নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র


বেতার সম্প্রচারক, অভিনেতা, নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ( জন্মঃ- ৪ অগস্ট, ১৯০৫ – মৃত্যুঃ- ৩ নভেম্বর, ১৯৯১ )

পঙ্কজকুমার মল্লিক ও কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ১৯৩০-এর দশক থেকে সুদীর্ঘকাল অল ইন্ডিয়া রেডিওয় বেতার সম্প্রচারকের কাজ করেছেন। এই সময় তিনি একাধিক নাটক রচনা ও প্রযোজনাও করেন।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণের সর্বাধিক পরিচিতি তাঁর মহিষাসুরমর্দিনী নামক বেতার সঙ্গীতালেখ্যটির জন্য। ১৯৩১ সাল থেকে অদ্যাবধি মহালয়ার দিন ভোর চারটের সময় কলকাতার আকাশবাণী থেকে এই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ এই অনুষ্ঠানের ভাষ্য ও শ্লোকপাঠ করেছেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ একাধিক নাটকে অভিনয় ও পরিচালনার কাজও করেন। ১৯৫৫ সালে নিষিদ্ধ ফল নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও রচনা করেছিলেন তিনি।

প্রথম জীবন ও শিক্ষা
১৯০৫ সালের ৪ অগস্ট উত্তর কলকাতায় মাতুলালয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন রায়বাহাদুর কালীকৃষ্ণ ভদ্র ও মা ছিলেন সরলাবালা দেবী। পরবর্তীকালে ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর কেনা ৭, রামধন মিত্র লেনে উঠে আসেন তাঁর পরিবারবর্গ। কালীকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন বহুভাষাবিদ। তিনি ১৪টি ভাষা জানতেন। নিম্ন আদালতে দোভাষীর কাজ করতেন তিনি। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের জগতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক পরিচিত ব্যক্তিত্ব। কালীকৃষ্ণ পুলিশ কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী কালীচরণ ঘোষের দ্বিতীয় সন্তান সরলাবালা দেবীকে বিবাহ করেন। ১৯২৭ সালে তিনি “রায়বাহাদুর” খেতাব পান। কালীকৃষ্ণের দুই পুত্র জন্মায় – ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ১৯২৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৮ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন।

কর্মজীবন
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ একাধিক ধ্রুপদি কাহিনিকে বেতার নাট্যের রূপ দেন। ১৯৩০-এর দশকে তিনি যোগ দেন অল ইন্ডিয়া রেডিওয়। এই সময় থেকেই দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেবী দুর্গার পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে দুই ঘণ্টার সঙ্গীতালেখ্য মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এই অনুষ্ঠানটির গ্রন্থনা করেছিলেন বাণীকুমার এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভাষ্য ও শ্লোকপাঠ করেন। আজও দুর্গাপূজা শুরু হয় এই অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মেস নং ৪৯ সহ একাধিক নাটক রচনা করেন। বিমল মিত্রের সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসটিকে তিনি মঞ্চায়িত করেছিলেন। ১৯৫২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সুবর্ণ গোলক গল্পটিকে তিনি নাট্যায়িত করেন।

উত্তরাধিকার
আজও দুর্গাপূজার সূচনায় মহালয়ার দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটির রেকর্ড আকাশবাণী, কলকাতা থেকে সম্প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয় যে, ১৯৭৬ সালে আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ বীরেন্দ্রকৃষ্ণের পরিবর্তে জনপ্রিয় অভিনেতা উত্তম কুমারকে দিয়ে অন্য একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করলে, তা জনমানসে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। আকাশবাণী কর্তৃপক্ষকে সেই অনুষ্ঠানের পরিবর্তে মূল মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানটিই সম্প্রচারিত করতে হয়।

২০০৬ সালের মহালয়ার দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্যা সুজাতা ভদ্র সারেগামা ইন্ডিয়া লিমিটেডের তরফ থেকে তাঁর পিতার এই মহান কীর্তির রয়্যালটি স্বরূপ ৫০,৯১৭ টাকার একটি চেক পান।

রচনাবলি
হিতোপদেশ, ১৯৪৮
বিশ্বরূপ-দর্শন, ১৯৬৩
রানা-বেরানা, ১৯৬৫
ব্রতকথা সমগ্র, ১৯৮৫
শ্রীমদ্ভাগবত: সম্পূর্ণ দ্বাদশ স্কন্দ, উপেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রীর সঙ্গে, ১৯৯০
নাটক
ব্ল্যাকআউট
সাত তুলসী, ১৯৪০

পূজা এলেই যেন হৃদয়তন্ত্রীতে আপনেই বেজে ওঠে সেই চিরপরিচিত সুর-

“রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিশো জহি………… ”
২০০৬ সালের মহালয়ার দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্যা সুজাতা ভদ্র সারেগামা ইন্ডিয়া লিমিটেডের তরফ থেকে তাঁর পিতার এই মহান কীর্তির রয়্যালটি স্বরূপ ৫০,৯১৭ টাকার একটি চেক পান।
আজকের এই দিনে তাকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।

সৌজন্যে- প্রতাপ কুমার সাহা।

Advertisements

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়


সাহিত্যিক
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ( জন্মঃ- ২২ জুলাই, ১৮৪৭ – মৃত্যুঃ- ৩ নভেম্বর, ১৯১৯ )
(সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত শ্যামনগরের কাছে রাহুতা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বিশ্বম্ভর মুখোপাধ্যায়।

কর্মজীবন
ত্রৈলোক্যনাথ চুঁচুড়ার ডাফ সাহেবের স্কুলে এবং ভদ্রেশ্বরের কাছে তেলিনীপাড়া বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সংসারের অসচ্ছল অবস্থার জন্য ১৮৬৫ সালে বাড়ি থেকে রোজগারের জন্য চলে যান এবং নানা দেশ ভ্রমণ করেন। প্রথমে দ্বারকা (বীরভূম) উখড়া (রাণীগঞ্জ) এবং শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রভৃতি স্থানে শিক্ষকতার কাজ করেন। কিন্তু কোথাও কাজ পছন্দ না হওয়ায় কটকে চলে যান। ১৮৬৮ সালে কটকে জেলার পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর হন। কটকে ওড়িয়া ভাষা শিখে ওড়িয়া ‘উৎকল শুভকরী’ নামে মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। পুলিশের চাকরি করাকালীন বিখ্যাত স্যার উইলিয়াম হান্টার সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হন। হান্টার সাহেব এঁর কথাবার্তা এবং অগাধ পান্ডিত্যে সন্তুষ্ট হয়ে ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় নিজের বেঙ্গল গেজেটিয়ার সংকলন অফিসে কেরানীর পদে নিযুক্ত করেন। এরপর ইনি উত্তর পশ্চিম প্রদেশের কৃষি ও বাণিজ্য বিভাগের অফিসে প্রধান কেরানীর পদে নিযুক্ত হন। পরে বিভাগীয় ডাইরেক্টরের একান্ত সহকারী হন।
১৮৭৭-১৮৭৮ সালে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হলে তিনি প্রান বাঁচানোর জন্য গাজর চাষ করার জন্য সরকারকে উপদেশ দেন। তাঁর কথানুযায়ী সরকার ১৮৮৭ সালে কয়েকটি জেলায় গাজরের চাষ করার বন্দোবস্ত করেন। এর ফলে দু বছর পরে রায়বেরিলী ও সুলতানপুর জেলায় দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর প্রস্তাবিত গাজর চাষের জন্য বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।

১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে ভারত সরকারের রাজস্ব বিভাগে বদলী হন। সেই সময় ইনি উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পোন্নতির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেন এবং বিশেষ কৃতকার্যও হন। ১৮৮৩ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে কয়েকটি বিষয়ে অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাজ্যে প্রদর্শনী আরম্ভ হয় তখন ত্রৈলোক্যনাথকে সেখানে পাঠানো হয়। সেই সময় তিনি ইউরোপের নানা জায়গায় ভ্রমণ করেন এবং এ ভিজিট টু ইউরোপ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটিতে তাঁর সমস্ত কাজ ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত রয়েছে।

১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে এই বিভাগ ত্যাগ করে কলকাতা মিউজিয়ামে সহকারি কিউরেটর হন । ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে দেশীয় শিক্ষা বাণিজ্যে যাতে উন্নতি হয় তার যথেষ্ট চেষ্টা করেন। কলকাতা, বোম্বে প্রভৃতি বড় বড় শহরে এবং বড় বড় রেলস্টেশনে ভারতীয় কারুকার্যের যে সকল দোকান দেখতে পাওয়া যায় তা এঁর উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সময় ইনি সরকারের অনুমতিক্রমে আর্ট ম্যানুফ্যাকচারারস অফ ইন্ডিয়া নামক একটি বই লেখেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে যে সব শিল্প দ্রব্য নির্মিত হত সেই সব শিল্প দ্রব্যের একটি তালিকা ইংরাজীতে প্রকাশ করেন। ত্রৈলোক্যনাথ বর্ধমানে থাকাকালীন ফার্সি ভাষা শিক্ষা করে অভূতপূর্ব নাম করেছিলেন।

সাহিত্য জীবন
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যিক হিসাবেই বিখ্যাত। তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন রকমের উদ্ভট হাস্যরসের প্রবর্তক ছিলেন। বঙ্গবাসী অফিস থেকে প্রকাশিত জন্মভূমি মাসিক পত্রিকায় ইনি অনেক ভালো ভালো প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বিশ্বকোষ নামক অভিধান এঁর চেষ্টাতেই আরম্ভ হয়। বিশ্বকোষ অভিধান রচনায় ভাই রঙ্গলালকে প্রচুর সাহায্য করেছিলেন । এছাড়া জন্মভূমি সাপ্তাহিক পত্রিকাতেও ইনি নিয়মিত লিখতেন। ওয়েলথ্ অফ ইন্ডিয়া নামক মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা কাজেও তিনি সাহায্য করতেন।

তাঁর রচিত ডমরু চরিত এবং কঙ্কাবতী খুবই বিখ্যাত। কঙ্কাবতী উপন্যাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “এইরূপ অদ্ভুত রূপকথা ভাল করিয়া লেখা বিশেষ ক্ষমতার কাজ। …এতদিন পরে বাঙ্গালায় এমন লেখকের অভ্যুদয়…যাঁহার লেখা আমাদের দেশের বালক বালিকাদের এবং তাঁদের পিতামাতার মনোরঞ্জন করিতে পারিবে।“

১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে ইনি পেনসন গ্রহণ করেন। এবং ৭৩ বছর বয়সে ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

গ্রন্থতালিকা
ফোকলা দিগম্বর
পাপের পরিণাম
ডমরু-চরিত
বাঙ্গাল নিধিরাম
বীরবালা
লুল্লু
নয়নচাঁদের ব্যবসা
কঙ্কাবতী
সোনা করা যাদুগরের গল্প
ভানুমতী ও রুস্তম
জাপানের উপকথা
পূজার ভূত
পিঠে-পার্বনে চীনে ভূত
বিদ্যাধরীর অরুচী
মেঘের কোলে ঝিকিমিকি সতী হাসে ফিকিফিকি
এক ঠেঙো-ছকু
মুক্তা-মালা
এ ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ অফ প্রোডাক্টস
এ হ্যান্ডবুক অফ ইন্ডিয়ান প্রোডাক্টস
এ লিস্ট অফ ইন্ডিয়ান ইকনমিক প্রোডাক্টস

প্রবোধ কুমার সান্যাল


সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং পরিব্রাজক
প্রবোধ কুমার সান্যাল ( জন্মঃ- ৭ জুলাই, ১৯০৫ – মৃত্যুঃ- ১৭ এপ্রিল, ১৯৮৩ )

প্রবোধ কুমার কলকাতার চরবাগানে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদিনিবাস ফরিদপুরে। তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম ‘কীর্তনীয়া’। চার বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে তিনি মাতুলালয়ে বাল্য ও কৈশোর অতিবাহিত করেন। ১৯৪১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত যুগান্তরের রোববারের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদক হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন। স্বদেশ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালে একবার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। বিজলি এবং পদাতিক পত্রিকাও তিনি সম্পাদনা করতেন। ভ্রমণপিয়াসী এই সাহিত্যিক হিমালয়ের অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন মহাদেশে ভ্রমণের ঋদ্ধ অভিজ্ঞতা ফুটে ওঠে তার লেখনীতে। তার ভ্রমণসাহিত্য মহাপ্রস্থানের পথে, রাশিয়ার ডায়েরি, দেবতাত্মা হিমালয় বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৬০ সালে তিনি কলকাতায় হিমালয় অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত কল্লোল যুগের সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত প্রবোধ কুমার। তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ।

হিমালয় ভ্রমণকথার প্রবাদপুরুষ : প্রবোধকুমার সান্যাল
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম শতবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি রূপে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে (মে ২০০৩) লেখক মন্তব্য করেছিলেন
“উমাপ্রসাদই প্রথম হিমালয়ের অপরিচিত অঞ্চলের ভ্রমণ বিবরণ বাঙালি পাঠকসমাজের সামনে উপস্থিত করেন”।
প্রবোধকুমার সান্যালের নাম প্রবন্ধকারের কেন মনে আসেনি জানি না। উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ভ্রমণ-রচনা ‘গঙ্গাবতরণ’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ তে আর

রবোধ কুমার সান্যালের ‘দেবতাত্মা হিমালয়’এর রচনাকাল ১৯৫৪। এমন কি, উমাপ্রসাদের প্রথম হিমালয় দর্শন, ঐ নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী ১৯২৮ এ, আর প্রবোধকুমার হিমালয়কে প্রথ চেনেন ১৯২৩ এ। তারও অনেক আগে ১৯৩৭এ প্রবোধ কুমারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ প্রকাশিত হয়। তবুও, প্রবোধকুমার সান্যাল নন, হিমালয় ভ্রমণ-কথা প্রথম সাহিত্য রসসিক্ত হয়ে বাঙালি পাঠকের সামনে আসে জলধর সেনের রচনায়। অতীতকালের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক অক্ষয় কুমার দত্ত মন্তব্য করেছেন,
“এই ভ্রমণকাহিনী যখন ধারাবাহিকরূপে ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হইতে আরম্ভ করে, তখন বঙ্গসাহিত্যের এক নতুন দ্বার উন্মুক্ত হইয়াছিল;- এখন সে পথে বহুলোকে সগর্ব্বে অগ্রসর হইলেও জলধরকেই প্রথম পাণ্ডা বা পথপ্রদর্শক বলিয়া নির্দ্দেশ করিতে হইবে”।
‘দেবতাত্মা হিমালয়’এর অনেক আগে প্রবোধকুমার রচনা করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘মহাপ্রস্থানের পথে’। কৈলাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা অসাধারণ ভ্রমণোপন্যাস। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ পাঠ করার পর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘তোমার ভাষা পাঠকের মনকে রাস্তায় বের করে আনে’।
১৯৩২ এ কেদারবদ্রী ভ্রমণ ও তারপর হৃষিকেশ থেকে পার্বত্য শহর রাণীক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে পরিক্রমণ করেছিলেন ৩৮ দিনে। সেই অভিজ্ঞতার কাহিনী নিয়েই লিখেছিলেন ‘মহাপ্রস্থানের পথে’। তারপর ১৯৩২ থেকে ১৯৩৬ দীর্ঘ পাঁচ বছর হিমালয় সন্নিহিত নানা স্থান ভ্রমণ করেন, সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, হিমালয়ের নানান প্রদেশের মানুষের জীবনপ্রণালী আর নানান মানুষের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। এই শীর্ষকটি তিনি গ্রহণ করেছিলেন কালিদাসের কুমারসম্ভবের বিখ্যাত শ্লোক থেকে,
অস্ত্যুত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নগাধিরাজঃ |
পূর্বাপরৌ তোয়নিধী বিগাহ্য স্থিতঃ পৃথিব্যা ইব মানদণ্ডঃ ||
হিমালয় আমাদের কাছে চির দুর্জ্ঞেয় রহস্য, দুর্নিবার তার আকর্ষণ। বুঝি বা সেই রহস্যের টানেই পর্যটকরা বারবার ছুটে যান। এই প্রসঙ্গে আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মন্তব্য অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থের মুখবন্ধে জওহরলাল মন্তব্য করেছিলেন
‘হিমালয় যে শুধু ভারতের বিস্তীর্ণ ভূভাগের শীর্ষে নগাধিরাজ রূপেই বিরাজমান তাই নয়, প্রত্যেক ভারতবাসীর অন্তরে তার একটি গভীর বাণীও মন্দ্রিত। ইতিহাসের ঊষাকাল থেকে হিমালয় আমাদের জাতির জীবনের সঙ্গে গ্রথিত; এবং শুধু যে আমাদের রাষ্ট্রনীতিকেই হিমালয় প্রভাবিত করে এসেছে তাই নয়, আমাদের শিল্পকলা,আমাদের পুরাণ এবং ধর্মের সঙ্গেও এই পর্বতমালা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে আছে। সুদূর অতীতকাল থেকে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের জাতীয় জীবনের বিকাশে হিমালয় যে অংশগ্রহণ করেছে, আমার মনে হয় পৃথিবীর অন্য কোথাও অপর কোন পাহাড়-পর্বত বা গিরিশ্রেণী তা করতে সক্ষম হয়নি”।
কালিদাসের ‘নগাধিরাজ’ বিশেষণের যাথার্থ্য আমরা বুঝতেই পারি।

হিমালয়ের মূল মেরুদন্ড দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মিরের শেষপ্রান্তে হিন্দুকুশের সঙ্গে মিলেছে। হিমালয়ের সেই মেরুদন্ডের দুই পার ছিল তাঁর ভ্রমণের পথ। সাতটি পার্বত্য ভূভাগে দুর্গম অঞ্চল সহ বিস্তীর্ণ পথ পরিক্রমণের বৃত্তান্ত লিখেছেন উত্তর ‘হিমালয় চরিত’ গ্রন্থে। সেই ভ্রমণ-কথায় মিশে আছে সেইসব অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাস, পৌরানিক কথা, নানান জাতি ও সমাজের স্তরবিন্যাস, শ্রেণী, বর্ণ ও ভাষার কথা, তাদের লোকাচার ও দৈনন্দিন যাপনের বিশ্বস্ত ছবি। হিমালয় কেন বারবার তাঁকে টেনে এনেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন ‘উত্তর হিমালয় চরিত’ গ্রন্থের মুখবন্ধে। লিখেছেন –
“এই ভ্রমণের পিছনে ছিল জানা ও অজানা পার্বত্যলোকের প্রতি আমার অন্ধ আসক্তির টান। আমার প্রকৃতিগত অস্থিরতা একমাত্র নিভৃত হিমালয়ের মধ্যেই স্থৈর্য লাভ করে। আমার পঞ্জরাস্থিমালা হিমালয়ের সঙ্গে মেলানো”।
নিতান্ত শৈশবে মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহীন প্রবোধকুমার জননী বিশ্বেশ্বরী দেবীর হরিদ্বার-হৃষিকেশ তীর্থভ্রমণে সঙ্গী হয়েছিলেন ১৯২৩ এর অক্টবরে, প্রবোধকুমার তখন ১৮ বছরের কিশোর। জননীই তাঁকে প্রথম হিমালয় চিনিয়েছিলেন। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থের ভুমিকায় প্রবোধকুমার লিখেছেন,
“সাধারণত যে জগতে ও যে সমাজে আমার চলাফেরা ছিল, হিমালয় তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক সুতরাং, সেদিনকার সেই তরুণ বয়সের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে সমগ্র হিমালয় আমার চোখে এক বিচিত্র অভিনব আবিষ্কার মনে হয়েছিল। নূতনের আকস্মিক আবির্ভাবে চমক লেগেছিল আমার জীবনে। যিনি আমাকে প্রথম হিমালয় চিনিয়েছিলেন, সেই জননীর অজ্ঞাতসারেও আমাকে বারকয়েক হিমালয়ের কয়েকটি অঞ্চলে যেতে হয়েছিল। কারণ তিনি জেনেছিলেন এ নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে”।
হিমালয়ের টানেই প্রবোধকুমার সেনা বিভাগে চাকরি নিয়ে দেড় বৎসরকাল পীরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণির ‘কো-মারি’ অঞ্চলে বসবাস করেছিলেন। এখন এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্গত।
জননীর তীর্থভ্রমণের সঙ্গী হয়ে প্রথম হিমালয় চেনা ও তার দূর্বার আকর্ষণ বোধ করলেও তার বারংবার হিমালয় ভ্রমণ তীর্থ-ভ্রমণের টানে ছিল না। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ ও ‘উত্তর হিমালয় চরিত’এ অসংখ্য দেবালয় ও তীর্থস্থানের বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলির প্রতিষ্ঠার পেছনে ইতিহাস ও পৌরাণিক পৃষ্ঠভূমির বিশ্বাসযোগ্য বৃত্তান্ত শুনিয়েছেন। তবু প্রবোধকুমারের ‘হিমালয় ভ্রমণ-কথা’ কখনোই ‘তীর্থ-ভ্রমণ-কথা’ হয়ে ওঠেনি। তাঁর নিজের কথায়,
“হিমালয় পর্যটক বলেই যে আমি তীর্থযাত্রী – একথা সত্য নয়। লক্ষ্যটা আনন্দের উপলক্ষ্যটা তীর্থের। হিমালয়ের রঙ মেখেছি আমি সর্ব দেহে মনে, রস পেয়েছি সর্বত্র। কেবলমাত্র তীর্থযাত্রা করাই যদি মূল উদ্দেশ্যই হত তাহলে যেদিন বদ্রীনাথ মন্দিরে ঢুকে বিষ্ণুমূর্তি দর্শন করলুম, সেদিনই আমার গাড়োয়াল দেখা শেষ হয়ে যেত। … হিমালয়ের সকল তীর্থদেবতা দর্শন মোটামুটি দশ বছরেই শেষ হয়, কিন্তু বত্রিশ বছরেও আমার কাছে হিমালয় শেষ হয়নি”।
১৯২৩ এ জননীর সঙ্গে প্রথম হিমালয় চিনেছিলেন তারপর ১৯৫৫ পর্যন্ত বারবার হিমালয় পর্যটন করেছেন। নিতান্ত শৈশবে পিতৃহারা প্রবোধকুমার প্রতিপালিত হন কলকাতায় মাতুলালয়ে (জন্মও মাতুলালয়ে, ৭ই জুলাই ১৯০৫)। স্কটশচার্চ কলেজিয়েট স্কুল ও সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন। ডাক বিভাগ ও পরে হিমালয়ের টানে সামরিক বিভাগেও কয়েক বছর কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ অধুনা লুপ্ত ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় রবিবাসরীয় সাহিত্য বিভাগের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩০ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বহু পাঠকবন্দিত উপন্যাস ও গল্পের স্রষ্টা প্রবোধকুমার। তাঁর কাহিনী অবলম্বনে বহু সফল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে, কাঁচ কাটা হীরে, পুষ্পধনু, প্রিয় বান্ধবী ইত্যাদি। মূলত কল্লোল যুগের সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত প্রবোধ কুমার। তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ। বন্ধু রূপে পেয়েছিলেন সেকালের বহু নামী দামী সাহিত্যিককেও। সবিতেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর (১ম পর্ব) – বইটিতে দেখা যায়,-
“কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দিলখুসা কেবিন আর জ্ঞান বাবুর চায়ের দোকানের আড্ডা যখন তুঙ্গে, তখনই দুই সাহিত্যিক গজেন্দ্র কুমার মিত্র ও সুমথনাথ ঘোষ ১৯৩৪-এর মার্চে গোড়াপত্তন করেন মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের; আড্ডার আরও একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। আড্ডার প্রথম যুগের মানুষ কবি শেখর কালিদাস রায়, ভাষাচার্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, কবি কৃষ্ণদয়াল বসু, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধ কুমার সান্যাল যোগ দিলেন আড্ডায়”।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, প্রবোধকুমারকে ঘাটশিলায় টেনে আনতে চেয়েছিলেন পর্যটক মননের সাহিত্যিক অরণ্যপ্রেমি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন,
“ঘাটশিলায় চলে এসো, ওই ঢাকুরিয়াতে থাকলে তোমার স্বাস্থ্য টিকবে না। ”
তবু নিশ্চিতভাবেই ‘পর্যটক প্রবোধকুমার’ বাংলা সাহিত্যের পাঠকমনে এক অন্যতর উচ্চতায় আসীন। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত কল্লোল যুগের সাহিত্যিকরা সেইভাবে হয়তো হিমালয় ভ্রমণ-পিপাসু ছিলেন না। কাজেই এই ব্যাপারে তাঁকে একেবারে পথিকৃৎই বলা চলে। এই নতুন বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বাঙালীদের মনে প্রবল হিমালয় প্রেমের সূচনা করেন। তাঁর কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ চলচ্চিত্রটি ও খুবই জনপ্রিয় ও উচ্চমানের। বস্তুত, বাঙালীর জীবনে হিমালয়ের আকর্ষণের শুরু এই ভ্রমণ-কাহিনী পাঠ ও এই চলচ্চিত্র দর্শন দিয়েই। হিন্দীতেও চলচ্চিত্র হয় ‘যাত্রিক’ নামে। এই লেখাটির তুমুল জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য এই দুটি ছবি। ভারত ও নেপাল ছাড়াও এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও রাশিয়া নানান অঞ্চল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। কলকাতার হিমালয়ান অ্যাসোশিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ভ্রমণপিপাসু প্রবোধকুমার ১৯৭৮ এ নরওয়ের পথে উত্তরমেরু ভ্রমণ করেন, তখন তাঁর বয়স তিয়াত্তর বছর। সেদিক দিয়ে প্রবোধকুমার সান্যালকে বিশ্বপর্যটকও বলা যায়। তবুও, বাংলাসাহিত্য তাঁকে মনে রাখবে তিন অনন্য হিমালয় ভ্রমণ-কথা ‘মহাপ্রস্থানের পথে’, ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ ও ‘উত্তর হিমালয় চরিত’ গ্রন্থের জন্য।
সার্থক ভ্রমণকাহিনী শুধুমাত্র সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক বিন্যাস বা অন্য প্রান্ত থেকে সেখানে যাওয়ার পথনির্দেশ নয়। সেখানকার মানুষ, তাদের জীবনযাপন, আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি সবই সেই ভ্রমণবৃত্তান্তের অঙ্গীভূত হয়। আর থাকে পর্যটকের ইতিহাস চেতনা ও মানুষকে দেখার চোখ।
শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তর শুরুতেই ভ্রমণকাহিনী লেখা সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা আজও প্রণিধানযোগ্য-
“কিন্তু বলিলেই ত বলা হয় না। ভ্রমণ করা এক, তাহা প্রকাশ করা আর। যাহার পা-দুটা আছে, সেই ভ্রমণ করিতে পারে; কিন্তু হাত-দুটা থাকিলেই ত আর লেখা যায় না! সে যে ভারি শক্ত।
খোদ শরৎচন্দ্র যে কাজকে ‘ভারি শক্ত’ বলেছেন, সেই কাজ করাতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন যাঁরা, প্রবোধ সান্যালের নাম একেবারে প্রথম সারিতেই আসবে।
অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি উক্তিও স্মরণ করি। বলেছিলেন
“ভ্রমণ থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনী, কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়”।
জীবন পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতির অবলোকন আর সাহিত্যের স্বাদ ভ্রমণ-কথাকে পাঠযোগ্য করে তোলে। প্রবোধকুমারের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ কিংবা ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ বাংলা সাহিত্যের সার্থক ভ্রমণ-সাহিত্য রূপে চির নন্দিত।
প্রবোধকুমারের বত্রিশ বছরের বারংবার হিমালয় পরিক্রমণের সেরা ফসল তার দুই খন্ডের গ্রন্থ ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। হিন্দুকুশ উপত্যকা থেকে পার্বত্য আসাম পর্যন্ত হিমালয়ের যে বিস্তৃত ভৌগোলিক উত্তর-প্রাচীর তার প্রত্যেকটি ভূভাগই তাঁর ভ্রমণের মধ্যে এসেছে। চব্বিশটি পর্যায় ভাগ করে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত সন্নিবেশিত করেছেন ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থে। অভ্রভেদী সুবিস্তৃত হিমালয় – আর সেই পর্বতমালা থেকে হাজার হাজার বছর ধরে সমতলে নেমে আসা স্রোতধারা সৃষ্ট খরতোয়া নদীর দুপাশে গড়ে ওঠা উপত্যকার সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে পর্যবেক্ষণ করেছে শিল্পীর জিজ্ঞাসু মন ও দৃষ্টিতে। আমাদের শুনিয়েছেন সেই বিবরণ। তার পরেও শুনিয়েছেন এক সারসত্য,
“মানুষের এক জন্মে সমগ্র হিমালয় আনুপূর্বিকভাবে ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ কাজ আয়ুষ্কালের একশো বছরেও কুলায় না”।
এই গ্রন্থ রচনার বত্রিশ বছর আগে যখন জননীর সঙ্গী হয়ে তরুণ প্রবোধকুমার হরিদ্বার, হৃষিকেশ, গঙ্গোত্রি ভ্রমণ করেছিলেন, তাঁর প্রথম তারুণ্য চোখ মেলেছিল শিবলিঙ্গ পর্বতমালার নীচে গঙ্গাবতরণের প্রান্তে। যে অঞ্চলটির প্রাচীন নাম ব্রহ্মপুরা, চারশো বছর পরে নাম হয় গাড়োয়াল। প্রবাদপ্রতীম গ্রন্থটির প্রথম পরিচ্ছদটির শিরোনাম তাই ‘ব্রহ্মপুরা গাড়োয়াল’। তারপর বত্রিশ বছরে বারবার গিয়েছেন এই ব্রহ্মপুরার প্রান্তসীমায় জিজ্ঞাসু মন নিয়ে। কিসের অন্বেষণে? কোন জিজ্ঞাসা নিয়ে? আমাদের যুগ-যুগান্তরের বিশ্বাস অভ্রভেদী হিমালয়ের প্রথম স্তর হলো ‘ব্রহ্মলোক’, তার নিচে শিবলিঙ্গ পর্বতমালার দূরতিক্রম্য স্তরটি ‘দেবলোক’ আর হিমালয়ের পাদমূলে যে স্তরে গঙ্গা প্রসারিত তা হ’ল মর্ত্যলোক। গঙ্গার অবতরণ উত্তর ব্রহ্মপুরার গোমুখ থেকে। প্রবোধকুমারের হিমালয় ভ্রমণকথা তীর্থভ্রমণের বৃত্তান্ত নয়, একথা উল্লেখ করেছি। আবার হ্যাঁ, তীর্থভ্রমণও বটে। কারণ তাঁর কাছে “পথই তীর্থ, এবং সেটি হলো গঙ্গাবতরণের পথ”। তাঁর সেই তীর্থ পরিক্রমণের অসমান্য বিবরণের কয়েকটি পংক্তি পুণরায় স্মরণ করার লোভ সম্বরণ করা গেলো না। লিখেছেন,
“ব্রহ্মলোকের গিরিসংকটে এবং গঙ্গাকে অনুসরণ করে যাবো যতদূর তার গতি, – এরই নাম তীর্থ পরিক্রমা …… দেবতাত্মা হিমালয়ের রহস্যলোকে এই অলকাপুরীর দর্শনপিপাসায় ছোটে মর্ত্যবাসী তীর্থযাত্রীরা। দুস্তর চড়াইপথে বুক ফেটে মরেছে কত মানুষ, নিঃশ্বাসের বায়ু খুঁজে না পেয়ে মরেছে, অভ্রভেদী গিরিচূড়ার সংকীর্ণ শঙ্কটে পদস্খলন ঘটে মরেছে কত শত, – ইতিহাসে তার হিসাব নেই কোথাও … তবু কোনকালে মানুষকে স্থির থাকতে দেয়নি ওই ব্রহ্মপুরার গঙ্গাপথ। গিরিসংকটের ভিতর দিয়ে যেমন চলেছে উন্মাদিনী জলধারা, তেমনি চলেছে তার পাশে-পাশে দুর্বার গতিতে তীর্থযাত্রী দলের অজেয় প্রাণধারা। সুখ দুঃখ স্নেহ মোহ বেদনা দয়া প্রীতি, – ওরাও চলেছে ওদের সঙ্গে সঙ্গে … ওদের ওই আনন্দ-বেদনার তরঙ্গদোলায় আমিও নিজেকে বার বার মিলিয়ে দিয়েছি”।
নিরস ভ্রমণ-বৃত্তান্ত নয়, এ যেন ভ্রমণের কাব্যকথা। ভ্রমণ-কথা কেমন হওয়া উচিৎ তারও নির্দেশ করে গেছেন প্রবোধকুমার। ‘উত্তর হিমালয় চরিত’ গ্রন্থের ভুমিকায় লিখেছেন,
“ভ্রমণকাহিনী রচনার নির্দিষ্ট পদ্ধতি কিছু নেই। পায়ের সঙ্গে মন হাঁটে, মনের খুশিমতো বিষয়বস্তুও হাঁটে। ভ্রমণের সকল বৃত্তান্তের মধ্যে গতিশীলতার স্বাদ না থাকলে সে-বস্তু প্রাণসত্তাহীন”।
প্রবোধকুমারের জীবন-পর্যবেক্ষণের মূল সূত্রই এই গতিশীলতা। তাঁর ভ্রমণ-সাহিত্যেরও প্রাণ-বিন্দু। প্রবোধকুমারের অমর সৃষ্টি ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ শেষ পংক্তি ক’টি বোধকরি সমস্ত হিমালয় ভ্রমণ-কথারই প্রাণ-বিন্দু,
“অতৃপ্তি আর অসন্তোষ থাক জীবনজোড়া, থাক নিবিড় নৈরাশ্য আর অসীম কালের বিরহবেদনা, থাক অনন্তলাভের প্রবল ব্যাকুলতা, – এরা তীর্থযাত্রার পাথেয়। কোথায় পৌঁছবো, সঠিক জানা নেই। কিন্তু আপন চিত্তের অশ্রান্ত গতি কামনা করি। যে গতি গঙ্গার, যে গতি সৃষ্টিলোকের, সেই গতিই জীবনের। একথাটি জেনেছি, গতিহীনতাই অপমৃত্যু”।
আমাদের অতএব সংশয় থাকে না, কেন তাঁর প্রথম হিমালয় ভ্রমণের প্রায় একশো বছর পরেও প্রবোধকুমার সান্যাল রহস্যঘেরা হিমালয় ভ্রমণের শ্রেষ্ঠ কথাকারের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত।

লিখেছেন- প্রতাপ চন্দ্র সাহা।

আদি গুরু শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাব কাল নির্ণয়।



শঙ্করাচার্য্যের পিতার নাম শিবগুরু, মাতার নাম সতীদেবী (মতান্তরে ভদ্র)। তাঁহার জন্মস্থান-দক্ষিণাত্যের কেরল-প্রদেশের কালাদি (কাল্‌টি) গ্রামে। ঐ গ্রাম পূর্ণা-নদীর তীরে অবস্থিত। এই মতই প্রসিদ্ধ; কিন্তু ‘শঙ্করবিজয়’ অন্য মত প্রকাশ করেন যে, শঙ্করের মাতার নাম বিশিষ্টা, পিতা বিশ্বজিৎ। বিশিষ্টা-মহাদেবের আরাধনায় সৰ্ব্বদা নিযুক্ত থাকতেন। তার পতি বিশ্বজিৎ তাতে তাকে পরিত্যাগ করে, সন্ন্যাস-ধৰ্ম অবলম্বন করেন। এই সময় দেবাদিদেব মহাদেব জ্যোতিঃরূপে মুখবিবর দিয়ে বিশিষ্টার উদরে প্রবিষ্ট হন। তাতেই গর্ভ-সঞ্চার হয়; আর সেই গর্ভে স্বয়ং শঙ্কর শঙ্করাচার্য রূপে জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষদের আবির্ভাব সম্বন্ধে অনেক স্থানেই এরকম অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। জন্মকাল সম্বন্ধেও এমন বিভিন্ন মতান্তরের শেষ নেই। এক গণনায় শঙ্করাচাৰ্য্য খৃষ্ট জন্মের ৪৬৯ বৎসর পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে প্রতিপন্ন হয়; আবার অন্য প্রকার গণনায় খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে তার আবির্ভাব-কাল নিৰ্দ্ধারিত হয়ে থাকে। সূক্ষ্ম-গণনায় পণ্ডিতেরা কেউ বা ৭৮৮ খৃষ্টাব্দে, কেউ বা ৬৬৮ খৃষ্টাব্দে শঙ্করাচার্যের জন্মকাল নির্দেশ করেন। শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাব কাল সম্বন্ধে এরকম মতান্নতর ঘটার প্রধান কারণ,-শক, সন প্রভৃতির গণনায় গণ্ডগোল। ‘শঙ্করবিজয়’ গ্রন্থে তার জন্ম সন লেখা নেই; লেখা আছে, তাঁর জন্ম-সময়ে বৃহস্পতি কেন্দ্রে, রবি মেষ রাশিতে, শনি তুলা রাশিতে এবং মঙ্গল মকর রাশিতে সংস্থিত ছিলেন। “এ মন্তব্যে নানারকম গণন হতে পারে। মতান্তরের এই এক প্রধান কারণ। অন্য কারণ,-বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত উদ্ভট-শ্লোকে শঙ্করের আবির্ভাব-কাল-নির্ণয়ের প্রয়াস। একটি উদ্ভট শ্লোক পাওয়া যায়,
“দুষ্টাচারবিনাশায় প্রাদুর্ভুতো মহীতলে। স এব শঙ্কারাচাৰ্য্যঃ সাক্ষাৎ কৈবল্যদায়কঃ॥ নিধিনাগেভবহ্ন্যব্দে বিভবে শঙ্করোদয়ঃ। অষ্টবর্ষে চতুৰ্ব্বেদান্‌ দ্বাদশে সৰ্ব্বশাস্ত্রকৃৎ॥
ষোড়শে কৃতবান ভাষ্যং দ্বাত্রিংশে মুনিবভ্যগাৎ॥
কল্যব্দে চন্দ্ৰনেত্রাঙ্কবহ্ন্যাব্দে গুহাপ্রবেশঃ। বৈশাথে পূর্ণিমায়ান্ত শঙ্করঃ শিবতামগাৎ॥
এই শ্লোকটি ‘নাস্তিকত্রাস’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। দাক্ষিণাত্যে বেলগ্রামে হাতে লেখা পুঁথি মধ্যে এই শ্লোকটি পাওয়া যায়, পণ্ডিতেরা শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাবের ও তিরোভাবের কাল স্থির করে থাকান। ৩৮৮৯ কল্যব্দে(নিধিনাগেভবহ্ন্যব্দে) তাঁহার জন্ম এবং ৩৯২১ কল্যব্দে (চন্দ্রনেত্রাঙ্কবহ্ন্যব্দে) তার শিবত্ব-প্রাপ্তি নির্দিষ্ট হয়। এই মতের উপরই অধিকাংশ বিদেশি পণ্ডিত আস্থা স্থাপন করে গেছেন। কিন্তু এই অপেক্ষা প্রবল যুক্তিপূর্ণ যে মত, সে মতের ভিত্তিস্থান দ্বারাবতী মঠের পিণাকী-চিহ্নিত লিপি। সে লিপির কিছু অংশ এই-
“যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩১ বৈশাখ শুক্লপঞ্চম্যাং শ্রীমচ্ছঙ্করাবতারঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩৬ চৈত্রগুক্লনবম্যাং তিথাবুপনয়নম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩৯ কাৰ্ত্তিকশুক্লৈকাদশ্যাং চতুর্থাশ্রমস্বীকারঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪০ ফাল্গুনগুক্লদ্বিতীয়ায়াং গোবিন্দপাদাদুপদেশঃ।
তত আরভ্য ২৬৪৬ জ্যৈষ্ঠ কৃষ্ণ ৩০ পৰ্য্যন্তং বদর্য্যাশ্রমে ষোড়শভাষ্যপ্রণয়নম।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৭ মার্গকৃষ্ণদ্বিতীয়ায়াং মণ্ডনেন সহ বাদারম্ভঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৮ চৈ, শু, ৪ মণ্ডনপরাজয়ঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৯ চৈ, শু, ৯ মণ্ডনমিশ্রস্যোত্তমাশ্রমগ্রহণম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৫০ চৈ, শু, ৩ দিগ্বিজয়মহোৎসবারম্ভঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৫৪ পৌ, শু, ১৫ হস্তামলকাচাৰ্য্যস্য শৃঙ্গপুর পীঠেহভিষেচনম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৬৩ কা, শু, ২৫ নিখিলজগদ্ধারকো ভগবান্‌ শঙ্করো ব্ৰহ্মাদ্য তীর্থে নিজ শরীরেণৈব বিমানমাস্থায় কৈলাসং জগাম।”
এ হিসাবে, ২৬৩১ যুধিষ্ঠিরাব্দে আবির্ভাব এবং ২৬৬৩ যুধিষ্ঠিরাব্দে তিরোভাব। এই অনুসারে শঙ্করাচাৰ্য্য খৃষ্ট-পূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে আবির্ভুত হয়েছিলেন।জন্ম-গ্ৰহণের পর জাতকর্ম সমাপন মাত্র শিশু শঙ্করাচার্য্য চারটি মহাবাক্য উচ্চারণ করেন। সেই মহাকাব্য-চতুষ্টয়,- “অহং ব্ৰহ্মাস্মি’, ‘তত্ত্বমসি’, ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম,’ ‘আয়মাত্মা ব্ৰহ্ম’। পিতা শিবগুরু এই শ্রুতিসার মহাকাব্য-চতুষ্টয় সদ্যোজাত শিশুর মুখে উচ্চারিত হতে শুনে বিস্ময়-সাগরে নিমগ্ন হলেন। শিশুর অপূর্ব কান্তি-মনোহর রূপ! দেশ-দেশান্তর হতে সাধুসন্ন্যাসী ও ব্ৰাহ্মণরা দলে দলে শিশুকে দেখতে আসলেন। একাদশ দিনে শুভলগ্নে শিশুর নামকরণ হল। দশ দিনের শিশু শঙ্করাচাৰ্য্য, দুই বৎসরের বালক অপেক্ষাও হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিমান হয়ে উঠলেন। প্রথম বর্ষে শঙ্করের ভাষা-শিক্ষা সমাপন হল। পঞ্চম বর্ষের মধ্যেই শঙ্করাচাৰ্য্য, ব্যাকরণ, পুরাণ, অলঙ্কার প্রভৃতিতে পারদর্শিতা লাভ করলেন। উপনয়নের আগেই শঙ্করের পিতৃবিয়োগ ঘটে। জননী ভদ্রাদেবী পতির পারলৌকিক কাজ সমাপন করে, কিছুদিন পরে পুত্রের উপনয়নের ব্যবস্থা করলেন। পঞ্চম বর্ষে উপনয়ন শেষে ব্রহ্মচৰ্য্য অবলম্বনে শঙ্কর গুরুগৃহে শাস্ত্র অনুশীলনে প্রবৃত্ত হলেন। অল্পদিনেই বেদ, বেদাঙ্গ, দর্শন, শ্রুতি, স্মৃতি প্রভৃতিতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি প্রকাশ পেল। গুরুগৃহ হতে প্রত্যাবর্তন করে শঙ্কর কিছুদিন জননীর সেবা-পরিচর্য্যায় এবং ব্রাহ্মণের নিত্যকর্ম অনুষ্ঠান যাগযজ্ঞ কাজে ব্ৰতী হন। সেই সময় বহু বিদ্যার্থী শঙ্করের নিকট শিক্ষালাভের জন্য আগমন করেন। উপনয়নের পর হতেই সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণের জন্য শঙ্করের মন একাত্ত উৎসুক হয়; কিন্তু জননীর আপত্তির কারণে কিছু দিন তার সে সঙ্কল্প কাজে পরিণত হয় না। এই সময়ে এক দিন নদীতে স্নান করতে গেলে, এক বৃহৎ আকার কুমীর শঙ্করকে আক্রমণ করে। শঙ্কর জননী কোনরকমে কুমীরের গ্রাস থেকে সন্তানকে মুক্ত করতে পারছেন না।
শঙ্কর তখন জননীকে বলেন,-“আমায় সন্ন্যাস-গ্রহণের অনুমতি প্রদান করলে কুম্ভীর আমায় পরিত্যাগ করতে পারে। কুম্ভীররূপী মহেশ্বর যেন শঙ্করকে বিশ্ব-সংসারের কাজে নিযুক্ত হওয়ার জন্য আহবান করছেন,-শঙ্করের উক্তিতে এই ভাব প্রকাশ পায়। পুত্রের প্রাণের মায়ায় জননী শঙ্করের সন্ন্যাস-গ্রহণে সন্মতি জ্ঞাপন করেন। এর পর একজন আত্মীয়ের পরিচর্য্যাধীনে জননীর সেবার ব্যবস্থা করে শঙ্কর সংসারত্যাগী হন। তখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ে নাস্তিকতার বিজয়-দুন্দুভি নিনাদিত হতেছিল। চাৰ্ব্বাক, শূন্যবাদী, নাস্তিক, বৌদ্ধ প্রভৃতি বিবিধ ধর্ম-সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ে তখন বেদ-বিহিত ধর্ম-কর্ম লোপ পেতে বসেছিল। শঙ্করাচাৰ্য্য সেই সকল ধর্ম-মতের কুজ্ঝটিকা-জাল অপসরণ করে সনাতন ধর্মের দিব্য জ্যোতিঃ প্রকাশ করলেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পুনরায় মঠমন্দির-সমূহ প্রতিষ্ঠিত হল। নিৰ্বাপিত-প্রায় অগ্নি-কণা পুনরায় লকলক শিখা বিস্তার করল; সনাতন হিন্দুধর্মের জয়নিনাদে দিগ মগুল পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। শঙ্করাচাৰ্য্য ধর্ম জগতে এক যুগান্তর উপস্থিত করলেন।

তথ্য সূত্র- পৃথিবীর ইতিহাস চতুর্থ খণ্ড।

সংকলনে- শ্রীমান কৃষ্ণকমল (মিন্টু)

সনাতন সংগঠন।