বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা


বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা
বিশ্বজিত পাল


বিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অধ্যয়নজনিত জ্ঞান। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বলতে বুঝায় বোধ, বুদ্ধি, অনুভব শক্তি, বোঝার বা বিচার করার ক্ষমতা। জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিকে বলা হয় জ্ঞানী। যে ব্যক্তি প্রকৃতি প্রাপ্ত বই, পুস্তক, পুঁথি ও শাস্ত্র পাঠ করে জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলে শাস্ত্রজ্ঞ। বেদ যিনি ভালোরূপে বোঝেন বা জানেন তাকে বলে প-িত বা বেদজ্ঞ। আর যিনি ব্রহ্ম, আত্মা, পরমাত্মা ইত্যাদি ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলা হয় পরমাত্মিক জ্ঞানী বা তত্ত্বজ্ঞ।

জ্ঞান সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন মান শূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয় বিষয়ে বিরক্তি, অহংকার, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিকে দুঃখ হিসেবে দেখা, পুত্র-স্ত্রী-গৃহের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে নিত্যের (ঈশ্বরের) প্রতি মনোনিবেশ করা, বঞ্চিত ও অবাঞ্ছিত বস্তু প্রাপ্তিতে সমভাবাপন্ন, জনবহুল স্থান বর্জন, নির্মল স্থান প্রিয়তা ও অনন্য নিষ্ঠা ও অপ্রতিহতা ভক্তির মাধ্যমে আমার সেবা করার নামই জ্ঞান। আর এ নিত্য, আধ্যাত্ম ও তত্ত্বজ্ঞান যিনি অনুসন্ধান করেন তিনিই জ্ঞানী। বাকিরা অজ্ঞানী। এতে স্পষ্ট যে, যে বিদ্যা আধ্যাত্ম, পারমাত্মিক, বা ঐশ্বরিক জ্ঞান দান করে না তা বিদ্যা নয়, অবিদ্যা।

অবিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অজ্ঞান বা মায়া। মায়া ঈশ্বরের ছায়া, তবে ঈশ্বর থেকে পৃথক নয়। যেমন- একজন মানুষের ছায়া তার থেকে পৃথক নয়। এটা ওই মানুষটির প্রতিবিম্ব যা তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে এবং দেখতে উল্টো দেখায়। তাই একটি ছায়া দেখে তার সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ছায়া মরীচিকার ন্যায় মায়ারূপ এক প্রতিবিম্ব, আদর্শ রূপ নয়। ময়লা থাকলে যেমন আয়নাতে নিজের রূপ দেখা যায় না, ঠিক তেমনি মায়ায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি ঈশ্বরের স্বরূপ দেখতে পায় না। এ মায়া বা অবিদ্যা পাঁচ প্রকার। যথা- তম, মোহ, মহামোহ, তামিস্র ও অন্ধতামিস্র।

তম:- সত্ত্ব, রজ, তম এ তিনটি প্রকৃতিগত গুণ থেকে তম সবচেয়ে নিকৃষ্টতম। তম গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রমাদ (ভ্রান্তি বা বিমূঢ়তা) আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে। তাই তারা কখনই ঈশ্বরকে জানতে পারে না।

মোহ:- প্রাকৃতিক জিনিসের প্রতি প্রবল আসক্ত থাকার নাম মোহ।

মহামোহ:- প্রত্যাশিত জিনিসটি না পাওয়া পর্যন্ত আসক্তি, পুনঃপুনঃ বৃদ্ধির নাম মহামোহ।

তামিস্র:- আবিধানিক অর্থে যে ক্রোধ জন্মায় তাকে তামিস্র বলে। শাস্ত্র মতে এটি একটি নরক বিশেষ। নিশাচর বা দুঃখের স্থান।

অন্ধতামিস্র:- নিবিড় অন্ধকার। এটি একটি ঘোর নরক বিশেষ। অত্যন্ত দুঃখের স্থান।

এ পাঁচ প্রকার অবিদ্যা প্রকৃতিজাত। তাই অবিদ্যার আরেক নাম প্রকৃতি। এই প্রকৃতি ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং অনাদি। সব বিকার এবং গুণ প্রকৃতি থেকে জন্ম। তাই এ প্রকৃতি বা অবিদ্যা এক মায়ারূপ বন্ধন যার অবস্থান ঈশ্বর ও মানুষের মাঝখানে। এটি একটি অস্বচ্ছ পর্দাও বটে যার কারণে মানুষ ঈশ্বরকে দেখতে না পেয়ে মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে ভুল পথে চলে। তারা ক্রমশ অন্ধকার থেকে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত নীচকুলে (পশু-পাখির যোনিতে) জন্ম গ্রহণ করে।

ত্রৈবিদ্যা বলতে ঋক, সাম, যজু নামক তিনটি বেদকে বুঝায়। যে ব্রাহ্মণ এই তিনটি বেদ অধ্যয়ন করেছেন তাকে বলা হয় ত্রিবেদি। যারা এ তিনটি বেদ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত তারা মনুষ্য সমাজে সম্মান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দুর্ভাগ্যবশত: বেদের অনেক বড় বড় প-িতরা বৈদিক জ্ঞানের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তারা কেবল আনুষ্ঠানিকতাবশত বেদ অধ্যায়ন করেন এবং ইন্দ্র, চন্দ্র, আদি দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়। তাই বেদান্ত সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন- ‘আমিই হলাম ত্রিবেদিদের একমাত্র লক্ষ্য।’ তাই যথার্থ ত্রিবেদি শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দের শরণাগত হন এবং তার প্রীতি উৎপাদনের জন্য বিশুদ্ধ ভক্তিযোগে নিয়োজিত থাকেন। এ ভক্তিযোগ শুরু হয় হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন ও কৃষ্ণতত্ত্ব জানার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। যথার্থ ত্রিবেদিরা জানেন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রই অর্থাৎ নামযজ্ঞই হচ্ছে সব যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ এবং একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পুরুষোত্তম। তাই তাকে জানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের পরম সার্থকতা।

ঈশ্বর নিরাকার। তিনি যখন নিরাকার, তখন তাকে বলা হয় ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সব জীব জগতের উপর প্রভূত্ব করেন। তাই ব্রহ্মের আরেক নাম ঈশ্বর। ঈশ্বর শব্দটির মানে হচ্ছে প্রভূ। এ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর যখন আমাদের কৃপা করেন, জগতের মঙ্গল করেন, তখন তাকে বলা হয় ভগবান।

ব্রহ্ম সব প্রাণের উৎস স্বরূপ। তার থেকেই জগতের সৃষ্টি। তার মধ্যেই জগতের অবস্থান। আবার তিনিই আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই ধর্মগ্রন্থ উপনিষদে বলা হয়েছে ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম।’ অর্থাৎ সবকিছু ব্রহ্ম বা ঈশ্বর। সুতরাং ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান দেব-দেবী এবং আত্মা আলাদা কিছু নয়। একই ঈশ্বরের ভিন্ন নাম ও পরিচয়। তাই শুধু দেব-দেবী কেন জীবকে সেবা করলেও ঈশ্বরের সেবা করা হয়।

নিরাকার হলেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যে কোন আকার ধারণ করতে পারেন। তাই তিনি সাকারও। ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুণ বা শক্তি যখন ভিন্ন ভিন্ন আকার লাভ করে তখনই তাকে বলা হয় দেব-দেবী। এককথায় ঈশ্বরের সাকার রূপই হচ্ছে দেব-দেবী। ঈশ্বরের বিদ্যা, জ্ঞান ও ধী শক্তির সাকার রূপই হলো সরস্বতী। তাই সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তিনি সবাইকে বিদ্যা দান করেন।

দেবী সরস্বতী যে বিদ্যা দান করেন তা ঈশ্বরেরই একটি গুণ। বেদ, পুরান প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে দেব-দেবীর পূজা করার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তাই বৈদিক মতে দেব-দেবীর পূজা করলে তারা সন্তুষ্ট হন। দেব-দেবীরা সন্তুষ্ট হলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন। সুতরাং দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে ঈশ্বরেরই পূজা করা হয়।

প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে পূজার মাধ্যমে আমরা সরস্বতী দেবীকে আহ্বান করি। স্তবস্তুতির মাধ্যমে তার প্রশংসা করি। তার কাছে কাম্য বস্তু অর্থাৎ বিদ্যা প্রার্থনা করি-

‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমহস্তুতো’

হে মহাভাগ সরস্বতী, বিদ্যাদেবী কমলনয়না, বিশ্বরূপা, বিশালাক্ষী আমাকে বিদ্যা দাও। তোমাকে নমস্কার।

বিদ্যাহীন ও জ্ঞানহীন ব্যক্তিরা মায়ামুখী। তাই তারা ঈশ্বর বিদ্বেষী। তারা ঈশরকে ভুলে গিয়ে মহামোহে আচ্ছন্ন হয়ে ঘোর নরকে প্রবেশ করে। কোনকালেই তারা ঈশ্বরকে পায় না।

হে মা সরস্বতী আমাদের বিদ্যা দান কর। আমরা যেন অহৈতুকী সেবার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরম ভক্ত হতে পারি। এ শুভলগ্নে তোমার কাছে এই একমাত্র মিনতি। কৃপা কর, দয়া কর মা এ অধম সন্তানদের। তোমর চরণে পুনঃপুনঃ অগণিত প্রণাম।

[লেখক : শিক্ষক।]

সপ্তাহের ০৭(সাত) দিনের নামকরণ কিভাবে হয়েছে।


Image result for সাত দিনের নাম

বছরের বার মাসের নাম যেমন রাখা হয়েছে নক্ষত্র মন্ডলে সূর্য্যের অবস্হান নির্নয় করে। ঠিক তেমনি সপ্তাহের দিনগুলি অর্থাৎ ০৭(সাত)টি দিনের নাম রাখা হয়েছে আমাদের সৌরমন্ডলে একমাত্র নক্ষত্রের নামে ০১দিন, পাচটি গ্রহের নামে ৫দিন ও একটি উপগ্রহের নামে ০১দিন। যেগুলি বিবরণ সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।

০১) বরিবারঃ – সূর্যের অপর নাম রবি – (আমাদের সূর্য মন্ডলের গ্রহগুলো একমাত্র অধিপতি নক্ষত্র সূর্য, অর্থাৎ যার থেকে সৌর মন্ডল সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুরা “সূর্য”কে দেবতা জ্ঞানে পূজো দিয়ে থাকেন। যে কোন মাঙ্গলিক কায্যে কিংবা যে কোন দেবতার পূজোর সময় পঞ্চদেবতার পুজো দিতে হয়। হিন্দুদের এই পঞ্চদেবতা তথা পাঁচজন দেবতার অন্যতম একজন হলো সূর্যদেব। হিন্দুধর্ম বিশ্বাস দৃঢভাবে বিশ্বাস করে আমাদের প্রিয় গ্রহ টিকে আছে সূর্যের অনুগ্রহে। অবশ্য আধুনিক বিজ্ঞানও তা অশ্বীকার করে না যে পৃথিবীর সমগ্র জ্বালানী শক্তির প্রধানতম উৎস এই সূর্য। হিন্দুধর্মাবলম্বীর ও অমুসিলম বিশ্বে বরিবারকে সপ্তাহের প্রথম দিন হিসাবে ধরা হয়।

০২) সোমবারঃ – চন্দ্রে অপর নাম সোম। সূর্য মন্ডলে পৃথিবী নামক গ্রহের একমাত্র উপগ্রহ হলো চন্দ্র। পৃথিবীতে চন্দ্রের প্রভাব দৃশ্যমান। জোয়ার-ভাটাই শুধু নয়, পৃথিবী নাম গ্রহের জীব জগতের উপর চন্দ্রে প্রভাব অনেক বেশী মাত্রায় পড়ে। হিন্দু পরিবারের সন্তান জন্ম লাভের সময় ঠিকুজি প্রস্তুত করার সময় চন্দ্রে প্রভাবের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। হিন্দু জ্যোতিশাস্ত্র বিদ গনের মতে চন্দ্রের প্রভাব বেশী হলেও একে ক্ষতিকর হিসাবে বিবেচনা করে না।

০৩) মঙ্গলবারঃ – মঙ্গল গ্রহের নামের সপ্তাহের একটি দিন রাখা হয়েছে। মঙ্গল সৌরমন্ডলের শক্তিশালী গ্রহ, পৃথিবীর ভুমন্ডলের সাথে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। পৃথিবীর উপর এই গ্রহটির প্রভাব রয়েছে।
০৪) বুধবারঃ –বুধ গ্রহের নামের সপ্তাহের একটি দিনের নাম করন করা হয়েছে। বুধ গ্রহের ইংরেজী নাম Mercury বা মার্কিউরী। বুধ হচ্ছে সূর্যের নিকটতম গ্রহ। সূর্যের খুব কাছের এবং সেই সাথে সৌরজগতের সবচাইতে ক্ষুদ্রতম গ্রহ হচ্ছে এই বুধ গ্রহ। এই কারণে বুধের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও অনেক কম, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

০৫) বৃহস্পতিবারঃ – সৌর মন্ডলের সর্বাপেক্ষা বড় গ্রহ বৃহস্পতির নামে সপ্তাহের পঞ্চম দিনের নামকরণ করা হয়েছে। এটি সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পঞ্চম এবং আকার আয়তনের দিক দিয়ে সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ হচ্চছ আমার বৃহস্পতি। সূর্যের সব কটি গ্রহের ভর সমস্টির প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ ভরই হচ্ছে বৃহস্পতির। আয়তনের কারনে বৃহস্পতিকে গ্রহরাজ বলা হয়। হিন্দু পুরানে বৃহস্পতিকে দেবগুরু তথা সকল শুভকর্মের ও শুভ ভাবনার গুরু হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বৃহস্পতি গ্রহকে ইংরেজীতে বলা হয় Jupiter (জুপিটার)। রোমানরা গ্রহটির নাম রেখেছিল পৌরাণিক চরিত্র জুপিচারের নামে। জুপিটার রোমান পুরাণের প্রধান দেবতা। রোমান ভাষায় জুপিটার শব্দের অর্থ হচ্ছে “আকাশের পিতা।”

০৬) শুক্রবারঃ – ‘শুক্র গ্রহ’ (Venus) সৌরজগতের দ্বিতীয় গ্রহ। কারণ সূর্য থেকে দূরত্বের দিক থেকে হিসেব করলে সূর্যের একেবারে কাছের গ্রহ হচ্ছে বুধ গ্রহ, আর এর পরই শুক্র গ্রহের অবস্থান। বুধ আর পৃথিবীর মতই এই গ্রহটিও কঠিন পদার্থ দিয়ে তৈরি বলে একে পার্থিব গ্রহ বলা হয়। পৃথিবী এবং শুক্রের মধ্যে গাঠনিক উপাদান, আকার আকৃতি, মুক্তি বেগ এবং অন্যান্য মহাযাগতিক আচার আচরণে অনেক মিল রয়েছে বলে শুক্রকে পৃথিবীর বোন গ্রহ বা ‘Sister Planet’ বলে। এটি এমন একটি গ্রহ যাকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন তাঁরা নামে ডাকা হয়। ভোর রাতের আকাশে শুকতারা আর সন্ধ্যার আকাশের সন্ধ্যাতারা একই বস্তু, যা সত্যিকার অর্থে একটি গ্রহ, আর এই গ্রহটিই হচ্ছে শুক্রগ্রহ। অনেক যায়গায় এই গ্রহটি যখন ভোরের আকাশে উদিত হয় তখন লুসিফার বা শয়তান নামেও ডাকা হয়ে থাকে। অন্যদিকে হিন্দু পুরানে শুক্রকে দৈতগুরু হিসাবে দেখানো হয়েছে। সুতরাং শুক্রগ্রহ তথা দৈত্যগুরুর নামে সপ্তাহের ষষ্ঠ দিনের নামকরণ করা হয়েছে।

০৭) শনিবারঃ – শনি গ্রহদেবতা হিসেবে হিন্দু পুরানে ও শাস্ত্রে সবিশেষ পরিচিত। হিন্দু সম্প্রদানের নবজাতকের ঠিকুজি তৈরীর করার সময় জ্যোতিষশাস্ত্রে জন্ম ছকে এর অবস্থান বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। শনি দ্বাদশে, জন্মরাশিতে ও দ্বিতীয়ে অবস্থানকালে সাড়ে সাত বছর মানুষকে প্রচণ্ড কষ্ট দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় শনি গ্রহ রূপে গুণে অসামান্য। তার কারণ, এই গ্রহকে ঘিরে থাকা চাকতিগুলি; যাকে আমরা বলি ‘শনির বলয়’। তুষারকণা, খুচরো পাথর আর ধূলিকণায় সৃষ্ট মোট নয়টি পূর্ণ ও তিনটি অর্ধবলয় শনিকে সর্বদা ঘিরে থাকে। শনি দৈত্যাকার গ্রহ; এর গড় ব্যাস পৃথিবীর তুলনায় নয় গুণ বড়। এর অভ্যন্তরভাগে আছে লোহা, নিকেল এবং সিলিকন ও অক্সিজেন মিশ্রিত পাথর। তার উপর যথাক্রমে একটি গভীর ধাতব হাইড্রোজেন স্তর, একটি তরল হাইড্রোজেন ও তরল হিলিয়াম স্তর এবং সবশেষে বাইরে একটি গ্যাসীয় স্তরের আস্তরণ।শনি গ্রহের রং হালকা হলুদ। এর কারণ শনির বায়ুমণ্ডলের উচ্চবর্তী স্তরে অবস্থিত অ্যামোনিয়া ক্রিস্টাল। শনির ধাতব হাইড্রোজেন স্তরে প্রবাহিত হয় এক ধরনের বিদ্যুত প্রবাহ। এই বিদ্যুৎ প্রবাহ থেকেই শনির গ্রহীয় চৌম্বক ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে।
হিন্দুদের পুরানে শনিকে দেবতা এবং একে নিয়ে বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ্য আছে। শনি গ্রহের নাম, এবং বিচিত্র গ্রহ। পুরানে উল্লেখ্য শনিদেবের দৃষ্টি যে দিকে পড়ে সেটি ভস্ম হয়ে যায়। সেই শনিগ্রহের নামে সপ্তাহের শেষ দিন তথা সপ্তম দিনের নামকরণ করা হয়েছে। সংকলনেঃ অরুন চন্দ্র মজুমদার।

দোলযাত্রা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা


অধ্যাপক হীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস
হি ন্দু শাস্ত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বাদশ প্রকার যাত্রার কথা বিধৃত রয়েছে। তার মধ্যে দোলযাত্রা অন্যতম। আগামী ৫ মার্চ এদেশে হিন্দু সম্প্রদায় এই উত্সব পালন করবেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আগমনের কোন কোনটি যাত্রা হিসেবে বর্ণিত, যেমন—ঝুলনযাত্রা, রথযাত্রা, রাসযাত্রা ইত্যাদি। আবার, কোন কোনটিতে যাত্রা উল্লেখিত থাকে না, যেমন—জন্মাষ্টমী। ভগবান যখন মন্দির থেকে ভক্তগণের মধ্যে নেমে আসেন, তখন তাকে বলে যাত্রা।
সনাতন ধর্মে প্রায় প্রতিটি উত্সব প্রকৃতি সম্বন্ধীয়। কেননা, নিরাকার—নিরাবয়ব পরব্রহ্ম যখন ভক্তের আকিঞ্চনে এক থেকে বহু হতে চাইলেন, তখন তিনি সাকারে প্রকাশিত হলেন। প্রথমেই তিনি পুরুষ ও প্রকৃতিতে বিভাজিত হলেন। এই পুরুষই আবার ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব রূপে বিশ্বচরাচর সৃজন-পালন ও প্রলয় করছেন। আর, প্রকৃতি সেই সৃষ্টির আদিশক্তি বা আদ্যাশক্তি। এই অখণ্ড আদ্যাশক্তিই জগতে ক্রিয়াশীলা রয়েছেন। তিনিই নানারূপে প্রকাশিতা হন। তিনিই সমরে সিংহবাহিনী, ভোগে ভবানী, জগত্পালনে জগদ্ধাত্রী, অসুর নিধনে করালী কালী, সম্পদে লক্ষ্মী, জ্ঞানে সরস্বতী। আবার পুরাণে তিনি হ্লাদিনী শক্তিরূপে বর্ণিতা। শক্তিমানের শক্তি তিনি, তিনিই বিশ্ববিধাত্রী। শক্তি ছাড়া শক্তিমান হয় না এবং শক্তিমান ছাড়া শক্তি থাকে না। একের মধ্যে দুই—দু’য়ে মিলে এক। একের মধ্যে বহু, বহু মিলে এক। সুতরাং, শক্তিমানের সাথে তার শক্তি মিলিত হতে চাইবে সেটাইতো স্বাভাবিক। প্রকৃতির প্রধান দৈবীশক্তি বা দেবতা—সূর্য। সূর্যের তথা প্রকৃতির দোলাচল বা গতাগতি দৃষ্টে দুটি উত্সব বা যাত্রা আখ্যায়িত। যথা : ঝুলনযাত্রা ও দোলযাত্রা। এ দুটি যাত্রা দুটি অয়ন-এর প্রারম্ভিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়। যথা : দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ। কাল বিভাজনে বছর একটি ইউনিট হিসেবে বিভাজিত। বছরের শ্রাবণ থেকে পৌষ- এ ছয় মাস হলো দক্ষিণায়ন (যখন সূর্য পৃথিবীর বিষুব রেখার দক্ষিণ অয়ন বা দিকে লম্বভাবে কিরণপাত করে) এবং মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ (যখন সূর্য বিষুব রেখার উত্তরদিকে লম্বভাবে বা খাড়াখাড়িভাবে কিরণপাত করে)। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষীয় একাদশী তিথি থেকে পূর্ণিমাতে হয় ঝুলনযাত্রা এবং ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমাতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ঝুলনযাত্রায় আহ্নিকগতির নিয়মে সূর্যের পূর্ব-পশ্চিমে গতাগতি নিরিখে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকাকে পূর্বদিকে মুখ করে ঝুলনমঞ্চে বসিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে দোল দেয়া হয়। আর, বার্ষিক গতির নিয়মে সূর্যের বছরে একবার দক্ষিণদিক থেকে উত্তরদিকে এবং একবার উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে গতাগতি নিরিখে ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকাকে দক্ষিণমুখ করে দোলমঞ্চে বসিয়ে উত্তর-দক্ষিণে দোল দেয়া হয়।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, এ সময়েই বসন্ত উত্সব হয়, হোলি উত্সব বা রং খেলা যার প্রধান আকর্ষণ। এর সাথে মহাপুণ্য আর একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, তাহলো মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব-এর আবির্ভাব তিথি। তাই, এ ফাল্গুনী পূর্ণিমায় উদ্যাপিত হয় দোলযাত্রা (দোলপূর্ণিমা), গৌর পূর্ণিমা, বসন্ত উত্সব (হোলি উত্সব) ইত্যাদি।
শীতের রুক্ষতা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় তথা ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সময়ে মানবদেহে রক্তের ৩টি উপাদান-আয়রন, ক্যালসিয়াম ও মার্কারির অভাব ঘটে বলেই দুর্বল দেহে চর্মরোগের তথা একটি বিশেষ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে যা কালক্রমে ‘বসন্ত রোগ’ নামে খ্যাত হয়েছে। তত্কালে, আধুনিক চিকিত্সা ছিল না বলেই প্রতিরোধক হিসেবে আবীর গায়ে মাখানো হতো। আবীরে তথা লাল রং-এ উক্ত তিনটি উপাদান বিদ্যমান থাকে। নিজের গায়ে নিজে অনেক সময় রং মাখতে অসুবিধা হয় বলে একে অপরের গায়ে রং মাখানোর বিষয়টি চালু হয়। কালক্রমে আনন্দ ও হাসি ঠাট্টার মধ্য দিয়ে রং দেয়া বা মাখানোর রীতিতে পরিণত হয়, যা হোলি খেলা উত্সব হিসেবে প্রচলিত হয়ে আছে। আর, এতে দিনে দিনে যুক্ত হতে থাকে নানা আনুষ্ঠানিকতা যা বসন্ত উত্সব নামে প্রচলিত হয়ে চলছে। কালপ্রবাহে কখনও পঞ্চমীতে, কখনও একাদশীতে, আবার কখনও পূর্ণিমাতে বসন্তোত্সব হতো।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, শ্রীকৃষ্ণকে বোঝার জন্যে গভীর অনুধ্যানের প্রয়োজন রয়েছে। শ্রীরাধিকার বিষয়টি মূলত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বিধৃত রয়েছে। সুতরাং শ্রীকৃষ্ণকে সম্যক অনুধ্যানের চেষ্টা করা হলে অবতারতত্ত্ব উপলব্ধিতে আনতে হবে। পরব্রহ্ম থেকে পুরুষ-প্রকৃতির বিভাজিত প্রকাশ এবং পুরুষই ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব—এ ত্রিরূপে প্রকটিত। বিষ্ণুই নারায়ণ। শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মধারী বিষ্ণুই ষড়বিধ অবতারে যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। যথা : যুগাবতার (চার যুগে চার অবতার), মন্বান্তর অবতার (চৌদ্দটি মন্বন্তরে চৌদ্দ অবতার)। এছাড়া, লীলাবতার, গুণাবতার, পুরুষাবতার, শক্তাবেশ অবতার রয়েছে। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি-এ চার যুগে বা চতুর্যুগের আয়ুষ্কাল ৪৩,২০,০০০ বছর। এর মধ্যে দ্বাপর যুগে বিষ্ণু অবতাররূপে আবির্ভূত হন শ্রীকৃষ্ণরূপে। অর্থাত্ সেই একইজন যুগে যুগে নানাভাবে নানারূপে আবির্ভূত হন। দ্বাপরে তিনি পূর্ণাবতার শ্রীকৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হন। তিনি বৃন্দাবন লীলা, মথুরালীলা, কুরুক্ষেত্র লীলা ও দ্বারকালীলায় অবতীর্ণ হন। তিনি মহাভারত বা ইতিহাসের শ্রীকৃষ্ণ, গীতার শ্রীকৃষ্ণ, পুরাণের শ্রীকৃষ্ণ এবং বৈষ্ণব আগমের শ্রীকৃষ্ণরূপে লীলারত থাকেন ১২৫ বছর। বৃন্দাবন লীলায় শ্রীকৃষ্ণের মাত্র ১০ বছর ৮ মাসের বালক বয়সী লীলা, যা অতিরঞ্জিত করা হয়েছে বর্ণনায়। একটি আরাধনা বা সাধনার ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণের লীলা মাধুর্য যা গানে/বর্ণনায় বিকৃত হয়ে গ্লানিকর একটি বোধভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
সবশেষে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের এই পূর্ণিমাতেই আবির্ভাবের বিষয়টি ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে আরও মহিমান্বিত করেছে। বৈষ্ণবীয় অধ্যাত্ম অনুধ্যানে পরিকীর্তিত যে, আরাধক/আরাধিকা কি করে তার নামকীর্তন ও আরাধনা করেন তা নিজেই আচরণ করে দেখাতে তথা রাধার ঋণ পরিশোধের সুকল্যাণ অভীপ্সায় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যরূপ পরিগ্রহ করেন। তিনি ‘বাহিরেতে রাধা অঙ্গ অন্তরে কৃষ্ণ’—হয়ে তথা রাধাকৃষ্ণের মিলিত বিগ্রহরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন নদীয়ানগরে। তাই, বলা যায়, এই পূর্ণিমাটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণিমা। কেননা, পার্থিবভাবে ঋতুর শ্রেষ্ঠ বসন্ত, মাসের শ্রেষ্ঠ ফাল্গুন, পক্ষ শ্রেষ্ঠ শুক্লপক্ষ, তিথি শ্রেষ্ঠ পূর্ণিমা, নক্ষত্র শ্রেষ্ঠ পূর্বফল্গুনী। মহাপ্রভুর এ আবির্ভাবের দিনটি হলো সর্বমঙ্গলময়। তাই, বৃন্দাবন দাস ঠাকুর বলেছেন—অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে যত আছে সুমঙ্গল সেই পূর্ণিমায় আসি মিলিলা সকল। সেদিন ছিল চন্দ্রগ্রহণ। প্রকৃতি হলো উদ্ভাসিত শোভাময়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা হলো— (দোলযাত্রা) মহিমান্বিত শ্রীগৌরচন্দ্রের আবির্ভাবে।

হিন্দুর পরিভাষা- হিন্দু নাম করণের অভিপ্রায় কি, কেন হিন্দু বলা হয়, এই সম্পর্কে সনাতন সমাজের সিদ্ধান্ত কি ছিল?  


226969_482015691852200_899036009_n
হিন্দুর পরিভাষা নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় হিন্দু মহাসভা, অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা, স্বামী বিবেকানন্দ, সনাতন ধর্মসভার সিদ্ধান্তে যুক্তি, প্রামাণ্য এবং বিচার বিশ্লেষনের মাধ্যমে ‘হিন্দু’ নামের যথার্থতা নির্ণয় হয়। কে হিন্দু???

হিন্দুর পরিভাষা-
বেদ-স্মৃতি-পুরাণে হিন্দু শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই। পারসিকদের ‘হপ্তহিন্দু’ হইতে ভারতীয় আর্য্যদিগের নাম হয়-হিন্দু। এই নাম পারসিকদের দেওয়া। হিন্দু শব্দ ইংরাজিতে ইণ্ড্‌(Ind)হয়, তাহা হইতে ইণ্ডিয়া(India)এবং ইণ্ডিয়ান(Indian)শব্দ উৎপন্ন। সমগ্র ভারতবর্ষ আর্যহিন্দুর অধিকারভুক্ত থাকায়, এই উপমহাদেশ বিদেশীর নিকট নাম গ্রহণ করে-হিন্দুস্থান। সেই প্রাচীন কালে এই উপমহাদেশের আদিবাসী অনার্যগণ এবং দ্রাবিড়গণ অবশেষে আর্য-সংস্কৃতি-সভ্যতা গ্রহণে সুসংস্কৃত হইয়া আর্যহিন্দুসমাজে স্থান পায়। তখন আর আর্য-অনার্যের ভেদ থাকে না। সকলেই এক হিন্দুনামে পরিচিত হয়। পরবর্তীকালে বহির্ভারত হইতে শক, হুন, গ্রীক, যবন(Ionian), মোগল, পাঠান, মুসলমান প্রভৃতি বিভিন্ন জাতি ভারতবর্ষে প্রবেশ করে এবং এই দেশের অধিবাসী হয়। কেহ কেহ বলেন যে, ঐ সব বহিরাগত জাতির কতকাংশ কালক্রমে আর্যহিন্দুর সংস্কৃতি-সভ্যতা গ্রহণ করিইয়া হিন্দুসমাজভূক্ত হইয়া যায়। যথা- শক, হুন,গ্রীক,যবন ইত্যাদি। এই কথা স্বীকার করিলেও অবশিষ্ঠাংশ যে এই দেশে নিজেদের স্বাতন্ত্র রক্ষা করিয়া আসিতেছেন ইহা অবিসংবাদী সত্য। অতএব, বর্তমান পটভূমিকায় ভারতের অধিবাসীদের ভিতর হিন্দু-অহিন্দু প্রশ্ন স্বভাবতঃ উঠে। সেই কারণ, হিন্দু নামের পরিভাষা সম্পর্কে কিছু আলোচনা অপরিহার্য হইয়া পড়ে।

#সিদ্ধান্ত- ১) হিন্দুমহাসভা বলেন- ভারতে উদ্ভুত কোন ধর্মে যিনি বিশ্বাস করেন, তিনিই হিন্দু। এই সংজ্ঞা ব্যাপক। ভারতের অপ্র নাম, হিন্দুস্থান। কাজেই হিন্দুস্থানে উৎপন্ন সকল ধর্মকেই হিন্দুধর্ম বলিলে একেবারে মিথ্যা হয় না। তবে আর্যহিন্দুর আদি ধর্মগ্রন্থ-বেদ। বেদ-প্রচারিত ধর্ম, বৈদিক ধর্ম। এই বৈদিক ধর্ম ব্যতীত বৌদ্ধধর্ম, জৈন ধর্ম এবং শিখ ধর্মও ভারতে উদ্ভুত। হিন্দুমহাসভার ঐ সংজ্ঞানুসারে বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখধর্মাবলম্বিগণও হিন্দু। যদিও এই তিন ধর্মের উদ্ভব বৈদিক ধর্ম হইতে, তথাপি বেদকে এবং বৈদিক সংস্কৃতিকে সম্পুর্ণ গ্রহণ না করায় তাহাদের লক্ষ্য ও লক্ষ্যাভিমুখী ভাবধারা স্বতন্ত্র হইয়া পড়ে এবং শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কার বিশিষ্ট রূপ ধারণ করে। এই অবস্থায় বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বীদিগকে হিন্দু সংজ্ঞার অন্তর্গত করিলে তাঁহাদের ঐ চিরানুষ্ঠিত অ চিরাদৃত বৈশিষ্ট্যধাকে অবজ্ঞা করা হয়। সেই হেতু ইহা যুক্তিসিদ্ধ নহে।

#সিদ্ধান্ত- ২) অখিল ভারতীয় হিন্দুমহাসভা আর এক পরিভাষা নির্দেশ করিয়াছেন- সিন্ধুনদ হইতে সাগর পর্যন্ত সুবিস্তৃত ভারতভূমিকে যিনি পিতৃভূমি ও পূণ্যভূমি বলিয়া স্বীকার করেন, তিনিই হিন্দু।
এই সংজ্ঞাটি আরো ব্যাপক নিঃসন্দেহ। পিতৃভূমির অর্থ- পিতৃপুরুষের আবাস। ভারতবর্ষে বহু মুনি,ঋষি, মহাপুরুষের আবির্ভাব; তাই ইহা পুণ্যভূমি। যাঁহাদের পিতৃভূমি এই ভারতবর্ষ, তাঁহারা যদি ইহাকে পুণ্যভূমি বলিয়া গ্রহণ করেন, তাহা হইলে এই সংজ্ঞানুয়ায়ী তাঁহারা হিন্দু। এখানে শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কার এই সবের কথা কিছু নাই। অতি সহজ। ধরা যাক্‌-বাঙ্গাল দেশ। এই দেশে বর্তমানকালীন অধিকাংশ মুসলমানের প্রপিতামহ অথবা তদূর্ধ পিতৃপুরুষ ছিলেন হিন্দু। পশ্চাৎ ইসলামের আওতায় ধর্মান্তরিত হন। ভারত তাহাদের পিতৃভূমি, ইহা নির্বিরোধী সত্য। এখন তাঁহারা যদি বহির্ভারতে মক্ক-মদিনা প্রভৃতি স্থানকে পূণ্যভূমি মনে না করিয়া সত্যসত্যই ভারতকে পুণ্যভুমি বলিয়া গ্রহণ করেন, তবে এই সংজ্ঞানুয়ায়ী তাঁহারাও হিন্দু। এইভাবে বাঙ্গালী খৃষ্টয়ানগণও হিন্দু হইতে পারেন। কিন্তু এই কথা ভুলিলে চলিবে না যে, সংস্কারের প্রয়োজন আছে। প্রত্যেক জাতিরই শাস্ত্রবিহিত সংস্কার আছে। কোন জাতির জাতিত্ব লাভ করিতে সেই জাতির শাস্ত্রবিহিত সংস্কারের অনুষ্ঠান আবশ্যক। অতএব, কেবলমাত্র ভারতকে পিতৃভূমি ও পূণ্যভুমি বলিয়া গ্রহণ করাই হিন্দু হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নহে-আর্যহিন্দুর বেদবিহিত সংস্কারের দ্বারা সংস্কৃত হওয়াও প্রয়োজন।

‪#‎সিদ্ধান্ত‬– ৩) হিন্দুর আরেক পরিভাষাও লক্ষিত হয়-হিংসয়া দূরতে চিত্তং তেন হিন্দুরিতীরিতঃ। অর্থাৎ- হিংসাতে যাহার চিত্ত ব্যথিত হয়, সেই হিন্দু। এই সংজ্ঞা যে আরো ব্যাপক তাহা সহজে বোধগম্য। এখানে ভারতবর্ষের নাম পর্যন্ত নাই। যে কোন দেশবাসী, যে কোন মতাবলম্বী, যদি মাত্র অহিংসা-মন্ত্র কায়মনোবাক্যে গ্রহণ করেন, তিনিই হিন্দু। হিংসায় চিত্ত ব্যথিত হয়, এমন মানুষ সকল দেশেই আছে। বলা বাহুল্য, তাঁহাদের সকলকে হিন্দু নামে অভিহিত করা কষ্টকল্পনা মাত্র।
#সিদ্ধান্ত- ৪)আরো এক হিন্দু-পরিভাষা দৃষ্টিগোচর হয়- যিনি বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থায় নিষ্ঠাবান, গোভক্ত, বেদকে মাতৃতুল্য জ্ঞান করেন, দেব-মূক্তির অবজ্ঞা করেন না, সকল ধর্মকে সমাদর করেন, পূনর্জন্মবিশ্বাসী, মুক্তিপ্রয়াসী এবং সর্ব জীবকে আত্মবৎ মনে করেন, তিনিই হিন্দু। (২) এই সংজ্ঞাটি সুন্দর। তবে একটা কথা। বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা সমর্থন করেন না, এমন সম্প্রদায় হিন্দু জাতির ভিতর আছে। তাঁহাদিগকে বাদ দিলে হিন্দু জাতি অযথা সঙ্কুচিত হইয়া পড়ে। তাই এই সংজ্ঞাটি কিছু সংকীর্ণ।
#সিদ্ধান্ত- ৫)সনাতন ধর্ম-সভার এক বৈঠকে স্বর্গীয় লোকমান্য শ্রীবালগঙ্গাধর তিলক হিন্দুর পরিভাষা সম্বন্ধে বলিয়াছেন- বেদে স্বপ্রমিত ও স্বতঃসিদ্ধ সত্যরাজি নিহিত, এই কথা যিনি বিশ্বাস করেন তিনি হিন্দু। এই সংজ্ঞা ব্যাপকতা অথবা সঙ্কীর্ণতা দোষে দুষ্ট নহে। আর্য-শিক্ষা-সভ্যতার চরম বিকাশ বৈদিক সাহিত্য। বেদে যে সকল শাশ্বত সনাতন সত্য নিহিত, তাহা সর্বকালে সর্বদেশে প্রযোজ্য। আর্যহিন্দু বেদপন্থী। রুচি-প্রকৃতির বোধ-শক্তির তারতম্যহেতু পরবর্তীকালে হিন্দুজাতির অভ্যন্তরে নানা মতবাদের ফলে নানা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হইলেও মূলতঃ সকলেই বেদানুগামী। প্রাচীন ইতিহাসে দেখা যায় যে, অনার্য-দ্রাবিড় বেদ-গ্রহণে বৈদিক সংস্কারে সুসংস্কৃত হইয়া আর্যহিন্দু-সমাজে স্থান পাইয়াছিল। অপর দিকে, ভগবান শ্রীবুদ্ধ স্বং হিন্দুর দশাবতারের অন্যতম হইয়াও হিন্দু-সমাজে স্থান পান নাই, যেহেতু তিনি বেদকে গ্রহণ করেন নাই। যিনি বেদকে গ্রহণ করেন, তিনিই হিন্দু – এই পরিভাষাটি সুষ্ঠু ও সমীচীন। কেহ কেহ মনে করেন যে, ব্রাহ্মধর্মাবলম্বীগণ হিন্দু-সংজ্ঞার বহির্ভূত। ইহা ঠিক নহে। ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায় বেদের জ্ঞানকাণ্ডের বা উপনিষদের সার সত্য গ্রহণ করিয়া নিরাকার সগুণ ব্রহ্মের উপাসনা প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজের পরিপোষ্টা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার রচিত ‘ব্রাহ্মধর্ম’ গ্রন্থে উপনিষদ্‌কে বিশেষভাবে মানিয়া লয়ে। সেই কারণ, বলা যাইতে পারে যে, ব্রাহ্মসম্প্রদায়ও হিন্দু। আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমৎ স্বামী দয়াদন্দ সরস্বতী তাঁহার ‘সত্যার্থ-প্রকাশ’ গ্রন্থে বেদের সংহিতা ও মন্ত্রভাগ এবং বেদের কর্মকাণ্ডন্তর্গত যাগযজ্ঞের কিয়দংশ গ্রহণ করিয়াছেন। সেই নিমিত্ত আর্যসমাজিগণও হিন্দু। ব্রাহ্মণ্যসমাজ বেদের সংহিতাভাগ, কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড সব মানিয়া লুইয়াছেন; তবে বলেন, যে বৈদিক যাগযজ্ঞ একালের উপযোগী নয়। অধুনা সাধারণতঃ ব্রাহ্মণ্যসমাজকেই হিন্দু নামে অভিহিত করা হয়। কিন্তু উদার দৃষ্টিতে আর্যসমাজী এবং ব্রাহ্মসমাজীও হিন্দু, কারণ তাঁহারাও বেদের কোন-অংশ-না -কোন-অংশ গ্রহণ করেন।