ এবং বিশিষ্ঠ, এরা ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করেছেন।

মলমাস, দায়, সংস্কার, শুদ্ধিনির্ণয়, প্রায়শ্চিত্ত, বিবাহ, একাদশী নির্ণয়, তড়াগ আদি উৎসর্গ, বৃষোৎসর্গ, ব্রত, ব্রতপ্রতিষ্ঠা, জ্যোতিষ, বাস্তু, দীক্ষা, আহ্নিক, কৃত্য, ক্ষেত্র মাহাত্ম্য সমূহ, সামশ্রাদ্ধ, যজুঃশ্রাদ্ধ, শুদ্রকৃত্য, এই সকল বিষয়ের মীমাংসা করে রঘুনন্দন অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব নামে স্মৃতিশাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন, ইহাও ধর্মশাস্ত্র সংগ্রহ নামে খ্যাতি লাভ করে। যথা-
মলিম্লুচে দায়ভাগে সংস্কারে শুদ্ধিনির্ণয়ে।
তড়াগভবনোৎসর্গে বৃষোৎসর্গত্রয়ে ব্রতে॥
প্রতিষ্ঠায়াং পরীক্ষারাং জ্যোতিষে বাস্তুসংজ্ঞকে।
দীক্ষায়ামাহ্নিকে কৃত্যে ক্ষেত্রে শ্রীপুরুষোত্তমে॥
সামশ্রাদ্ধে যজুঃশ্রাদ্ধে শূদ্রকৃত্যবিচারণে।
ইত্যাষ্টাবিংশতি স্থানে তত্ত্বং বক্ষ্যামি যত্নতঃ॥
(রঘ্ননন্দন)
মূল ধর্মসংহিতা গুলিই ধর্মশ্রাস্ত্র, ঐ সকল সংহিতা হতে ধর্মব্যবস্থা নির্ণয় করা যখন দুষ্কর হল, তখন ঐ সংহিতা অবলম্বন করে যে সকল সংগ্রহ গ্রন্থ প্রণয়ন হল, তা হতেই ধর্মব্যবস্থা সকল প্রচারিত হতে লাগল। এই সকল সংগ্রহ গ্রন্থ স্মৃতি নামে অভিহিত।
নিবেদন- শ্রীমান কৃষ্ণকমল(মিন্টু)
নিবেদন- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল

Advertisements

অউম(ওঁ)



ওমিত্যেতদহ্মরমিদঁ সর্বং তস্যোপব্যাখ্যানং ভতংভবদ্ভবিষ্যদিতি সর্বমোঙ্কার এব।যচ্চান্যৎ ত্রিকালাতীতং তদপ্যোঙ্কার এব।।
“ওঁ ইতি এতৎ = ওঁ,এই; অহ্মরম=অহ্মর (অবিনাশী পরমাত্মা); ইদম= এই ; সর্বম = সম্পূর্ণ জগত ; তস্য=তার ;উপব্যাখ্যানম = উপব্যাখ্যানম অর্থাৎ তার নিকটতম মহিমার বোধক; ভূতম =ভূত ( যা হয়েছে); ভগৎ = বর্তমান (এবং) ; ভবিষ্যৎ (যা হবে); ইতি = এই; সর্বম= সম্পূর্ণ জগত ; ওঁকার এব= ওঁকারই; চ= তথা ; যৎ=যা; ত্রিকালাতীতম=ত্রিকালাতীত ; অন্যৎ = অন্য (কোনো তত্ত্ব); তৎ = তা,অপি=ও; ওঁকার = ওঁকার, এব= ই।। (মাণ্ডূক্যোপনিষদ /১)

★ব্যাখ্যা –এই উপণিষদে পরব্রহ্ম পরমাত্মার সমগ্র রুপের তত্ত্ব বোঝাবার জন্য চার পাদের কল্পনা করা হয়েছে। নাম এবং নামীর একতার প্রতিপাদন করার জন্য প্রণবের অ,উ,এবং ম,,এই তিন মাত্রার সাথে এবং মাত্রারহিত তার অব্যক্তরুপের সঙ্গে পরব্রহ্ম পরমাত্মার এক একটি পাদের সমত্ব দেখানো হয়েছে।এইভাবে এই মন্ত্রে পরব্রহ্ম পরমাত্মার নাম যে ওঁকার,তাকে সমগ্র পুরুষোত্তম থেকে অভিন্ন স্বীকার করে একথা বলা হয়েছে যে,ওঁ এই অহ্মরই পূর্ণব্রহ্ম অবিনাশী পরমাত্মা।প্রত্যহ্ম দৃশ্যমান জড় চেতন, এই সম্পূর্ণ জগত তার উপব্যাখ্যান অর্থাৎ তারই নিকটতম মহিমার নিদর্শক। যে স্থল এবং সূক্ষ্ম জগৎ প্রথমে উৎপন্ন হয়ে তাতে বিলীন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে উৎপন্ন হবে,,,সে সমস্ত ওঁকার অর্থাৎ পরব্রহ্ম পরমাত্মাই।এছাড়া ও যা তিনকালের অতীত,এসবের থেকে ভিন্ন,তাও ওঁকারই অর্থাৎ কারণ,সূক্ষ্ম এবং স্থূল,, এই তিন ভেদেবিশিষ্ট জগৎ এবং এর ধারক পরব্রহ্মের যে অংশটুকুও এর আত্মারুপে এবং আধাররুপে অভিব্যক্ত হয়,,,শুধুমাত্র ততটুকুই পরমাত্মার স্বরুপ নয়,তিনি তা থেকে আর ব্যাপক। অতএব তার অভিব্যক্ত অংশ এবং তার অতীত যা কিছু সব মিলে পরব্রহ্ম পরমাত্মারই সমগ্র রুপ। এর অভিপ্রায় এই যে,যারা পরব্রহ্মকে কেবল সাকাররুপে স্বীকার করেন অথবা নিরাকার অথবা সর্বথা নির্বিশেষরুপে স্বীকার করেন তাকে সর্বজ্ঞ,সর্বাধার,সর্বকারণ,সর্বেশ্বর, আনন্দ,বিজ্ঞান আদি কল্যাণময় গুণসম্পন্ন বলে স্বীকার করেন না,তারা প্রকৃতপহ্মে পরব্রহ্মের এক অংশকেই পরমাত্মারুপে স্বীকার করেন।পূর্ণব্রহ্ম পরমাত্মা সাকার এবং নিরাকার,,,,দুইই,,আবার সাকার ও নিরাকার উভয় থেকে ভিন্ন ও।সম্পূর্ণ জগত তার স্বরুপ,আবার তিনি এই জগত থেকে পৃথক ও।তিনি সর্বগুণরাহিত নির্বিশেষ ও এবং সর্বগুণসম্পন্ন ও একথা স্বীকার করাই হল তাকে সর্বাঙ্গ রুপে স্বীকার করা।।
লিখেছেন- সুমিত ভট্টাচার্য্য।

বৈষ্ণব পদাবলী-রাধা তত্ত্ব



বৈষ্ণব পদাবলীকে অনেক সমালোচক বলেছেন বৈষ্ণব তত্ত্বের রসভাষ্য৷ কেউ আবার বলেছেন, বৈষ্ণব পদাবলী নাকি সমুদ্রগামী নদীর মতো প্রবাহমান ও গতিশীল৷যাইহোক, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার আঁড়ালে বৈষ্ণব পদাবলীতে যে অনেক তত্ত্বকথা প্রকাশ পেয়েছে,একথা স্বীকার্য৷ এই তত্ত্বগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যতত্ত্ব,রাধাতত্ত্ব, সাধ্য-সাধন তত্ত্ব ও অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব৷
আমাদের আলোচ্য হল রাধাতত্ত্ব৷ চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই এদেশে বৈষ্ণব পদ রচিত হয়েছে৷ মহাপ্রভূ নিজে অনেকসময় বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের পদ শুনতে শুনতে মূর্চ্ছা (দিব্যজ্ঞান হারানো) যেতেন৷ বৈষ্ণব তাত্ত্বিকেরা চৈতন্যজীবনীকাব্যগুলি ও কিছু প্রামান্য সংস্কৃত গ্রন্থের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে, শ্রীচৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের যুগল অবতার৷ তিনি বহিরঙ্গে রাধা ও অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ৷ তত্ত্বমতে শ্রীকৃষ্ণই মনের তিনটি সাধ পূরণের জন্য শ্রীরাধার ভাবযুক্ত হয়ে শ্রীচৈতন্যরূপে আবির্ভূত হলেন৷ সেগুলি হল–
১)রাধার প্রেমের স্বরূপ কেমন,
২)রাধার প্রেমে কৃষ্ণ কেমন আনন্দ অনুভব করেন,
৩)কৃষ্ণপ্রেমের আনন্দ অনুভব করে রাধার মনে কিরূপ আনন্দ হয়,
এই সমস্ত কিছু উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন ছিল রাধাকৃষ্ণের একই দেহে অবস্থান৷ রাধাকৃষ্ণ যে একত্মা ও অভেদ দেহ, সেই প্রসঙ্গের সঙ্গে এই চৈতন্যতত্ত্বটির যোগ আছে৷ ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থে কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলেছেন–
“রাধাকৃষ্ণ এক আত্মা দুই দেহ ধরি৷
অন্যোন্যে বিলাসে রস আস্বাদন করি৷৷
সেই দুই এক এবে চৈতন্য গোঁসাঞি৷
ভাব আস্বাদিতে দোঁহে হৈল এক ঠাঞি৷৷”
এই দর্শনের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে গৌরচন্দ্রিকা ও গোরাঙ্গ বিষয়ক পদগুলি রচিত হয়৷ চৈতন্যদেব আবির্ভাবের পর পূর্ববর্তী বৈষ্ণব পদাবলীর সঙ্গে চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়িয় দর্শন একস্রোতে মিশে যায়৷ তাই চৈতন্য পরবর্তী কবিরা আগে ভক্ত, পরে কবি৷
উল্লেখ্য, গৌড়িয় বৈষ্ণব পদকর্তারা শ্রীচৈতন্যের মতো প্রথমে রাধাভাবে ভাবিত হতেন এবং পড়ে কৃষ্ণসাধনা করতেন৷ বৈষ্ণবীয় রসশাস্ত্রে একেই বলা হয়েছে রাধা-তত্ত্ব৷ শ্রীচৈতন্যদেবও গুরু পরম্পরায় মাধবেন্দ্রপুরী, ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকে রাধাভাবটি আত্মস্থ করেছিলেন৷ চৈতন্যজীবনীকাব্যে পাই –
“ইষ্টগোষ্ঠী কৃষ্ণকথা কহি কতোক্ষণ৷
প্রভুপদে ধরি রায় করে নিবেদন৷৷
কৃষ্ণতত্ত্ব, রাধাতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব সার৷
রসতত্ত্ব লীলাতত্ত্ব বিবিধ প্রকার৷৷”
শ্রীমদ্ভাগবতে রাধা নামটির সেভাবে উল্লেখ না থাকলেও বিষ্ণুপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে রাধাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে৷ ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে শ্রীমতি রাধা শ্রীকৃষ্ণের অর্ধাংশস্বরূপা, আবার তিনিই মূল প্রকৃতি; তিনিই সৃষ্টির আধার৷ তাই এই পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং রাধাকে বলেছেন — দুধে যেমন সাদা রঙ মিশে থাকে, অনলে যেমন দহিকা শক্তি বিরাজ করে, গন্ধ যেমন পৃথিবীকে আশ্রয় করে অবস্থান করে; আমিও তেমনি তোমার মধ্যে বিরাজ করছি৷ আমাদের কোনো ভেদ নেই৷ গৌড়ীয় বৈষ্ণব তাত্ত্বিকগণ মনে করেন, লীলারস আস্বাদনের জন্য কৃষ্ণ ও রাধা আলাদা দেহ স্বীকার করলেও চৈতন্যদেবের মধ্যে তাঁরা পুনরায় ঐক্য লাভ করেছেন৷ এই বিষয়টির সঙ্গে অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্বের যোগ আছে৷ বৃন্দাবনের গোপিকাগণের প্রেম ছিল কামগন্ধহীন, তাঁদের মধ্যে আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিবাঞ্ছা ছিল না,ছিল কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতিবাঞ্ছা৷ কবিরাজ গোস্বামী এই কাম ও প্রেমের পার্থক্য দিয়েছেন এভাবে–
“আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা তারে বলি কাম৷
কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি-ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম৷৷”
আর গোপিদের মধ্যে রাধার শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করেছেন এভাবে —-
“সেই গোপীগণ মধ্যে উত্তমা রাধিকা৷
রূপে গুণে সৌভাগ্যে প্রেমে সর্বাধিকা৷৷”
রাধার প্রেম যে গোপিগণের প্রেমের থেকে আলাদা, তা গৌড়িয় বৈষ্ণবতত্ত্বে স্বীকার্য৷শ্রীমতি রাধা শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি৷ শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমের তীব্র প্রকাশ ঘটেছে শ্রীচৈতন্যের মধ্যে৷ এই বিষয়টিই গৌড়িয় বৈষ্ণবতত্ত্বে রাধাতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত৷ শ্রীমন্মহাপ্রভুর কাছ থেকেই এই তত্ত্বটি পরবর্তীকালে বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামী জানতে পেরেছিলেন৷
আলোচক – ধনঞ্জয় চক্রবর্তী
(বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, কোচবিহার।

প্রশ্নঃ সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কিরূপ বলা হয়েছে?


প্রশ্নঃ সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কিরূপ বলা হয়েছে?

উত্তর:
সরস্বতী বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্প, কলা ও সংগীতের দেবী। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায় অধ্যায়নরত বিদ্যার্থীরা এই পূজা সাড়ম্বরে করে থাকেন। মাতা সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী অর্থাৎ কল্যাণ ও শান্তি বিধায়িনী, তিনি বরদা এবং জাগতিক মোহ ধ্বংসকারী। সুপ্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বিশেষত বেদে আমরা মাতা সরস্বতীকে পাই। সরস্বতী তাই পুরোপুরি বৈদিক দেবী। বৈদিক ঋষিরা বিভিন্ন ধ্যান মন্ত্রে তার বন্দনা করেছেন। যেমনঃ

চোদয়িত্রী সূনৃতানাং চেতন্তী সুমতীনাং।
যজ্ঞং দধে সরস্বতী॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১১)
মহো অর্নঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা।
ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১২)

অনুবাদঃ
সত্য ও প্রিয়বাণীর (মঙ্গলজনক বা মানব হিতকর কথা) প্রেরণাদাত্রী এবং সৎবুদ্ধির চেতনাদাত্রী মাতা সরস্বতী শুভকর্মকে ধারণ করে আছেন।জ্ঞানদাত্রী মাতা সরস্বতী প্রজ্ঞাশক্তি দ্বারা মহান জ্ঞান সমুদ্রকে প্রকাশ করেন এবং ধারণাবতী বুদ্ধি সমূহকে দীপ্তি দান করেন। (অনুবাদ ১/৩/১১-১২)
শংনো দেবা বিশ্বদেবা ভবন্তু শং সরস্বতী সহধীভিরস্তু।(ঋগ্বেদ ৭/৩৫/১১)

অনুবাদঃ
জ্ঞান জ্যোতির রক্ষক বিদ্বানেরা আমাদের কল্যাণ বিধান করুন। বিদ্যাদেবী সরস্বতী নানা প্রকারে বুদ্ধির সাথে কল্যাণদায়িনী হোক।
বৈদিক যুগে মাতা সরস্বতী বিভিন্নভাবে পূজিতা হয়ে থাকলেও তাকে ঋষিরা প্রধানত দুইটি রূপে বন্দনা করে থাকতেন। (১) নদীরূপে (২) মাতৃ বা দেবী রূপে। এই বিষয়ে এবার আমরা প্রামাণিক বৈদিক মন্ত্র দেখাবো

অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।
অপ্রশস্তা ইব স্মাসি প্রশস্তিমল্ব নস্কৃধি॥ (ঋগ্বেদ ২/৪১/১৬)

অনুবাদ:
মাতৃগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে সরস্বতী! আমরা অসমৃদ্ধের ন্যায় রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধশালী কর।

এই মন্ত্রে আমরা দেখতে পেলাম তিনি যেমন মাতৃগণের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ তেমনি নদীর মধ্যেও। এই সরস্বতী এক বিশাল নদী ছিল বৈদিক যুগে, যদিও বর্তমানে সেটা লুপ্ত। কিন্তু ঋষিদের বর্ণনায় আমরা সেই নদী সম্পর্কে বর্ণনা পাই। যেমনঃ
প্র ক্ষোদসা ধায়সা সস্র এষা সরস্বতী ধরুণামায়সী পূঃ।
প্রবাবধানা রক্ষেব যাতি বিশ্ব অপো মহিনা সিন্ধুরন্যাঃ॥
একচেতৎ সরস্বতী নদীনাং শুচির্যতী গিরিভ্য আসমুদ্রাৎ। (ঋগ্বেদ ৭/৯৫/১-২)

অনুবাদঃ
এ সরস্বতী আয়োনির্মিত পুরীর ন্যায় ধারয়িত্রী হয়ে ধারক উদক (জল) সাথে প্রবাহিতা হচ্ছেন। তিনি অন্য সমস্ত স্যন্দনশীল জলকে মহিমাদ্বারা বাধা প্রদান করে পথের ন্যায় গমন করেছেন। নদীগণের মধ্যে শুদ্ধা গিরি অবধি সমুদ্র পর্যন্ত গমনশালী একা সরস্বতী অবগত হয়েছিলেন।

বৃহদু গারিষে বচোহসূর্যা নদীনম্ ।
সরস্বতী মিণহয়া সুবৃক্তিভিঃ স্তোমৈর্ব সিষ্ট রোদসী॥ ১
উভে যরে মহিনা শুভ্রে অন্ধাসী অধিক্ষিয়ন্তি পুরবঃ।
সানো বোধবিত্রী মরুৎসখা চোদ রাধো মযোনাম্॥২ (ঋগ্বেদ ৭/৯৬/১-২)

অনুবাদঃ
হে বশিষ্ঠ! তুমি নদীগণের মধ্যে বলবতী সরস্বতীর উদ্দেশ্যে বৃহৎ স্তোত্রগান রচনা কর, দ্যাবা পৃথিবীতে বর্তমানা সরস্বতী! তোমার মহিমা দ্বারা মনুষ্যগণ উভয়বিধ অন্ন প্রাপ্ত হয়। তুমি রক্ষাকারিণী হয়ে হয়ে আমাদের অবগত হও, মরুৎগণের সখা হয়ে হবিষ্মানদের নিকট ধন প্রেরণ কর।

বৈদিক যুগে সরস্বতী নদীর তীরে মনোরম প্রাকৃতিক নতুন পরিবেশে, কল্লোলিনীর উচ্ছল জল তরঙ্গে শ্বেত শুভ্র রাজহংসের আনাগোনায়, সামগানের সুমধুর সুরে ভাবুক ঋষিমনে জ্ঞানদায়িনী সরস্বতী মাতার আবির্ভাব হয়। তিনি বাগদেবী বেদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন, ‘তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদী বদ্বোবচ্চ নিগমা মূল ঋগ্বেদে সরস্বতীর উভয় প্রকার গুণ লক্ষিত হয়। পুরাকালে সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞ সম্পাদন হত এবং ক্রমে সে সরস্বতী নদী সে পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাগদেবী বলে পরিণত হলেন। বেদে সরস্বতী শুধু বিদ্যাদায়িনী বা জ্ঞানদায়িনী নয় তিনি অশুভ শক্তি ধ্বংসকারী।

সরস্বতী দেবনিদো নি বর্হয় প্রজাং বিশ্বাস্য বৃসয়স্য মায়িনঃ।
উত ক্ষিতিভ্যোহবনীরবিন্দো বিষমেভ্যো অস্রবো বাজিনীবতি॥ (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৩)

আনুবাদঃ
হে সরস্বতী তুমি দেবনিন্দকগণকে বধ করেছ এবং সর্বব্যাপী মায়াবী কৃসয়ের পুত্রকে সংহার করেছ। হে অন্নসম্পনা দেবী! তুমি মানবগণকে ভূমি প্রদান করেছ এবং তাদের জন্য বারিবর্ষণ করেছ। মাতা সরস্বতী আমাদের অশুভশক্তি বিনাশে শক্তি দিয়ে থাকেন।

যস্ত্বা দেবী সরস্বতুৎপব্রুতে ধনে হিতো ইন্দ্রংন বৃত্রতূর্যে। (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৫)

অনুবাদঃ হে দেবী সরস্বতী যে ব্যক্তি তোমাকে ইন্দ্রের ন্যায় স্তব করেন সে ব্যক্তি যখন ধনলাভার্থে যুদ্ধ করেন তখন তাকে তুমি রক্ষা কর।

দেবী সরস্বতী শুচি শুভ্র, শ্বেত অঙ্গকান্তি, শ্বেতপদ্মাসীনা এবং শ্বেত হংসবাহনা। তার কৃপায় মানুষের জাগতিক এবং পারমার্থিক জ্ঞান লাভ হয়। তিনি সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সঙ্গীত ও রাগের সমন্বয়ে ‘ওঁ কার ও গায়ত্রী মন্ত্র শুদ্ধাচারে উচ্চারণে জীবাত্মা পরমাত্মায় লয় হয়। উপনিষদে বলা হয়েছে-

বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্ বেদোভয়্সঁহ।
অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীত্বা বিদ্যায়াহমৃতমশ্নূতে॥ (ঈশ উপনিষদ/১১)

অনুবাদঃ
যে মানুষ সেই উভয়কে অর্থাৎ জ্ঞানের তত্ত্বকে ও কর্মের তত্ত্বকে ও একসঙ্গে যথার্থ রূপে জানতে পারে। সে কর্মসমুহ অনুষ্ঠানে মৃত্যুকে অতিক্রম করে আর জ্ঞানের অনুষ্ঠানে অমৃতকে উপভোগ করে অর্থাৎ আনন্দময় অমৃত লাভ করে। মার কৃপাতে আমরা উভয়বিধ জ্ঞানই পেয়ে থাকি। উপরের বর্ণনায় এটা প্রমাণিত যে দেবী সরস্বতী বেদের যুগ থেকেই পূজতিা।