প্রশ্নঃ অনেকে বলে থাকেন সাবানের ক্ষার প্রস্তুতিতে হিন্দু বিজ্ঞানীর অবদান রয়েছে। এই ক্ষার প্রস্তুত প্রণালি প্রথম কে আবিষ্কার করেন?


প্রশ্নঃ অনেকে বলে থাকেন সাবানের ক্ষার প্রস্তুতিতে হিন্দু বিজ্ঞানীর অবদান রয়েছে। এই ক্ষার প্রস্তুত প্রণালি প্রথম কে আবিষ্কার করেন?

Related image

উত্তর:
আমরা ৬০ নং প্রশ্নে বিজ্ঞানী সুশ্রুত নিয়ে আলোচনা করেছি। এই মহান বিজ্ঞানী শুধু প্লাস্টিক সার্জারির জনকই নন, পৃথিবীর প্রথম ক্ষার প্রস্তুত প্রণালি তিনিই বর্ণনা করেন। তাঁর ‘সুশ্রুত সংহিতা’ গ্রন্থের ‘ক্ষার প্রস্তুতকরণ’ নামক অধ্যায়ে এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া আছে।

ক্ষার সাধারণত দু’ধরনের-

১. মৃদু ক্ষার (Mild Alkali)
২. তীক্ষ্ম ক্ষার (Caustic Alkali)

ইউরোপে মাত্র অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত রাসায়নিক গ্রন্থে সর্বপ্রথম ক্ষারের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেখা যায়। এর হাত ধরে আজকাল উন্নত সাবান ও ডিটারজেন্ট বের হয়েছে কিন্তু একসময় সোডা দিয়ে কাপড় কাচা হতো। গ্রামের অনেক বৃদ্ধ লোকজন বলতে পারবেন যে কলা গাছের ‘বাসনা’ (শুকনো ছাল) পুড়িয়ে একসময় ক্ষার তৈরি করে তা দিয়ে কাপড় পরিষ্কার করা হত।

খ্রিস্টের জন্মের বহুবছর আগে ক্ষার প্রস্তুত প্রণালি বলে গেছেন হিন্দু বিজ্ঞানী সুশ্রুত। তাঁর বর্ণনা মতে- স্থলজ উদ্ভিদ পোড়ালে যে ক্ষার তৈরি হয় তাকে তিনি মৃদু ক্ষার (Mild Alkali) বলেছেন। আবার এদের সাথে চূণ মিশিয়ে ফোটালে যে ক্ষার তৈরি হয় তা তীক্ষ্ম ক্ষার (Caustic Alkali)। সেকালে মৃদু ক্ষারের নাম ছিল ‘সর্জিকাক্ষার’ বাংলায় ‘সাজিমাটি’ আর তীক্ষ্ম ক্ষারের নাম ছিল ‘যবক্ষার’ কেননা যবের শীষ পুড়িয়ে এই ক্ষার তৈরি করা হত।

এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রাচীন হিন্দু বিজ্ঞানী সুশ্রুতই ছিলেন প্রথম ক্ষার প্রস্তুতকারী ও প্রস্তুত প্রণালীর জনক। কিন্তু দু:খের বিষয় শুধু সুশ্রুতের চিন্তা-চেতনাকেই আমরা কাজে লাগাইনি তা নয়, বলতে গেলে কেউই আমরা এই মহান বিজ্ঞানীর নামটিও জানি না।

তথ্যসূত্র: পিণাকপাণি দত্ত, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়(সম্পাদিত), প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রবন্ধসংগ্রহ, দে’জ পাবলিশিং, জানুয়ারি ২০১২, কলকাতা, পৃ. ২১১-২১২।

Advertisements

প্রশ্ন:- নবপত্রিকা কি ?


 প্রশ্ন:- নবপত্রিকা কি ?

Image result for nabapatrika

উত্তরঃ
নবপত্রিকা পূজা দুর্গাপূজার একটি বড় অংশ । চণ্ডীতে স্তব মন্ত্রে বলা হয়েছে “যা দেবি সর্বভূতেষু” অর্থাৎ সেই মহাশক্তি দেবী ভগবতী সকল কিছুতে বিরাজমানা। তাই দুর্গাপূজায় কিছু বৃক্ষকে মাতৃশক্তির প্রতিভূ হিসাবে পুজো করা হয়। এই সকল বৃক্ষের সংখ্যা নয়টি, সেগুলি যথাক্রমে
……… রম্ভা ,কাচ্চ, হরিদ্রা , জয়ন্তী , বিল্বদাড়িমৌ ।
অশোকা, মানকশ্বৈব, ধানাঞ্চ, নবপত্রিকা ।।
অনুবাদঃ
কলা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান এরা নবপত্রিকা । এই সকল বৃক্ষের মধ্যে মাতৃ শক্তির অবস্থান চিন্তা করা হয় । এ সব বৃক্ষের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ও রয়েছেন …… কলাতে ব্রাহ্মনী, কচুতে কালীকা, হরিদ্রাতে দুর্গা, জয়ন্তীতে কার্ত্তিকী, বেলে শিবা, ডালিমে রক্তদন্তিকা, অশোকে দেবী শোকরহিতা, মানে চামুন্ডা, ধানে লক্ষ্মী । এই বৃক্ষ গুলি আমাদের জন্যে অনেক উপকারি । যদিও সকল বৃক্ষই আমাদের প্রয়োজনীয় তারপরও এই বৃক্ষ গুলিতে বিশেষ কিছু গুণ আছে যা আমাদের মানব দেহের জন্যেও উপকারি। নিন্মে কিছু সংক্ষেপে বর্ণনা করা হল।

কলাঃ
এটি আমাদের একটি পরিচিত ফল। কলার বৈজ্ঞানিক নাম Musa Paradisiaca L. কলার ব্যাপক পুষ্টি গুণের জন্যে একে ফ্রুট অব ওয়ায়িজ বা জ্ঞানের ফল বলা হয়। কলাতে প্রায় সকল প্রকার ভিটামিন অর্থাৎ এ, বি, সি, ডি এবং ম্যাগনেশিয়াম, পটাসিয়াম, সুক্রোজ, ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজ ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে যেগুলো মানব দেহের জন্যে প্রচুর দরকারি ।

কচুঃ
কচুর বৈজ্ঞানিক নাম Colocasia Esculenta(L) Schott . কচু শাঁকে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ। এছাড়া রয়েছে প্রোটিন, শর্করা, স্নেহ, ভিটামিন বি-১(থায়ামিন) বি-২(রিবোফ্লাবিন) সি ক্যালসিয়াম , লৌহ ইত্যাদি গুরুত্ত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান ।

হরিদ্রাঃ
হলুদ কে সংস্কৃতে হরিদ্রা বলা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Curcuma Longa L. এটি সাধারণত মশলা এবং রূপ চর্চাতে ব্যাবহৃত হয় । হলুদে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন, খনিজ লবণ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, লোহা ইত্যাদি আছে। তাছাড়া হলুদ ক্যান্সার প্রতিরোধি এবং মানব দেহে টিউমারের বৃদ্ধি রোধ করে ।

জয়ন্তীঃ
এই গাছটি সম্পর্কে তেমন একটা তথ্য দেয়া গেল না বলে দুঃখিত।

বেলঃ
বেল গাছ শিব ঠাকুরের প্রিয়। সংস্কৃতে একে শ্রীফল বলা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Aegle marmelos correa । এতে রয়েছে শর্করা, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ক্যারোটিন, স্নেহ, থায়ামিন,রিবোফ্লাবিন, নায়াসিন, অ্যাসকোরিক আ্যাসিড, টার্টারিক আ্যাসিড, ইত্যাদি উপাদান । বেল কোষ্ঠ্যকাঠিন্য সমস্যায় খুব কার্যকর । এ ছাড়া অজীর্ন, পেটের গোলমাল ইত্যাদিতে খুবই উপকারি ।

দাড়িম্ব (ডালিম)ঃ এটি আমাদের পরিচিত ফল । বৈজ্ঞানিক নাম Punica granatum Linn । আমরা সবাই জানি রোগীদের পথ্য হিসাবে এটি বহুল ব্যাবহৃত। এটি রক্ত বর্ধক এবং মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে ।

অশোকঃ
এটি মাঝারি আকারের চির সবুজ গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Saraca indica । এই গাছ ভেষজ গুণ সম্পন্ন । আন্ত্রিক রোগ, উদারাময়, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসায় এটি ব্যাবহৃত হয় ।

মানঃ
এটিও আমাদের পরিচিত । বৈজ্ঞানিক নাম Alocasia indica (Roxb)Schott । এটি রক্ত দুষ্টিনাশক।অশ্বরোগে উপকারি, সেই সাথে কোষ্ঠবদ্ধ রোগে কার্যকর । বাত ব্যাথা নিরাময়ে এটি ফলপ্রদ ।

ধানঃ
ধানের কথা বিস্তারিত নাই বা বলি, কারণ এ সম্পর্কে সবাই আমরা কম বেশি জানি ।

তথ্যসূত্র : ভেষজ উদ্ভিদ পরিচিতি (১ম/২য় খন্ড) ড.হাসনা হেনা বেগম ( চেয়ারম্যান উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ ও ডিন বিজ্ঞান বিভাগ …জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ) আফসার ব্রাদার্স প্রকাশ কালঃ একুশে বইমেলা ২০১২

পরিশেষে একটি ভ্রান্তির কথা দিয়ে শেষ করি ।ছোট বেলা থেকে বড়দের মুখে আমরা অনেকে শুনে আসছি নবপত্রিকা নাকি গণেশের বউ । যা কি না একটি ভ্রান্তিমূলক এবং মহাপাপজনক কথা । পৌরানিক কাহিনীতে আমরা গণেশের স্ত্রীর নাম পাই ঋদ্ধি এবং সিদ্ধি । আসলে নবপত্রিকা কে ঘোমটা দিয়ে নতুন বধূর মত করে সাজানো হয়, যার ফলে অনেক জায়গায় নবপত্রিকা কে কলাবৌ নামে ডাকা হয় এবং দুর্গা পূজার চালচিত্রে তার অবস্থান হল মাতৃভক্ত গণেশের পাশে । সম্ভবত এই কারণে সমাজে ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে ।উপরের বর্ণনায় আমরা স্পষ্টই দেখেছি নবপত্রিকা অধিষ্ঠাত্রী দেবীরা যেমন ধানে লক্ষী, হলুদে দুর্গা এরা সবাই মায়ের অংশ , তাই নবপত্রিকা গণেশের মা, তথা প্রকৃতি স্বরূপিণী মা দুর্গা । নিঃসন্দেহে আমাদের এই মহাপাপজনক ভ্রান্ত ধারণা থেকে উত্তোরন প্রয়োজন ।

 

প্রশ্ন: বৃক্ষরোপণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মতামত কি?


প্রশ্ন: বৃক্ষরোপণ ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মতামত কি?

উত্তর:
খুব সরল দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে হিন্দু ধর্মের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে অরণ্য। বৈদিক জ্ঞান আরণ্যকের জন্ম এই অরণ্য থেকেই। ঋষিদের নিভৃত সাধনার জায়গাগুলোর মধ্যে অরণ্য অন্যতম। শুধু তাই নয় হিন্দুদের আচারের ভিতরে রয়েছে এধরনের বৈশিষ্ট্য বটবৃক্ষ, ফুল, লতা-পাতা সব নিয়েই হিন্দু তার পূজার আয়োজন করে থাকে। সঙ্গত কারণেই হিন্দু ঋষিগণ বৃক্ষরোপণের ওপর যেমন জোর দিয়েছেন তেমনি বৃক্ষনিধন করতে শুধু নিষেধই করেননি, বৃক্ষনিধনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করেছেন।

বৃক্ষরোপণে হিন্দুধর্মের নির্দেশ:

উদ্ভিদাদি রোপণ ও পরিচর্যা করলে ভূমিদান ও গোদানের সমতুল্য পুণ্য অর্জিত হয়। বরাহ পুরাণ, ১৭২/৩৫

যে ব্যক্তি একটি অশ্বত্থ, একটি নিম, একটি বটবৃক্ষ, দশটি পুষ্পবিরুৎ, দাড়িম্ব, লেবু গাছ, পাচটি আম্র চারা রোপণ করে তাদের যত্নের সাথে বৃদ্ধি করে তাকে কথনই নরকে যেতে হয় না। বরাহ পুরাণ, ১৭২/৩৬

যদি কোন দরিদ্র ব্যক্তি একটিমাত্র গাছও রোপণ করেন তবে তিনি ব্রহ্মসদনে যাবার অধিকার অর্জন করেন এবং তার তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সেই ফল ভোগ করে। ব্রহ্মনারদীয় পুরাণ, ১৩/৫২

বৃক্ষনিধন সম্পর্কে হিন্দুধর্মের মত :

যদি কেউ স্বীয় রন্ধনের উদ্দেশ্যে জ্বালানির জন্য সবুজ কাচাগাছ ভূপাতিত করে তবে তাকে চরম পতিত বলে গণ্য করা হবে। মনুস্মৃতি, ১১/৬৬

কোন বৃক্ষের বিস্তারিত শাখা বা যে সকল বৃক্ষ প্রয়োজনীয় ও উপকারী তার শাখা, কাণ্ড, মূল ছেদন করলে অপরাধের মাত্রানুযায়ী তার জরিমানা কুড়ি,চল্লিশ বা আশি কার্ষাপণ ( ষোলপণ বা এক কাহন )। কেউ পবিত্র স্মৃতি সৌধ, শ্মাশানভূমি, উপাসনাপ্রাঙ্গণ, পবিত্রস্থানের সীমানা নির্দেশকারী বৃক্ষ বা তার শাখা, কাণ্ড বা মূল ছেদন বা বিদীর্ণ করে তার জরিমানের হার উপর্যুক্ত জরিমানার দ্বিগুণ হবে। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, ২/২৩০

খনি, শিল্পকারখানা, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণের জন্য যন্ত্রচালিত উপায়ে বড়ো বড়ো বৃক্ষের উৎসাদন করবে তাদের একঘরে করা হবে। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, ২/২৩১

এমনকি পরিবেশ রক্ষায় নগর পরিষ্কারের কথা হিন্দু ঋষিগণ সোজা ভাষায় বলে গেছেন-

নগর বা গ্রামের আবাসিক এলাকা থেকে অনেকদূরে মলমূত্র, দেহ প্রক্ষালনের জল, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ, স্নানাগারের বর্জ্য জল অপসারিত করতে হবে। মনুস্মৃতি, ৪/১৫১

 তথ্যসুত্র- হিন্দু ধর্ম জিজ্ঞাসা।

প্রশ্ন: দৈবী ও অসুর স্বভাবীর লক্ষণ কি কি?


প্রশ্ন: দৈবী ও অসুর স্বভাবীর লক্ষণ কি কি?

Related image

উত্তর:
দৈবী তথা সদগুণযুক্তের লক্ষণগুলো হল-
১. নির্ভীকতা
২. চিত্তশুদ্ধি
৩. আত্মজ্ঞনিষ্ঠা
৪. কর্মে তৎপর
৫. দান
৬. ইন্দ্রিয় সংযম
৭. যজ্ঞ
৮. অধ্যয়ন
৯. তপস্যা
১০. সরলতা
১১. অহিংসা
১২. সত্য
১৩. অক্রোধ
১৪. ত্যাগ
১৫. শান্তি
১৬. পরনিন্দা বর্জন
১৭. জীবে দয়া
১৮. লোভহীনতা
১৯. মৃদুতা
২০. কুকর্মে লজ্জা
২১. অচাঞ্চল্য
২২. তেজস্বিতা
২৩. ক্ষমা
২৪. ধৃতি
২৫. শৌচ
২৬. অনভিমান

অসুর স্বভাবীর বৈশিষ্ট্য-

১. দম্ভ
২. দর্প
৩. অভিমান
৪. ক্রোধ
৫. নিষ্ঠুরতা
৬. অজ্ঞান
৭. আত্মশ্লাঘা
৮. অবিনয়নী
৯. ধনগর্ব
১০. ক্রূর
১১. কাম
১২. ক্রোধ
১৩. লোভ
১৪. হিংসা

সূত্র: গীতা, দৈবাসুর-সম্পদ-বিভাগযোগ