শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা: ষষ্ঠ অধ্যায় – ধ্যানযোগ(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : ষষ্ঠ অধ্যায় – ধ্যানযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
কর্মফলের আশা না করিয়া যিনি কর্তব্য (অগ্নিহোত্রাদি) নিত্যকর্ম করেন, তিনিও সন্ন্যাসী, তিনিও কর্মযোগী । অগ্নিহোত্রাদি শ্রৌত ও তপোদানাদি স্মার্ত কর্ম যিনি ত্যাগ করিয়াছেন, কেবল তিনিই সন্ন্যাসী বা যোগী নন। ১

হে পাণ্ডব, শাস্ত্র যাহাকে সর্বকর্ম ও তাহার ফলত্যাগরূপ সন্ন্যাস বলেন, নিষ্কামকর্মানুষ্ঠানরূপ যোগকে তুমি সেই সিন্ন্যাস বলিয়াই জানিবে । কারণ, সংকল্পশূন্য না হইলে (কর্মফলের বাসনা ত্যাগ না করিলে) কেহ কর্মযোগী হইতে পারে না। ২

যিনি কর্মফলত্যাগী ও ধ্যানযোগে আরোহণ করিতে ইচ্ছুক, অর্থাৎ ধ্যানযোগে অনারূঢ় (ধ্যানযোগে অবস্থানে অশক্ত), তাঁহার পক্ষে নিষ্কাম কর্মানুষ্ঠানই উৎকৃষ্ট সাধন । সেই নিষ্কাম কর্মী যখন যোগারূঢ় হন, তখন সর্বকর্ম হইতে নিবৃত্তিই তাঁহার যোগারূঢ়ত্বের সাধন হয় । অর্থাৎ যেমন যেমন তিনি কর্ম হইতে উপরত হন, তেমন তেমন তাঁহার চিত্ত সমাহিত হয় এবং তিনি শীঘ্র যোগারূঢ় হন। ৩

যখন চিত্ত-সমাধান-অভ্যাসকারী যোগী ঐহিক ও পারত্রিক বিষয়ে সকল সংকল্প ত্যাগ করিয়া শব্দস্পর্শাদি ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ে ও নিত্যনৈমিত্তিকাদি কর্মে প্রয়োজনাভাবে কর্তব্যবুদ্ধিশূন্য হন, তখন তাহাকে যোগারূঢ় বলা হয়। ৪

মানুষ বিবেকযুক্ত মন দ্বারা (আত্মনা) আপনিই আপনাকে সংসার হইতে উদ্ধার করিবে (যোগারুঢ় করিবে); কখনো নিজেকে বিষয়াসক্ত করিবে না। কারণ, শুদ্ধ মনই মানুষের প্রকৃত হিতকারী, মুক্তির হেতু এবং বিষয়াসক্ত মনই মানুষের পরম শত্রু, বন্ধনের কারণ। ৫

যে বিবেকযুক্ত মন দ্বারা দেহেন্দ্রিয়াদি বশীভূত হইয়াছে, সেই সংযত মনই আত্মার বন্ধু, কারণ উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তি রহিত হইয়া সেই মনই মুক্তির সহায়ক হয়। কিন্তু অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির বিবেকশূন্য মন উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তিবশে শত্রুর ন্যায় স্বীয় অনিষ্টসাধনে প্রবৃত্ত হয়। ৬

ব্রহ্ম জিতেন্দ্রিয় ও প্রশান্ত যোগারূঢ় ব্যক্তির সাক্ষাৎ আত্মভাবে বর্তমান থাকেন। এইরূপ জীবন্মুক্ত ব্যক্তি শীত ও উষ্ণে, সুখ ও দুঃখে এবং সম্মান ও অপমানে অবিচলিত। ৭

কারণ যে যোগী শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতিতে পরিতৃপ্ত, যিনি শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্বে নির্বিকার ও জিতেন্দ্রিয় এবং যিনি মৃৎখণ্ড, প্রস্তর ও সুবর্ণে সমদর্শী (হেয়-উপাদেয়-বুদ্ধিশূন্য), তিনি যোগারূঢ় বলিয়া কথিত হন। ৮

সুহৃৎ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, দ্বেষ্য, বন্ধু, সদাচারী ও পাপীতে যাঁহার সমবুদ্ধি (ব্রহ্মবুদ্ধি) সুদৃঢ় হইয়াছে, তিনিই যোগারূঢ়। ৯

[যোগারূঢ়-অবস্থা-প্রাপ্তির উপায় বর্ণনা করিতেছেন – ]

নির্জন স্থানে যোগী একাকি (নিঃসঙ্গ), নিরাকাঙ্ক্ষ ও পরিগ্রশূন্য হইয়া দেহ ও মন সংযমপূর্বক অন্তঃকরণ সতত সমাহিত করিবেন। ১০

স্বভাবতঃ বা সংস্কারতঃ শুদ্ধ (ও বিবিক্ত) স্থানে যোগী প্রথমে কুশ, তদুপরি যথাক্রমে মৃগচর্ম ও বস্ত্রদ্বারা রচিত নাতি উচ্চ বা নাতি নিম্ন স্বীয় স্থির আসন স্থাপন করিবেন। ১১

যোগী সেই আসনে বসিয়া বাহ্য ও অন্তরিন্দ্রিয়ের কার্য সংযমপূর্বক চিত্তশুদ্ধির জন্য একাগ্র মনে যোগাভ্যাস করিবেন। ১২

মেরুদণ্ড, গ্রীবা ও মস্তক সরল ও নিশ্চলভাবে ধারণপূর্বক স্থির হইয়া এবং কোন দিকে না তাকাইয়া স্বীয় নাসিকাগ্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিবেন। ১৩

প্রশান্তচিত্ত, ভয়রহিত, ব্রহ্মচর্য পালন ও গুরুসেবাদি ব্রতে স্থিত, মদ্গতচিত্ত ও মৎপরায়ণ যোগী মন একাগ্র করিয়া নিত্য ধ্যানাভ্যাস করিবেন। ১৪

[যোগের ফল বলিতেছেন – ]

যোগী এইরূপে সদা সংযতভাবে মন সমাহিত করিয়া আমার স্বরূপভূত মোক্ষপ্রদ পরম শান্তি প্রাপ্ত হন। ১৫

অতিভোজির, একান্ত অনাহারীর, অত্যন্ত নিদ্রালুর এবং অতি অনিদ্রা-অভ্যাসীর ধ্যান হয় না। ১৬

যিনি পরিমিত আহার ও বিহার করেন এবং মন্ত্রজপ শাস্ত্রপাঠাদি কর্মে পরিমিত প্রচেষ্টা করেন, যাঁহার নিদ্রা ও জাগরণ নিয়মিত (কালে ও পরিমাণে নির্দিষ্ট), তাঁহার ধ্যান সংসারদুঃখের নাশক হয়। ১৭

[ভগবান্‌ সম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনা করিতেছেন।]

যখন যোগী সকল কামনা হইতে মুক্ত হন এবং তাঁহার চিত্ত বাহ্য চিন্তা পরিত্যাগপুর্বক বৃত্তিরহিত হইয়া আত্মাতে অবস্থান করে, তখন তাঁহার (সম্প্রজ্ঞাত) সমাধি হয়। ১৮

বায়ুবর্জিত স্থানে অবস্থিত দীপশিখা যেমন কম্পিত হয় না, চিত্তবৃত্তির নিরোধ-অভ্যাসকারী যোগীর একাগ্রীভূত চিত্তেরও সেই উপমা জানিবে, অর্থাৎ যোগীর নিরুদ্ধ চিত্ত সবিকল্প সমাধিতে সেইরূপ নিষ্কম্প দীপশিখার ন্যায় নিশ্চলভাবে অবস্থিত থাকে । ১৯

[ভগবান্‌ অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনা করিতেছেন ।]

যে অবস্থায় ধ্যানাভ্যাস দ্বারা চিত্ত সর্ববৃত্তিশূন্য হয় এবং যে অবস্থায় শুদ্ধ অন্তঃকরণ দ্বারা পরম চৈতন্য জ্যোতিঃস্বরূপ আত্মাকে উপলব্ধি করিয়া যোগী প্রত্যগাত্মাতেই পরিতুষ্ট হন। ২০

যে অবস্থায় আত্মাকারা বুদ্ধি দ্বারা গ্রাহ্য ও ইন্দ্রিয়গোচরাতীত অর্থাৎ অবিষয়জনিত ব্রহ্মানন্দরূপ পরমসুখ যোগী অনুভব করেন, এবং যাহাতে অবস্থিত হইলে আত্মস্বরূপে সংস্থিতি হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। ২১

যাহা লাভ করিয়া যোগী অন্য লাভ তদপেক্ষা অধিক মনে করেন না এবং যে আত্মতত্ত্বে অবস্থিত হইয়া শস্ত্রনিপাতাদিরূপ মহাদুঃখেও বিচলিত হন না (অপরিপক্ক যোগে দুঃখ অসহ্য হয়)।২২

নিখিল দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃতিরূপ সেই আত্মস্থিতিকে (ব্রাহ্মী-স্থিতিকে) অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলিয়া জানিবে। নির্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে এই সমাধি অভ্যাস করা উচিত। ২৩

সংকল্পজাত সমস্ত কামনা নিঃশেষে ত্যাগ করিয়া মনের দ্বারাই ইন্দ্রিয়সমূহকে সকল বিষয় হইতে নিবৃত করিয়া।২৪

ধৈর্যযুক্ত বুদ্ধি দ্বারা মনকে ধীরে ধীরে উপরত করিবে এবং আত্মাতে মনকে বিলীন করিয়া অন্য কিছুই চিন্তা করিবে না। ইহাই অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তরঙ্গ সাধন। ২৫

সমাধিসাধনে প্রবৃত্ত যোগী চঞ্চল ও অস্থির মন যে যে বিষয়ে ধাবিত হয় সেই সেই বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া ইহাকে আত্মাতেই স্থির করিবেন। ২৬

প্রশান্তচিত্ত, মোহাদি ক্লেশরূপ রজোবৃত্তিশূন্য, নিষ্পাপ ও ব্রহ্মভাব-প্রাপ্ত যোগীই পরম সুখ লাভ করেন। ২৭

এইরূপে মনকে সদা যোগমুক্ত করিয়া নিষ্পাপ যোগী অনায়াসে ব্রহ্ম হইতে অভিন্ন আত্যন্তিকি শান্তি লাভ করেন। ২৮

[সমাধির ফলে সংসারদুঃখনাশক ব্রহ্মৈকত্ব-দর্শন হয়। ইহাই বর্ণিত হইতেছে -]

সমাধিমান পুরুষ সর্বভূতে ব্রহ্মদর্শী হইয়া স্বীয় আত্মাকে ব্রহ্মাদিস্থাবরান্ত সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে স্বীয় আত্মাতে দর্শন করেন। ২৯

[আত্মৈকত্ব-দর্শনের ফল শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন -]

যিনি সর্বভূতে সকলের আত্মা আমাকে এবং সর্বাত্মা আমাতে ব্রহ্মাদি সর্বভূতকে দর্শন করেন, তাঁহার ও আমার একাত্মতা হেতু আমি তাঁহার অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার অদৃশ্য (পরোক্ষ) হন না। ৩০

যিনি সর্বভূতে প্রত্যগাত্মরূপে অবস্থিত আমাকে স্বীয় আত্মরূপে অভেদজ্ঞানে ভজনা করেন, অর্থাৎ আমিই সেই – এইরূপ অপরোক্ষানুভব করেন, সেই যোগী যে কোন অবস্থায় বিদ্যমান থাকিয়াও আমাতেই অবস্থিত করেন; তাঁহার মোক্ষের প্রতিবন্ধক কিছুই হইতে পারে না। ৩১

হে অর্জুন, যিনি সকল ভূতের সুখ ও দুঃখকে নিজের সুখ ও দুঃখ বলিয়া অনুভব করেন, আমার মতে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী। ৩২

অর্জুন বলিলেন –
হে মধুসূদন, সম্যগ্‌দর্শনরূপ যে সমত্বযোগ আপনি ব্যাখ্যা করিলেন, আমার মনের চঞ্চল স্বভাববশতঃ আমি ইহার নিশ্চল স্থিতি দেখিতে পাইতেছি না। ৩৩

হে কৃষ্ণ, মন অতি চঞ্চল, প্রবল এবং শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপ-উৎপাদক। ইহাকে বিষয়বাসনা হইতে নিবৃত্ত করা অতিশয় কঠিন। সেইজন্য উহার নিরোধ আকাশস্থ বায়ুকে পাত্রবিশেষে আবদ্ধ করার ন্যায় দুঃসাধ্য মনে করি। ৩৪

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
হে মহাবাহো, মন যে দুর্নিরোধ ও চঞ্চল তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু হে কৌন্তেয়, ধ্যানাভ্যাস এবং ঐহিক ও পারলৌকিক বিষয়ভোগে বিতৃষ্ণা সাধন দ্বারা ইহাকে সংযত করা যায়। ৩৫

অসংযত ব্যক্তির পক্ষে সমাধি দুষ্প্রাপ্য – ইহা আমার অভিমত। কিন্তু পুনঃ পুনঃ যত্নশীল ও জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি ধ্যানাভ্যাস ও বৈরাগ্যসাধন দ্বারা এই সমাধি লাভ করিতে পারেন। ৩৬

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন –
হে কৃষ্ণ, শ্রদ্ধাবান্‌ সম্যক্‌ যত্নহীন যোগচ্যুত যোগী যোগে সিদ্ধিলাভ না করিলে কোন্‌ মার্গে গমন করেন ? ৩৭

হে কৃষ্ণ, ব্রহ্মপ্রাপ্তির পথে কর্মমার্গ ও ধ্যানমার্গ হইতে বিভ্রষ্ট, বিমূঢ় ও নিরাশ্রয় যোগী সংচ্ছিন্ন মেঘখণ্ডের ন্যায় কি বিনষ্ট হন ? ৩৮

হে কৃষ্ণ, আমার এই সংশয় নিঃশেষে দূর করিতে একমাত্র আপনিই সমর্থ । কারণ আপনি ভিন্ন অন্য কোনও ঋষি বা দেবতা আমার এই সংশয় দূর করিতে পারিবেন না। ৩৯

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
হে পার্থ, বৈদিক কর্মত্যাগ করা সত্ত্বেও যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি ইহলোকে পতিত বা নিন্দিত হন না, পরলোকেও নিকৃষ্ট শরীর প্রাপ্ত হন না। হে বৎস, ইহার কারণ, কল্যাণকারীর কখনও অধোগতি হয় না। ৪০

যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি (অল্পকাল যোগাভ্যাসী) পুণ্যকারিগণের প্রাপ্য ব্রহ্মলোকাদি ঊর্ধ্বলোক লাভ করিয়া তথায় বহু বৎসর বাস করেন। অনন্তর সদাচারসম্পন্ন ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। ৪১

অথবা, যোগভ্রষ্ট পুরুষ (চিরাভ্যস্ত) জ্ঞানবান্‌ যোগিগণের কুলে জন্মগ্রহণ করেন । ঈদৃশ (দ্বিতীয় প্রকার) জন্ম জগতে অতি দুর্লভ। ৪২

হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট পুরুষ সেই দেহে পূর্ব জন্মের সুকৃতির ফলে মোক্ষপর বুদ্ধি লাভ করিয়া সিদ্ধিলাভের জন্য অধিকতর প্রযত্ন করেন। ৪৩

তিনি (যোগভ্রষ্ট) পূর্বজন্মের অভ্যাসবশে যেন অবশ হইয়াও যোগসাধনে প্রবৃত্ত হন । যোগের স্বরূপ জানিতে ইচ্ছুক হইয়া যোগমার্গে প্রবৃত্ত যোগভ্রষ্টও বেদোক্ত যজ্ঞানুষ্ঠানের ফল অতিক্রম করেন । আর যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া তন্নিষ্ঠ হইয়া যোগাভ্যাস করেন, তাঁহার সাফল্যের নিশ্চয়তা বলাই বাহুল্য। ৪৪

যোগী ইহজন্মে পূর্বজন্মকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিকতর যত্ন করিয়া পাপমুক্ত হইয়া পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধনসঞ্চিত সংস্কার দ্বারা সিদ্ধিলাভ করিয়া মোক্ষপ্রাপ্ত হন। ৪৫

যোগী কৃচ্ছ্র চান্দ্রায়ণাদি তপোনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ অপেক্ষা এবং অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞপরায়ণ কর্মিগণ অপেক্ষাও যোগী শ্রেষ্ঠ । অতএব হে অর্জুন, তুমি যোগী হও। ৪৬

যিনি শ্রদ্ধার সহিত মদ্গত চিত্তে আমার ভজনা করেন, তিনি দেবতাদিধ্যানপর সকল যোগীর মধ্যে উৎকৃষ্ট, ইহা আমার অভিমত। ৪৭

[এই অধ্যায়ের শেষ শ্লোক দুইটি পরবর্তী (সপ্তম) অধ্যায়ের সূচনা-স্বরূপ।]

ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ধ্যানযোগনামক ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত।
Continue reading

Advertisements

মুখবন্ধ-১০ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


উপসংহারে বলা যায়, ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে এক অপ্রাকৃত সাহিত্য, যা অতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করা উচিত। গীতাশাস্ত্রমিদং পুনং যঃ পঠেৎ প্রযতঃ পুমান্-ভগবদ্‌গীতার নির্দেশকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারলে, অতি সহজেই সমস্ত ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এই জীবনে ভয় ও শোকাদি বর্জিত হয়ে পরবর্তী জীবনে চিন্ময় সত্তা অর্জন করা যায়। (গীতা-মাহাত্ম্য ১)

আরও একটি সুবিধা হচ্ছে-

গীতাধ্যায়নশীলস্য প্রাণায়মপরস্য চ।

নৈব সন্তি হি পাপানি পূর্বজন্মকৃতানি চ ।।

কেউ যদি আন্তরিকভাবে এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভগবদ্‌গীতা পাঠ করে, তা হলে ভগবানের করুণায় তার অতীতের সমস্ত পাপকর্মের ফল তাকে প্রভাবিত করে না।” (গীতা-মাহাত্ম্য ২) ভগবদ্‌গীতার শেষ পর্যায়ে (১৮/৬৬) অতি উচ্চস্বরে ভগবান বলেছেন-

সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

সর্ব রকমের ধর্মানুষ্ঠান পরিত্যাগ করে আমার শরণ নাও। তা হলে আমি সমস্ত পাপ থেকে তোমাকে মুক্ত করব। তুমি কোন ভয় করো না।” এভাবে ভগবানের পাদপদ্মে যিনি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেন, ভগবান তাঁর সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেই মানুষের সকল পাপকর্মের প্রতিক্রিয়া থেকে তাকে রক্ষা করেন।

মলিনে মোচনং পুংসাং জলস্নানং দিনে দিনে।

সকৃদ্‌ গীতামৃতস্নানং সংসারমলনাশনম্ ।।

প্রতিদিন জলে স্নান করে মানুষ নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু কেউ যদি ভগবদ্‌গীতার গঙ্গাজলে একটি বারও স্নান করে, তা হলে তার জড় জীবনের মলিনতা একেবারেই বিনষ্ট হয়ে যায়।” (গীতা-মাহাত্ম্য ৩)

গীতা সুগীতা কর্তব্যা কিমন্যৈঃ শাস্ত্রবিস্তরৈ।

যা স্বয়ং পদ্মনাভস্য মুখপদ্মাদ্‌ বিনিঃসৃতা ।।

যেহেতু ভগবদ্‌গীতার বাণী স্বয়ং পরম পুরুষোত্তম মুখনিঃসৃত বাণী, তাই এই গ্রন্থ পাঠ করলে আর অন্য কোন বৈদিক সাহিত্য পড়বার দরকার হয় না। গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিতভাবে ভগবদ্‌গীতা শ্রবণ ও কীর্ত্তন করলে আমাদের অন্তর্নিহিত ভগবদ্ভক্তির স্বাভাবিক বিকাশ হয়। বর্তমান জগতে মানুষেরা নানা রকম কাজে এতই ব্যস্ত থাকে যে, তাদের পক্ষে সমস্ত বৈদিক সাহিত্য পাঠ করা সম্ভব নয়। সমস্ত বৈদিক সাহিত্য পড়বার প্রয়োজনও নেই। এই একটি গ্রন্থ ভগবদ্‌গীতা পাঠ করলেই মানুষ সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারমর্ম উপলব্ধি করতে পারবে, কারণ ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে বেদের সার এবং গীতা স্বয়ং ভগবানের মুখনিঃসৃত উপদেশ বাণী। (গীতা-মাহাত্ম্য ৪)

আরও বলা হয়েছে–

ভারতামৃতসর্বস্বং বিষ্ণুবক্ত্রাদ্‌ বিনিঃসৃতম্‌।

গীতাগঙ্গোদকং পীত্বা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।।

গঙ্গাজল পান করলে অবধারিতভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, আর যিনি ভগবদ্‌গীতার পুণ্য পীযূষ পান করেছেন,তাঁর কথা আর কি বলবার আছে? ভগবদ্‌গীতা হচ্ছে মহাভারতের অমৃতরস, যা আদি বিষ্ণু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলে গেছেন।” (গীতা-মাহাত্ম্য ৫) ভগবদ্‌গীতা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত, আর গঙ্গা ভগবানের চরণপদ্ম থেকে উদ্ভুত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভগবানের মুখ ও পায়ের মধ্যে অবশ্য কোন পার্থক্য নেই। তবে আমাদের এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভগবদ্‌গীতার গুরুত্ব গঙ্গার চেয়েও বেশি।

সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দন।

পার্থো বৎস সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ।।

এই গীতোপনিষদ্‌ ভগবদ্‌গীতা সমস্ত উপনিষদের সারাতিসার এবং তা ঠিক একটি গাভীর মতো, এবং রাখাল বালকরূপে প্রসিদ্ধ ভগবান শ্রীকৃষ্ণই এই গাভীবে দোহন করেছেন। অর্জুন যেন গোবৎসের মতো এবং জ্ঞানীগুণী ও শুদ্ধ ভক্তেরাই ভগবদ্‌গীতার সেই অমৃতময় দুগ্ধ পান করে থাকেন।” (গীতা-মাহাত্ম্য ৬)

একং শাস্ত্রং দেবকীপুত্রগীতম্‌

একো দবো দেবকীপুত্র এব।

একা মন্ত্রস্তস্য নামানি যানি

কর্মাপ্যেকং তস্য দেবস্য সেবা।।

(গীতা-মাহাত্ম্য ৭)

বর্তমান জগতে মানুষ আকুলভাবে আকাঙক্ষা করছে একটি শাস্ত্রের, একক ভগবানের, একটি ধর্মের এবং একটি বৃত্তির। তাই, একং শাস্ত্রং দেবকীপুত্রগীতম্-সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য সেই একক শাস্ত্র হোক ভগবদ্‌গীতা । একো দেবো দেবকীপুত্র এব- সমগ্র বিশ্বচরাচরের একক ভগবান হোন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। একো মন্ত্রস্তস্য নামানি–একক মন্ত্র, একক প্রার্থনা, একক স্তোত্র হোক তাঁর নাম কীর্ত্তন-

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।।

এবং কর্মাপ্যেকং তস্য দেবস্য সেবা– সমস্ত মানুষের একটিই বৃত্তি হোক–পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা।

মুখবদ্ধ সমাপ্ত।

মুখবন্ধ-০৯ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


এটি কিভাবে সম্ভব? এই প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ আচার্যরা বলেন যে, যখন কোন বিবাহিত স্ত্রীলোক পর-পুরুষে আসক্ত হয় কিংবা কোন পুরুষ পরস্ত্রীতে আকৃষ্ট হয়, তখন সেই আসক্তি অত্যন্ত প্রবল হয়। তখন সে সারাক্ষণ উৎকন্ঠিত হয়ে থাকে কিভাবে, কখন সে তার প্রেমিকের সাথে মিলিত হবে, এমন কি যখন তার গৃহকর্মে সে ব্যস্ত থাকে, তখনও তার মন প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হবার আশায় আকুল হয়ে থাকে। সে তখন অতি নিপুণতার সঙ্গে তার গৃহকর্ম সমাধা করে, যাতে তার স্বামী তাকে তার আসক্তির জন্য কোন রকম সন্দেহ না করে। ঠিক তেমনই, আমাদের সর্বক্ষণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন থাকতে হবে এবং সুষ্ঠুভাবে আমাদের কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে। এই জন্য ভগবানের প্রতি গভীর অনুরাগের একান্ত প্রয়োজন। ভগবানের প্রতি গভীর ভালবাসা থাকলেই মানুষ জাগতিক কর্তব্যগুলি সম্পাদন করার সময়েও তাঁকে বিস্মৃত হয় না। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে ভগবানের প্রতি এই গভীর ভালবাসা আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তুলতে পারি। অর্জুন যেমন সব সময়ই ভগবানের কথা চিন্তা করতেন, আমাদেরও তেমন ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকা উচিত। অর্জুন ছিলেন ভগবানের নিত্যসঙ্গী এবং তিনি ছিলেন যোদ্ধা। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত হয়ে বনে গিয়ে ধ্যান করতে উপদেশ দেননি। যোগ সম্বন্ধে যখন তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করে অর্জুনকে শোনান, তখন অর্জুন তাঁকে স্পষ্ট বলেন যে, তা অনুশীলন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অর্জুন বলেছিলেন-

যোহয়ং যোগস্ত্বয়া প্রোক্তঃ সাম্যেন মধুসূদন।

এতস্যাহং ন পশ্যামি চঞ্চলত্বাৎ স্থিতিং স্থিরাম্ ।।

হে মধুসূদন! যোগ সম্বন্ধে তুমি আমাকে যা বললে তা থেকে আমি বুঝতে পারছি যে, এর অনুশীলন করা আমার পক্ষে অসম্ভব ও অসহনীয়, কারণ আমার মন অত্যন্ত চঞ্চল ও অস্থির।” (ভঃ গীঃ ৬/৩৩)

কিন্তু ভগবান তখন তাঁকে বলেছিলেন-

যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্‌গতেনান্তরাত্মনা।

শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ ।।

যোগীদের মধ্যে যে গভীর শ্রদ্ধা সহকারে মদ্‌গতচিত্তে নিজের অন্তরাত্মায় আমাকে চিন্তা করে এবং আমার অপ্রাকৃত সেবায় নিয়োজিত থাকে, সে-ই যোগসাধনায় অন্তরঙ্গভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত এবং সেই হচ্ছে যোগীশ্রেষ্ঠ এবং সেটিই আমার অভিমত।” (ভঃ গীঃ ৬/৪৭) সুতরাঙ যিনি সব সময় ভগবদ্ভাবনায় মগ্ন, তিনিই হচ্ছেন যোগীশ্রেষ্ঠ, তিনি হচ্ছেন পরম জ্ঞানী এবং তিনি হচ্ছেন শুদ্ধ ভক্ত। ভগবান অর্জুনকে আরও বলেছেন যে, ক্ষত্রিয় হবার ফলে তাঁকে যুদ্ধ করতেই হবে, কিন্তু তিনি যদি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে যুদ্ধ করেন, তবে সেই যুদ্ধে জয়লাভ তো হবেই, উপরন্তু অন্তকালে তিনি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে সমর্থ হবে। এভাবে আমরা দেখতে পাই, যিনি ভগাবানের কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন, তিনি পারেন ভগবানের কৃপা লাভ করতে।

আমরা সাধারণ আমাদের দেহ দিয়ে কাজ করি না, মন ও বুদ্ধি দিয়ে কাজ করি। তাই, যদি মন ও বুদ্ধি ভগবানের ভাবনায় মগ্ন থাকে, তা হলে ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হয়ে যায়। তখন আপাতদৃষ্টিতে ইন্দ্রিয়ের কর্মগুলি অপরিবর্তিত থেকে যায়, কিন্তু মনোবৃত্তির আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। ভগবদ্‌গীতা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে, কিভাবে মন ও বুদ্ধিকে ভগবানের ভাবনায় মগ্ন করতে হয়। এভাবে সর্বতোভাবে ভগবানের ভাবনায় মগ্ন হবার ফলেই আমরা ভগবানের আলয়ে প্রবেশ করবার যোগ্যতা অর্জন করি। মন যদি কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত হয়, তা হলে ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকেই তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকে। এটিই হচ্ছে কৌশল এবং এটি ভগবদ্‌গীতার রহস্যও-শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় সর্বতোভাবে নিমগ্ন থাকা।

আধুনিক মানুষ চাঁদে পৌঁছানোর জন্য অনেক পরিশ্রম করে চলেছে, কিন্তু তার পারমার্থিক উন্নতির জন্য সে কোন রকম চেষ্টাই করেনি। পঞ্চাশ-ষাট বছরের অল্প আয়ু নিয়ে আমরা এখানে এসেছি, তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানকে স্মরণ করবার জন্য এই সময়টি পুরোপুরিভাবে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করা এবং তার পদ্ধতি হচ্ছে-

শ্রবণং কীর্ত্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।

অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্ ।।

(শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৫/২৩)

ভক্তিযোগ সাধণের নয়টি প্রণালীর মধ্যে সবচেয়ে সহজ হচ্ছে শ্রবণম্‌ অর্থাৎ আত্মতত্ত্বজ্ঞ পুরুষের কাছে ভগবদ্‌গীতা শ্রবণ করা এবং এর ফলে মন ভগবন্মুখী হয়ে উঠবে। তখন পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করা সহজ হবে এবং এই জড় দেহ ত্যাগ করার পর চিন্ময় দেহ লাভ করে ভগবানের আলয়ে উন্নীত হয়ে আমরা ভগবানের সাহচর্য লাভ করতে সক্ষম হব।

ভগবান আরও বলেছেন-

অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগামিনা।

পরমং পুরুষং দিব্যং যাতি পার্থানুচিন্তয়ন্।।

অভ্যাসের দ্বারা যে সর্বদা ভগবানরূপে আমার ধ্যানে মগ্ন, বিপদগামী না হয়ে যার মন সর্বদা আমাকে স্মরণ করে, হে পার্থ! সে নিঃসন্দেহে আমার কাছে ফিরে আসবে।” (গীঃ ৮/৮)

এই পদ্ধতি মোটেই কঠিন নয়। তবে আসল কথা হচ্ছে, এর অনুশীলনের শিক্ষা তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে, যিনি অভিজ্ঞা ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞ। তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ–যিনি ইতিমধ্যেই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হয়েছেন, তাঁর সমীপবর্তী হতে হবে। মনের কাজই হচ্ছে সর্বদা এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো, তাই অভ্যাস করতে হবে মনকে একাগ্র করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম ও রূপে নিবদ্ধ করতে। মন স্বভাবতই চঞ্চল, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের নামের শব্দতরঙ্গে একে স্থির করা যায়। এভাবে পরব্যোমে চিন্ময় জগতে পরম পুরুষ ভগবানের ধ্যান করে তাঁর করুণা লাভ করা সম্ভব। ভগবদ্‌গীতায় চরম উপলব্ধির পন্থা ও উপায় বা পরম প্রাপ্তির কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং জ্ঞান-ভাণ্ডারের দ্বার সকলেরই জন্যই উন্মুক্ত হয়ে আছে। কাউকেই নিষিদ্ধ করা হয়নি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে সকল শ্রেণীর মানুষই তাঁর সমীপবর্তী হতে পারে, কেন না শ্রীকৃষ্ণের নাম শ্রবণ ও স্মরণ সকলের পক্ষেই সম্ভব।

ভগবান আরও বলেছেন (ভঃ গীঃ ৯/৩২-৩৩)-

মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেঽপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।

স্ত্রিয়ো বিশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেহপি যান্তি পরাং গতিম্‌ ।।

কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুন্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা।

অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্‌ ।।

এভাবে ভগবান বলছেন যে, এমন কি বৈশ্য, পতিতা স্ত্রীলোক অথবা শূদ্র কিংবা নিম্নস্তরের মানুষেরাও পরম গতি লাভ করতে হলে যে উচ্চমানের বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন হতে হবে, এমন কোন কথা নেই। আসল কথা হচ্ছে, যদি কেউ ভক্তিযোগের দ্বারা ভগবানের সেবায় ব্রতী হন এবং ভগবানকে জীবনের পরম আশ্রয় বলে মনে করেন, তবে তিনি অপ্রাকৃত জগতে উত্তীর্ণ হয়ে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করতে সক্ষম হন। কেউ যদি ভগবদ্‌গীতার উপদেশবাণীকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে তার অনুশীলন করেন, তবে তিনি তাঁর জীবনকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে তুলতে পারেন এবং এই জড়া প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার ফলে যে সমস্ত জাগতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, তার সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেন। এই হচ্ছে ভগবদ্গীতার মূল কথা।

 

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৮ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


জীবসকল এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে ভ্রমণ করছে, কিন্তু যে-কোন গ্রহেই আমরা ইচ্ছা করলে যান্ত্রিক উপায়ে যেতে পারি না। অন্যান্য গ্রহে যেতে হলে তার জন্য একটি পদ্ধতি আছে। সেই সম্বন্ধে উল্লেখ আছে যে-যান্তি দেবব্রতা দেবান্‌পিতৃন যান্তি পিতৃব্রতাঃ। আমাদের গ্রহান্তরে ভ্রমণের জন্য কোন যান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। গীতাতে ভগবান বলেছেন-যান্তি দেবব্রতা দেবান্‌। চন্দ্র, সূর্য আদি উচ্চস্তরের গ্রহদের বলা হয় স্বর্গলোক। গ্রহমণ্ডলীকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে-স্বর্গলোক (উচ্চ), ভূলোক (মধ্য) ও পাতাললোক (নিম্ন)। পৃথিবী ভূলোকের অন্তর্গত।ভগবদ্‌গীতা থেকে আমরা জানতে পারি, কিভাব আমরা দেবলোক বা স্বর্গলোকে অতি সহজ প্রক্রিয়ায় যেতে পারি-যান্তি দেবব্রতা দেবান্‌। কোন বিশেষ গ্রহের বিশেষ দেবতাকে পূজা করলেই সেই গ্রহে যাওয়া যায়। চন্দ্রদেবকে পূজা করলে চন্দ্রলোকে যাওয়া যায়। এভাবে যে-কোন উচ্চতর গ্রহলোকেই যাওয়া যায়।

কিন্তু ভগবদ্‌গীতা এই জড় জগতের কোন গ্রহলোকে যেতে উপদেশ দিচ্ছে না, কারণ জড় জগতের সর্বোচ্চলোক ব্রহ্মলোক কোন ধরনের যান্ত্রিক কৌশলে হয়ত চল্লিশ হাজার বছর ভ্রমণ করে (আর ততদিন কেই বা বাঁচবে) গেলেও জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির জড়-জাগতিক ক্লেশ থেকে সেখানেও নিস্তার পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেউ যদি পরম লোক কৃষ্ণলোকে কিংবা চিন্ময় আকাশের অন্য কোন গ্রহে যেতে চায়, তা হলে তাকে সেখানে এই সব জড়-জাগতিক দুর্দশা ভোগ করতে হবে না। চিন্ময় আকাশে যে সমস্ত গ্রহলোক আছে, তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হচ্ছে গোলক বৃন্দাবন, যেখানে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ থাকেন। ভগবদ্‌গীতায় এই সব কিছুই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে কিভাবে সেই চিন্ময় আকাশে ফিরে গিয়ে প্রকৃতই আনন্দময় জীবন শুরু করা যায়, তার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ভগবদ্‌গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে এই জড় জগতের প্রকৃত রূপের বর্ণনা করে বলা হয়েছে-

ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুরব্যয়ম।

ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ ।।

ঊর্ধ্বমূল ও অধঃশাখাবিশিষ্ট একটি অশ্বত্থ গাছ রয়েছে। বৈদিক মন্ত্রগুলি হচ্ছে এর পাতা। যে এই গাছটিকে জানে, সে বেদকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছে।” এখানে জড় জগৎকে বলা হয়েছে ঊর্ধ্বমূল ও অধঃশাখাবিশিষ্ট একটি অশ্বত্থ গাছের মতো। সাধারণত গাছের শাখা থাকে ঊধ্বমুখী এবং তার মূল থাকে নিম্নমুখী। কিন্তু আমরা যখন জলাশয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সেই জলে গাছের প্রতিবিম্ব দেখি, তখন দেখতে পাই তার মূল ঊর্ধ্বমুখী এবং তার শাখা অধোমুখী। সেই রকম, এই জড় জগৎ হচ্ছে অপ্রাকৃত জগতের প্রতিবিম্ব। প্রতিবিম্বের কোন স্থায়িত্ব নেই, সে শুধু একটি ছায়া মাত্র। কিন্তু এই ছায়া থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রকৃত বস্তু রয়েছে। মরুভূমিতে জল নেই, কিন্তু মরীচিকার মাধ্যমে আমরা ইঙ্গিত পাই যে, জল বলে একটি পদার্থ আছে। জড় জগতে তেমনই জল নেই, আনন্দ নেই, কিন্তু প্রকৃত আনন্দের, বাস্তবিক জলের সন্ধান রয়েছে অপ্রাকৃত জগতে।

ভগবান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিম্নলিখিত উপায়ে আমরা চিন্ময় জগৎ লাভ করতে পারি (ভঃ গীঃ ১৫/৫)-

নির্মানমোহা জিতসঙ্গদোষা

অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ।

দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈ-

র্গচ্ছন্ত্যমূঢ়াঃ পদমব্যয়ং তৎ ।।

সেই পদম্‌অব্যয়ম্ বা নিত্য জগতে সে-ই যেতে পারে, যে নির্মানমোহ অর্থাৎ যে মোহমুক্ত হতে পেরেছে। এর অর্থ কি? এই জড় জগতে সকলেই কিচ্ছু না কিছু না হতে চায়। কেউ চায় রাজা হত, কেউ চায় প্রধানমন্ত্রী হতে, কেউ চায় ঐশ্বর্যশালী হতে, এভাবে সকলেই কিছু না কিছু হতে চায়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই অভিলাষগুলির প্রতি আসক্তি থাকি, ততক্ষণ আমরা আমাদের দেহকে আমাদের স্বরূপ বলে মনে করি, কারণ দেহকে কেন্দ্র করেই এই সমস্ত আশা-আকাঙ্খাগুলি জন্ম নেয়। আমরা যে আমাদের দেহ নই, এই উপলব্ধিটাই হচ্ছে অধ্যাত্ম-উপলব্ধির প্রথম সোপান। জড় জগতের যে তিনটি গুণের দ্বারা আমরা আবদ্ধ হয়ে পড়ি, তার থেকে মুক্ত হওয়াটাই হচ্ছে আমাদের প্রথম কতর্ব্য এবং তার উপায় হচ্ছে ভগবদ্ভক্তি। ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের সেবা করলে এই বন্ধন আপনা থেকেই খসে পড়ে। কামনা-বাসনার বশবর্তী হবার ফলে আমরা জড়া প্রকৃতির উপরে আধিপত্য করতে চাই এবং তার ফলে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ি। যতক্ষণ না আমরা আধিপত্য করার এই বাসনাকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে পারছি, ততক্ষণ আমরা জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের আলয় সনাতন ধামে ফিরে যেতে পারব না। সেই ভগবৎ-ধাম, যা সনাতন, সেখানে কেবল তাঁরাই যেতে পারেন, যাঁরা জড় জগতের ভোগ-বাসনার দ্বারা লালায়িত নন, যাঁরা ভগবানের সেবায় নিজেদের সর্বতোভাবে নিয়োজিত করেছেন। কেউ এভাবে অধিষ্ঠিত হলে তিনি অনায়াসে পরম ধামে উপনীত হন।

ভগবদ্‌গীতায় অন্যত্র (৮/২১) বলা হয়েছে-

অব্যক্তোঽক্ষর ইত্যুক্তস্তমাহুঃ পরমাং গতিম্ ।

যং প্রাপ্য ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।।

অব্যক্ত মানে অপ্রকাশিত। এমন কি এই জড় জগতের সব কিছু আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়নি। আমাদের জড় ইন্দ্রিয় এতই সীমিত যে, জড় আকাশে যে সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রাদি আছে, তাও আমাদের গোচরীভূত হয় না। বৈদিক সাহিত্যে সমস্ত উল্লেখযোগ্য গ্রহ-নক্ষত্রের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা সেই সব বিশ্বাস করতে পারি অথবা বিশ্বাস নাও করতে পারি। বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবতে এর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। এই জড় আকাশের ঊর্ধ্বে যে অপ্রাকৃত লোক আছে, শ্রীমদ্ভাগবতে তাকে অব্যক্ত অর্থাৎ অপ্রকাশিত বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই যে অপ্রাকৃত লোক যা নিত্য, সনাতন, যেখানে প্রতিনিয়ত দিব্য আনন্দের আস্বাধন পাওয়া যায়, যেখানে প্রতিনিয়ত ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করা যায়, সেই যে দিব্য জগৎ, তাই হচ্ছে মানব-জীবনের পরম লক্ষ্য-মানব-জীবনের পরম গন্তব্যস্থল। সেখানে একবার উত্তীর্ণ হলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না। সেই পরম রজ্যের জন্যই মানুষের বাসনা ও আগ্রহ থাকা উচিত।

এখানে প্রশ্ন হতে পারে-কিভাবে সেই অপ্রাকৃত জগতে যাওয়া যায়? ভগবদ্‌গীতার অষ্টম অধ্যায়ে এই বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-

অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্ত্বা কলেবরম্।

যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ ।।

মৃত্যুকালে যিনি আমাকে স্মরণ করে শরীর ত্যাগ করেন, তিনি তৎক্ষণাৎ আমার ভাব প্রাপ্ত হন। এই বিষয়ে কোন সংশয় নেই।” (ভঃ গীঃ৮/৫) মৃত্যুকালে শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করতে পারলেই শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপ স্মরণ করতে হবে; এই রূপ স্মরণ করতে করতে যদি কেউ দেহত্যাগ করে, তা হলে সে অবশ্যই দিব্য ধামে চলে যায়। এখানে মদ্ভাবম্ বলতে পরমেশ্বর ভগবানের পরম ভাবের কথা বলা হয়েছে। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সৎ-চিৎ-আন্দ বিগ্রহ অর্থাৎ তাঁর রূপ নিত্য, জ্ঞানময় ও আনন্দময়। আমাদের এই জড় দেহ সৎ-চিৎ আনন্দময় নয়। এই দেহ অসৎ, এই দেহের কোন স্থায়িত্ব নেই। এই দেহ বিনাশ হয়ে যাবে। এই দেহ চিৎ বা জ্ঞানময় নয়, পক্ষান্তরে এই দেহ অজ্ঞানতায় পরিপূর্ণ। অপ্রাকৃত জগৎ সম্বন্ধে আমাদের কোন জ্ঞান নেই, এমন কি এই জড় জগৎ সম্বন্ধেও আমাদের যে জ্ঞান আছে, তা ভ্রান্ত ও সীমিত। এই দেহ নিরানন্দ, আনন্দময় হবার পরিবর্তে এই দেহ দুঃখ-দুর্দশায় পরিপূর্ণ। এই জগতে যত রকমের দুঃখ-দুর্দশা আমরা পেয়ে থাকি, তা সবই এই দেহটির জন্যই। কিন্তু যখন আমরা এই দেহটিকে ত্যাগকরবার সময় পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপটি স্মরণ করি, তখন আমরা জড় জগতের কলুষমুক্ত সৎ-চিৎ-আনন্দময় দিব্য দেহ প্রাপ্ত হই।

এই জগতে দেহত্যাগ করা এবং অন্য একটি দেহ লাভ করা প্রকৃতির নিয়মের দ্বারা সুচারুভাবে পরিচালিত হয়। পরবর্তী জীবনে কে কি রকম দেহ প্রাপ্ত হবে, তা নির্ধারিত হবার পরেই মানুষ মৃত্যু বরণ করে। জীব নিজে নয়, তার থেকে উচ্চস্তরে যে-সমস্ত নির্ভরযোগ্য অধিকারীরা রয়েছেন, যাঁরা ভগবানের আদেশ অনুসারে এই জড় জগতের পরিচালনা করেন, তাঁরাই জীবের কর্ম অনুসারে তাদের অথবা নিম্নলোকে পতিত হই। এভাবেই প্রতিটি জীবন তার পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির কর্মক্ষেত্র। এই জীবনে যদি আমরা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবৎ-ধাম উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি, তবে এই দেহত্যাগ করবার পর আমরা অবশ্যই ভগবানের মতো সৎ-চিৎ-আনন্দময় দেহ প্রাপ্ত হয়ে ভগবৎ ধামে ফিরে যেতে পারব।

পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, বিভিন্ন ধরনের পরমার্থবাদী আছেন-ব্রহ্মবাদী, পরমাত্মবাদী ও ভক্ত। আর এই কথাও বলা হয়েছে যে, ব্রহ্মজ্যোতিতে বা চিন্ময় আকাশে অগণিত চিন্ময় গ্রহাদি ভাসছে। এই সব গ্রহের সংখ্যা সমস্ত জড় জগতের গ্রহের থেকে অনেক বেশি। এই জড় জগতের আয়তন সৃষ্টির এক চতুর্থাংশের সমান বলে অনুমিত হয়েছে (একাংশেন স্থিতো জগৎ)। এই জড় জগতের অংশে অগণিত সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র সমন্বিত কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সমস্ত জড় সৃষ্টি হচ্ছে সমগ্র সৃষ্টির এক অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সৃষ্টির অধিকাংশই রয়েছে চিন্ময় আকাশে। পরমার্থবাদীদের মধ্যে যাঁরা নির্বিশেষবাদী, যাঁরা ভগবানের নিরাকার রূপকে উপলব্ধি করতে চান, তাঁরা ভগবানের দেহনির্গত ব্রহ্মজ্যোতিতে বিলীন হয়ে যান। এভাবে তাঁরা চিদাকাশ প্রাপ্ত হন। কিন্তু ভগবানের ভক্ত ভগবানের দিব্য সান্নিধ্য লাভ করতে চান, তাই তিনি বৈকুণ্ঠলোকে উন্নীত হয়ে ভগবানের নিত্য সাহচর্য লাভ করেন। অসংখ্য বৈকুণ্ঠলোকে ভগবান তাঁর অংশ-প্রকাশ-চতুর্ভুজ বিষ্ণু এবং প্রদুম্ন, অনিরুদ্ধ, গোবিন্দ আদি রূপে তাঁর ভক্তদের সঙ্গদান করেন। তাই জীবনের শেসে পরমার্থবাদীরা ব্রহ্মজ্যোতি, পরমাত্মা কিংবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিন্তা করে থাকেন। সকলের ক্ষেত্রেই তাঁরা চিদাকাশে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু তাদের মধ্যে কেবল ভগবানের ভক্তেরাই বৈকুণ্ঠলোকে অথবা গোলকে বৃন্দাবনে ভগবানের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ভগবান এই বিষয়ে বলেছেন, “এতে কোনও সন্দেহ নেই।” এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেই হবে। আমাদের কল্পনার অতীত বলে এই কথা অবিশ্বাস করা উচিত নয়। আমাদের মনোভাব অর্জুনের মতো হওয়া উচিত-“তুমি যা বলেছ তা আমি সমস্ত বিশ্বাস করি।” তাই ভগবান যখন বলেছেন যে, মৃত্যুর সময় ব্রহ্ম, পরমাত্মা কিংবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপের ধ্যান করলেই তাঁর আলয় অপ্রাকৃত জগতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়, এই কথা ধ্রুব সত্য বলে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মৃত্যুর সময়ে ভগবানের রূপের চিন্তা করে চিন্ময় জগতে প্রবেশ করা যে সম্ভব, তা ভগবদ্‌গীতায় (৮/৬) বর্ণিত হয়েছে-

যং যং পাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।

তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ।।

যেভাবে ভাবিত হয়ে শরীর ত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে সেই রকম ভাবযুক্ত শরীর প্রাপ্ত হয়।” এখন, আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, জড়া প্রকৃতি হচ্ছে ভগবানের বহু শক্তির মধ্যে একটি শক্তির প্রকাশ। বিষ্ণুপুরাণে (৬/৭/৬১) ভগবানের শক্তির বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে-

বিষ্ণুশক্তিঃ পরা প্রোক্তা ক্ষেত্রজ্ঞাখ্যা তথাপরা।

অবিদ্যা কর্মসংজ্ঞান্যা তৃতীয়া শক্তিরিষ্যতে ।।

ভগবানের শক্তি বিচিত্র ও অনন্তরূপে প্রকাশিত। আমাদের সীমিত অনুভূতি দিয়ে তাঁর সেই শক্তি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু মহাজ্ঞানী মুনি-ঋষিরা, যাঁরা মুক্ত পুরুষ, যাঁরা সত্যদ্রষ্টা, তাঁরা ভগবানের শক্তিকে পুর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং এই শক্তিকে তাঁরা তিনটি ভাগে বিভক্ত করে তার বিশ্লেষণ করেছেন। এই সমস্ত শক্তিই হচ্ছে বিষ্ণুশক্তির প্রকাশ, অর্থাৎ তাঁরা ভগবানের শ্রীবিষ্ণুর বিভিন্ন শক্তি। সেই প্রথম শক্তিকে বলা হয় শক্তি বা চিৎ-শক্তি। জীবও এই উৎকৃষ্ট শক্তি থেকে উদ্ভুত, সেই কথা ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে। ভগবানের এই অন্তরঙ্গা শক্তি ব্যতীত আর যে সমস্ত শক্তি, তাকে বলা হয় জড়া শক্তি। এই সমস্থ শক্তি নিম্নতর শক্তি এবং সেগুলি তামসিক গুণের দ্বারা প্রভাবিত। মৃত্যুর সময় এই জড় জগতের তামসিক গুণের দ্বারা আচ্ছাদিত নিম্নতর শক্তিতে থাকতে পারি অথবা চিন্ময় জগতের চিৎ-শক্তিতে উত্তীর্ণ হতে পারি। তাই তা ভগবদ্‌গীতায় (৮/৬)-

যং যং পাপি স্মরন্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।

তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ।।

যেভাবে ভাবিত হয়ে শরীর ত্যাগ করে, সে নিঃসন্দেহে সেই রকম ভাবযুক্ত শরীর প্রাপ্ত হয়।”

আমাদের জীবনে আমরা হয় জড়া শক্তি নতুবা চিৎ-শক্তির সম্বন্ধে ভাবতে অভ্যস্ত। এখন, আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে জড়া শক্তি থেকে চিৎ-শক্তিতে কিভাবে রূপান্তরিত করতে পারি? খবরের কাগজ, উপন্যাস আদি নানা রকম বই আমাদের মনকে জড়া শক্তির ভাবনার যোগান দেয়। আমাদের চিন্তাধারা এই ধরনের সাহিত্যের দ্বারা আবিষ্ট হয়ে আছে বলেই আমরা উচ্চতর চিৎ-শক্তিকে উপলব্ধি করত অক্ষম হয়ে পড়েছি। আমরা যদি এই চিৎ-শক্তিকে জানতে চাই, বা ভগবৎতত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে চাই, তবে আমাদের বৈদিক সাহিত্যের শরণ নিতে হবে। মানুষকে অপ্রাকৃত জগতের সন্ধান দেবার জন্যই ভারতের মুনি-ঋষিদের মাধ্যমে ভগবান বেদ, পুরাণ আদি বৈদিক শাস্ত্র প্রণয়ন করিয়েছেন। এই সমস্ত সাহিত্য মানষের কল্পনাপ্রসূত নয়; এগুলি হচ্ছে সত্য দর্শনের বিশদ ঐতিহাসিক বিবরণ।

শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (মধ্য ২০/১২২) বলা হয়েছে-

মায়ামুগ্ধ জীবের নাহি স্বতঃ কৃষ্ণজ্ঞান।

জীবের কৃপায় কৈলা কৃষ্ণ বেদ-পুরাণ ।।

স্মৃতিভ্রষ্ট জীবেরা ভগবানের সঙ্গে তাদের শাশ্বত সম্পর্কের কথা ভুলে গেছে এবং তাই তারা জড়-জাগতিক কার্যকলাপে মগ্ন হয়ে আছে। তাদের চিন্তাধারাকে অপ্রাকৃত স্তরে উন্নীত করবার জন্য শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বহু বৈদিক শাস্ত্র প্রদান করেছেন। প্রথমে তিনি বেদকে চার ভাগে ভাগ করেন। তারপর পুরাণে তিনি তাদের ব্যাখ্যা করেন এবং অল্পবুদ্ধিসম্মন্ন লোকদের জন্য তিনি মহাভারত রচনা করেন। এই মহাভারতে তিনি ভগবদ্‌গীতার বাণী প্রদান করেন। তারপর সমস্ত বৈদিক সাহিত্যের সংক্ষিপ্তসার বেদান্তসূত্র প্রণয়ন করেন। বেদান্তসূত্রকে সহজবোধ্য করে তিনি তার ভাষ্য শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেন। মনোনিবেশ সহকারে এই সমস্ত বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। জড় জগতে আবদ্ধ সাংসারিক লোকের যেমন খবরের কাগজ, নানা রকমের পত্রিকা, নাটক, নভেল আদি পড়ে থাকে এবং তার ফলে জড় জগতের প্রতি তাদের মোহমুগ্ধ অনুরাগ গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে, তেমনই যারা ভগবানের স্বরূপশক্তিকে উপলব্ধি করে ভগবৎ-ধামে ফিরে যেতে চায়, তাদের কর্তব্য হচ্ছে মহামুনি ব্যাসদেবের রচিত বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করা। বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়ন করার ফলে আমরা জানতে পারি-ভগবান কে, তাঁর স্বরূপ কি, আমাদের সঙ্গে তাঁর কি সম্পর্ক। এই সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন করার ফলে মন ভগবন্মুখী হয়ে ওঠে এবং তার ফলে অন্তকালে ভগবানের সচ্চিদানন্দময় রূপের ধ্যান করতে করতে আমরা দেহত্যাগ করতে পারি। ভগবদ্‌গীতাতে ভগবান বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এটিই হচ্ছে তাঁর কাছে ফিরে যাবার একমাত্র পথ এবং তিনি বলেছেন যে, “এতে কোন সন্দেহ নেই।”

তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ।

ময্যর্পিতমনোবুদ্ধির্মামেবৈষ্যস্যসংশয়ঃ।।

অতএব অর্জুন! সর্বক্ষণ আমাকে স্মরণ করে তোমার স্বভাব বিহিত যুদ্ধ করা উচিত। তোমার মন ও বুদ্ধি আমাতে অর্পন করে কার্য করলে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।” (ভঃ গীঃ ৮/৭) ।

তিনি অর্জুনকে তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত হয়ে তাঁর ধ্যান করতে আদেশ দেননি। ভগবান কোন অবাস্তব পরামর্শ দেন না। পক্ষান্তরে, তিনি বলেছেন, “আমাকে স্মরণ করে তুমি তোমার কর্তব্যকর্ম করে যাও।” এই জড় জগতে দেহ ধারণ করতে হতে কাজ করতেই হবে। কর্ম অনুসারে মানব-সমাজকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র-এই চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এতে ব্রাহ্মণেরা বা সমাজের বুদ্ধিমান লোকেরা এক ধরনের কাজ করছে, ক্ষত্রিয়েরা বা পরিচালক সম্প্রদায় অন্য ধরনের কাজ করছে এবং ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সম্প্রদায় তাদের বিশেষ ধরনের কাজ করছে। মানব-সমাজে প্রত্যেকেই সে শ্রমিকই হোক, ব্যবাসায়ী হোক, যোদ্ধা হোক, চাষী হোক অথবা এমন কি সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, বৈজ্ঞানিক কিংবা ধর্মতত্ত্ববিদই হোন না কেন এদের সকলকেই জীবন ধারণ করবার জন্য তাদের নির্ধরিত কর্ম করতেই হয়। তাই ভগবান অর্জুনকে তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। পক্ষান্তরে তিনি বলেছেন যে, সব সময় সকল কর্মের মাঝে তাঁকে স্মরণ করে, (মামনুস্মর) তাঁর পাদপদ্মে মন ও বুদ্ধি অর্পণ করে কর্তব্যকর্ম করে যেতে। দৈনন্দিন জীবনে জীবন-সংগ্রামের সময় যদি শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ না করা যায়, তবে মৃত্যুর মুহূর্তে তাঁকে স্মরণ করা সম্ভব হবে না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও এই উপদেশ দিয়ে গেছেন। তিনি বলে গেছেন যে, কীর্তনীয়াঃ সদা হরিঃ-সর্বক্ষণ ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তনের অভ্যাস করা উচিত। ভগবানের নাম তাঁর রূপের থেকে ভিন্ন নয়; তাই যখন আমরা তাঁর নাম কীর্ত্তন করি, তখন আমরা তাঁর পবিত্র সান্নিধ্য লাভ করে থাকি। তাই অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ, সব সময় আমাকে স্মরণ কর এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ সর্বদাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্তন করি-এই দুটি একই উপদেশ। ভগবানের দিব্য রূপকে স্মরণ করা এবং তাঁর দিব্য নামের কীর্ত্তন করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অপ্রাকৃত স্তরে নাম ও রূপ অভিন্ন। তাই আমাদের সর্বক্ষণ চব্বিশ ঘন্টাই ভগবানকে স্মরণ করারর অভ্যাস করতে হবে। তাঁর পবিত্র নাম কীর্তন করে আমাদের জীবনের কার্যকলাপ এমনভাবে চালিত করত হবে যাতে আমরা সর্বদাই তাঁকে স্মরণ করতে পারি।