শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিষয়ক প্ৰশ্ন এবং উত্তর-১৮


প্রশ্নঃ- ভগবান বলেন যে, ‘আমিও কর্তব্য পালন করি, কেন না আমি যদি সাবধানতাপূর্বক কর্তব্য পালন না করি, তবে লোকেরাও কর্তব্যচ্যুত হবে'(৩/২২-২৪)। তাহলে এখন লোকে কর্তব্যচ্যুত হয়ে পড়েছে কেন?

উল্লেখ্য শ্লোকঃ
ন মে পার্থাস্তি কর্ত্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন।
নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত্ত এব চ কর্ম্মণি।।২২
অর্থঃ- হে পার্থ, ত্রিলোক মধ্যে আমার করণীয় কিছু নাই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছু নাই, তথাপি আমি কর্মানুষ্ঠানেই ব্যাপৃত আছি।
যদি হ্যহং ন বর্ত্তেয় জাতু কর্ম্মণ্যতন্দ্রিতঃ।
মম বর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ।।২৩
অর্থঃ- হে পার্থ, যদি অনলস হইয়া কর্মানুষ্ঠান না করি, তবে মানবগণ সর্ব্বপ্রকারে আমারই পথের অনুবর্ত্তী হইবে। (কেহই কর্ম্ম করিবে না)।
উৎসীদেয়ুরিমে লোকা ন কুর্য্যাং কর্ম্ম চেদহম্।
সঙ্করস্য চ কর্ত্তা স্যামুপহন্যামিমাঃ প্রজাঃ।।২৪
অর্থঃ- যদি আমি কর্ম্ম না করি তাহা হইলে এই লোক সকল উৎসন্ন যাইবে। আমি বর্ণ-সঙ্করাদি সামাজিক বিশৃঙ্খলার হেতু হইব এবং ধর্ম্মলোপহেতু প্রজাগণের বিনাশের কারণ হইব।
গ্রন্থঃ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা দর্পন।
Advertisements

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিষয়ক প্ৰশ্ন এবং উত্তর-১৭


প্রশ্নঃ- পরমাত্মা যদি সর্ব্ব্যাপীই হন তাহলে তাঁকে (৩/১৫)কেবল নিত্য প্রতিষ্ঠিত কেন বলা হয়, তিনি দ্বিতীয় কোন স্থানে কি প্রতিষ্ঠিত নন্‌ ?

উত্তরঃ- সর্বব্যাপী পরমাত্মাকে যজ্ঞে অর্থাতকর্তব্য কর্মে নিত্য প্রতিষ্ঠিত বলার তাৎপর্য্য এই যে, যজ্ঞ হচ্ছে তাঁর উপলব্ধি স্থান। যেমন জমিতে সর্বত্র জল থাকলেও তা কুযো হতে পাওয়া যায়, তেমনি পরমাত্মা সর্বত্র পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও নিজ নিজ কর্তব্য কর্ম নিষ্কামভাবে করলে তবেই তাঁকে পাওয়া যায়। এর গূঢ়ার্থ এই যে, যিনি নিজ কর্তব্য কর্ম সঠিকভাবে পালন করেন, তিনি সর্বব্যাপী পরমাত্মাকে অনুভব করতে পারেন!

উল্লেখ্য শ্লোক-

কর্ম্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মোক্ষরসমুদ্ভব ।
তস্মাৎ সর্ব্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত ॥১৫॥
কর্ম্ম (কর্ম্ম) ব্রহ্মোদ্ভবং (বেদ হইতে উৎপন্ন) বিদ্ধি (জানিবে), ব্রহ্ম (বেদ) অক্ষর সমুদ্ভব (অক্ষর অর্থাৎ পরব্রহ্ম হইতে সমুদ্ভূত), তস্মাৎ (অতএব) সর্ব্বগতং (সর্ব্বব্যাপক) ব্রহ্ম (পরব্রহ্ম) যজ্ঞে (যজ্ঞে) নিত্যং (সর্ব্বদা) প্রতিষ্ঠত (প্রতিষ্ঠিত আছেন) ॥১৫॥
ব্রহ্ম (বেদ) হইতে কর্ম্ম উদ্ভূত এবং ঐ বেদ অক্ষর অর্থাৎ অচ্যুত হইতে উৎপন্ন, সুতরাং সর্ব্বব্যাপক ভগবান্ অচ্যুত যজ্ঞে নিত্যকালই প্রতিষ্ঠিত ॥১৫॥

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিষয়ক প্ৰশ্ন এবং উত্তর-১৬


প্রশ্নঃ- বারিপাতের সঙ্গে হোমরুপ যজ্ঞের সম্বন্ধ আছে অর্থাৎ বিধিপালন পূর্বক হোম(যজ্ঞ) করা হলে বৃষ্টিপাত হয়, তবুও তৃতীয় অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোক ‘যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জন্যঃ’ এই অংশে যজ্ঞ শব্দটি হোমরূপী যজ্ঞরূপে গ্রহণ না করে কর্তব্য কর্মরূপ অর্থে কেন গ্রহণ করা হয়েছে ?
 
উত্তরঃ- প্রকৃতপক্ষে কর্তব্যচ্যুত হয়ে অকর্তব্য ঘটালে যথাযথভাবে বর্ষা হয় না, আকাল হয়। কর্তব্য কর্ম করলে সৃষ্টিচক্র সুচারুরূপে চলে আর কর্তব্য কর্ম না করলে সৃষ্টিচক্রের গতি ব্যাহত হয়। গোরুর গাড়ীর চাকা যদি ঠিক থাকে গাড়ীও ঠীকভাবে চলে, কিন্তু চাকার যদি কোন অংশ ভেঙ্গে যায় তবে সমস্ত গাড়ীটির উপরই তাঁর প্রভাব পড়ে। এইরূপ কেউ যদি নিজ কর্তব্য থেকে চ্যুত হয়, তাহলে তার প্রভাব সমস্ত সৃষ্টীচক্রের উপরই পড়ে। বর্তমানে মানুষ নিজ নিজ কর্তব্য ঠিকমত পালন করে না এবং অকর্তব্যমূলক ব্যবহার করে, এইজন্যই আকাল হয় এবং কলহ-অশান্তি ইত্যাদি বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ যদি নিজ নিজ কর্তব্য ঠিকমতো পালন করবেন এবং বৃষ্টিও সময় মতই হবে।
দ্বিতীয়তঃ অর্জুনের প্রশ্ন (৩/১-২)এবং ভগবানের উত্তর (৩/৭-৯)তথা প্রকরণ(৩/১০-১৩)বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যেম কর্তব্যকর্মের প্রবহমানতা বিদ্যমান এবং পরের শ্লোকগুলিতেও (৩/১৪-১৬) সেই কর্তব্যকর্মের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং এখানে কর্তব্যকর্মকে যজ্ঞরূপে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
গ্রন্থঃ- শ্রীমদ্ভগবগীতা দর্পন স্বামী রামসুখ দাস।
প্রচারে- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বিষয়ক প্ৰশ্ন এবং উত্তর-১৩


প্রশ্নঃ- কর্ম শুরু না করা এবং কর্মত্যাগ করা- এই দুটি একই কথা, কেননা দুটিতেই কর্মের অভাব আছে। অতএব ‘কর্মের অভাবে সিদ্ধি হয় না’- এইরুপ বলাই সঙ্গত ছিল। তবুও ভগবান (৩/৪) উপরিউক্ত দুটি কথা একই সাথে বলেছেন কেন ?

উত্তরঃ- ভগবান ঐ দুটি কথা কর্মযোগ এবং জ্ঞানযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন। কর্মযোগে নিষ্কামভাবে কর্ম করলেই সমত্ত্বের উপলব্ধি হয়; কারণ মানুষ যদি কর্ম না করে তাহলে ‘সিদ্ধি অসিদ্ধিতে আমার সমত্ব আছে কি নেই’- তা সে কি করে জানবে ? সেইজন্যই ভগবান বলেছেন, কর্ম আরম্ভ না করলে সিদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া যায় না। জ্ঞানযোগে বিবেক দ্বারা সমত্ব প্রাপ্তি হয়, কেবল কর্ম ত্যাগ করলেই হয় না। তাই ভগবান বলেছেন কর্মত্যাগ করামাত্রই সিদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া যায় না। এর তাৎপর্য এই যে, কর্মযোগ বা জ্ঞানযোগ দুই পথেই কর্ম কোনো প্রতিবন্ধক নয়, দুই পথেরই মুখ্য বিষয় হল কর্তৃত্ববোধের ত্যাগ।
 
উল্লেখ শ্লোকঃ-
ন কর্ম্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্ম্যং পুরুষোঽশ্নুতে ।
ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥৪॥
পুরুষ শাস্ত্রীয় কর্ম্মের অনুষ্ঠান না করিলে নৈষ্কর্ম্ম্যরূপ জ্ঞান লাভ করিতে পারে না । অশুদ্ধচিত্ত ব্যক্তি শাস্ত্রীয় কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া কিরূপে সিদ্ধিলাভ করিবে? ॥৪॥
গ্রন্থঃ- শ্রীমদ্ভগবগীতা দর্পন

গ্রন্থঃ- শ্রীমদ্ভগবগীতা দর্পন
সংকলনে #কৃষ্ণকমল প্রচারে- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল