মুখবন্ধ-০৭ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


বাস্তবিকই ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে সেবা করার সম্পর্ক। পরমেশ্বর হচ্ছেন পরম ভোক্তা এবং আমরা, জীবেরা হচ্ছি তাঁর সেবক। তাঁরই সন্তোষ বিধানের জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমরা যদি সর্বদাই তাঁর সেবা করে চলি, তবেই আমরা সুখী হতে পারি। এ ছাড়া আর কোনভাবেই সুখী হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উদরকে বাদ দিয়ে শরীরের কোন অঙ্গ যেমন স্বতন্ত্রভাবে সুখী হতে পারে না, আমরাও তেমন ভগবানের সেবা না করে সুখী হতে পারি না।

বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা বা তাঁদেরকে সেবা করা ভগবদ্‌গীতাতে অনুমোদনকরা হয়নি। সপ্তম অধ্যায়ের বিংশতি শ্লোকে বলা হয়েছে-

কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ।

তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।।

জগ-জাগতিক কামনা-বাসনা দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে যে, যাদের জ্ঞান অপরহৃত হয়েছে, তারা তাদের স্বীকা স্বভাব অনুযায়ী এবং পূজার বিশেষ নিয়মবিধি পালন করে বিভিন্ন দেব-দেবীদের শরণাগত হয়।” এখানে পরিষ্কার ভাবেই বলা হয়েছে যে, যারা কামনা-বাসনা দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা না করে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে। শ্রীকৃষ্ণ বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি-বিশেষের নাম বোঝায় না। শ্রীকৃষ্ণ নামের অর্থ হচ্ছে পরম আনন্দ। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সমস্ত আনন্দের উৎস, সমস্ত আনন্দের আধার। আমরা সকলেই আনন্দের অভিলাষী। আনন্দময়োহভ্যাষাৎ (বেদান্তসূত্র ১/১/১২)। ভগবানের অংশ হবার ফলে জীব চৈতন্যময় এবং তাই সে সর্বদাই আনন্দের অনুসন্ধান করে। ভগবান সদানন্দময়, তিনি সমস্ত আনন্দের আধার, তাই জীব যখন ভগবন্মুখী হয়ে সর্বতোভাবে ভগবানের সেবাপরায়ণ হয়ে তাঁর সান্নিধ্যে আসে, তখন তার চিরবাঞ্ছিত দিব্য আনন্দ সে অনুভব করতে পারে।

ভগবান এই মর্ত্যলোকে অবতরণ করেন তাঁর আনন্দময় বৃন্দাবন-লীলা প্রদর্শন করার জন্য। এই বৃন্দাবন-লীলা হচ্ছে আনন্দের চরম প্রকাশ। শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে থাকেন, তখন সেখানে রাখাল বালকের সঙ্গে, গোপ-বালিকাদের সঙ্গে, বৃন্দাবনবাসীদের সঙ্গে এবং গাভীদের সঙ্গে তাঁর সমস্ত লীলা হচ্ছে দিব্য আনন্দ পরিপূর্ণ। বৃন্দাবনের প্রতিটি জীবই কৃষ্ণগত প্রাণ, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই তাঁরা জানেন না। তিনি যে সব কিছুর পরম ভোক্তা, তাঁর পাদপদ্মে আত্মসমর্পনই যে শ্রেষ্ঠ সমর্পণ এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করাটা যে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজন, তা প্রতিপন্ন করবার জন্য তিনি তাঁর পিতা নন্দ মহারাজকেও ইন্দ্রের পূজা করা থেকে নিরস্ত করেন। কারণ তিনি প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন যে, অন্য কোন দেব-দবীর পূজা করবার কোন দরকার নেই মানুষের। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করাই প্রতিটি মানুষের একমাত্র কর্তব্য, কারণ মানব-জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবৎ-ধামে ফিরে যাওয়া।

ভগবদ্‌গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আলয় ভগবৎধামের বর্ণনা করে বলা হয়েছে-

ন তদ্‌ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো না পাবকঃ।

যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।।

আমার পরম ধাম সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি অথবা বৈদ্যুতিক আলোকের দ্বারা আলোকিত নয়। সেখানে একবার পৌঁছলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।”

এই শ্লোকে সেই চিরশাশ্বত অপ্রাকৃত আকাশের কথা বলা হয়েছে। আকাশ সম্বন্ধে আমাদের একটি জড়-জাগতিক ধারণা আছে। এই জড় আকাশের কথা যখনই আমরা ভাবি, তখন সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র আদির কথা আপনা থেকেই মনে আসে। কিন্তু এই শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে, দিব্য আকাশকে আলোকিত করার জন্য সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি অথবা কোন বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োজন হয় না, কারণ সেই আকাশ দিব্য ব্রহ্মজ্যোতির দ্বারা আলোকিত। এই ব্রহ্মজ্যোতি হচ্ছে ভগবানের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটা। অন্যান্য গ্রহাদিতে পৌঁছানোর জন্য আমরা কঠিন পরিশ্রম করছি, কিন্তু পরমেশ্বরের আলয় সম্বন্ধে ধারণা করা কিছুই কঠিন নয়। ভগবানের দিব্য ধামের নাম গোলোক। ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩৭) এই গোলোকের খুব সুন্দর বিবরণ আছে-গোলোক এব নিবসত্যখিলত্মভূতঃ। ভগবান চিরকালই তাঁর আলয় গোলোকে অবস্থান করেন, তবু এই জগতে থেকেও তাঁর সমীপবর্তী হওয়া যায় এবঙ এই জগতে ভগবান তাঁর প্রকৃত সচ্চিদানন্দময় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন।তিনি যখন তাঁর এই রূপ নিয়ে প্রকাশিত হন, তখন আর তাঁর রূপ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করার কোন প্রয়োজনীয়তা আমাদের থাকে না। এই ধরনের জল্পনা-কল্পনা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করবার জন্য তিনি তার স্বরূপে অবতীর্ণ হন এবং তাঁর শ্যামসুন্দর রূপ প্রদর্শন করেন। দুর্ভাগ্যবশত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা তাঁকে চিনতে পারে না এবং তাঁকে সাধারণ মানুষ বলে মনেউপহাস করে। ভগবান আমাদের কাছেআমাদেরই মতো একজনের রূপ নিয়ে আসেন এবংআমাদের সঙ্গে লীলাখেলা করেন, কিন্তু তাই বলে তাঁকে আমাদের মতো একজন বলে মনে করা উচিত নয়। তাঁর অনন্ত শক্তির প্রভাবে তিনি তাঁর অপ্রাকৃত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে আসেন এবং তাঁর লীলা প্রদর্শন করেন।তাঁর আপন আলয় গোলক বৃন্দাবনে তাঁর যে লীলা, এই লীলা তাঁরই প্রতিরূপ।

চিন্ময় আকাশের ব্রহ্মজ্যোতিতে অসংখ্য গ্রহ ভাসছে। এই ব্রহ্মজ্যোতিতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে পরম ধাম কৃষ্ণলোক এবং জড় পদার্থ দ্বারা গঠিত নয় সেই রকম অসংখ্য আনন্দময় চিন্ময় গ্রহ সেই ব্রহ্মজ্যোতিতে ভাসছে। ভগবান বলেছেন-ন তদ্‌ভাসয়তে সূর্যো না শশাঙ্কো ন পাবকঃ / যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। যে একবার সেই অপ্রাকৃত আকাশে যায়, তাকে আর এই জড় আকাশে নেমে আসতে হয় না। এই জড়-জাগতিক আকাশে, চাঁদের কথা ছেড়েই দিলাম, যদি মানুষ সবচেয়ে ঊর্ধ্বে যে ব্রহ্মলোক আছে সেখানেও যায়, তবে দেখবে যে, সেখানেও এখানকার মতো জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির হাত থেকে নিস্তার নেই। এই জড় জগতের কোন গ্রহলোকের পক্ষেই এই চারটি জড় নিয়মের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়।

ক্রমশঃ

Advertisements

মুখবন্ধ-০৬ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


বর্তমান জগতে ধর্ম বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি, সনাতন ধর্ম ঠিক তা নয়। ধর্ম বলতে সাধারণত কোন বিশ্বাসকে বোঝায়, এবং এই বিশ্বাসের পরিবর্তন হতে পারে। কোন বিশেষ পন্থার প্রতি কারও বিশ্বাস থাকতে পারে, এবং সে এই বিশ্বাসের পরিবর্তন করে অন্য কিছু গ্রহণ করতেও পারে। কিন্তু সনাতন ধর্ম বলতে সেই সব কার্য্যকলাপকে বোঝায়, যা পরিবর্তন হতে পারে না। যেমন, জল থেকে তার তরলতা কখনই বাদ দেওয়া যায় না, আগুন থেকে যেমন তাপ ও আলোককে বাদ দেওয়া যায় না, তেমনই সনাতন জীবেরসনাতন বৃত্তি জীবের থেকে আলাদা করা যায় না। জীবের সঙ্গে তার সনাতন ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং যখন আমরা সনাতন ধর্মের কথা বলি, তখন শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের প্রামাণ্য ভাষ্য মেনে নিতে হবে যে,এর কোন আদি-অন্ত নেই। যার কোন আদি নেই, অন্ত নেই, সেই ধর্ম কখনই সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। এই ধর্ম সমস্ত জীবের ধর্ম, তাই তাকে কখনই কোন সীমার মধ্যে সীমিত রাখা যায় না। একে কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে বদ্ধ রাখাও চলে না। কিন্তু তবু কিছু সাম্প্রদায়িক লোক মনে করে যে, ‘সনাতন ধর্মওএকটি সাম্প্রদায়িক ধর্ম, কিন্তু এটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্কীর্ণতা ও বিকৃত বুদ্ধিজাত অন্ধতার প্রকাশ। আমরা যখন আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে সনাতন ধর্মের যথার্থতা বিশ্লেষণ করি, তখন দেখি যে এই ধর্ম পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ধর্ম-শুধু তাই নয়, এই ধর্ম সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবের ধর্ম।

অসনাতন ধর্মবিশ্বাসের সূত্রপাতের ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের বর্ষপঞ্জিতে লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সনাতন ধর্মের সূত্রপাতের কোন ইতিহাস নেই, কারণ সনাতন ধর্ম সনাতন জীবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থেকে চিরকালই বর্তমান। জীব সম্বন্ধেও শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, সে জন্ম-মৃত্যুর অতীত। ভগবদ্‌গীতাতে বলা হয়েছে যে, জীবের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। সে শাশ্বত ও অবিনশ্বর এবং তার দেহের মুত্যু হলেও তার কখনই মৃত্যু হয় না। সনাতন ধর্ম বলতে যে ধর্ম বোঝায়, তা আমাদের বুঝতে হবে ধর্ম কথাটির সংস্কৃত অর্থের মাধ্যমে। ধর্ম বলতে বোঝায় যা অপরিহার্য অঙ্গরূপে কোন কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে। যেমন, তাপ ও আলোক এই দুটি গুণ আগুণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাপ ও আলোক ছাড়া আগুনের কোন রকম প্রকাশ হতে পারে না। তেমনই জীবের অপরিহার্য অঙ্গ কি? জীবের অস্তিত্বের প্রকাশ কিভাবে হয়? তার নিত্য সঙ্গীরূপে যা তার সঙ্গে চিরকাল বিদ্যমান তা কি? তার এই নিত্য সঙ্গী হচ্ছে তার শাশ্বত গুণবৈশিষ্ট্য এবং এই শাশ্বত গুণবৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তার সনাতন ধর্ম।

সনাতন গোস্বামী যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে জীবের স্বরূপ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, “জীবের স্বরূপ হয়-কৃষ্ণের নিত্যদাস।” পরম পুরুষোত্তম ভগবানের নিত্যদাসত্বই হচ্ছে জীবের স্বরূপ-বৈশিষ্ট। শ্রীমন্মহাপ্রভুর এই উক্তির বিশ্লেষণ যদি আমরা করি, তা হলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, প্রতিটি জীবই সর্বক্ষণ কারও না কারও সেবায় ব্যস্ত। এভাবে অপরের সেবা করার মাধ্যমেই জীব জীবনকে উপভোগ করে। নীচুস্তরের পশুরা ভৃত্য যেভাবে প্রভুর সেবা করে, ঠিক সেভাবে মানুষের সেবা করে। মানুষের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই যে, ‘প্রভুকে সেবা করে, ‘প্রভুকে সেবা করে, আর সেবা করে প্রভুকে। এভাবে সকলেই কারও না কারও দাসত্ব করে চলেছে। এই পরিবেশে আমরা দেখতে পাই, বন্ধু বন্ধুর সেবা করে, মান সন্তানের সেবা করে, স্ত্রী স্বামীর সেবা করে, স্বামী স্ত্রীর সেবা করে ইত্যাদি। এভাবে খোঁজ করলে দেখা যাবে যে, জীবকুলের সমাজে সেবামূলক কাজের কোন অন্যথা নেই। রাজনীতিবিদেরা জনগণের কাছে তাদের নানা প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে তাদের সেবার ক্ষমতা বোঝাবার চেষ্টা করে থাকে। ভোটদাতারা তাই মনে করে যে, রাজনীতিবিদেরা সমাজের খুব ভাল সেবা করতে পারবে, তাই তারা তাদের মূল্যবান ভোট তাদের দিয়ে দেয়। দোকানদর খরিদ্দারের সেবা করে এবং শিল্পী ধনিক সম্প্রদায়ের সেবা করে। ধনিক সম্প্রদায় তাদের পরিবারের সেবা করে এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিত্য জীবের নিত্য সামর্থ্য অনুযায়ী রাষ্ট্র ওসমাজের সেবা করে। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, কোন জীবই অপর কোন জীবের সেবা না করে থাকতে পারে না। এর ফলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, সেবা হচ্ছে জীবের সর্বকালীন সাথী এবং সেবাকার্যই হচ্ছে জীবের শাশ্বত ধর্ম।

তবুও মানুষ দেশ-কাল-পাত্র অনুসারে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদির ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার ফলে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মালম্বী হয়ে পড়ে। এই ধরণের ধর্মবিশ্বাস কখনই সনাতন ধর্ম নয়। কোন হিন্দু তার বিশ্বাস পরিবর্তন করে মুসলমান হতে পারে অথবা কোন মুসলমান তার ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু হতে পারে, কিংবা কোন খ্রিস্টান যে কোন ধর্মালম্বীই হোক না কেন, মানুষ প্রতিনিয়তই অপরের সেবা করে চলেছে। তাই যে কোন ধর্ম-বিশ্বাসকে অবলম্বন করা এবং সনাতন ধর্মাচরণ করার অর্থ এক নয়। সেবা করাই হচ্ছে সনাতন ধর্ম।

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৫ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


আমাদের জন্য ভগবান যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা কিভাবে সদ্ব্যবহার করতে হবে তার অনেক সুন্দর সুন্দর উদাহরণ আছে। ভগবদ্‌গীতাতেও এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন ঠিক করেন তিনি যুদ্ধ করবেন না। এটি ছিল তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। অর্জুন পরমেশ্বর ভগবানকে বলেন যে, সেই যুদ্ধে নিজের আত্মীয়-পরিজনের হত্যা করে রাজ্যভোগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দেহাত্মবুদ্ধির ফলে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে তাঁর দেহ, এবং তাঁর দেহজাত আত্মীয়-পরিজন, ভাই, ভাইপো, ভগ্নীপতি প্রভৃতিকে তিনি তাঁর আপনজন বলে মনে করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর দেহের দাবিগুলি মেটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর ঐ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্যই ভগবান ভগবদ্‌গীতার দিব্যজ্ঞান তাকে দান করেন। এই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তা প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারার ফলেই অর্জুন ভগবানের পরিচালনায় যুদ্ধ করতে ব্রতী হন। তখন তিনি বলেন, করিষ্যে বচনং তব-“তুমি যা বলবে আমি তাই করব।”

এই পৃথিবীতে মানুষ কুকুর-বেড়ালের মতো ঝগড়া করে দিন কাটাবার জন্য আসেনি। তাকে তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে এবং একটি পশুর মতো জীবন যাপন করা বর্জন করতে হবে। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছে, এবং সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারাংশ ব্যক্ত হয়েছে ভগবদ্‌গীতাতে। বৈদিক সাহিত্য মানুষের জন্য, পশুদের জন্য নয়। তাই প্রতিটি মানুষের কর্তব্য হচ্ছে বৈদিক জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করে মানবজীবন সার্থক করে তোলা। কোন পশু যখন অন্য পশুকে হত্যা করে, তাতে তার পাপ হয় না, কিন্তু মানুষ যদি তার বিকৃত রুচির তৃপ্তি সাধনের জন্য কোন পশুকে হত্যা করে, তখন সে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধে অপরাধী হয়। ভগবদ্‌গীতাতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, প্রকৃতির বিভিন্ন গুণ অনুসারে তিন রকমের কর্ম সাধিত হয়, যথা-সত্ত্বগুণের প্রভাবে কর্ম, রজোগুণের প্রভাবে কর্ম এবং তমোগুণের প্রভাবে কর্ম। তেমনই আহার্য বস্তুও আছে তিন ধরনের-সত্ত্বগুণের আহার, রজোগুণের আহার, আর তমোগুণের আহার। এই সবই পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা আছে এবং যদি আমরা ভগবদ্‌গীতার এই সব নির্দেশ যথার্থভাবে কাজে লাগাই, তা হলে আমাদের সারা জীবন পবিত্র হয়ে উঠবে এবং পরিণামে আমরা এই জড় জগতের আকাশের উর্ধ্বে আমাদের পরম লক্ষ্যে উপণীত হতে পারব (যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম)।

এই পরম গন্তব্যস্থলের নাম সনাতন ধাম। সেই নিত্য শাশ্বত অপ্রাকৃত জগৎই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত আলয়। এই জড় জগতে আমরা দেখতে পাই সব কিছু অস্থায়ী। তাদের প্রকাশ, কিছুকালের জন্য তারা অবস্থান করে, কিছু ফল প্রসব করে, ক্ষয় প্রাপ্ত হয় এবং তারপর এক সময় তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এটিই হচ্ছে জড় জগতের ধর্ম, আমাদের এই দেহ, অথবা এক টুকরো ফল অথবা অন্য যে-কোন কিছুরই দৃষ্টান্ত আমরা দিই না কেন। কিন্তু এই অস্থায়ী জগতের অতীত আর একটি জগৎ আছে, যার কথা আমরা জানতে পারি বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে। সেই জগৎ শাশ্বত, সনাতন। বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি জীবও শাশ্বত, সনাতন। ভগবদ্‌গীতার একাদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভগবান সনাতন এবং সনাতন ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবার ফলে জীবাত্মাও সনাতন। ভগবানের সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে, এবং যেহেতু গুণগতভাবে সনাতন ধাম, সনাতন ভগবান ও সনাতন জীব-সবই এক, তাই ভগবদ্‌গীতার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সনাতন বৃত্তি অথবা আমাদের সনাতন ধর্মকে পুনর্জাগরিত করা। অস্থায়ীভাবে আমরা নানা ধরনের কর্মে নিয়োজিত হয়ে রয়েছি, কিন্তু এই সমস্ত কর্ম পবিত্রতা অর্জন করতে পারে, যদি আমরা এই সমস্ত অস্থায়ী কর্ম বর্জন করি আর পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশ মতো কর্মভার গ্রহণ করি। এরই নাম পবিত্র জীবন।

ভগবান ও তাঁর দিব্যধাম উভয়ই সনাতন। জীবও সনাতন। জীব যখন তার সনাতন প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলে সনাতন ধাম ভগবানের সান্নিধ্যে আসে, তখনই তার জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। যেহেতু সমস্ত জীব পরমেশ্বরেরই সন্তান, সেই কারণে তাদের সকলেরই প্রতি তিনি পরম করুণাময়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতাতে (১৪/৪) বলেছেন, সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ/তাসাং ব্রহ্ম মহদ্‌যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা-“হে কৌন্তেয়! সমস্ত যোনিতে যে সমস্ত দেহ উৎপন্ন হয়, ব্রহ্মরূপা প্রকৃতিই তাদের জননী এবং আমিই বীজ প্রদানকারী পিতা।” অবশ্যই বিভিন্ন কর্ম অনুসারে সব করমের জীব রয়েছে, কিন্তু এখানে ভগবান বলেছেন যে, তিনি সকলেরই পিতা। তাই এই পৃথিবীতে ভগবান অবতরণ করেন এই সমস্ত পতিত, বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য, যাতে তারা তাদের শাশ্বত সনাতন অবস্থা ফিরে পেয়ে ভগবানের সঙ্গে চিরন্তন সঙ্গ লাভ করে এবং সনাতন শাশ্বত চিদাকাশে আবার অধিষ্ঠিত হতে পারে। ভগবান স্বয়ং বিভিন্ন অবতাররূপে অবতরণ করেন, কখনও বা তিনি তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরকে অথবা তাঁর প্রিয় সন্তানকে পাঠান, কখনও বা তাঁর অনুগামী ভৃত্যকে বা আচার্যকে পাঠন বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য।

তাই সনাতন ধর্ম বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মপদ্ধতিকে বোঝায় না। এটি হচ্ছে পরম শাশ্বত ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নিত্য শাশ্বত জীবসকলের নিত্য ধর্ম। আগেই বলা হয়েছে, সনাতন ধর্ম হচ্ছে জীবের নিত্য ধর্ম। শ্রীপাদ রামানুজাচার্য সনাতন শব্দটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “যার কোন শুরু নেই এবং শেষ নেই।” তাই যখন আমরা সনাতন ধর্মের কথা বলি, শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের নির্দেশনুসারে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই ধর্মের আদি নেই এবং অন্ত নেই।

 

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৪ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


ভগবানের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক হচ্ছে প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্ক। প্রভু যদি সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হয়, তবে ভৃত্যও সন্তুষ্ট হয়। সেই রকম, পরমেশ্বর ভগবানকে সন্তুষ্ট করা উচিত। যদিও সৃষ্টিকর্তা হওয়ার প্রবণতা এবং জড় জগৎ উপভোগের প্রবণতা জীবদের মধেও রয়েছে, কেন না প্রকাশমান জগতের সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর ভগবানের মধ্যে সেই একই প্রবণতা বিদ্যমান।

সুতরাং, ভগবদ্‌গীতাতে আমরা দেখতে পাব যে, পরম নিয়ন্তা, নিয়ন্ত্রণাধীন জীবসকল, নিখিল জগৎ, মহাকাল ও কর্ম-এই সব নিয়েই পূর্ণ সত্তা বিরাজিত, এবং সব কিছুরই আলোচনা এখানে ব্যাখ্যা করা আছে। এগুলি এক সাথে নিয়েই পূর্ণ পরম সত্তা গঠিত হয়। এই পূর্ণ সত্তাকে বলা হয় পরমতত্ত্ব। এই পূর্ণ সত্তা ও পূর্ণ পরমতত্ত্ব হচ্ছেন পূর্ণ পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁরই বিভিন্ন শক্তির ফলে সমস্ত কিছুরই অভিপ্রকাশ ঘটে থাকে। তিনিই হচ্ছেন সম্যক্ভাবে পূর্ণ।

গীতাতে এই কথাও বলা হয়েছে যে, নির্বিশেষ ব্রহ্মের আরও বিশদ ব্যাখ্যা করে ব্রহ্মসূত্রতে বলা হয়েছে যে, নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে সূর্যরশ্মির মতো। নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের রশ্মিচ্ছটা। তাই, নির্বিশেষ ব্রহ্ম হচ্ছে পূর্ণ পরমতত্ত্বের অসম্পূর্ণ উপলব্ধি এবং পরমাত্মার ধারণাও সেই রকম। ভগবদ্‌গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে দেখা যাবে যে, পরমাত্মার উপলব্ধিও ভগবানের পূর্ণ উপলব্ধি নয়। কারণ পরমাত্মা হচ্ছে ভগবানের আংশিক প্রকাশ। ভগবদ্‌গীতাতে আমরা জানতে পারি যে, পুরুষোত্তম ভগবান হচ্ছেন নির্বিশেষ ব্রহ্ম ও পরমাত্মা উভয়েরই ঊর্ধ্বে পরমতত্ত্ব। ভগবান হচ্ছেন সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। ব্রহ্মসংহিতার শুরুতেই বলা হয়েছে-ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ/অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্।”পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বা গোবিন্দ হচ্ছেন সর্বকারণের কারণ, অনাদির আদি গোবিন্দ এবং সৎ, চিৎ ও আনন্দের মূর্তবিগ্রহ হচ্ছেন তিনিই।” ব্রহ্ম-উপলব্ধি হচ্ছে তাঁর সৎ (শাশ্বত সনাতন) বৈশিষ্টের উপলব্ধি। পরমাত্মা-উপলব্ধি হচ্ছে সৎ-চিৎ (অনন্ত জ্ঞান) রূপের উপলব্ধি। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করা হচ্ছে তাঁর সৎ, চিৎ ও আনন্দের অপ্রাকৃত রূপকে পূর্ণভাবে অনুভব করা।

অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করে যে, পরমতত্ত্ব হচ্ছেন নির্বিশেষ, তাঁর কোন রূপ নেই, কোন আকার নেই, কিন্তু তাদের এই ধারাণাটি ভুল। তিনি হচ্ছেন অপ্রাকৃত চিন্ময় পুরুষ; সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে এই কথা দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্। (কঠ উপনিষদ ২/২/১৩) যেমন আমরা সকলে স্বতন্ত্র জীব এবং আমাদের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য আছে, তেমনই পরম-তত্ত্বের সর্বোচ্চ স্তরে যিনি সর্বকারণের কারণ, তাঁরও রূপ আছে। তিনি পুরুষ, তিনি ভগবান এবং প্রাকৃত ও অপ্রাকৃত সমস্ত কিছুর উৎস হচ্ছেন তিনিই। তাঁকে উপলব্ধি করা হলে তাঁর অপ্রাকৃত রূপের সব কিছুই উপলব্ধি করা হয়ে যায়। যিনি স্বয়ং পূর্ণ, তিনি কখনই নির্বিশেষ হতে পারেন না। যদি তিনি নির্বিশেষ হন, যদি তিনি কোন কিছু ন্যুন হন, তবে তিনি পূর্ণ হবেন কেমন করে? আমাদের অভিজ্ঞতায় যা আছে এবং যা আমাদের অভিজ্ঞতার অতীত, তা সবই ভগবানের মধ্যে বিদ্যমান। নতুবা তা পূর্ণতত্ত্ব হতে পারে না।

সম্যক্ সম্পূর্ণ পুরুষোত্তম ভগবানের মধ্যে রয়েছে বিপুল শক্তিরাজি (পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রূয়তে)। শ্রীকৃষ্ণের শক্তির বিভিন্ন প্রকাশ কিভাবে হয়, তাও ভগবদ্‌গীতাতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই যে পরিদৃশ্যমান জগৎ অথবা অনিত্য জড় জগৎ, যাতে আমরা অধিষ্ঠিত হয়েছি, এটিও স্বয়ং পূর্ণ, কারণ যে চব্বিশটি উপাদান দ্বারা এই জড় জগৎ অনিত্যরূপে অভিব্যক্ত হয়েছে, সাংখ্য-দর্শন অনুযায়ী, তাদের সম্যক্‌রূপে সমন্বয়ের ফলে উদ্ভুত হয়েছে পূর্ণ সম্পদ, যা এই ব্রহ্মাণ্ডের অস্ত্বিত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য। এর মধ্যে কোন কিছুই অতিরিক্ত নেই, আবার অন্য কিছুর দরকারও নেই। এই অভিপ্রকাশের স্থায়িত্ব পরম পূর্ণের শক্তির দ্বারা নির্ধারিত নিজস্ব সময়ের উপর নির্ভরশীল। সেই সময় শেষ হয়ে গেলে, পরম পূর্ণের পূর্ণ ব্যবস্থার নির্দেশে এই অস্থায়ী অভিব্যাক্তির লয় হয়ে যায়। এখানে জীবও তার ক্ষুদ্র সত্তা নিয়ে পূর্ণ এবং পরম পূর্ণ ভগবানকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করবার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সমস্ত জীবেরই আছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ভগবানের সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অপূর্ণ, তাই আমরা সব রকমের অপূর্ণতা অনুভব করি। ভগবৎ তত্ত্বজ্ঞানের পূর্ণ প্রকাশ হয়েছে বেদে এবং বৈদিক জ্ঞান পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে ভগবদ্‌গীতাতে।  

বেদের সমস্ত জ্ঞানই অভ্রান্ত। হিন্দুরা জানে যে, বেদ পূর্ণ ও অভ্রান্ত। যেমন স্মৃতি, অর্থাৎ বৈদিক অনুশাসন অনুযায়ী পশুর মল অপবিত্র এবং তা স্পর্শ করলে স্নান করে পবিত্র হতে হয়। আবার বৈদিক শাস্ত্রেই বলা হচ্ছে যে, গোময় পশুর মল হলেও তা পবিত্র, এমনকি কোন স্থান যদি অপবিত্র হয়ে থাকে, তবে সেখানে গোময় লেপন করলে তা পবিত্র হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটি পরস্পরবিরোধী উক্তি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বৈদিক অনুশাসন বলেই এটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি গ্রহণ করে কেউ ভুল করেছে, তা বলা হয় না। পরবর্তীকালে জীবাণুনাশক গুণ বর্তমান রয়েছে। সুতরাং বৈদিক জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে অভ্রান্ত এবং তাই বেদকে নিঃশঙ্কচিন্তে অনুসরণ করা যায়। বৈদিক জ্ঞান সব রকম সন্দেহ ও ভ্রান্তির অতীত, এবং ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারাংশ।

বৈদিক জ্ঞান নিয়ে গবেষণা চলে না। গবেষণা বলতে সাধারণত যা বোঝায়, তা ত্রুটিপূর্ণ, কারণ ত্রুটিপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ঐ সব গবেষণা হয়ে থাকে। ত্রুটিহীন, অভ্রান্ত জ্ঞান আমাদের ভগবদ্‌গীতা থেকে গ্রহণ করতে হবে, যার উৎস হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান এবং যা গুরু-শিষ্য পরম্পরাক্রমে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিতভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। অর্জুন যখন শিষ্যরূপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে গীতার জ্ঞান আহরণ করেন, তখন তিনি কোন রকম বাদানুবাদ না করে, ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণীকে পরম সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। ভগবদ্‌গীতাকে আংশিকভাবে গ্রহণ করা চলে না। আমরা বলতে পারি না যে, ভগবদ্‌গীতার একটি অংশ আমরা গ্রহণ করব, আর বাকিটা গ্রহণ করব না। ভগবদ্‌গীতার বাণী সম্পূর্ণঅপরিবর্তিতভাবে খেয়ালখুশি মতো বাদ না দিয়ে কিংবা মনগড়া ব্যাখ্যা না করেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যেভাবে তা বলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই ভগবদ্‌গীতার যথাযথ নির্দেশ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, গীতা হচ্ছে বৈদিক জ্ঞানের পূর্ণ প্রকাশ। বৈদিক জ্ঞান এই জড় জগতের জ্ঞান নয়, এর প্রবর্তক হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান, তাই বেদের জ্ঞান হচ্ছে দিব্যজ্ঞান। অপ্রাকৃত উৎস থেকে বৈদিক জ্ঞান গ্রহণ করতে হয় এবং এর প্রথম বাণী নিঃসৃত হয়েছিল স্বয়ং ভগবানের কাছ থেকেই। ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণীকে বলা হয় অপৌরুষেয় অর্থাৎ ভগবানের কথা সাধারণ মানুষের কথার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, সাধারণ মানুষ চারটি ত্রুটির দ্বারা কলুষিত-১) ভ্রম, ২) প্রমাদ, ৩) বিপ্রলিপ্সা, ৪) করণাপাটব। ভ্রম-সাধারণ মানষ অবধারিতভাবে ভুল করে; প্রমাদ-সে মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন, বিপ্রলিপ্সা-সে অন্যকে প্রতারণা করতে চেষ্টা করে এবং করণাপাটব-সে তার ত্রুটিপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সীমিত। এই সমস্ত ত্রুটি থাকার ফলে মানুষ সর্বপরিব্যাপ্ত পরম জ্ঞান গ্রহণ করতে ও প্রদান করতে অক্ষম।

বৈদিক জ্ঞান এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জীবদের দ্বারা প্রদত্ত হয়নি। প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মার হৃদয়ে ভগবান সর্বপ্রথমে এই জ্ঞান প্রদান করেন, তারপর ব্রহ্মা যেভাবে পরমেশ্বরের কাছ থেকে সেই জ্ঞান পেয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই তাঁর সন্তান ও শিষ্যদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। ভগবান হচ্ছেন পূর্ণ, জড়া প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা তাঁর কখনই প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই যাঁরা যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন তাঁরা বুঝতে পারেন, ভগবানই হচ্ছে আদি স্রষ্টা-ব্রহ্মাকে তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি হচ্ছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুর ভোক্তা। ভগবদ্‌গীতার একাদশ অধ্যায়ে ভগবানকে প্রপিতামহ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, কারণ তিনি পিতামহ ব্রহ্মারও পিতা। এভাবে সর্বত্রই আমরা দেখতে পাই যে, ভগবানই হচ্ছে সব কিছুর স্রষ্টা। তাই আমাদের কখনই মনে করা উচিত নয়, আমরা কোন কিছুর মালিক। মালিক কেবল তিনিই, যিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। জীবন ধারণ করার জন্য যেটুকু প্রয়োজন এবং ভগবান আমাদের জন্য যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, ঠিক ততটুকুই আমাদের গ্রহণ করা উচিত।

ক্রমশঃ