প্রশ্ন: বৃক্ষরোপণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মতামত কি?


প্রশ্ন: বৃক্ষরোপণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মতামত কি?

উত্তর:
খুব সরল দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে হিন্দু ধর্মের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে অরণ্য। বৈদিক জ্ঞান আরণ্যকের জন্ম এই অরণ্য থেকেই। ঋষিদের নিভৃত সাধনার জায়গাগুলোর মধ্যে অরণ্য অন্যতম। শুধু তাই নয় হিন্দুদের আচারের ভিতরে রয়েছে এধরনের বৈশিষ্ট্য বটবৃক্ষ, ফুল, লতা-পাতা সব নিয়েই হিন্দু তার পূজার আয়োজন করে থাকে। সঙ্গত কারণেই হিন্দু ঋষিগণ বৃক্ষরোপণের ওপর যেমন জোর দিয়েছেন তেমনি বৃক্ষনিধন করতে শুধু নিষেধই করেননি, বৃক্ষনিধনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করেছেন।

বৃক্ষরোপণে হিন্দুধর্মের নির্দেশ:

উদ্ভিদাদি রোপণ ও পরিচর্যা করলে ভূমিদান ও গোদানের সমতুল্য পুণ্য অর্জিত হয়। বরাহ পুরাণ, ১৭২/৩৫

যে ব্যক্তি একটি অশ্বত্থ, একটি নিম, একটি বটবৃক্ষ, দশটি পুষ্পবিরুৎ, দাড়িম্ব, লেবু গাছ, পাচটি আম্র চারা রোপণ করে তাদের যত্নের সাথে বৃদ্ধি করে তাকে কথনই নরকে যেতে হয় না। বরাহ পুরাণ, ১৭২/৩৬

যদি কোন দরিদ্র ব্যক্তি একটিমাত্র গাছও রোপণ করেন তবে তিনি ব্রহ্মসদনে যাবার অধিকার অর্জন করেন এবং তার তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সেই ফল ভোগ করে। ব্রহ্মনারদীয় পুরাণ, ১৩/৫২

বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মত :

যদি কেউ স্বীয় রন্ধনের উদ্দেশ্যে জ্বালানির জন্য সবুজ কাচাগাছ ভূপাতিত করে তবে তাকে চরম পতিত বলে গণ্য করা হবে। মনুস্মৃতি, ১১/৬৬

কোন বৃক্ষের বিস্তারিত শাখা বা যে সকল বৃক্ষ প্রয়োজনীয় ও উপকারী তার শাখা, কাণ্ড, মূল ছেদন করলে অপরাধের মাত্রানুযায়ী তার জরিমানা কুড়ি,চল্লিশ বা আশি কার্ষাপণ ( ষোলপণ বা এক কাহন )। কেউ পবিত্র স্মৃতি সৌধ, শ্মাশানভূমি, উপাসনাপ্রাঙ্গণ, পবিত্রস্থানের সীমানা নির্দেশকারী বৃক্ষ বা তার শাখা, কাণ্ড বা মূল ছেদন বা বিদীর্ণ করে তার জরিমানের হার উপর্যুক্ত জরিমানার দ্বিগুণ হবে। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, ২/২৩০

খনি, শিল্পকারখানা, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণের জন্য যন্ত্রচালিত উপায়ে বড়ো বড়ো বৃক্ষের উৎসাদন করবে তাদের একঘরে করা হবে। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, ২/২৩১

এমনকি পরিবেশ রক্ষায় নগর পরিষ্কারের কথা হিন্দু ঋষিগণ সোজা ভাষায় বলে গেছেন-

নগর বা গ্রামের আবাসিক এলাকা থেকে অনেকদূরে মলমূত্র, দেহ প্রক্ষালনের জল, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ, স্নানাগারের বর্জ্য জল অপসারিত করতে হবে। মনুস্মৃতি, ৪/১৫১

 তথ্যসুত্র- হিন্দু ধর্ম জিজ্ঞাসা।

প্রশ্ন: দৈবী ও অসুর স্বভাবীর লক্ষণ কি কি?


প্রশ্ন: দৈবী ও অসুর স্বভাবীর লক্ষণ কি কি?

Related image

উত্তর:
দৈবী তথা সদগুণযুক্তের লক্ষণগুলো হল-
১. নির্ভীকতা
২. চিত্তশুদ্ধি
৩. আত্মজ্ঞনিষ্ঠা
৪. কর্মে তৎপর
৫. দান
৬. ইন্দ্রিয় সংযম
৭. যজ্ঞ
৮. অধ্যয়ন
৯. তপস্যা
১০. সরলতা
১১. অহিংসা
১২. সত্য
১৩. অক্রোধ
১৪. ত্যাগ
১৫. শান্তি
১৬. পরনিন্দা বর্জন
১৭. জীবে দয়া
১৮. লোভহীনতা
১৯. মৃদুতা
২০. কুকর্মে লজ্জা
২১. অচাঞ্চল্য
২২. তেজস্বিতা
২৩. ক্ষমা
২৪. ধৃতি
২৫. শৌচ
২৬. অনভিমান

অসুর স্বভাবীর বৈশিষ্ট্য-

১. দম্ভ
২. দর্প
৩. অভিমান
৪. ক্রোধ
৫. নিষ্ঠুরতা
৬. অজ্ঞান
৭. আত্মশ্লাঘা
৮. অবিনয়নী
৯. ধনগর্ব
১০. ক্রূর
১১. কাম
১২. ক্রোধ
১৩. লোভ
১৪. হিংসা

সূত্র: গীতা, দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ

প্রশ্ন: যজ্ঞ কি? পঞ্চযজ্ঞের প্রসঙ্গে জানতে চাই?


প্রশ্ন: যজ্ঞ কি? পঞ্চযজ্ঞের প্রসঙ্গে জানতে চাই?

Image result for যজ্ঞ

উত্তর:
যজ্ঞ: ঈশ্বরের প্রীতির উদ্দেশ্যে কর্ম বা আরাধনা মাত্রই যজ্ঞ। শুধু কাঠ-খড়ের মধ্যে আগুনে আহুতি দেয়া যজ্ঞ নয় সেটা যজ্ঞের বাহ্যিক রূপ।

বৈদিক মন্ত্রের দুটি অঙ্গ- একটি বাহ্য তথা আনুষ্ঠানিক অন্যটি আভ্যন্তরীণ তথা আধ্যাত্মিক। বাহ্য অনুষ্ঠানটি আধ্যাত্মিক তত্ত্বেরই প্রতীকরূপ। সাধারণ কথায় বললে ধান-দূর্বায় আশীর্বাদের বাহ্যিক আর দার্শনিক রূপ সম্পদ ও দীর্ঘায়ু কামনা।

গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রধান পাঁচটি যজ্ঞের কথা বলেছেন। সেগুলো হলো-
১. দ্রব্যযজ্ঞ ( যেমন: মন্দির প্রতিষ্ঠা, দান …)
২. তপোযজ্ঞ ( উপবাস ব্রতাদি… )
৩. যোগযজ্ঞ ( যম, নিয়ম, প্রাণায়াম…)
৪. স্বাধ্যায় যজ্ঞ ( বেদাভ্যাস)
৫. বেদজ্ঞান যজ্ঞ ( বুদ্ধি দ্বারা বেদার্থ অনুধাবন), গীতা, ৪/২৮

গীতায় ভগবান জ্ঞানযজ্ঞেরই শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। গীতা, ৪/৩৩

প্রশ্ন: অনেক ধর্ম প্রশ্ন করাকে গর্হিত বলে আখ্যা দিয়েছে কিন্তু হিন্দুধর্ম এসম্পর্কে কি বলে?


প্রশ্ন: অনেক ধর্ম প্রশ্ন করাকে গর্হিত বলে আখ্যা দিয়েছে কিন্তু হিন্দুধর্ম এসম্পর্কে কি বলে?

Image result for questions

উত্তর:
প্রশ্ন করারকে হিন্দুধর্ম কখনই গর্হিত বলেনি বরং হিন্দুধর্মের বহু জায়গায় প্রশ্ন করাকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। কঠোপনিষদে নচিকেতা ও যমের কথোপকথনে সেকথা স্পষ্ট। এখানে জ্ঞানীর কাছে গিয়ে আত্মতত্ত্ব জেনে নিতে বলা হয়েছে।

উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরানু নিবোধত।
ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দূরত্যয়া
দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি।। কঠোপনিষদ, ১/৩/১৪

অনুবাদ:
তোমরা উত্থিত হও, মোহ-নিদ্রা ত্যাগ করে জাগ্রত হও, শ্রেষ্ঠ আচার্যগণের নিকট গমন করে আত্মতত্ত্ব জ্ঞাত হও; যাঁরা ক্রান্তদর্শী তাঁরা বলেন- আত্মজ্ঞানের পথ ক্ষুরধারার মত দুর্গম, দুরতিক্রমণীয়।

অন্যদিকে গীতা বলছে-
সেই জ্ঞান তুমি জ্ঞানীদের কাছে গিয়ে জেনে নাও। কপটতা ত্যাগ করে সরলভাবে প্রশ্ন করলে জ্ঞানীগণ তোমাকে উপদেশ (উত্তর) দেবেন। গীতা, ৪/৩৫

আবার বৃহদারণ্যক উপনিষদে যাজ্ঞবল্ক্য ও গার্গী উপাখ্যানে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে দেখা যায়। যাজ্ঞবল্ক্য বিদূষী গার্গীকে অতিপ্রশ্ন করতে নিষেধ করলেও গার্গী প্রশ্ন করেই যায়।

যেহেতু প্রশ্ন ছাড়া সম্যক জ্ঞান লাভ অসম্ভব তাই হিন্দুধর্ম কখনই প্রশ্ন করাকে গর্হিত বলেনি। এটা হিন্দুধর্মের উদারতা, কেননা অতিপ্রশ্নের ভয় ঋষিদের ছিল না। যাদের উত্তরহীন প্রশ্নের ভয় থাকে তারাই প্রশ্নের দরজায় তারা ঝুলিয়ে দেয়।

তথ্যসুত্র- হিন্দু ধর্ম জিজ্ঞাসা।