মুখবন্ধ-০৫ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


আমাদের জন্য ভগবান যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা কিভাবে সদ্ব্যবহার করতে হবে তার অনেক সুন্দর সুন্দর উদাহরণ আছে। ভগবদ্‌গীতাতেও এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন ঠিক করেন তিনি যুদ্ধ করবেন না। এটি ছিল তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। অর্জুন পরমেশ্বর ভগবানকে বলেন যে, সেই যুদ্ধে নিজের আত্মীয়-পরিজনের হত্যা করে রাজ্যভোগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দেহাত্মবুদ্ধির ফলে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে তাঁর দেহ, এবং তাঁর দেহজাত আত্মীয়-পরিজন, ভাই, ভাইপো, ভগ্নীপতি প্রভৃতিকে তিনি তাঁর আপনজন বলে মনে করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর দেহের দাবিগুলি মেটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর ঐ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্যই ভগবান ভগবদ্‌গীতার দিব্যজ্ঞান তাকে দান করেন। এই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তা প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারার ফলেই অর্জুন ভগবানের পরিচালনায় যুদ্ধ করতে ব্রতী হন। তখন তিনি বলেন, করিষ্যে বচনং তব-“তুমি যা বলবে আমি তাই করব।”

এই পৃথিবীতে মানুষ কুকুর-বেড়ালের মতো ঝগড়া করে দিন কাটাবার জন্য আসেনি। তাকে তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে এবং একটি পশুর মতো জীবন যাপন করা বর্জন করতে হবে। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছে, এবং সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারাংশ ব্যক্ত হয়েছে ভগবদ্‌গীতাতে। বৈদিক সাহিত্য মানুষের জন্য, পশুদের জন্য নয়। তাই প্রতিটি মানুষের কর্তব্য হচ্ছে বৈদিক জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করে মানবজীবন সার্থক করে তোলা। কোন পশু যখন অন্য পশুকে হত্যা করে, তাতে তার পাপ হয় না, কিন্তু মানুষ যদি তার বিকৃত রুচির তৃপ্তি সাধনের জন্য কোন পশুকে হত্যা করে, তখন সে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধে অপরাধী হয়। ভগবদ্‌গীতাতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, প্রকৃতির বিভিন্ন গুণ অনুসারে তিন রকমের কর্ম সাধিত হয়, যথা-সত্ত্বগুণের প্রভাবে কর্ম, রজোগুণের প্রভাবে কর্ম এবং তমোগুণের প্রভাবে কর্ম। তেমনই আহার্য বস্তুও আছে তিন ধরনের-সত্ত্বগুণের আহার, রজোগুণের আহার, আর তমোগুণের আহার। এই সবই পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা আছে এবং যদি আমরা ভগবদ্‌গীতার এই সব নির্দেশ যথার্থভাবে কাজে লাগাই, তা হলে আমাদের সারা জীবন পবিত্র হয়ে উঠবে এবং পরিণামে আমরা এই জড় জগতের আকাশের উর্ধ্বে আমাদের পরম লক্ষ্যে উপণীত হতে পারব (যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম)।

এই পরম গন্তব্যস্থলের নাম সনাতন ধাম। সেই নিত্য শাশ্বত অপ্রাকৃত জগৎই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত আলয়। এই জড় জগতে আমরা দেখতে পাই সব কিছু অস্থায়ী। তাদের প্রকাশ, কিছুকালের জন্য তারা অবস্থান করে, কিছু ফল প্রসব করে, ক্ষয় প্রাপ্ত হয় এবং তারপর এক সময় তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এটিই হচ্ছে জড় জগতের ধর্ম, আমাদের এই দেহ, অথবা এক টুকরো ফল অথবা অন্য যে-কোন কিছুরই দৃষ্টান্ত আমরা দিই না কেন। কিন্তু এই অস্থায়ী জগতের অতীত আর একটি জগৎ আছে, যার কথা আমরা জানতে পারি বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে। সেই জগৎ শাশ্বত, সনাতন। বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি জীবও শাশ্বত, সনাতন। ভগবদ্‌গীতার একাদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভগবান সনাতন এবং সনাতন ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবার ফলে জীবাত্মাও সনাতন। ভগবানের সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে, এবং যেহেতু গুণগতভাবে সনাতন ধাম, সনাতন ভগবান ও সনাতন জীব-সবই এক, তাই ভগবদ্‌গীতার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সনাতন বৃত্তি অথবা আমাদের সনাতন ধর্মকে পুনর্জাগরিত করা। অস্থায়ীভাবে আমরা নানা ধরনের কর্মে নিয়োজিত হয়ে রয়েছি, কিন্তু এই সমস্ত কর্ম পবিত্রতা অর্জন করতে পারে, যদি আমরা এই সমস্ত অস্থায়ী কর্ম বর্জন করি আর পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশ মতো কর্মভার গ্রহণ করি। এরই নাম পবিত্র জীবন।

ভগবান ও তাঁর দিব্যধাম উভয়ই সনাতন। জীবও সনাতন। জীব যখন তার সনাতন প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলে সনাতন ধাম ভগবানের সান্নিধ্যে আসে, তখনই তার জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। যেহেতু সমস্ত জীব পরমেশ্বরেরই সন্তান, সেই কারণে তাদের সকলেরই প্রতি তিনি পরম করুণাময়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতাতে (১৪/৪) বলেছেন, সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ/তাসাং ব্রহ্ম মহদ্‌যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা-“হে কৌন্তেয়! সমস্ত যোনিতে যে সমস্ত দেহ উৎপন্ন হয়, ব্রহ্মরূপা প্রকৃতিই তাদের জননী এবং আমিই বীজ প্রদানকারী পিতা।” অবশ্যই বিভিন্ন কর্ম অনুসারে সব করমের জীব রয়েছে, কিন্তু এখানে ভগবান বলেছেন যে, তিনি সকলেরই পিতা। তাই এই পৃথিবীতে ভগবান অবতরণ করেন এই সমস্ত পতিত, বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য, যাতে তারা তাদের শাশ্বত সনাতন অবস্থা ফিরে পেয়ে ভগবানের সঙ্গে চিরন্তন সঙ্গ লাভ করে এবং সনাতন শাশ্বত চিদাকাশে আবার অধিষ্ঠিত হতে পারে। ভগবান স্বয়ং বিভিন্ন অবতাররূপে অবতরণ করেন, কখনও বা তিনি তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরকে অথবা তাঁর প্রিয় সন্তানকে পাঠান, কখনও বা তাঁর অনুগামী ভৃত্যকে বা আচার্যকে পাঠন বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য।

তাই সনাতন ধর্ম বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মপদ্ধতিকে বোঝায় না। এটি হচ্ছে পরম শাশ্বত ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নিত্য শাশ্বত জীবসকলের নিত্য ধর্ম। আগেই বলা হয়েছে, সনাতন ধর্ম হচ্ছে জীবের নিত্য ধর্ম। শ্রীপাদ রামানুজাচার্য সনাতন শব্দটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “যার কোন শুরু নেই এবং শেষ নেই।” তাই যখন আমরা সনাতন ধর্মের কথা বলি, শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের নির্দেশনুসারে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই ধর্মের আদি নেই এবং অন্ত নেই।

 

ক্রমশঃ

Advertisements

মুখবন্ধ-০৪ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


ভগবানের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক হচ্ছে প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্ক। প্রভু যদি সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হয়, তবে ভৃত্যও সন্তুষ্ট হয়। সেই রকম, পরমেশ্বর ভগবানকে সন্তুষ্ট করা উচিত। যদিও সৃষ্টিকর্তা হওয়ার প্রবণতা এবং জড় জগৎ উপভোগের প্রবণতা জীবদের মধেও রয়েছে, কেন না প্রকাশমান জগতের সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর ভগবানের মধ্যে সেই একই প্রবণতা বিদ্যমান।

সুতরাং, ভগবদ্‌গীতাতে আমরা দেখতে পাব যে, পরম নিয়ন্তা, নিয়ন্ত্রণাধীন জীবসকল, নিখিল জগৎ, মহাকাল ও কর্ম-এই সব নিয়েই পূর্ণ সত্তা বিরাজিত, এবং সব কিছুরই আলোচনা এখানে ব্যাখ্যা করা আছে। এগুলি এক সাথে নিয়েই পূর্ণ পরম সত্তা গঠিত হয়। এই পূর্ণ সত্তাকে বলা হয় পরমতত্ত্ব। এই পূর্ণ সত্তা ও পূর্ণ পরমতত্ত্ব হচ্ছেন পূর্ণ পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁরই বিভিন্ন শক্তির ফলে সমস্ত কিছুরই অভিপ্রকাশ ঘটে থাকে। তিনিই হচ্ছেন সম্যক্ভাবে পূর্ণ।

গীতাতে এই কথাও বলা হয়েছে যে, নির্বিশেষ ব্রহ্মের আরও বিশদ ব্যাখ্যা করে ব্রহ্মসূত্রতে বলা হয়েছে যে, নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে সূর্যরশ্মির মতো। নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের রশ্মিচ্ছটা। তাই, নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে পূর্ণ পরমতত্ত্বের অসম্পূর্ণ উপলব্ধি এবং পরমাত্মার ধারণাও সেই রকম। ভগবদ্‌গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে দেখা যাবে যে, পরমাত্মার উপলব্ধিও ভগবানের পূর্ণ উপলব্ধি নয়। কারণ পরমাত্মা হচ্ছে ভগবানের আংশিক প্রকাশ। ভগবদ্‌গীতাতে আমরা জানতে পারি যে, পুরুষোত্তম ভগবান হচ্ছেন নির্বিশেষ ব্রহ্ম ও পরমাত্মা উভয়েরই ঊর্ধ্বে পরমতত্ত্ব। ভগবান হচ্ছেন সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। ব্রহ্মসংহিতার শুরুতেই বলা হয়েছে-ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ/অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।”পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বা গোবিন্দ হচ্ছেন সর্বকারণের কারণ, অনাদির আদি গোবিন্দ এবং সৎ, চিৎ ও আনন্দের মূর্তবিগ্রহ হচ্ছেন তিনিই।” ব্রহ্ম-উপলব্ধি হচ্ছে তাঁর সৎ (শাশ্বত সনাতন) বৈশিষ্টের উপলব্ধি। পরমাত্মা-উপলব্ধি হচ্ছে সৎ-চিৎ (অনন্ত জ্ঞান) রূপের উপলব্ধি। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করা হচ্ছে তাঁর সৎ, চিৎ ও আনন্দের অপ্রাকৃত রূপকে পূর্ণভাবে অনুভব করা।

অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করে যে, পরমতত্ত্ব হচ্ছেন নির্বিশেষ, তাঁর কোন রূপ নেই, কোন আকার নেই, কিন্তু তাদের এই ধারাণাটি ভুল। তিনি হচ্ছেন অপ্রাকৃত চিন্ময় পুরুষ; সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে এই কথা দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্। (কঠ উপনিষদ ২/২/১৩) যেমন আমরা সকলে স্বতন্ত্র জীব এবং আমাদের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য আছে, তেমনই পরম-তত্ত্বের সর্বোচ্চ স্তরে যিনি সর্বকারণের কারণ, তাঁরও রূপ আছে। তিনি পুরুষ, তিনি ভগবান এবং প্রাকৃত ও অপ্রাকৃত সমস্ত কিছুর উৎস হচ্ছেন তিনিই। তাঁকে উপলব্ধি করা হলে তাঁর অপ্রাকৃত রূপের সব কিছুই উপলব্ধি করা হয়ে যায়। যিনি স্বয়ং পূর্ণ, তিনি কখনই নির্বিশেষ হতে পারেন না। যদি তিনি নির্বিশেষ হন, যদি তিনি কোন কিছু ন্যুন হন, তবে তিনি পূর্ণ হবেন কেমন করে? আমাদের অভিজ্ঞতায় যা আছে এবং যা আমাদের অভিজ্ঞতার অতীত, তা সবই ভগবানের মধ্যে বিদ্যমান। নতুবা তা পূর্ণতত্ত্ব হতে পারে না।

সম্যক্ সম্পূর্ণ পুরুষোত্তম ভগবানের মধ্যে রয়েছে বিপুল শক্তিরাজি (পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রূয়তে)। শ্রীকৃষ্ণের শক্তির বিভিন্ন প্রকাশ কিভাবে হয়, তাও ভগবদ্‌গীতাতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই যে পরিদৃশ্যমান জগৎ অথবা অনিত্য জড় জগৎ, যাতে আমরা অধিষ্ঠিত হয়েছি, এটিও স্বয়ং পূর্ণ, কারণ যে চব্বিশটি উপাদান দ্বারা এই জড় জগৎ অনিত্যরূপে অভিব্যক্ত হয়েছে, সাংখ্য-দর্শন অনুযায়ী, তাদের সম্যক্‌রূপে সমন্বয়ের ফলে উদ্ভুত হয়েছে পূর্ণ সম্পদ, যা এই ব্রহ্মাণ্ডের অস্ত্বিত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। এর মধ্যে কোন কিছুই অতিরিক্ত নেই, আবার অন্য কিছুর দরকারও নেই। এই অভিপ্রকাশের স্থায়িত্ব পরম পূর্ণের শক্তির দ্বারা নির্ধারিত নিজস্ব সময়ের উপর নির্ভরশীল। সেই সময় শেষ হয়ে গেলে, পরম পূর্ণের পূর্ণ ব্যবস্থার নির্দেশে এই অস্থায়ী অভিব্যাক্তির লয় হয়ে যায়। এখানে জীবও তার ক্ষুদ্র সত্তা নিয়ে পূর্ণ এবং পরম পূর্ণ ভগবানকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করবার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সমস্ত জীবেরই আছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ভগবানের সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অপূর্ণ, তাই আমরা সব রকমের অপূর্ণতা অনুভব করি। ভগবৎ তত্ত্বজ্ঞানের পূর্ণ প্রকাশ হয়েছে বেদে এবং বৈদিক জ্ঞান পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে ভগবদ্‌গীতাতে।  

বেদের সমস্ত জ্ঞানই অভ্রান্ত। হিন্দুরা জানে যে, বেদ পূর্ণ ও অভ্রান্ত। যেমন স্মৃতি, অর্থাৎ বৈদিক অনুশাসন অনুযায়ী পশুর মল অপবিত্র এবং তা স্পর্শ করলে স্নান করে পবিত্র হতে হয়। আবার বৈদিক শাস্ত্রেই বলা হচ্ছে যে, গোময় পশুর মল হলেও তা পবিত্র, এমনকি কোন স্থান যদি অপবিত্র হয়ে থাকে, তবে সেখানে গোময় লেপন করলে তা পবিত্র হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি পরস্পরবিরোধী উক্তি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বৈদিক অনুশাসন বলেই এটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি গ্রহণ করে কেউ ভুল করেছে, তা বলা হয় না। পরবর্তীকালে জীবাণুনাশক গুণ বর্তমান রয়েছে। সুতরাং বৈদিক জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে অভ্রান্ত এবং তাই বেদকে নিঃশঙ্কচিন্তে অনুসরণ করা যায়। বৈদিক জ্ঞান সব রকম সন্দেহ ও ভ্রান্তির অতীত, এবং ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারাংশ।

বৈদিক জ্ঞান নিয়ে গবেষণা চলে না। গবেষণা বলতে সাধারণত যা বোঝায়, তা ত্রুটিপূর্ণ, কারণ ত্রুটিপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ঐ সব গবেষণা হয়ে থাকে। ত্রুটিহীন, অভ্রান্ত জ্ঞান আমাদের ভগবদ্‌গীতা থেকে গ্রহণ করতে হবে, যার উৎস হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান এবং যা গুরু-শিষ্য পরম্পরাক্রমে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিতভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্জুন যখন শিষ্যরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে গীতার জ্ঞান আহরণ করেন, তখন তিনি কোন রকম বাদানুবাদ না করে, ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণীকে পরম সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। ভগবদ্‌গীতাকে আংশিকভাবে গ্রহণ করা চলে না। আমরা বলতে পারি না যে, ভগবদ্‌গীতার একটি অংশ আমরা গ্রহণ করব, আর বাকিটা গ্রহণ করব না। ভগবদ্‌গীতার বাণী সম্পূর্ণঅপরিবর্তিতভাবে খেয়ালখুশি মতো বাদ না দিয়ে কিংবা মনগড়া ব্যাখ্যা না করেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যেভাবে তা বলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই ভগবদ্‌গীতার যথাযথ নির্দেশ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, গীতা হচ্ছে বৈদিক জ্ঞানের পূর্ণ প্রকাশ। বৈদিক জ্ঞান এই জড় জগতের জ্ঞান নয়, এর প্রবর্তক হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান, তাই বেদের জ্ঞান হচ্ছে দিব্যজ্ঞান। অপ্রাকৃত উৎস থেকে বৈদিক জ্ঞান গ্রহণ করতে হয় এবং এর প্রথম বাণী নিঃসৃত হয়েছিল স্বয়ং ভগবানের কাছ থেকেই। ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণীকে বলা হয় অপৌরুষেয় অর্থাৎ ভগবানের কথা সাধারণ মানুষের কথার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, সাধারণ মানুষ চারটি ত্রুটির দ্বারা কলুষিত-১) ভ্রম, ২) প্রমাদ, ৩) বিপ্রলিপ্সা, ৪) করণাপাটব। ভ্রম-সাধারণ মানষ অবধারিতভাবে ভুল করে; প্রমাদ-সে মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন, বিপ্রলিপ্সা-সে অন্যকে প্রতারণা করতে চেষ্টা করে এবং করণাপাটব-সে তার ত্রুটিপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সীমিত। এই সমস্ত ত্রুটি থাকার ফলে মানুষ সর্বপরিব্যাপ্ত পরম জ্ঞান গ্রহণ করতে ও প্রদান করতে অক্ষম।

বৈদিক জ্ঞান এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জীবদের দ্বারা প্রদত্ত হয়নি। প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মার হৃদয়ে ভগবান সর্বপ্রথমে এই জ্ঞান প্রদান করেন, তারপর ব্রহ্মা যেভাবে পরমেশ্বরের কাছ থেকে সেই জ্ঞান পেয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই তাঁর সন্তান ও শিষ্যদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। ভগবান হচ্ছেন পূর্ণ, জড়া প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা তাঁর কখনই প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই যাঁরা যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন তাঁরা বুঝতে পারেন, ভগবানই হচ্ছে আদি স্রষ্টা-ব্রহ্মাকে তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি হচ্ছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুর ভোক্তা। ভগবদ্‌গীতার একাদশ অধ্যায়ে ভগবানকে প্রপিতামহ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, কারণ তিনি পিতামহ ব্রহ্মারও পিতা। এভাবে সর্বত্রই আমরা দেখতে পাই যে, ভগবানই হচ্ছে সব কিছুর স্রষ্টা। তাই আমাদের কখনই মনে করা উচিত নয়, আমরা কোন কিছুর মালিক। মালিক কেবল তিনিই, যিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। জীবন ধারণ করার জন্য যেটুকু প্রয়োজন এবং ভগবান আমাদের জন্য যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, ঠিক ততটুকুই আমাদের গ্রহণ করা উচিত।

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৩ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


জড়া প্রকৃতি কি? গীতায় তাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, তা হচ্ছে নিকৃষ্টা প্রকৃতি আর জীবকে বলা হয়েছে উৎকৃষ্টা প্রকৃতি। উৎকৃষ্ট হোক বা নিকৃষ্টই হোক, প্রকৃতি সব সময় নিয়ন্ত্রণাধীন। স্ত্রী যেমন স্বামীর দ্বারা পরিচালিত হয়, নারীস্বরূপা প্রকৃতিও তেমনই ঈশ্বরের দ্বারা পরিচালিত। জীব ও জড়া প্রকৃতি উভয়কে পরমেশ্বর পরিচালিত করেন। গীতাতে বলা হয়েছে, জীব যদিও ভগবানের অপরিহার্য অংশ, তবুও তাকে প্রকৃতি বলেই স্বীকার করতে হবে। ভগবদ্‌গীতার সপ্তম অধ্যায়ে তা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্/জীবভূতাম্-“এই জড়া প্রকৃতি আমার নিম্নতর প্রকৃতি, এই নিম্নতর প্রকৃতির অতীত আর একটি প্রকৃতি আছে-জীবভূতাম্‌অর্থাৎ জীবসত্তা।

জড়া প্রকৃতি গঠিত হয়েছে সত্ত্ব, রজ ও তম_ এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে। এই গুণত্রয়ের ঊর্ধ্বে আছে অনন্ত কাল এবং অনন্ত কালের প্রভাবে ও পরিচালনায় এই গুণগুলির সমন্বয় ঘটে এবং তার ফলে প্রকৃতি সক্রিয় হয়ে ওঠে-একে বলা হয় কর্ম। অনন্ত কাল ধরে এই কর্মপ্রক্রিয়া ঘটে চলেছে। আমরা আমাদের কর্মের ফলস্বরূপ সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করি। যেমন, মনে করা যাক যে, আমি একজন ব্যবসায়ী, তখন আমি যদি বুদ্ধি খাটিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করি, তবে আমি সেই অর্থ উপভোগ করতে পারি। কিন্তু আমি যদি আমার সমস্ত সম্পদ অপচয় করে ফেলি, তবে আমাকে ক্লেশ স্বীকার করতে হবে। সেই রকম জীবনের প্রতিটি ক্ষত্রেই আমাদের কর্মের ফলস্বরূপ সুখ অথবা দুঃখ পেয়ে থাকি।

ভগবদ্‌গীতায় ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম-এই সব কিছুরই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পাঁচটির মধ্যে ঈশ্বর, জীব, জড়া প্রকৃতি ও কাল হচ্ছে নিত্য। প্রকৃতির অভিপ্রকাশ অনিত্য হতে পারে, কিন্তু তা মিথ্যা নয়। কোন কোন দার্শনিক বলে থাকেন যে, জড়া প্রকৃতির প্রকাশ মিথ্যা, কিন্তু ভগবদ্‌গীতার দর্শন বা বৈষ্ণব দর্শন তা স্বীকার করে না। প্রকৃতির প্রকাশ যদিও সাময়িক, তবুও তা সত্য। তাকে আকাশে ভাসমান মেঘ অথবা শস্যের পুষ্টি সাধনকারী বর্ষা ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা চলে। যখন বর্ষা ঋতু শেষ হয়ে যায় এবং মেঘ ভেসে চলে যায়, তখন সমস্ত শস্যকণা যা বৃষ্টির ফলে পুষ্ট হয়েছিল, তা শুকিয়ে যায়। তেমনই কোন এক সময়ে এই জড় জগতের প্রকাশ, কিছুকালের জন্য তার স্থিতি হয় এবং তারপর তা অন্তর্হিত হয়ে যায়। প্রকৃতি এভাবে কাজ কলে চলে। এভাবে অনন্তকাল ধরে প্রকৃতির প্রকাশ, স্থিতি ও অন্তর্ধান হয়ে চলেছে। তাই প্রকৃতি নিত্য, প্রকৃতি মিথ্যা নয়। ভগবান তাই একে বলেছেন, “আমার প্রকৃতি”। এই জড়া প্রকৃতি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের ভিন্না প্রকৃতি। তেমনই জীবও হচ্ছে ভগবানের শক্তি, তবে তারা বিচ্ছিন্ন নয়, ভগবানের সঙ্গে নিত্য সম্পর্কযুক্ত। তাই ঈশ্বর, জীব, জড়া প্রকৃতি ও কাল একে অপরের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং সকলেই নিত্য। কিন্তু অন্য বিষয় কর্ম নিত্য নয়। বস্তুত কর্মের ফল অতি প্রাচীন হতে পারে। স্মরণাতীত কাল থেকে কর্মের ফলস্বরূপ আমরা সুখ অথবা দুঃখ ভোগ করছি। কিন্তু আমরা আমাদের কর্মফলকে পরিবর্তিত করতে পারি এবং এই পরিবর্তন নির্ভর করে আমাদের জ্ঞানের পূর্ণতার উপর। আমরা নানা রকমের কর্ম সম্পাদন করি। নিঃসন্দেহে আমরা জানি না, কোন কর্ম আমাদের করা উচিত এবং কোন্‌কর্ম করা উচিত নয়। বিশেষ করে আমরা জানি না, কোন্ কর্ম করলে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হোয়া যায়। ভগবদ্‌গীতায় ভগবান তার ব্যাখ্যা করে আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন কোন্‌কর্ম করা আমাদের কর্তব্য।

ঈশ্বর হচ্ছেন পরম চেতনার উৎস। জীব ঈশ্বরের অপরিহার্য অংশ, তাই সেও চেতন। জীব ও জড়া প্রকৃতি উভয়কেই প্রকৃতি বা ভগবানের শক্তি বলা হয়। কিন্তু তার মধ্যে জীবনই কেবল চেতন-জড়া প্রকৃতি অচেতন। সেটিই হচ্ছে পার্থক্য। তাই জীব-প্রকৃতিকে উৎকৃষ্টতর প্রকৃতি বলা হয়, কেন না জীব ভগবানের মতো চৈতন্যময়। ঈশ্বর কিন্তু পরম চৈতন্যময়, কেউ যদি বলে যে, জীবও পরম চৈতন্যময়, তবে তা ভুল হবে। জীব কোন অবস্থাতেই সমস্ত চেতনার উৎস হতে পারে না। জীব তার সিদ্ধি লাভের কোন অবস্থাতেই পরম চৈতন্যময় হতে পারে না, এবং জীব তা হতে পারে কোন মতবাদে যদি বলে, তবে সেটি বিভ্রান্তিকর মতবাদ। সে চৈতন্যময় বটে, কিন্তু পরম চৈতন্যময় নয়।

জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, জীবের মতো ভগবানও ক্ষেত্রজ্ঞ অর্থাৎ চেতন, তবে জীব কেবল তার নিজের দেহটি সম্বন্ধে সচেতন, কিন্তু ভগবান সমস্ত দেহ সম্বন্ধেই সচেতন। যেহেতু তিনি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করেন, তাই তিনি সকলের অন্তরতম প্রদেশের কথা জানেন। এই কথা আমাদের ভুললে চলবে না। এই সম্বন্ধে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, পরম পুরুষোত্তম ভগবান পরমাত্মারূপে সর্বজীবের অন্তরে অধিষ্টিত এবং জীবের বাসনা অনুসারে তিনিই তাদের পরিচালিত করেন।

মোহাচ্ছন্ন হয়ে জীব তার কর্তব্যকর্ম ভুলে যায়। প্রথমত তার স্বাধীন ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে সে কোন কিছু করার সংকল্প করে, এবং তারপর সে নিজের কর্মের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে এক দেহ পরিত্যাগ করে আর এক দেহ ধারণ করে-যেমন আমরা পুরাতন কাপড় ফেলে দিয়ে নতুন কাপড় পরি। এভাবে পূর্বকৃত কর্মের ফলস্বরূপ আত্মা এক দেহ থেকে আর এক দেহে দেহান্তরিত হয় এবং তার বিগত কর্ম অনুসারে সে নানা রকম কষ্ট পায়। কিন্তু জীব যখন সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রকৃতিস্থ হয় এবং তার কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে সচেতন হয়, তখনই সে তার পূর্বকৃত কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়। তখন আর তাকে তার পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করতে হয় না। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, কর্ম নিত্য নয়। তাই ভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি ও কাল নিত্য, কিন্তু কর্ম অনিত্য।

পরম চৈতন্যময় ঈশ্বর ও জীব গুণগতভাবে এক। ঈশ্বরের পরম চৈতন্য এবং জীবের অনুচেতনা, উভয়েই অপ্রাকৃত। এমন নয় যে, জড় বস্তুর সংস্পর্শে আসার ফলে জীবের চেতনার বিকাশ হয়। এই ধারণাটি ভ্রান্ত। কোন বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশে জড়ের মধ্য থেকে চেতনের উদ্ভব হয়, সেই কথা ভগবদ্‌গীতায় স্বীকার করা হয় নি। জড়া প্রকৃতির প্রভাবে চেতনার বিকৃত প্রতিফলন হতে পারে এবং তা হচ্ছে রঙিন কাঁচের মাধ্যমে প্রতিফলিত রঙিন আলোকের মতো। কিন্তু পরমেশ্বরের চেতনা কখনই জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত বা কলুষিত হয় না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ-“আমার দ্বারা পরিচালিত প্রকৃতি।” তিনি যখন এই জড় জগতে অবতরণ করেন, তখন তাঁর চেতনা জড়া প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত হয় না। তাই যদি হত, তবে তিনি পরম তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত ভগবদ্‌গীতার জ্ঞান দান করতে পারতেন না। জড়া প্রকৃতির দ্বারা চেতনা যতক্ষণ কলুষিত থাকে, ততক্ষণ অপ্রাকৃতি জগৎ সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ব্যক্ত করা যায় না। ভগবান পরম চৈতন্যময় এবং তিনি জড়া প্রকৃতির কলুষ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। তাই, অপ্রাকৃত জগতের পূর্ণ জ্ঞান কেবল তিনি দান করতে পারেন।

আমাদের চেতনা এখন জড়া প্রকৃতির প্রভাবে কলুষিত হয়ে আছে। তাই, ভগবদ্‌গীতার মাধ্যমে ভগবান আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, কিভাবে আমাদের চেতনা কলুষমুক্ত হয়ে পবিত্র হলে আমাদের অন্তর ভগবন্মুখী হয়ে ওঠে এবং তখন আমাদের সমস্ত কর্তব্যকর্মই ভগবানের ইচ্ছানুসারে সাধিত হয়, ফলে আমরা সুখী হতে পারি। এমন নয় যে, কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হলে আমাদের সমস্ত কতর্ব্যকর্ম ত্যাগ করতে হবে। কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হবার উপায় হচ্ছে কর্তব্যকর্মকে পবিত্র করা। এই পবিত্র কর্মেরই নাম ভক্তি। ভক্তির বর্শবর্তী হয়ে যে কর্ম করা হয়, আপাতদৃষ্টিকে তাকে সাধারণ কর্ম বলে মতে হতে পারে, কিন্তু এই কর্মকে কোন রকম কলুষতা কখনো স্পর্শ করতে পারে না। ভগবানের ভক্তকে দেখে একজন মূর্খ লোক মনে করতে পারে যে, তিনি সাধারণ মানুষের মতোই কাজ করে চলেছেন, কিন্তু সেটি তার নির্বুদ্ধিতা। সে বুঝতে পারে যে, ভগবদ্ভক্ত অথবা ভগবানের কার্যকলাপ অপবিত্র চেতনা বা জড়ের দ্বারা কলুষিত হয় না। সেই সমস্ত ত্রিগুণাতীত। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আমাদের চেতনা এখন কলুষিত এবং তাই ভক্তিযোগ সাধন করার মাধ্যমে আমাদের চেতনাকে কলুষমুক্ত করতে হবে।

আমরা যখন জড়ের প্রভাবে কলুষিত থাকি, তখন আমাদের সেই অবস্থাকে বলা হয় বদ্ধ অবস্থা। এই বদ্ধ অবস্থায় আমাদের চেতনা বিকৃত হয়ে থাকে এবং তার ফলে আমরা মনে করি যে, জড় পদার্থ থেকে আমরা উদ্ভুত হয়েছি। এরই নাম অহঙ্কার। যে মানুষ তার দেহগতচিন্তায় মগ্ন, সে কখনও তার স্বরূপ জানতে পারে না। ভগবান ভগবদ্‌গীতায় বলেছিলেন, যাতে মানুষ তার দেহগত ভাবনাকে অতিক্রম করে তার স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে। ভগবানের কাছ থেকে এই জ্ঞান লাভ করার জন্যই অর্জুন নিজেকে সেই অবস্থায় উপস্থাপিত করেছিলেন।

দেহাত্মবুদ্ধি থেকে অবশ্যই মুক্তিলাভ করতে হবে; অধ্যাত্মবাদীদের সেটিই প্রাথমিক কতর্ব্য। এই জড় বন্ধন থেকে যে মুক্ত হতে চায়, তাকে প্রথমে জানতে হবে যে, তার প্রকৃত স্বরূপ তার জড় দেহটি নয়। মুক্তির অর্থই হচ্ছে জড় চেতনা থেকে মুক্ত হওয়া। শ্রীমদ্ভাগবতেও মুক্তির অর্থ ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, মুক্তির্হিত্বান্যথারূপঙ স্বরূপেণ ব্যবস্থিতিঃ -মুক্তির অর্থ হচ্ছে এই জড় জগতের কলুষিত চেতনা থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধ চেতনার স্তরে অবস্থিত হওয়া। ভগবদ্‌গীতার প্রতিটি নির্দেশই এই পবিত্র শুদ্ধ চেতনার স্তরে অবস্থিত হওয়ার কথা বলছে এবং তাই আমরা দেখতে পাই যে, ভগবদ্‌গীতার শেষ পর্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জিজ্ঞেস করছেন যে, তাঁর চেতনা কলুষমুক্ত হয়ে পবিত্র হয়েছে কি না। পবিত্র বা বিশুদ্ধ চেতনা বলতে বোঝায় ভগবানের নির্দেশ অনুসারে কর্ম করা। এই হচ্ছে বিশুদ্ধ চেতনার মর্মার্থ। আমরা যেহেতু ভগবানের অপরিহার্য অংশ, তাই আমরা চেতন, কিন্তু জড়া প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার ফলে প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা আমাদের চেতনা প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে। কিন্তু ভগবান যেহেতু পরমেশ্বর, তাই তিনি কখনই এর দ্বারা প্রভাবান্বিত হন না। ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র জীব ও ভগবানের মধ্যে এটিই হচ্ছে পার্থক্য।

এই চেতনা বলতে কি বোঝায়? এই চেতনা হচ্ছে “আমি আছি।” তারপর আমি কি? কলুষিত চেতনায় এই আমি মানে, “আমি হচ্ছি সমস্ত জগতের অধীশ্বর। আমি হচ্ছি ভোক্তা।” এই জগৎ প্রতিনিয়তই আবর্তিত হচ্ছে, কারণ প্রত্যেকটি জীবসত্তা মনে করে যে, সে হচ্ছে এই জড় জগতের স্রষ্টা ও অধীশ্বর। জড় চেতনার দুটি প্রকাশ হয়। তার একটির প্রভাবে জীব মনে করে সে হচ্ছে স্রষ্টা এবং অন্যটির প্রভাবে সে মনে করে সে হচ্ছে ভোক্তা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন সব কিছুর স্রষ্টা ও ভোক্তা, আর জীব ভগবানের অপরিহার্য অংশ হবার ফলে সে স্রষ্টাও নয়, ভোক্তাও নয়, সে হচ্ছে সহায়ক। সে হচ্ছে সৃষ্ট ও ভোগ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি যন্ত্রের একটি অংশ যেমন সমগ্র যন্ত্রটির পরিচালনায় সহযোগিতা করে, ঠিক তেমনই ভগবানের অংশ হবার ফলে জীবের একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের কাজে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা।

হাত, পা, চোখ, মুখ আদি হচ্ছে দেহের বিভিন্ন অংশ, কিন্তু তারা কখনই ভোক্তা নয়। ভোক্তা হচ্ছে উদর, এগুলি সমষ্টিগতভাবে কাজ করে উদরকে ভোগ করতে সাহায্য করে। যেমন পা দেহকে বহন করে নিয়ে চলে, হাত খাদ্য সংগ্রহ করে, দাঁত চর্বন করে। এভাবে সমস্ত দেহই উদরকে ভোগ করতে সহযোগিতা করে, কারণ উদর তুষ্ট হলে সমস্ত দেহ পুষ্ট হয়। তাই সব কিছু উদরকে দেওয়া হয় এবং তার ফলে সমস্ত দেহ বলিষ্ঠ ও সক্রিয় হয়। গাছের গোড়ায় জল দিলে যেমন সমস্ত গাছটিকে জল দেওয়া হয়, উদরকে খাদ্য দিলে যেমন দেহকে খাদ্য দেওয়া হয়, ঠিক তেমনই পরম স্রষ্টা ও পরম ভোক্তা ভগবানের সৃষ্টিকার্যে ও ভোগের কার্যে সহযোগিতা করাই আমাদের কর্তব্য। এভাবে তাঁকে তুষ্ট করার ফলেই আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সফল হয়। যদি হাতের আঙুল মনে করে, উদরকে না দিয়ে সে নিজেই সব কিছু খাবে, তা হলে তাকে নিরাশ হতে হবে। ঠিক তেমনই জীব যদি মনে করে, ভগবানকে বাদ দিয়ে সে নিজেই সুখী হবে, তবে তাকে নিরাশ হতে হবে। ভগবান সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই হচ্ছে একমাত্র ভোক্তা, আর সমস্ত জীব হচ্ছে তাঁর সহায়ক। ভগবানের সহায়তা করার মাধ্যমে জীব তার অস্তিত্বের সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারে এবং তার ফলেই সে আনন্দ উপভোগ করতে পারে।

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০২ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


ভগবদ্‌গীতার মর্মোপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে অর্জুন কিভাবে তা গ্রহণ করেছিলেন। ভগবদ্‌গীতার দশম অধ্যায়ে (১০/১২-১৪) তা বর্ণনা করা হয়েছে-

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবজং বিভুম্॥

আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা।

অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে॥

সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ॥ 

অর্জুন বললেন-তুমিই পরম পুরুষোত্তম ভগবান, পরম ধাম, পরম পবিত্র ও পরব্রহ্ম। তুমিই শাশ্বত, দিব্য, আদি পুরুষ, অজ ও বিভু। নারদ, অসিত, দেব, ব্যাস আদি সমস্ত মহান ঋষিরাই তোমার এই তত্ত্ব প্রতিপন্ন করে গেছেন, আর এখন তুমি নিজেও তা আমার কাছে ব্যক্ত করছ। হে শ্রীকৃষ্ণ, তুমি আমাকে যা বলেছ তা আমি সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করেছি। হে ভগবান! দেব অথবা দানব কেউই তোমার তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না।”

পরম পুরুষোত্তম ভগবানের কাছে ভগবদ্‌গীতা শোনার পর অর্জুন বুঝতে পেরেছিলেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরং ব্রহ্ম অর্থাৎ পরব্রহ্ম। প্রতিটি জীবন ব্রহ্ম, কিন্তু পরম জীব অথবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান হচ্ছে পরব্রহ্ম। পরং ধাম কথাটির অর্থ হচ্ছে তিনি সব কিছুর পরম আশ্রয় অথবা পরম ধাম। পবিত্রম্ মানে তিনি হচ্ছে বিশুদ্ধ অর্থাৎ জড় জগতের কোন রকম কলুষ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। পুরুষম্ কথাটির অর্থ হচ্ছে, তিনিই পরম ভোক্তা, শাশ্বতম্ অর্থ সনাতন, দিব্যম্ কথাটির অর্থ হচ্ছে অপ্রাকৃত; আদিদেবম্ অর্থ পরম পুরুষ ভগবান; অজম্‌ অর্থ জন্মরহিত এবং বিভুম্‌ শব্দটির অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ।

কেউ মনে করতে পারেন যে, অর্জুন যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের বন্ধু ছিলেন, তাই তিনি ভাবোচ্ছ্বসিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের গুণকীর্তন করেছেন। কিন্তু ভগবদ্‌গীতার পাঠকের মন থেকে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য অর্জুন পরবর্তী শ্লোকে বলেছেন যে, নারদ, অসিত, দেবল বলে স্বীকার করেছেন। তাই অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন যে, তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথাকেই তিনি সম্পূর্ণ নির্ভুল বলে গ্রহণ করেন। সর্বমেতদ্‌ঋতং মন্যে-“তোমার প্রতিটি কথাই আমি পরম সত্য বলে গ্রহণ করি।” অর্জুন আরও বলেছেন যে, ভগবানের ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করা খুবই দুষ্কর এবং দেবতারাও তাঁর প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারেন না। এর অর্থ হচ্ছে যে, মানুষের চেয়ে উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত যে দেবতা, তাঁরাও ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে অক্ষম। তাই সাধারণ মানুষ ভগবানের ভক্ত না হলে কিভাবে তাঁকে উপলব্ধি করবে?

ভগবদ্‌গীতাকে তাই ভক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।

শ্রীকৃষ্ণকে কখনই আমাদের সমকক্ষ বলে মনে করা উচিত নয়। শ্রীকৃষ্ণকে একজন সাধারণ ব্যক্তি বলে মনে করা উচিত নয়, এমন কি তাঁকে একজন মহাপুরুষ বলেও মনে করা উচিত নয়। ভগবদ্‌গীতার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে হলে শ্রীকৃষ্ণকে পরম পুরুষোত্তম ভগবান বলে স্বীকার করে নিতেই হবে। সুতরাং ভগবদ্‌গীতার বিবৃতি অনুসারে কিংবা অর্জুনের অভিব্যক্তি অনুসরণে যিনি ভগবদ্‌গীতা বুঝতে চেষ্টা করছেন, তাঁকে শ্রীকৃষ্ণ যে পরম পুরুষোত্তম ভগবান, তা অন্তত তত্ত্বগতভাবে মেনে নিতে হবে এবং সেই রকম বিনম্র মনোভাব নিয়ে ভগবদ্‌গীতা উপলব্ধি করা সম্ভব। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ভগবদ্‌গীতা না পড়লে, তা বুঝতে পারা খুবই কঠিন, কারণ এই শাস্ত্রটি চিরকালই বিপুল রহস্যাবৃত।

ভগবদ্‌গীতা আসলে কি? ভগবদ্‌গীতার উদ্দেশ্য হচ্ছে অজ্ঞানতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মানুষকে উদ্ধার করা। প্রতিটি মানুষই নানাভাবে দুঃখকষ্ট পাচ্ছে, যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় অর্জুনও এক মহা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অর্জুন ভগবানের কাছে আত্মসমর্পন করলেন এবং তার ফলে তখন ভগবান তাকেঁ গীতার তত্ত্বজ্ঞান দান করে মোহমুক্ত করলেন। এই জড় জগতে কেবল অর্জুনই নন, আমরা প্রত্যেকেই সর্বদাই উদ্বেগ-উঃকন্ঠায় জর্জরিত। এই জড় জগতের অনিত্য পরিবেশে আমাদের যে অস্তিত্ব, তা অস্তিত্বহীনের মতো। এই জড় অস্তিত্বের অনিত্যতা আমাদের ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তাতে ভীত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে নিত্য। কিন্তু যে-কোন কারণবশত আমরা অসৎ সত্তায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। অসৎ বলতে বোঝায় যার অস্তিত্ব নেই।

এই অনিত্য অস্তিত্বের ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত দুঃখকষ্ট ভোগ করছে। কিন্তু সে এতই মোহাচ্ছন্ন যে, তার দুঃখকষ্ট সম্পর্কে সে মোটেই অবগত নয়। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কেবল দুই-একজন তাদের ক্লেশ-জর্জরিত অনিত্য অবস্থাকে উপলব্ধি করতে পেরে অনুসন্ধান করতে শুরু করে, “আমি কে?” “আমি কোথা থেকে এলাম?” “কেন আমি এই জটিল অবস্থায় পতিত হয়েছি?” মানষ যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মোহাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে উঠে তার দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন হয়ে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য অনুসন্ধান করছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে বুঝতেপারছে যে, সে দুঃখ-দুর্দশা চায় না, ততক্ষণ তাকে যথার্থ মানুষ বলে গণ্য করা চলে না। মানুষের মনুষ্যত্বের সূচনা তখনই হয়, যখন তার মনে এই সমস্ত প্রশ্ণের উদয হতে শুরু করে। ব্রহ্মসূত্রে এই অনুসন্ধানকে বলা হয় ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। মানব-জীবনে এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ব্যতীত আর সমস্ত কর্মকেই ব্যর্থ বা অর্থহীন বলে গণ্য করা হয়। তাই যারা ইতোমধ্যেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, “আমি কে?” “আমি কোথা থেকে এলাম?” “আমি কেন কষ্ট পাচ্ছি?” “মৃত্যুর পরে আমি কোথায় যাব?” তাঁরাই ভগবদ্‌গীতার প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এই তত্ত্ব যিনি আন্তরিকভাবে অনুসন্ধান করেন, তিনি ভগবানের প্রতি অকৃত্রিম ভক্তি অর্জন করেন। অর্জুন ছিলেন এমনই একজন অনুসন্ধানী শিক্ষার্থী। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করে দেবার জন্যই এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার তত্ত্বানুসন্ধানী মানুষের মধ্যে কোন ভাগ্যবান ব্যক্তি কেবল ভগবৎ-তত্ত্ব পূর্ণরূপে উপলব্ধি করে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হন এবং এমন মানুষের জন্যই ভগবান ভগবদ্‌গীতা শুনিয়েছেন। অজ্ঞতারূপ হিংস্র জন্তুটি আমাদের প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে, কিন্তু ভগবান করুণাময়, বিশেষ করে মানষের প্রতি তাঁর করুণা অপার। তাই তিনি তাঁর বন্ধু অর্জুনকে শিক্ষার্থীরূপে গ্রহণ করে ভগবদ্‌গীতার মাধ্যমে মানুষকে ভগবৎ-তত্ত্ব দান করে গেছেন।

অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সহচর, তাই জড় জগতের অজ্ঞতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না, কিন্তু ভগবানের ইচ্ছানুসারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যাতে তিনি তাঁর সেই কঙ্কটময় অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ভগবান আগামী দিনের মানুষের উদ্ধারের উপায়-স্বরূপ ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত ভগবদ্‌গীতা বর্ণনা করলেন। অপার করুণাময় ভগবান মানব-জীবনকে সার্থক করে তুলবার জন্য মানুষকে তার স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত করলেন, আর তাদের নির্দেশ দিলেন কিভাবে জীবন অতিবাহিত করা উচিত।

ভগবদ্‌গীতার বিষয়ববস্তুতে আমরা পাঁচটি মূল তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি। সর্বপ্রথমে ভগবানের স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে জীবের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ঈশ্বর আছেন এবং তিনিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ করছেন, আর জীব প্রতিনিয়তই তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যদি কেউ বলে যে, সে কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না, সে মুক্ত, তা হলে বুঝতে হবে সে উন্মাদ। জীব সর্বদাই, বিশেষ করে বদ্ধ অবস্থায় সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রিত। তাই ভগবদ্‌গীতার পরম নিয়ন্তা ঈশ্বর ও সর্বদা নিয়ন্ত্রিত জীবের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। তা ছাড়া প্রকৃতি (জড়া প্রকৃতি), কাল (সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব ও জড়া প্রকৃতির অভিব্যক্তির অস্তিত্বের স্থিতিকাল), এবং কর্মও (কার্যকলাপ) আলোচনা করা হয়েছে। ভৌতিক জগতের প্রকাশ বিভিন্ন কার্যকলাপে পরিপূর্ণ। সমস্ত জীবের বিভিন্ন কার্যকলাপে লিপ্ত। তাই ভগবদ্‌গীতা থেকে আমাদের জানতে হবে ভগবান কে? জীব কি? প্রকৃতি কি? ভৌতিক জগৎ কি? আর কিভাবে তা মহাকালের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং জীবের কার্যকলাপ কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভগবদ্‌গীতায় এই পাঁচটি বিষয়বস্তু আলোচনা করার মাধ্যমে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করা হয়েছে যে, ভগবান বা শ্রীকৃষ্ণ বা পরব্রহ্ম বা পরম নিয়ন্তা বা পরমাত্মা-যে নামেই তাঁকে সম্বোধন করা হোক, তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ। সকল জীবই পরম নিয়ন্তার মতোই গুণগতভাবে সমান। যেমন, জড়া প্রকৃতিজাত এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছু ভগবান নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা ভগবদ্‌গীতার শেষ অধ্যায়গুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে। জড়া প্রকৃতি স্বাধীন নয়। পরমেশ্বরের নির্দেশে তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ তাই বলেছেন, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচম্‌”এই জড়া প্রকৃতি আমার নির্দেশনায় ক্রিয়াশীল।” আমরা যখন ভৌতিক জগতে বিস্ময়কর কোন কিছু ঘটতে দেখি, তখন আমাদের বোঝা উচিত যে, এর পেছনে একজন নিয়ন্তা রয়েছেন। নিয়ন্ত্রিত না হলে কোন কিছুরই প্রকাশ হতে পারে না। যদি কেউ মনে করে যে, কোন পরিচালক ব্যতীতই প্রকৃতি পরিচালিত হচ্ছে, তবে তা শিশুসুলভ নির্বুদ্ধিতা। একটি শিশু যেমন একটি মোটর গাড়ি চলতে দেখে মনে করতে পারে যে, কোন ঘোড়া বা পশুর দ্বারা পরিচালিত না হয়ে মোটর গাড়িটি নিজে নিজে চলছে, কিন্তু পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোন মানুষই মোটর গাড়ির কারিগরি ব্যবস্থার ব্যাপারটি জানে। সে জানে যে, একজন চালক কলকব্জা নাড়িয়ে সেই গাড়িটিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তেমনই, পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন এই ভৌতিক জগতের সমস্ত কিছুর পরিচালক। তাঁরই তত্ত্বাবধানে সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে।

জীব হচ্ছে ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ভগবদ্‌গীতাতে তার বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এক বিন্দু সমুদ্রের জল যেমন গুণগতভাবে সমস্ত সমুদ্রের জল থেকে অভিন্ন, এক কণা সোনাও যেমন সোনা ঠিক তেমনই জীব পরম নিয়ন্তা বা ঈশ্বর বা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপরিহার্য অংশ হবার ফলে, ভগবানের সমস্ত গুণই তার মধ্যে অনু পরিমাণে বিদ্যমান, কেন না প্রতিটি জীব ক্ষুদ্র ঈশ্বর, নিয়ন্ত্রণাধীন ঈশ্বর। আমরা প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করছি, যেমন এখন আমরা অন্তরিক্ষ অথবা অন্যান্য গ্রহ নিয়ন্ত্রিত করবার চেষ্টা করছি। এই প্রচেষ্টা স্বাভাবিক, কারণ কর্তৃত্ব করার এই গুণ শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব করার বাসনা আমাদের মনে থাকলেও আমাদের বোঝা উচিত যে, আমরা পরম নিয়ন্তা নই। ভগবদ্‌গীতাতে এর বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ক্রমশঃ