শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা: ষষ্ঠ অধ্যায় – ধ্যানযোগ(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : ষষ্ঠ অধ্যায় – ধ্যানযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
কর্মফলের আশা না করিয়া যিনি কর্তব্য (অগ্নিহোত্রাদি) নিত্যকর্ম করেন, তিনিও সন্ন্যাসী, তিনিও কর্মযোগী । অগ্নিহোত্রাদি শ্রৌত ও তপোদানাদি স্মার্ত কর্ম যিনি ত্যাগ করিয়াছেন, কেবল তিনিই সন্ন্যাসী বা যোগী নন। ১

হে পাণ্ডব, শাস্ত্র যাহাকে সর্বকর্ম ও তাহার ফলত্যাগরূপ সন্ন্যাস বলেন, নিষ্কামকর্মানুষ্ঠানরূপ যোগকে তুমি সেই সিন্ন্যাস বলিয়াই জানিবে । কারণ, সংকল্পশূন্য না হইলে (কর্মফলের বাসনা ত্যাগ না করিলে) কেহ কর্মযোগী হইতে পারে না। ২

যিনি কর্মফলত্যাগী ও ধ্যানযোগে আরোহণ করিতে ইচ্ছুক, অর্থাৎ ধ্যানযোগে অনারূঢ় (ধ্যানযোগে অবস্থানে অশক্ত), তাঁহার পক্ষে নিষ্কাম কর্মানুষ্ঠানই উৎকৃষ্ট সাধন । সেই নিষ্কাম কর্মী যখন যোগারূঢ় হন, তখন সর্বকর্ম হইতে নিবৃত্তিই তাঁহার যোগারূঢ়ত্বের সাধন হয় । অর্থাৎ যেমন যেমন তিনি কর্ম হইতে উপরত হন, তেমন তেমন তাঁহার চিত্ত সমাহিত হয় এবং তিনি শীঘ্র যোগারূঢ় হন। ৩

যখন চিত্ত-সমাধান-অভ্যাসকারী যোগী ঐহিক ও পারত্রিক বিষয়ে সকল সংকল্প ত্যাগ করিয়া শব্দস্পর্শাদি ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ে ও নিত্যনৈমিত্তিকাদি কর্মে প্রয়োজনাভাবে কর্তব্যবুদ্ধিশূন্য হন, তখন তাহাকে যোগারূঢ় বলা হয়। ৪

মানুষ বিবেকযুক্ত মন দ্বারা (আত্মনা) আপনিই আপনাকে সংসার হইতে উদ্ধার করিবে (যোগারুঢ় করিবে); কখনো নিজেকে বিষয়াসক্ত করিবে না। কারণ, শুদ্ধ মনই মানুষের প্রকৃত হিতকারী, মুক্তির হেতু এবং বিষয়াসক্ত মনই মানুষের পরম শত্রু, বন্ধনের কারণ। ৫

যে বিবেকযুক্ত মন দ্বারা দেহেন্দ্রিয়াদি বশীভূত হইয়াছে, সেই সংযত মনই আত্মার বন্ধু, কারণ উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তি রহিত হইয়া সেই মনই মুক্তির সহায়ক হয়। কিন্তু অজিতেন্দ্রিয় ব্যক্তির বিবেকশূন্য মন উচ্ছৃঙ্খল প্রবৃত্তিবশে শত্রুর ন্যায় স্বীয় অনিষ্টসাধনে প্রবৃত্ত হয়। ৬

ব্রহ্ম জিতেন্দ্রিয় ও প্রশান্ত যোগারূঢ় ব্যক্তির সাক্ষাৎ আত্মভাবে বর্তমান থাকেন। এইরূপ জীবন্মুক্ত ব্যক্তি শীত ও উষ্ণে, সুখ ও দুঃখে এবং সম্মান ও অপমানে অবিচলিত। ৭

কারণ যে যোগী শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতিতে পরিতৃপ্ত, যিনি শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্বে নির্বিকার ও জিতেন্দ্রিয় এবং যিনি মৃৎখণ্ড, প্রস্তর ও সুবর্ণে সমদর্শী (হেয়-উপাদেয়-বুদ্ধিশূন্য), তিনি যোগারূঢ় বলিয়া কথিত হন। ৮

সুহৃৎ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, দ্বেষ্য, বন্ধু, সদাচারী ও পাপীতে যাঁহার সমবুদ্ধি (ব্রহ্মবুদ্ধি) সুদৃঢ় হইয়াছে, তিনিই যোগারূঢ়। ৯

[যোগারূঢ়-অবস্থা-প্রাপ্তির উপায় বর্ণনা করিতেছেন – ]

নির্জন স্থানে যোগী একাকি (নিঃসঙ্গ), নিরাকাঙ্ক্ষ ও পরিগ্রশূন্য হইয়া দেহ ও মন সংযমপূর্বক অন্তঃকরণ সতত সমাহিত করিবেন। ১০

স্বভাবতঃ বা সংস্কারতঃ শুদ্ধ (ও বিবিক্ত) স্থানে যোগী প্রথমে কুশ, তদুপরি যথাক্রমে মৃগচর্ম ও বস্ত্রদ্বারা রচিত নাতি উচ্চ বা নাতি নিম্ন স্বীয় স্থির আসন স্থাপন করিবেন। ১১

যোগী সেই আসনে বসিয়া বাহ্য ও অন্তরিন্দ্রিয়ের কার্য সংযমপূর্বক চিত্তশুদ্ধির জন্য একাগ্র মনে যোগাভ্যাস করিবেন। ১২

মেরুদণ্ড, গ্রীবা ও মস্তক সরল ও নিশ্চলভাবে ধারণপূর্বক স্থির হইয়া এবং কোন দিকে না তাকাইয়া স্বীয় নাসিকাগ্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিবেন। ১৩

প্রশান্তচিত্ত, ভয়রহিত, ব্রহ্মচর্য পালন ও গুরুসেবাদি ব্রতে স্থিত, মদ্গতচিত্ত ও মৎপরায়ণ যোগী মন একাগ্র করিয়া নিত্য ধ্যানাভ্যাস করিবেন। ১৪

[যোগের ফল বলিতেছেন – ]

যোগী এইরূপে সদা সংযতভাবে মন সমাহিত করিয়া আমার স্বরূপভূত মোক্ষপ্রদ পরম শান্তি প্রাপ্ত হন। ১৫

অতিভোজির, একান্ত অনাহারীর, অত্যন্ত নিদ্রালুর এবং অতি অনিদ্রা-অভ্যাসীর ধ্যান হয় না। ১৬

যিনি পরিমিত আহার ও বিহার করেন এবং মন্ত্রজপ শাস্ত্রপাঠাদি কর্মে পরিমিত প্রচেষ্টা করেন, যাঁহার নিদ্রা ও জাগরণ নিয়মিত (কালে ও পরিমাণে নির্দিষ্ট), তাঁহার ধ্যান সংসারদুঃখের নাশক হয়। ১৭

[ভগবান্‌ সম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনা করিতেছেন।]

যখন যোগী সকল কামনা হইতে মুক্ত হন এবং তাঁহার চিত্ত বাহ্য চিন্তা পরিত্যাগপুর্বক বৃত্তিরহিত হইয়া আত্মাতে অবস্থান করে, তখন তাঁহার (সম্প্রজ্ঞাত) সমাধি হয়। ১৮

বায়ুবর্জিত স্থানে অবস্থিত দীপশিখা যেমন কম্পিত হয় না, চিত্তবৃত্তির নিরোধ-অভ্যাসকারী যোগীর একাগ্রীভূত চিত্তেরও সেই উপমা জানিবে, অর্থাৎ যোগীর নিরুদ্ধ চিত্ত সবিকল্প সমাধিতে সেইরূপ নিষ্কম্প দীপশিখার ন্যায় নিশ্চলভাবে অবস্থিত থাকে । ১৯

[ভগবান্‌ অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির বর্ণনা করিতেছেন ।]

যে অবস্থায় ধ্যানাভ্যাস দ্বারা চিত্ত সর্ববৃত্তিশূন্য হয় এবং যে অবস্থায় শুদ্ধ অন্তঃকরণ দ্বারা পরম চৈতন্য জ্যোতিঃস্বরূপ আত্মাকে উপলব্ধি করিয়া যোগী প্রত্যগাত্মাতেই পরিতুষ্ট হন। ২০

যে অবস্থায় আত্মাকারা বুদ্ধি দ্বারা গ্রাহ্য ও ইন্দ্রিয়গোচরাতীত অর্থাৎ অবিষয়জনিত ব্রহ্মানন্দরূপ পরমসুখ যোগী অনুভব করেন, এবং যাহাতে অবস্থিত হইলে আত্মস্বরূপে সংস্থিতি হইতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। ২১

যাহা লাভ করিয়া যোগী অন্য লাভ তদপেক্ষা অধিক মনে করেন না এবং যে আত্মতত্ত্বে অবস্থিত হইয়া শস্ত্রনিপাতাদিরূপ মহাদুঃখেও বিচলিত হন না (অপরিপক্ক যোগে দুঃখ অসহ্য হয়)।২২

নিখিল দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃতিরূপ সেই আত্মস্থিতিকে (ব্রাহ্মী-স্থিতিকে) অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি বলিয়া জানিবে। নির্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে এই সমাধি অভ্যাস করা উচিত। ২৩

সংকল্পজাত সমস্ত কামনা নিঃশেষে ত্যাগ করিয়া মনের দ্বারাই ইন্দ্রিয়সমূহকে সকল বিষয় হইতে নিবৃত করিয়া।২৪

ধৈর্যযুক্ত বুদ্ধি দ্বারা মনকে ধীরে ধীরে উপরত করিবে এবং আত্মাতে মনকে বিলীন করিয়া অন্য কিছুই চিন্তা করিবে না। ইহাই অসম্প্রজ্ঞাত সমাধির অন্তরঙ্গ সাধন। ২৫

সমাধিসাধনে প্রবৃত্ত যোগী চঞ্চল ও অস্থির মন যে যে বিষয়ে ধাবিত হয় সেই সেই বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া ইহাকে আত্মাতেই স্থির করিবেন। ২৬

প্রশান্তচিত্ত, মোহাদি ক্লেশরূপ রজোবৃত্তিশূন্য, নিষ্পাপ ও ব্রহ্মভাব-প্রাপ্ত যোগীই পরম সুখ লাভ করেন। ২৭

এইরূপে মনকে সদা যোগমুক্ত করিয়া নিষ্পাপ যোগী অনায়াসে ব্রহ্ম হইতে অভিন্ন আত্যন্তিকি শান্তি লাভ করেন। ২৮

[সমাধির ফলে সংসারদুঃখনাশক ব্রহ্মৈকত্ব-দর্শন হয়। ইহাই বর্ণিত হইতেছে -]

সমাধিমান পুরুষ সর্বভূতে ব্রহ্মদর্শী হইয়া স্বীয় আত্মাকে ব্রহ্মাদিস্থাবরান্ত সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে স্বীয় আত্মাতে দর্শন করেন। ২৯

[আত্মৈকত্ব-দর্শনের ফল শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন -]

যিনি সর্বভূতে সকলের আত্মা আমাকে এবং সর্বাত্মা আমাতে ব্রহ্মাদি সর্বভূতকে দর্শন করেন, তাঁহার ও আমার একাত্মতা হেতু আমি তাঁহার অদৃশ্য হই না এবং তিনিও আমার অদৃশ্য (পরোক্ষ) হন না। ৩০

যিনি সর্বভূতে প্রত্যগাত্মরূপে অবস্থিত আমাকে স্বীয় আত্মরূপে অভেদজ্ঞানে ভজনা করেন, অর্থাৎ আমিই সেই – এইরূপ অপরোক্ষানুভব করেন, সেই যোগী যে কোন অবস্থায় বিদ্যমান থাকিয়াও আমাতেই অবস্থিত করেন; তাঁহার মোক্ষের প্রতিবন্ধক কিছুই হইতে পারে না। ৩১

হে অর্জুন, যিনি সকল ভূতের সুখ ও দুঃখকে নিজের সুখ ও দুঃখ বলিয়া অনুভব করেন, আমার মতে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী। ৩২

অর্জুন বলিলেন –
হে মধুসূদন, সম্যগ্‌দর্শনরূপ যে সমত্বযোগ আপনি ব্যাখ্যা করিলেন, আমার মনের চঞ্চল স্বভাববশতঃ আমি ইহার নিশ্চল স্থিতি দেখিতে পাইতেছি না। ৩৩

হে কৃষ্ণ, মন অতি চঞ্চল, প্রবল এবং শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপ-উৎপাদক। ইহাকে বিষয়বাসনা হইতে নিবৃত্ত করা অতিশয় কঠিন। সেইজন্য উহার নিরোধ আকাশস্থ বায়ুকে পাত্রবিশেষে আবদ্ধ করার ন্যায় দুঃসাধ্য মনে করি। ৩৪

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
হে মহাবাহো, মন যে দুর্নিরোধ ও চঞ্চল তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু হে কৌন্তেয়, ধ্যানাভ্যাস এবং ঐহিক ও পারলৌকিক বিষয়ভোগে বিতৃষ্ণা সাধন দ্বারা ইহাকে সংযত করা যায়। ৩৫

অসংযত ব্যক্তির পক্ষে সমাধি দুষ্প্রাপ্য – ইহা আমার অভিমত। কিন্তু পুনঃ পুনঃ যত্নশীল ও জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি ধ্যানাভ্যাস ও বৈরাগ্যসাধন দ্বারা এই সমাধি লাভ করিতে পারেন। ৩৬

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন –
হে কৃষ্ণ, শ্রদ্ধাবান্‌ সম্যক্‌ যত্নহীন যোগচ্যুত যোগী যোগে সিদ্ধিলাভ না করিলে কোন্‌ মার্গে গমন করেন ? ৩৭

হে কৃষ্ণ, ব্রহ্মপ্রাপ্তির পথে কর্মমার্গ ও ধ্যানমার্গ হইতে বিভ্রষ্ট, বিমূঢ় ও নিরাশ্রয় যোগী সংচ্ছিন্ন মেঘখণ্ডের ন্যায় কি বিনষ্ট হন ? ৩৮

হে কৃষ্ণ, আমার এই সংশয় নিঃশেষে দূর করিতে একমাত্র আপনিই সমর্থ । কারণ আপনি ভিন্ন অন্য কোনও ঋষি বা দেবতা আমার এই সংশয় দূর করিতে পারিবেন না। ৩৯

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন –
হে পার্থ, বৈদিক কর্মত্যাগ করা সত্ত্বেও যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি ইহলোকে পতিত বা নিন্দিত হন না, পরলোকেও নিকৃষ্ট শরীর প্রাপ্ত হন না। হে বৎস, ইহার কারণ, কল্যাণকারীর কখনও অধোগতি হয় না। ৪০

যোগভ্রষ্ট ব্যক্তি (অল্পকাল যোগাভ্যাসী) পুণ্যকারিগণের প্রাপ্য ব্রহ্মলোকাদি ঊর্ধ্বলোক লাভ করিয়া তথায় বহু বৎসর বাস করেন। অনন্তর সদাচারসম্পন্ন ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। ৪১

অথবা, যোগভ্রষ্ট পুরুষ (চিরাভ্যস্ত) জ্ঞানবান্‌ যোগিগণের কুলে জন্মগ্রহণ করেন । ঈদৃশ (দ্বিতীয় প্রকার) জন্ম জগতে অতি দুর্লভ। ৪২

হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট পুরুষ সেই দেহে পূর্ব জন্মের সুকৃতির ফলে মোক্ষপর বুদ্ধি লাভ করিয়া সিদ্ধিলাভের জন্য অধিকতর প্রযত্ন করেন। ৪৩

তিনি (যোগভ্রষ্ট) পূর্বজন্মের অভ্যাসবশে যেন অবশ হইয়াও যোগসাধনে প্রবৃত্ত হন । যোগের স্বরূপ জানিতে ইচ্ছুক হইয়া যোগমার্গে প্রবৃত্ত যোগভ্রষ্টও বেদোক্ত যজ্ঞানুষ্ঠানের ফল অতিক্রম করেন । আর যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া তন্নিষ্ঠ হইয়া যোগাভ্যাস করেন, তাঁহার সাফল্যের নিশ্চয়তা বলাই বাহুল্য। ৪৪

যোগী ইহজন্মে পূর্বজন্মকৃত যত্ন অপেক্ষা অধিকতর যত্ন করিয়া পাপমুক্ত হইয়া পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধনসঞ্চিত সংস্কার দ্বারা সিদ্ধিলাভ করিয়া মোক্ষপ্রাপ্ত হন। ৪৫

যোগী কৃচ্ছ্র চান্দ্রায়ণাদি তপোনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতগণ অপেক্ষা এবং অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞপরায়ণ কর্মিগণ অপেক্ষাও যোগী শ্রেষ্ঠ । অতএব হে অর্জুন, তুমি যোগী হও। ৪৬

যিনি শ্রদ্ধার সহিত মদ্গত চিত্তে আমার ভজনা করেন, তিনি দেবতাদিধ্যানপর সকল যোগীর মধ্যে উৎকৃষ্ট, ইহা আমার অভিমত। ৪৭

[এই অধ্যায়ের শেষ শ্লোক দুইটি পরবর্তী (সপ্তম) অধ্যায়ের সূচনা-স্বরূপ।]

ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে ধ্যানযোগনামক ষষ্ঠ অধ্যায় সমাপ্ত।
Continue reading

Advertisements

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : পঞ্চম অধ্যায় – সন্ন্যাসযোগ


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : পঞ্চম অধ্যায় – সন্ন্যাসযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

অর্জুন উবাচ –

সন্ন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগঞ্চ শংসসি ।
যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রূহি সুনিশ্চিতম্ ॥ ১
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে কৃষ্ণ, আপনি শাস্ত্রীয় কর্মের ত্যাগ আবার শাস্ত্রীয় কর্মের অনুষ্ঠান করিতে বলিতেছেন । এই দুইটির মধ্যে যেটি প্রকৃতপক্ষে মোক্ষদায়ক তাহা আমাকে নিশ্চয় করিয়া বলুন । ১
শ্রীভগবান্ উবাচ –
সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে ॥ ২
উত্তরে শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
কর্মের ত্যাগ ও কর্মের অনুষ্ঠান উভয়ই মুক্তিমার্গ; কিন্তু তাহাদের মধ্যে জ্ঞানহীন কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান উৎকৃষ্টতর । ২
জ্ঞেয়ঃ স নিত্যসন্ন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি ।
নির্দ্বন্দ্বো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে ॥ ৩
যিনি দুঃখ ও দুঃখের সাধনকে দ্বেষ করেন না এবং সুখ ও সুখের সাধনকে আকাঙ্ক্ষা করেন না, সেই রাগদ্বেষাদিশূন্য কর্মযোগীকে নিত্যসন্ন্যাসী বলিয়াই জানিবে । কারণ হে মহাবাহো, রাগদ্বেষাদি-দ্বন্দ্বহীন ব্যক্তি সংসারবন্ধন হইতে অনায়াসে মুক্ত হন । ৩
সাংখ্যযোগৌ পৃথগ্‌বালাঃ প্রবদন্তি ন পণ্ডিতাঃ ।
একমপ্যাস্থিতঃ সম্যগুভয়োর্বিন্দতে ফলম্ ।। ৪
অজ্ঞ ব্যক্তিগণ সাংখ্য এবং যোগকে পরস্পরবিরুদ্ধ ও ভিন্ন-ফল-বিশিষ্ট বলিয়া থাকেন; কিন্তু আত্মজ্ঞানিগণ তাহা বলেন না । কারণ উভয়ের ফল এক মোক্ষ। সেইজন্য একটি সম্যগ্‌রূপে অনুষ্ঠিত হইলে উভয়ের ফল মোক্ষ লাভ হয় । ৪
যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদ্‌যোগৈরপি গম্যতে ।
একং সাংখ্যঞ্চ যোগঞ্চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি ।। ৫
জ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসিগণ মোক্ষ নামক যে ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হন, যোগিগণও সেই ব্রহ্মপদই লাভ করেন। সাংখ্য ও যোগের ফল একই মোক্ষ বলিয়া উভয়কে যিনি অভিন্ন দেখেন, তিনিই যথার্থদর্শী, সম্যক্‌ জ্ঞানী । ৫
সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি ।। ৬
হে মহাবাহো, নিষ্কাম কর্মযোগ ব্যাতীত জ্ঞানযুক্ত পরমার্থ সন্ন্যাস লাভ করা অসম্ভব। নিষ্কাম কর্মযোগনিষ্ঠ ব্যক্তি সন্ন্যাসী (মুনি) হইয়া অচিরে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন । ৬
যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ ।
সর্বভূতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে ।। ৭
যিনি নিষ্কামকর্মযোগ দ্বারা শুদ্ধচিত্ত, অতএব সংযতদেহ ও জিতেন্দ্রিয় এবং এইরূপে যিনি ব্রহ্ম হইতে স্তম্ব পর্যন্ত সর্বভূতের আত্মাকে স্বীয় আত্মারূপে দর্শন করেন, তিনি স্বাভাবিক বা লোক-সংগ্রহার্থ কর্ম করিয়াও লিপ্ত (বদ্ধ) হন না । ৭
নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ ।
পশ্যন্ শৃণ্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশ্নন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্ ।। ৮
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্নন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্ ।। ৯
নিষ্কাম কর্মযোগী ক্রমে তত্ত্বদর্শী হইয়া দর্শনে, শ্রবণে, স্পর্শনে, আঘ্রাণে, ভোজনে, গমনে, নিদ্রায়, নিঃশ্বাস-গ্রহণে, কথনে, মলমূত্রাদি ত্যাগে, গ্রহণে, চক্ষুর উন্মেষে এবং নিমিষেও ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্ত – এইরূপ দৃঢ় ধারণা করিয়া ‘আমি অকর্তা, কিছুই করি না’ – ইহা নিশ্চিত জানেন । ৮-৯
ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ ।
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা ।। ১০
যে মুমুক্ষু কর্মফলে আসক্তি ত্যাগপুর্বক পরমেশ্বরের উদ্দেশে সকল কর্ম করেন, জল যেমন পদ্মপত্রকে আর্দ্র করিতে পারে না, পাপপুণ্য সেইরূপ তাঁহাকে স্পর্শ করে না । ১০
কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈরপি ।
যোগিনঃ কর্ম কুর্বন্তি সঙ্গং ত্যক্ত্বাত্মশুদ্ধয়ে ।। ১১
নিষ্কাম কর্মযোগীগণ ফলাসক্তি বর্জনপূর্বক মমত্ব-ভাবশূন্য (‘আমার’ – এই ভাবরহিত) হইয়া কায়, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা চিত্তশুদ্ধির জন্য কর্ম করেন । ১১
যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্ ।
অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে ।। ১২
ঈশ্বরের নিমিত্ত কর্ম করিতেছি, ফললাভের জন্য নহে – এইরূপে কর্মফল ত্যাগপূর্বক নিষ্কাম কর্মযোগী জ্ঞাননিষ্ঠার ফলস্বরূপ চিরশান্তির (মোক্ষের) অধিকারী হন; কিন্তু সকাম কর্মী কর্মফলে আসক্তিবশে সংসারে আবদ্ধ হন । ১২
সর্বকর্মাণি মনসা সংন্যস্যাস্তে সুখং বশী ।
নবদ্বারে পুরে দেহী নৈব কুর্বন্ন কারয়ন্ ।। ১৩
কিন্তু যিনি পরমার্থদর্শী, সেই জিতেন্দ্রিয় পুরুষ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য ও নিষিদ্ধ – সমস্ত কর্ম ত্যাগপূর্বক নিজে কিছু না করিয়া এবং দেহেন্দ্রিয়াদিকে কোন কর্মে প্রবর্তিত না করিয়া দেহেন্দ্রিয়াদি-সঙ্ঘাতে আত্মাভিমানশূন্য, নিরায়াস ও প্রসন্নচিত্ত হইয়া নবদ্বার-বিশিষ্ট দেহনগরে অবস্থান করেন । ১৩
ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ ।
ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে ।। ১৪
কারণ আত্মা মানুষের কর্তৃত্ব, কর্ম ও কর্মফলপ্রাপ্তি সৃষ্টি করেন না; কিন্তু অবিদ্যারূপিণী মায়াশক্তি কর্তৃত্বাদিরূপে প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ অবিদ্যাপ্রভাবে কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদি আত্মাতে আরোপিত হয় । ১৪
নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ ।। ১৫
পরমার্থতঃ আত্মা কাহারও পাপ বা পূজা জপহোমাদিরূপ পুণ্যও গ্রহণ করেন না । পূর্বোক্ত অবিদ্যা দ্বারা ‘আমি কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদিরহিত’ – এই বিবেকজ্ঞান আত্মজ্ঞান দ্বারা আবৃত বলিয়া প্রাণিগণ মোহগ্রস্থ হয়, অর্থাৎ মোহবশে ‘আমি করি ও করাই’, ‘আমি ভোগ করি ও করাই’ – ইত্যাদি ভ্রম করিয়া থাকে । ১৫
জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ ।
তেষামাদিত্যবজ্‌জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎ পরম্ ।। ১৬
কিন্তু আত্মজ্ঞান দ্বারা যাঁহাদের অনাদি অজ্ঞান বিনষ্ট হইয়াছে, সূর্য যেমন সকল বস্তুকে অবভাসিত করেন, তেমন তাঁহাদের আত্মজ্ঞান শ্রুতিস্মৃতি-প্রসিদ্ধ ব্রহ্মকে সর্ববস্তুতে প্রকাশিত করে । ১৬
তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ ।
গচ্ছন্ত্যপুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননির্ধূতকল্মষাঃ ।। ১৭
যাঁহাদের বুদ্ধি ব্রহ্মনিষ্ঠ, ব্রহ্মে যাঁহাদের আত্মভাব, ব্রহ্মে যাঁহাদের স্থিতি, যাঁহারা ব্রহ্মপরায়ণ, ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা যাঁহাদের সমস্ত পাপ ও পুণ্য বিধৌত হইয়াছে, তাঁহারা মোক্ষ লাভ করেন; তাঁহাদের আর পুনর্জন্ম হয় না । ১৭
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি ।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ।। ১৮
বিদ্বান্‌ ও বিনয়ী ব্রাহ্মণ, গরু, হস্তী, কুকুর ও চণ্ডালে ব্রহ্মজ্ঞানিগণ সমদর্শী হন, অর্থাৎ ব্রহ্মদর্শন করেন । ১৮
ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্থিতং মনঃ ।
নির্দোষং হি সমং ব্রহ্ম তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ ।। ১৯
যাঁহাদের মন সর্বভূতস্থ ব্রহ্মে নিশ্চল, এই জীবনেই তাঁহারা সৃষ্টি বা জন্ম জয় করেন; কারণ, ব্রহ্ম ব্রাহ্মণচণ্ডালাদিতে সর্বত্র অভিন্ন এবং তাহাদের গুণদোষাদি দ্বারা অস্পৃষ্ট । অতএব তাঁহারা ব্রহ্মেই অবস্থিত ও দেহেন্দ্রিয়াদিতে অভিমানহীন, তাঁহাদিগকে দোষ-গন্ধও স্পর্শ করে না । ১৯
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্ ।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ ।। ২০
নির্দোষ ব্রহ্মই সর্বভূতে এক আত্মরূপে বিরাজিত – এই প্রকার স্থির বুদ্ধি ও জ্ঞান দ্বারা মোহশূন্য ব্রহ্মবিৎ পুরুষ প্রিয় বস্তু পাইয়া উৎফুল্ল বা অপ্রিয় বস্তু পাইয়া উদ্বিগ্ন হন না । ২০
বাহ্যস্পর্শেষ্বসক্তাত্মা বিন্দত্যাত্মনি যৎ সুখম্ ।
স ব্রহ্মযোগযুক্তাত্মা সুখমক্ষয়মশ্নুতে ।। ২১
যিনি শব্দাদি বাহ্যবিষয়ে অনাসক্ত, তিনি প্রত্যগাত্মাতে বাহ্যবিষয়নিরপেক্ষ শাশ্বত সুখ অনুভব করেন এবং ব্রহ্মযোগযুক্ত হইয়া অক্ষয় ব্রহ্মানন্দের অধিকারী হন । ২১
যে হি সংস্পর্শজা ভোগা দুঃখযোনয় এব তে ।
আদ্যন্তবন্তঃ কৌন্তেয় ন তেষু রমতে বুধঃ ।। ২২
হে কৌন্তেয়, রূপরসাদি বিষয় হইতে উৎপন্ন সকল সুখ সর্বদা দুঃখেরই কারণ; এগুলির আদি আছে, অন্ত আছে, অতএব ক্ষণিক। ইহা ইহলোকে যেমন সত্য, পরলোকেও তেমনি সত্য। সেই জন্য জ্ঞানিগণ ইহাতে প্রীতিলাভ করেন না । ২২
শক্নোতীহৈব যঃ সোঢ়ুং প্রাক্ শরীরবিমোক্ষণাৎ ।
কামক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ ।। ২৩
এই জীবনে যিনি আমরণ কাম ও ক্রোধের বেগধারণ করিতে পারেন, তিনিই যোগী, তিনিই সুখী । ২৩
যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ ।
স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি ।। ২৪
যিনি আত্মাতেই সুখ অনভব করেন বাহ্যবিষয়ে নয়, যিনি আত্মাতেই ক্রীড়াযুক্ত বাহ্যবিষয়ে নয়, এবং যিনি অন্তর্জ্যোতি ও ব্রহ্মস্বরূপ, তিনি ইহজীবনেই ব্রহ্মানন্দ লাভ করেন । ২৪
লভন্তে ব্রহ্মনির্বাণমৃষয়ঃ ক্ষীণকল্মষাঃ ।
ছিন্নদ্বৈধা যতাত্মানঃ সর্বভূতহিতে রতাঃ ।। ২৫
যাঁহারা নিষ্কাম কর্ম দ্বারা পাপমুক্ত, শ্রবণ ও মনন দ্বারা সংশয়রহিত, নিদিধ্যাসন দ্বারা জিতেন্দ্রিয় এবং সকল জীবের কল্যাণে নিরত, সেই সম্যগ্‌দর্শি সন্ন্যাসিগণ ইহজীবনেই ব্রহ্মনির্বাণ (মোক্ষ) লাভ করেন ।  ২৫
কামক্রোধবিযুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্ ।
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্ ।। ২৬
কামক্রোধ হইতে মুক্ত, সংযত-চিত্ত, আত্মজ্ঞ সন্ন্যাসিগণের জীবিতাবস্থায় ও মৃত্যুর পরে উভয়তঃ ব্রহ্মনির্বাণ বিরাজ করে । সেই জীনন্মুক্তগণের মৃত্যুর পরে আর দেহধারণ হয় না । ২৬
 স্পর্শান্ কৃত্বা বহির্বাহ্যাংশ্চক্ষুশ্চৈবান্তরে ভ্রুবোঃ ।
প্রাণাপানৌ সমৌ কৃত্বা নাসাভ্যন্তরচারিণৌ ।। ২৭
যতেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধির্মুনির্মোক্ষপরায়ণঃ ।
বিগতেচ্ছাভয়ক্রোধো যঃ সদা মুক্ত এব সঃ ।। ২৮
মন হইতে বাহ্য বিষয় বাহির করিয়া দৃষ্টি যেন ভ্রূযুগলের মধ্যে স্থির করিয়া, নাসিকার মধ্যে বিচরণশীল প্রাণ ও অপান বায়ুর ঊর্ধ্ব ও অধোগতি সমান (রোধ) করিয়া এবং ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সংযমপূর্বক ইচ্ছা, ভয় ও ক্রোধ-শূন্য হইয়া যে মুনি সর্বদা বিরাজ করেন, তিনি জীবন্মুক্তই হন । ২৭-২৮
[উক্ত সমাহিতচিত্ত যোগিগণের দ্বারা কি বিজ্ঞেয় ? তাহার উত্তরে শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন – ]
ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্ ।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি ।। ২৯
কর্তা ও দেবতারূপে আমি যজ্ঞ ও তপস্যার ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সকলের উপকারী সুহৃদ্‌ এই প্রকারে আমাকে স্বীয় আত্মরূপে জানিয়া যোগী শান্তি (মুক্তি) লাভ করেন । ২৯
শ্রীভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে কর্ম-সন্ন্যাসযোগনামক পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত ।

২) আত্মজ্ঞানহীনের কর্মসন্ন্যাস – [শাঙ্করভাষ্য]
কর্তৃত্বাভিমানহেতু আত্মজ্ঞানহীনের কর্মসন্ন্যাস অসম্ভব; কিছু কর্মত্যাগ হইতে পারে কিন্তু তাহার পক্ষে সম্পূর্ণ কর্মত্যাগ সম্ভব নহে । অবিদ্বানের পক্ষে কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা কর্মযোগ সহজ বলিয়া শ্রেষ্ঠ । তবে বৈরাগ্য থাকিলে অবিদ্বানের কর্মসন্ন্যাস নিষিদ্ধ নহে । যথা ‘যে দিনই সথার্থ বৈরাগ্য হইবে, সে দিনই সংসারত্যাগ করিবে ।’ – [জাবাল উপঃ, ৪]
৩) নিত্যসন্ন্যাসী : তিনি কর্মে নিরত থাকিয়াও সদা নিষ্কাম ও অনাসক্ত
৫) সাংখ্য : জ্ঞানের উদয় হইলে যে সন্ন্যাস হয় তাহাই সাংখ্য বা বিদ্বৎ-সন্ন্যাস
যোগ : ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত ও ঈশ্বরে সমর্পিত বেদবিহিত কর্মের অনুষ্ঠান
৬) পরমার্থ সন্ন্যাস : পরমার্থযোগ; আত্মজ্ঞানের স্বরূপই সন্ন্যাস । এইজন্য পরব্রহ্ম শব্দ দ্বারা সন্ন্যাসই প্রতিপাদিত । বৈদিক কর্মযোগ ইহার উপায় বলিয়া যোগও সন্ন্যাস নামে উপচারিত হয় ।
১৩) নিত্য কর্ম = সন্ধ্যাবন্দনাদি অবশ্য কর্তব্য দৈনিক কর্ম
নৈমিত্তিক কর্ম = নিমিত্তবশতঃ যাহা করিতে হয়
কাম্য কর্ম = স্বর্গাদিফলপ্রদ অশ্বমেধাদি কর্ম (নিষ্কাম কর্মীর ত্যাজ্য)
নিষিদ্ধ কর্ম = ব্রাহ্মণহত্যা ইত্যাদি (সকলেরই ত্যাজ্য)
নবদ্বার : আত্মার উপলব্ধির দ্বারস্বরূপ সাতটি ছিদ্র মুখমণ্ডলে এবং মূত্র ও পুরীষ (মল)-ত্যাগের জন্য দুইটি ছিদ্র নিম্নদেহে আছে । মানষীর দেহপুর এই নবদ্বারযুক্ত ।
১৪) আত্মা কাহাকেও ‘কর’ বলিয়া নিয়োগ করেন না – সুতরাং কারয়িতা নহেন । তিনি প্রাণিগণের অভিলষিত বস্তুও নির্মাণ করেন না – অতএব তিনি কর্তাও নহেন । কিংবা তিনি যে প্রাণিগণের কৃতকর্মের ফল প্রদান করেন এবং তজ্জন্য কর্মফলদাতা হন, তাহাও নহে । স্বরূপতই আত্মা কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বাদিরহিত । নীলিমাশূন্য আকাশে যেমন নীলিমা-ভ্রম হয়, সেইরূপ আত্মাতে কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বাদিভ্রম হয় ।
১৬) অজ্ঞান অনাদি, অথচ সান্ত । অজ্ঞানের উৎপত্তি জানা যায় না, কিন্তু জ্ঞান হইলে উহা বিনষ্ট হইয়া যায় ।
সূর্যের উদয়মাত্র যেমন ঘটাদিবস্তু প্রকাশের আবরক অন্ধকার অপসারিত হয়, সেইরূপ আত্মজ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আত্মার ব্রহ্মস্বরূপতার আবরক অজ্ঞান বিদূরিত হয় এববগ আত্মাই ব্রহ্ম – এই জ্ঞান সাক্ষাৎ ব্যক্ত হয় ।
১৮) উৎকৃষ্ট ও অপকৃষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিতে এইরূপ সমদৃষ্টির জন্য দোষের আশঙ্কা ভগবান্‌ বারণ করিতেছেন ।
সূর্য যেমন গঙ্গাজলে ও সুরাতে প্রতিবিম্বিত হইলে গঙ্গাজলের গুণে বা সুরার দোষে লিপ্ত হন না, সেইরূপ ব্রহ্ম শুদ্ধ ও অশুদ্ধ বস্তুতে অবস্থিত হইলেও তাঁহাকে শুদ্ধি বা অশুদ্ধি স্পর্শ করে না ।

২১) ব্রহ্মযোগ = ব্রহ্মে যোগ (সমাধি), ব্রহ্মের সহিত আত্মার অভেদানুভব

২৩) কামবেগের চিহ্ন : শরীরে রোমাঞ্চ, হৃষ্টনেত্র ও হৃষ্টবদনাদি
ক্রোধবেগের লক্ষণ : শরীরে কম্প, প্রস্বেদ, অধরোষ্ঠের দংশন ও আরক্ত নেত্র প্রভৃতি

২৪) ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া তিনি ব্রহ্মপ্রাপ্ত হন, অর্থাৎ মায়াবলে বিস্মৃত ব্রহ্মত্বের জ্ঞান লাভ করেন ।

২৬) ঈশ্বরে সর্বভাব অর্পণপূর্বক তাঁহাতে সকল কর্ম সমর্পণ দ্বারা অনুষ্ঠিত কর্মযোগের (চিত্তশুদ্ধি, জ্ঞান-প্রাপ্তি ও সর্বকর্ম-সন্ন্যাসক্রমে) মোক্ষপ্রদত্ত এবং সম্যগ্‌দর্শননিষ্ঠ সন্ন্যাসীদের সদ্যোমুক্তি বলা হইয়াছে ।
সদ্যোমুক্তি : জ্ঞানলাভকালেই জীবিতাবস্থায় ব্রহ্মরূপে অবস্থান এবং দেহান্তে অপুনর্জন্ম ।

_________________________________________
*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : চতুর্থ অধ্যায় – জ্ঞানযোগ


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : চতুর্থ অধ্যায় – জ্ঞানযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
পূর্বাধ্যায়ে উক্ত নিষ্ঠাদ্বয়াত্মক এই অব্যয়যোগ আমি সূর্যকে বলিয়াছিলাম; সূর্য স্বীয় পুত্র মনুকে এবং মনু তৎপুত্র ইক্ষ্বাকুকে ইহা বলিয়াছিলেন । ১
হে পরন্তপ, ক্ষত্রিয়-পরম্পরাগত এই যোগ রাজর্ষিগণ বিদিত হইয়াছিলেন । ইহলোকে এই যোগ কালক্রমে বিনষ্ট হইয়াছে, অর্থাৎ ইহার সম্প্রদায় বিচ্ছিন্ন হইয়াছে । ২
তুমি আমার ভক্ত ও সখা । এইজন্য তোমাকে আজ এই পুরাতন যোগই বলিলাম; কারণ ইহা অতি গূঢ় রহস্য । ৩
অর্জুন বলিলেন
আপনার জন্ম অনেক পরে এবং সূর্যের জন্ম বহু পূর্বে হইয়াছিল । আপনি সৃষ্টির প্রারম্ভে সূর্যকে এই যোগ বলিয়াছিলেন, তাহা কিরূপে বুঝিব ? ৪
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
হে পরন্তপ অর্জুন, আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হইয়াছে। আমি সেই সকল জানি; কিন্তু তুমি তৎসমুদয় বিস্মৃত হইয়াছ । ৫
[ধর্মাধর্মাতীত নিত্য ঈশ্বরের জন্ম কিরূপে সম্ভব ?]
আমি জন্মরহিত, অলুপ্তজ্ঞানশক্তি-স্বভাব এবং ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত সর্বভূতের ঈশ্বর হইয়াও সমস্ত জগৎ যাহার বশীভূত আমার সেই ত্রিগুণাত্মিকা শক্তিকে আশ্রয় করিয়া স্বীয় মায়া দ্বারা যেন দেহধারণ করি । ৬
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম ।। ৭
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ।। ৮
হে ভারত, যখন প্রাণিগণের অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়সের কারণ বর্ণাশ্রমাদি ধর্মের অধঃপতন ও অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি স্বীয় মায়াবলে যেন দেহবান হই, যেন জাত হই । ৭
সাধুদিগের রক্ষার জন্য, দুষ্টদিগের বিনাশের জন্য এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে নরাদিরূপে অবতীর্ণ হই । ৮

হে অর্জুন, যিনি আমার এই প্রকার অলৌকিক মায়িক জন্ম ও সাধুপরিত্রাণাদি অপ্রাকৃত কর্ম তত্ত্বতঃ জানেন, তিনি আমাকেই লাভ করেন এবং দেহান্তে আর পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হন না । ৯
আসক্তিরহিত, ভয়শূন্য ও ক্রোধবর্জিত, মদ্গতচিত্ত ও আমারই শরণাগত (কেবল জ্ঞাননিষ্ঠ) বহু ব্যাক্তি জ্ঞানরূপ তপস্যা দ্বারা পরা শুদ্ধি লাভ করিয়া ব্রহ্মভাব (মোক্ষ) প্রাপ্ত হইয়াছেন । ১০
[আপনি কাহাকেও মোক্ষ দেন, কাহাকেও দেন না – এই পক্ষপাতিত্ব কি আপনার আছে? না, তাহা নহে ।]
যিনি যে প্রকারে (মোক্ষ, জ্ঞান, কাম্য বস্তু, অথবা আর্তি-নিবারণের জন্য) আমার উপাসনা করেন, আমি (সর্বফলদাতা পরমেশ্বর) তাঁহাকে সেই ফলপ্রদান দ্বারাই অনুগৃহীত করি, অর্থাৎ সকামকে তাঁহার কাম্য ফল এবং নিষ্কামকে মুক্তি প্রদান করি । হে পার্থ, বর্ণাশ্রমাদি-ধর্মনিষ্ঠ মনুষ্যগণ সকল প্রকারে আমার পথের অনুসরণ করেন । যাঁহারা যে প্রকারে ইন্দ্রাদি দেবতার উপাসনা করেন, তাঁহারা সেই সকল প্রকারে সর্বাত্মক, সর্বাবস্থ আমারই মোক্ষমার্গের অনুবর্তন করেন; কারণ আমিই ইন্দ্রাদি সর্বদেবরূপধারী । ১১
তবে শ্রৌত ও স্মার্ত কর্মের ফল কামনা করিয়া অনেকে ইহলোকে ইন্দ্রাদি দেবতার পূজা করেন, কিন্তু মুক্তির জন্য সাক্ষাৎভাবে আমার শরণাগত হন না । কারণ, মনুষ্যলোকে কাম্য কর্মের ফল শীঘ্র লাভ হয় । ১২
[তাঁহারা আমারই কর্মাত্মক মার্গের অনুবর্তন করেন; কারণ] সত্ত্বাদিগুণ ও শমাদি কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি ব্রাহ্মণাদি চারিবর্ণের সৃষ্টি করিয়াছি । আমি মায়িক ব্যবহারে চতুর্বর্ণের সৃষ্টিকর্তা হইলেও আমাকে পরমার্থদৃষ্টিতে অব্যয় অকর্তা ও অসংসারী বলিয়া জানিও । ১৩
অতএব আমার অহংকার এবং কর্মফলে আকাঙ্ক্ষা না থাকায় কোন কর্ম আমাকে বদ্ধ করিতে পারে না । এইরূপে যিনি আমাকে পরমাত্মা হইতে অভিন্ন এবং কর্তৃত্বরহিত ও কর্মফলে স্পৃহাশূন্য বলিয়া জানেন, তিনি কর্ম দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না; কর্ম তাঁহার জন্মান্তরের আরম্ভক হয় না। কর্ম যে আমার বন্ধনের কারণ হয় না তাহা বলাই বাহুল্য । ১৪
‘আমি অকর্তা, অভোক্তা ও কর্মফলে নিঃস্পৃহ’ – এই রূপ আমাকে জানিয়া জনকাদি পূর্বতন মুমুক্ষুগণও নিষ্কাম কর্ম করিয়াছিলেন । যেহেতু প্রাচীনগণ পূর্বকালে নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন, অতএব তুমিও নিষ্কাম কর্ম কর, কর্মত্যাগ করিও না । ১৫
কর্ম কি এবং অকর্ম (কর্মের অভাব) কি – এই বিষয়ে পণ্ডিতগণও ভ্রান্ত হন । অতএব যাহা জানিলে সংসাররূপ অশুভ হইতে মুক্ত হইবে, সেই কর্ম ও অকর্ম তোমাকে বলিব । ১৬
শাস্ত্রবিহিত কর্মের, নিষিদ্ধ কর্মের ও অকর্মের তত্ত্ব অবগত হওয়া আবশ্যক । কারণ শাস্ত্রবিহিত কর্ম, অকর্ম ও নিষিদ্ধ কর্মের স্বরূপ (তত্ত্ব) অত্যন্ত দুর্জ্ঞেয় । ১৭
যিনি কর্মে অকর্ম ও অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনি মনুষ্যগণের মধ্যে জ্ঞানী ও যোগযুক্ত এবং সর্ব কর্মের কর্তা । ইহাই কর্ম ও অকর্মের বোদ্ধব্য রহস্য । এই জ্ঞানে মুক্তি লাভ হয় । ১৮
যাঁহার সমস্ত কর্মপ্রচেষ্টা কাম ও (তৎকারণ) সংকল্পরহিত এবং যাঁহার শুভাশুভ কর্ম (কর্মে অকর্ম ও অকর্মে কর্মদর্শনরূপ) জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হইয়াছে, তাঁহাকে জ্ঞানিগণ প্রকৃত পণ্ডিত বলিয়া থাকেন । ১৯
[সম্যক আত্মদর্শন দ্বারা যদিও সাধনের সহিত কর্ম পরিত্যাগ হইয়াই থাকে, তথাপি লোকসংগ্রহাদি কোন নিমিত্তবশতঃ কর্মত্যাগ অসম্ভব হইলে] যিনি উক্ত জ্ঞান দ্বারা কর্মফলাসক্তি বর্জনপূর্বক সর্বদা ইন্দ্রিয়বিষয়ে আকাঙ্ক্ষাশূন্য, সদাতৃপ্ত ও নিরবলম্বন থাকেন, তিনি জনকাদির ন্যায় পূর্ববৎ কর্মে প্রবৃত্ত হইয়াও আত্মার নৈষ্কর্ম্যদর্শনহেতু কোন কর্ম করেন না । ২০
যিনি নিষ্কাম ও সকল প্রকার ভোগ্যবস্তুত্যাগী এবং যাঁহার অন্তঃকরণ ও দেহেন্দ্রিয় সংযত, তিনি জ্ঞান দ্বারা কর্তৃত্বাভিমানশূন্য হইয়া শরীরধারণের উপযোগী কর্ম মাত্র করেন; কিন্তু তাহাতে পাপপুণ্যভাগী হন না । এইরূপে জ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসীই মুক্ত হন । ২১
যিনি যদৃচ্ছালাভে পরিতুষ্ট, শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্ব দ্বারা পীড়িত হইলেও অবিষণ্ণচিত্ত, মাৎসর্যহীন (নির্বৈর) ও লাভালাভে হর্ষবিষাদরহিত, তিনি শরীরধারণের উপযোগী কর্ম করিলেও সেই কর্মে বদ্ধ হন না । ২২
আসক্তিশূন্য, ধর্মাধর্ম ও কর্তৃত্ব-ভোক্তৃত্বাদির বন্ধন হইতে বিমুক্ত ও ব্রহ্মজ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি দ্বারা যজ্ঞার্থ কর্ম অনুষ্ঠিত হইলেও তাহার সমগ্র কর্ম বিনষ্ট হয় অর্থাৎ ফলপ্রসব করে না । ২৩
কারণ, ব্রহ্মবিৎ হবনীয় দ্রব্যের অর্পণকে, ঘৃতকে, হোমাগ্নিকে, আহুতিদানের কর্তাকে এবং হোমক্রিয়াকে ব্রহ্মরূপে দর্শন করেন । তাঁহার দৃষ্টিতে ব্রহ্মরূপ কর্মে সমাহিতচিত্ত ব্যক্তির প্রাপ্তব্য ফলও ব্রহ্ম । ২৪
অন্য যোগিগণ দেবতাপূজারূপ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন । আর কেহ কেহ নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে জীবাত্মাকে নির্বিশেষ ব্রহ্মরূপে আহুতি প্রদান করেন, অর্থাৎ সোপাধিক জীবাত্মাকে নিরুপাধিক পরমাত্মারূপে দর্শন করেন । ২৫
অন্য কোন কোন যোগী কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সকলকে সংযম-অগ্নিতে আহুতি দেন অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সংযম করেন । অপর কোন কোন যোগী শব্দাদি বিষয়সমূহ ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে আহুতি দেন (অর্থাৎ শ্রোত্রাদি দ্বারা শাস্ত্রবিহিত বিষয়গ্রহণকে হোম মনে করেন) । ২৬
আত্মাতে সংযমরূপ বিবেক-বিজ্ঞান প্রদীপ্ত যে যোগাগ্নি তাহাতে অপর যোগিগণ সকল ইন্দ্রিয়কর্ম এবং প্রাণাদি দশ বায়ুর কার্য আহুতি দেন (লয় করেন) । ২৭
অন্য কেহ কেহ দ্রব্যদানরূপ যজ্ঞ করেন । কেহ কেহ তপোরূপ যজ্ঞ এবং কেহ কেহ প্রাণায়াম ও প্রত্যাহারাদি যোগরূপ যজ্ঞ করেন । অপর কোন কোন দৃঢ়ব্রত যত্নশীল যোগী বেদাভ্যাস (শাস্ত্রপাঠ) ও শাস্ত্রার্থনিশ্চয়রূপ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন । ২৮
অন্যান্য যোগী অপানবায়ুতে প্রাণবায়ু (পূরক প্রাণায়াম) এবং প্রাণবায়ুতে অপানবায়ু আহুতি দিয়া (রেচকনামক প্রাণায়াম করিয়া) প্রাণ ও অপানবায়ুর গতি রোধপূর্বক কুম্ভকরূপ প্রাণায়াম করেন । ২৯
অপর কোন কোন যোগী আহার-সংযমপূর্বক প্রাণবায়ুসমূহে অন্যান্য প্রাণবায়ু আহুতি দেন অর্থাৎ যে যে প্রাণবায়ু জয় করেন, সেই সেই প্রাণবায়ুতে অন্যান্য প্রাণবায়ু হোম করেন । এই সকল যজ্ঞের জ্ঞাতা ও কর্তা যজ্ঞ দ্বারা পাপমুক্ত হন । ৩০
যথোক্ত যজ্ঞসমূহ সম্পাদনপূর্বক অন্তে বিহিত অমৃত নামক অন্ন যাঁহারা শাস্ত্রবিধি অনুসারে ভোজন করেন, তাঁহারা সনাতন ব্রহ্ম প্রাপ্ত হন । হে কুরুশ্রেষ্ঠ, যজ্ঞহীন ব্যক্তির ইহলোকই নাই, সর্ব-লোকাতীত আত্মজ্ঞান লাভ তো দূরের কথা । ৩১
বেদমুখে এইরূপ বহুবিধ যজ্ঞ ব্যাখ্যাত হইয়াছে । সেই সকলকে কায়িক, বাচনিক ও মানসিক কর্মজাত বলিয়া জানিবে । “আত্মা নিষ্ক্রিয়; আমি সেই উদাসীন আত্মা, এই সকল ব্যাপার আমার নহে” – এইরূপ আত্মজ্ঞান হইলে শুভাশুভরূপ সংসার হইতে মুক্ত হইবে । আত্মজ্ঞ পুরূষ নৈষ্কর্ম্য-সিদ্ধ । ৩২
হে পরন্তপ, সংসার-ফলারম্ভক দ্রব্যসাধ্য যজ্ঞ অপেক্ষা মোক্ষদায়ক জ্ঞান-যজ্ঞ শ্রেষ্ঠ । কারণ হে পার্থ, অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞ এবং সমস্ত শ্রৌত ও স্মার্ত যজ্ঞোপাসনাদি ব্রহ্মজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হয় । ৩৩
যে বিধি দ্বারা সেই জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা বলিতেছি, অবগত হও । প্রণিপাত, সশ্রদ্ধ জিজ্ঞাসা ও গুরুসেবা দ্বারা প্রসন্ন হইয়া তত্ত্বদর্শী জ্ঞানী তোমাকে সেই ব্রহ্মজ্ঞান উপদেশ করিবেন । ৩৪
হে পাণ্ডব, আমার দ্বারা উপদিষ্ট জ্ঞান লাভ করিলে তুমি আর এইরূপ মোহগ্রস্ত হইবে না; কারণ একবার ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হইলে পুনরায় অজ্ঞান আসে না । সেই জ্ঞান দ্বারা তুমি ব্রহ্মা হইতে স্থাবর পর্যন্ত ভূতসমূহকে স্বীয় আত্মাতে (প্রত্যগাত্মাতে) এবং আমাতে (পরমেশ্বরে, পরব্রহ্মে) দেখিতে পাইবে । ৩৫
যদি তুমি সকল পাপী হইতে অধিক পাপিষ্ঠ হও, তথাপি এই জ্ঞানের পোত দ্বারা সমূদয় ধর্মাধর্মরূপ সংসার-সাগর উত্তীর্ণ হইবে, ব্রহ্মজ্ঞানের এইরূপ মাহাত্ম্য । ৩৬
হে অর্জুন, যেমন প্রজ্বলিত অগ্নি কাষ্ঠরাশিকে ভস্মীভূত করে, সেইরূপ ব্রহ্মজ্ঞানাগ্নি সমস্ত শুভাশুভ কর্ম ভস্মসাৎ করে । ব্রহ্মজ্ঞানাগ্নির দ্বারা বিদগ্ধ হইলে কোন কর্মই ফল প্রসব করিতে পারে না । ৩৭
ব্রহ্মজ্ঞান অজ্ঞান-নাশক ও অত্যন্ত শুদ্ধিকর । ইহার তুল্য পবিত্র বস্তু ইহলোকে বা পরলোকে আর কিছু নাই । দীর্ঘকাল প্রযত্ন দ্বারা কর্মযোগে চিত্ত শুদ্ধ হইলে মূমুক্ষু স্বীয় আত্মাতে সেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন । ৩৮

গুরুবাক্যে ও বেদান্তোপদেশে বিশ্বাসী, জ্ঞাননিষ্ঠ ও জিতেন্দ্রিয় মূমুক্ষু অবশ্যই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন । তিনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিয়া জন্মান্তরগ্রহণ বা লোকান্তরগমন না করিয়াই শাশ্বতী শান্তি বা মোক্ষ প্রাপ্ত হন । ৩৯
অজ্ঞ, শাস্ত্রে শ্রদ্ধাহীন, (জ্ঞান ও কর্মের অনুষ্ঠানবিষয়ে) সন্দিগ্ধচিত্ত ব্যক্তি পরমার্থের অযোগ্য হয় । সন্দিগ্ধচিত্ত ব্যক্তির ইহলোকও নাই, পরলোকও নাই এবং ঐহিক সুখও নাই । ৪০
স্বীয় আত্মাকে ব্রহ্মরূপে দর্শন দ্বারা যাঁহার সংশয় ছিন্ন এবং ধর্মাধর্মত্যাগ হইয়াছে, সেই আত্মবান্‌ অপ্রমত্ত ব্যক্তিকে দৃষ্ট কর্মরাশি আবদ্ধ করিতে পারে না, অর্থাৎ তাঁহার কর্ম নিষ্কাম বলিয়া অনিষ্ট, ইষ্ট বা মিশ্র কোন প্রকার ফল উৎপন্ন করেনা । ৪১
[নিষ্কাম কর্মযোগ দ্বারা ক্রমে যোগী সংশয়শূন্য ও মুক্ত হন । এই যোগ জ্ঞানসাধন ও কর্মানুষ্ঠানের ফলবিষয়ে সংশয় বিনাশ করে ।]
অতএব হে ভারত, অজ্ঞানজাত বুদ্ধিস্থিত, আত্মবিষয়ক এই সংশয়কে জ্ঞানরূপ অসি দ্বারা ছেদন করিয়া ব্রহ্মদর্শনের শ্রেষ্ঠ মার্গ নিষ্কাম কর্মযোগ অবলম্বন কর এবং যুদ্ধার্থ উত্থিত হও । ৪২
ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে জ্ঞানযোগনামক চতুর্থ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________
১) অব্যয় : কারণ এই যোগ দ্বারা প্রাপ্তব্য মোক্ষ অব্যয়
সপ্তম মনু শ্রাদ্ধদেব – [শ্রীধর স্বামী]

৫) তুমি তৎসমূদয় বিস্মৃত হইয়াছ : কারণ ধর্মাধর্মাদি দ্বারা তোমার জ্ঞানশক্তি সমাবৃত এবং মায়াধীন; কিন্তু আমি নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্তস্বভাব ও মায়াধীশ বলিয়া আমার জ্ঞানশক্তি সর্বদা অনাবৃত ।

৬) ঈশ্বরের জন্ম বাস্তব নহে, মায়িক । অবতারের আত্মজ্ঞান দিব্য জ্ঞান আজন্ম অলুপ্ত থাকে ।

৯) অবতার মায়ামনুষ্য

১২) মনুষ্যলোকেই বর্ণবিহিত ও আশ্রমবিহিত কর্মে অধিকার আছে, অন্য লোকে নহে ।

১৩) অকর্তা : ঈশ্বরত্ব এবং ঈশ্বরের কর্মও পরমার্থতঃ মায়িক ।

১৭) জন্মমৃত্যুরূপ ও কর্তৃত্বভোক্তৃত্বাদিরূপ সংসার বা সংসৃতি

১৮) তিনি প্রবৃত্তির কর্তা নহেন এবং নিবৃত্তিরও কর্তা নহেন – ইহা যিনি জানেন তিনিই বুদ্ধিমান । আমি কর্ম করি, এইরূপ জ্ঞান ভ্রান্তি । আত্মাতে শরীরেন্দ্রিয়-ব্যাপারে উপরম আরোপ করিয়া আমি (আত্মা) নিষ্কর্মা, সুখী – এই জ্ঞানও মিথ্যা । বর্তমান শ্লোকে এই উভয় প্রকার ভ্রান্তি দূর করা হইয়াছে ।
মৃগতৃষ্ণায় জলের ন্যায় ও শুক্তিকায় রজতের ন্যায় নিষ্ক্রিয় আত্মাতে কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্ব দর্শন ভ্রান্ত জীবের স্বভাব । নৌকারূঢ় ব্যাক্তি নৌকা চলিতে থাকিলে তটস্থ গতিহীন বৃক্ষসমূহে প্রতিকূল গতি এবং দুরবর্তী গতিশীল বস্তুকে গতিহীন দেখেন । এইরূপ বিপরীত দর্শন মায়িক সংসারের ধর্ম । – [শঙ্করাচার্য]
২০) নিরবলম্বন : ঐহিক ও পারত্রিক অভ্যুদয়বিষয়ে সাধনশূন্য ও দৃষ্টাদৃষ্ট ফলের উপায়রহিত । ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কোন অবলম্বন তাঁহার নাই ।
আত্মজ্ঞ অকর্তৃত্বে নিশ্চলভাবে সর্বদা আরূঢ় থাকেন । কিন্তু লোকসংগ্রহাদিরূপ দিব্য দায় না থাকিলে পূর্বোক্ত আত্মবিষয়ক জ্ঞান উৎপন্ন হইলেই সাধনের সহিত কর্মত্যাগ করিয়া জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি মুক্ত হন ।
২২) লাভালাভ : শরীরযাত্রানির্বাহের উপযোগী যদৃচ্ছালাভের প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি ।
ব্রহ্মবিৎ শুধু শরীরস্থিতির জন্য যে কর্ম করেন, তাহাতে বদ্ধ হন না; কারণ তাহার সর্ব কর্ম জ্ঞানাগ্নিদগ্ধ ।
২৩) অগ্র = ফল, অতএব সমগ্র = ফলের সহিত ।
স্মৃতিশাস্ত্রমতে ভোগব্যতীত কর্মক্ষয় হয় না । ইহা ব্রহ্মবিদের পক্ষে প্রযোজ্য নহে । অবশ্য ব্রহ্মজ্ঞকেও প্রারব্ধ ভোগ করিতে হয় ।
২৪) ব্রহ্মজ্ঞানী লোকসংগ্রহার্থ এইরূপে কর্ম করিলেও তাঁহার কর্ম অকর্মই; কারণ ঐ কর্মের ফলোৎপাদিনী শক্তি ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা বিনষ্ট হয় ।
২৫) ইহাই জ্ঞানযজ্ঞ
২৯) কুম্ভক : মুখ ও নাসিকা দ্বারা বায়ুর বাহিরে গমনই প্রাণগতি ও ভিতরে আসার নাম অপানগতি । এই উভয় গতিরোধই কুম্ভক ।
৩৬) মূমুক্ষুর পক্ষে ধর্ম বা পুণ্যও বন্ধন বলিয়া বিবেচিত হয় ।
৩৭) অতীত অনেক জন্মের সঞ্চিত, ইহজন্মে জ্ঞানোৎপত্তির পূর্বে কৃত এবং জ্ঞান সহ ভাবী সমস্ত কর্ম জ্ঞান দ্বারা বিনষ্ট হয় । কিন্তু প্রারব্ধ কর্ম নষ্ট না হইয়া ভোগ দ্বারা ক্ষয় প্রাপ্ত হয় । – [ব্রহ্মসূত্র, ৪|১|১৩-১৫, ১৯] ।
প্রারব্ধ কর্ম = যে কর্মের ফল এই শরীরে ভোগ করিতে হইবে অর্থাৎ যে কর্ম ফল দিতে আরম্ভ করিয়াছে
৪১) ছিন্ন : কারণরূপী ব্রহ্ম এবং জগদ্‌রূপী ব্রহ্ম যাঁহার দর্শন হয়, তাঁহার হৃদয়গ্রন্থি ভেদ হইয়া যায়, সকল সংশয় ছিন্ন হয় এবং কর্মরাশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ।
৪২) সাধারণতঃ সংশয়ী পুরুষের সংশয়বিষয়ক বস্তু স্বীয় আত্মা হইতে পৃথক্‌ । যেমন, অন্ধকারে দৃষ্ট শুষ্ক বৃক্ষকে – বৃক্ষ কি পুরুষ – এইরূপ সংশয় হয় । এই প্রকার সংশয় অন্যের জ্ঞান দ্বারা নষ্ট হয়, এই স্থানে সংশয় আত্মবিষয়ক এবং সংশয়বস্তুও স্বীয় আত্মা । সুতরাং শ্বাশ্রয় (আত্মাশ্রয়) সংশয়ের সমুচ্ছেদ স্বাশ্রয়জ্ঞান দ্বারাই সম্ভব, অন্য জ্ঞান দ্বারা নহে । সেই জন্য আত্মবিষয়ক সংশয় আত্মনিশ্চয়রূপ খড়্গ দ্বারা সমুচ্ছেদ্য । এই আত্মনিশ্চয়-লাভ সুকঠিন । – [আনন্দগিরি]
_________________________________________
*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

[২য় অধ্যায়ে ভগবান্‌ নিবৃত্তিবিষয়ক জ্ঞাননিষ্ঠা ও প্রবৃত্তিবিষয়ক কর্মনিষ্ঠা – এই দুই প্রকার নিষ্ঠা নির্দেশ করিয়াছেন । জ্ঞানের দ্বারাই জ্ঞাননিষ্ঠদিগের পরমপুরুষার্থ লাভ হয় – এই উপদেশ দিয়াছেন । আবার কর্মও কর্তব্য – এই উপদেশও দিয়াছেন; কিন্তু কর্ম দ্বারা যে শ্রেয়প্রাপ্তি হয়, তাহা বলেন নাই । ইহাতে কর্ম হইতে জ্ঞান শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া – ]

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে জনার্দন, যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিংসাত্মক কর্মে (যুদ্ধে) কেন নিযুক্ত করিতেছেন ? ১

আপনি সন্দেহজনক-রূপে প্রতীয়মান বাক্য দ্বারা আমার মন যেন ভ্রান্ত করিতেছেন । এই উভয়ের একটি আমাকে নিশ্চয় করিয়া বলুন, যাহা দ্বারা আমি শ্রেয়োলাভ করিতে পারি । ২
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
হে অনঘ (নিষ্পাপ) অর্জুন, ইহলোকে জ্ঞানাধিকারিগণের জন্য জ্ঞানযোগ এবং নিষ্কাম কর্মিগণের জন্য কর্মযোগ – এই দুই প্রকার নিষ্ঠার বিষয় সৃষ্টির প্রারম্ভে আমি বেদমুখে বলিয়াছি । ৩

কর্মানুষ্ঠান না করিয়া কেহ নৈষ্কর্ম্য (নিষ্ক্রিয় আত্মা-রূপে অবস্থিতি, মোক্ষ) লাভ করিতে পারে না । কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হইলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি হয় না । কেবলমাত্র জ্ঞানশূন্য কর্মত্যাগ দ্বারা উক্ত অবস্থালাভ অসম্ভব । ৪
কর্ম না করিয়া কেহই ক্ষণকালও থাকিতে পারে না । অ-স্বতন্ত্র হইয়া সকলেই মায়াজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের প্রভাবে কর্ম করিতে বাধ্য হয় । ৫
যে মূঢ় ব্যক্তি হস্ত, পদ ও বাক্যাদি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় সংযত করিয়া মনে মনে শব্দরসাদি ইন্দ্রিয়বিষয় স্মরণপূর্বক অবস্থান করে, তাহাকে মিথ্যাচারী বলে । ৬
কিন্তু যিনি বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা চক্ষুকর্ণাদি পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় সংযত করিয়া অনাসক্তভাবে কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা কর্মানুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ । ৭
তুমি শাস্ত্রোপদিষ্ট নিত্যকর্ম কর । কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়ঃ। কর্মহীন হইলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হইবে না । ৮
ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্ম ব্যতীত অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ হয় । অতএব, তুমি ভগবানের উদ্দেশে অনাসক্ত হইয়া বর্ণাশ্রমোচিত সর্ব কর্ম কর । ৯
সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মাযজ্ঞের সহিত ব্রাহ্মণাদি ত্রিবর্ণ সৃষ্টি করিয়া বলিয়াছিলেন – এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা সদা সমৃদ্ধ হও, এই যজ্ঞ দ্বারা তোমাদের অভীষ্টপ্রদানে কামধেনুর তুল্য হউক । ১০
এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা ইন্দ্রাদি দেবতাগণকে সংবর্ধনা কর এবং দেবতাগণও তোমাদিগকে বৃষ্ট্যাদি দ্বারা শস্যাদি উৎপাদনপূর্বক অনুগৃহীত করুন । এইরূপে পরস্পরের ভাবনা দ্বারা তোমরা পরম মঙ্গল লাভ করিবে । ১১
দেবতাগণ যজ্ঞ দ্বারা আরাধিত হইয়া তোমাদিগকে বাঞ্ছিত ভোগ্যবস্তু প্রদান করিবেন । সুতরাং এই দেবতাপ্রদত্ত বস্তু দেবতাগকে নিবেদন না করিয়া যিনি ভোগ করেন, তিনি নিশ্চয়ই চোর । ১২
যে সদাচারগণ যজ্ঞাবশেষ (নিবেদিত অন্ন) ভোজন করেন, তাঁহারা সকল পাপ হইতে মুক্ত হন । যে পাপাচারগণ কেবল নিজের জন্য অন্নপাক করে, তাঁহারা পাপান্ন ভোজন করে । ১৩
অন্ন হইতে প্রাণীদিগের শরীর উৎপন্ন হয়, মেঘ হইতে অন্নের উৎপত্তি হয়, যজ্ঞধূম হইতে মেঘ সৃষ্ট হয় এবং যজ্ঞ (অপূর্ব, অদৃষ্ট বা কর্মফল) বেদবিধি হইতে উৎপন্ন হয় । ১৪
যজ্ঞাদি কর্ম বেদ হইতে উৎপন্ন জানিবে । বেদ অক্ষর পরমাত্মা হইতে সমুদ্ভূত । অতএব সর্বার্থ-প্রকাশক বেদ সর্বদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন । ১৫
হে পার্থ, যে ব্যক্তি এই প্রকারে ঈশ্বরকর্তৃক প্রবর্তিত কর্মচক্রের অনুগামী না হয়, সেই ইন্দ্রিয়াসক্ত পাপী ব্যক্তি বৃথা জীবনধারণ করে । ১৬
কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মাতেই প্রীত, আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সন্তুষ্ট, তাঁহার কোন কর্তব্য নাই । ১৭
আত্মজ্ঞানীর ইহজগতে কর্মানুষ্ঠানের কোনও প্রয়োজন নাই । কর্ম না করিলেও তাঁহার কোন প্রত্যবায় হয় না; এবং ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত কোন প্রাণীতে তাঁহার কোন প্রয়োজন-সম্বন্ধ নাই । ১৮
অতএব তুমি অনাসক্ত হইয়া সর্বদা কর্তব্য (নিত্য) কর্মের অনুষ্ঠান কর । কামনাশূন্য হইয়া কর্ম করিলে মানুষ নিশ্চয়ই মুক্তিলাভ করে । ১৯
জনক, অশ্বপতি প্রভৃতি রাজর্ষি নিষ্কাম কর্ম করিয়াই মোক্ষ লাভ করিয়াছিলেন । সুতরাং লোকসংগ্রহের নিমিত্তও তোমার নিষ্কাম কর্ম করা উচিত । ২০
কোন সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তি যাহা যাহা আচরণ করেন, সেই সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকে তাহাই অনুসরণ করে । তিনি যে লৌকিক বা বৈদিক কর্ম প্রামাণিক বলিয়া অনুষ্ঠান করেন, অন্য লোকে তাহাই অনুসরণ করে । ২১
হে পার্থ, স্বর্গমর্ত্যাদি তিন লোকে আমার কোন কর্তব্য কর্ম নাই এবং আমার অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য বস্তু নাই । তথাপি আমি লোক-কল্যাণের নিমিত্ত সর্বদা কর্মে ব্যাপৃত আছি; কর্মত্যাগ করি নাই । ২২
হে পার্থ, যদি আমি অনলস হইয়া শুভ কর্মে প্রবৃত্ত না হই, তবে মানবগণ সর্বপ্রকারে আমার অবলম্বিত পথেরই অনুবর্তী হইবে – অর্থাৎ অলস হইয়া কর্মত্যাগ করিবে । ২৩
उत्सीदेयुरिमे लोका न कुर्यां कर्म चेदहम् ।
संकरस्य च कर्ता स्यामुपहन्यामिमाः प्रजाः ॥3.24॥

যদি আমি কর্ম না করি, লোকস্থিতিকর কর্মের অভাবে এই সকল লোক উৎসন্ন হইবে । আমি বর্ণসঙ্করাদি* সামাজিক বিশৃঙ্খলার হেতু এবং সেই জন্য প্রজাগণের বিনাশের কারণ হইব । ২৪
হে ভারত, অজ্ঞানীগণ আসক্ত হইয়া যেরূপ কর্ম করেন, জ্ঞানীগণ অনাসক্ত হইয়া লোকশিক্ষার জন্য সেইরূপ কর্ম করিবেন । ২৫
জ্ঞানীগণ কর্মাসক্ত জ্ঞানহীনগণের বুদ্ধিভেদ জন্মাইবেন না । তাঁহারা অবহিতচিত্তে সকল কর্ম অনুষ্ঠান করিয়া জ্ঞানহীনদিগকে কর্মে প্রবৃত্ত করিবেন । ২৬
প্রকৃতির গুণত্রয় শরীরেন্দ্রিয়াদিসংঘাতে পরিণত হইয়া লৌকিক ও বৈদিক সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে । অহংকার দ্বারা যাঁহার চিত্ত বিমূঢ় হইয়াছে, তিনি ‘আমি কর্তা’ এইরূপ মনে করেন । ২৭
হে মহাবাহো, সত্তগুণের পরিণাম চক্ষু ও কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সকল, তমগুণের পরিণাম রূপ ও রসাদি বিষয়-সকলে প্রবৃত্ত আছে । কিন্তু আত্মা নিঃসঙ্গ – ইহা জানিয়া গুণবিভাগ ও কর্মবিভাগের যথার্থ তত্ত্বজ্ঞ কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করেন । ২৮
প্রকৃতির গুণ দ্বারা ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ দেহেন্দ্রিয়সংঘাতের কর্মে আসক্ত হন অর্থাৎ ফলের জন্য আমরা কর্ম করি – এইরূপ অভিমান করেন । সর্বজ্ঞ আত্মবিৎ সেই অজ্ঞ অনাত্মবিৎ মন্দবুদ্ধি ব্যক্তিগণকে বিচালিত করিবেন না । ২৯
পরমেশ্বরের জন্য ভৃত্যবৎ কর্ম করিতেছি – এই বুদ্ধি দ্বারা আমাতে সমস্ত কর্ম সমর্পণ করিয়া ফলাভিসন্ধিরহিত, মমত্বহীন ও শোকশূন্য হইয়া তুমি যুদ্ধ কর । ৩০
যাঁহারা নিষ্কাম কর্মবিষয়ে শ্রদ্ধাবান ও অসূয়াশূন্য হইয়া আমার এই মত সর্বদা অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারাও ধর্মাধর্মাদি কর্মের কর্তৃত্ববুদ্ধিরূপ বন্ধন হইতে মুক্ত হন । ৩১
কিন্তু যে অশ্রদ্ধাবান ব্যক্তিগণ আমার এই বাক্যের নিন্দা করে এবং উহা পালন করে না, সেই বিবেকহীন ব্যক্তিগণকে সর্বজ্ঞান-মূঢ় (কর্ম-, সগুণ- ও নির্গুণজ্ঞানে অযোগ্য) ও পরমার্থভ্রষ্ট বলিয়া জানিও । ৩২
জ্ঞানীও স্বীয় প্রকৃতির অনুরূপ কার্য করেন, অজ্ঞের কি কথা ? প্রাণিগণ স্ব স্ব প্রকৃতিকে অনুসরণ করে; সুতরাং আমার বা অন্যের শাসন বা নিষেধে কি ফল হইবে ? ৩৩
সকল ইন্দ্রিয়েরই অনুকূল ও প্রতিকূল বিষয়ভেদে যথাক্রমে আসক্তি ও বিদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী । কিছুতেই উহাদের বশীভূত হইবে না । কারণ, এই দুইটি জীবের শ্রেয়োমার্গের প্রতিকূল । ৩৪
স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হইলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট । বর্ণাশ্রমবিহিত স্বধর্মসাধনে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের বর্ণাশ্রমোচিত ধর্মের অনুষ্ঠান অধোগতির কারণ বলিয়া বিপজ্জনক । ৩৫
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে কৃষ্ণ, মানুষ কাহার দ্বারা চালিত হইয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হইয়াই পাপানুচরণে প্রবৃত্ত হয় ? ৩৬
শ্রীভগবান কহিলেন
ইহা রজোগুণজাত, দুষ্পূরণীয় ও অত্যূগ্র কাম এবং ইহাই ক্রোধ । সংসারে ইহাকে মহাশত্রু বলিয়া জানিবে । ৩৭
যেরূপ ধুম দ্বারা অগ্নি, ময়লা দ্বারা দর্পণ এবং জরায়ু দ্বারা গর্ভ আচ্ছন্ন থাকে, সেইরূপ কামনা দ্বারা এই বিবেকবুদ্ধি আবৃত থাকে । ৩৮
হে কৌন্তেয়, এই কাম জ্ঞানীর চিরশত্রু । ইহা অনলের (ন অলং – নাই পর্যাপ্তি) ন্যায় দুষ্পূরণীয় । এই তৃষ্ণারূপ কাম দ্বারা বিবেকবুদ্ধি আবৃত থাকে । ৩৯
পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, সংকল্পবিকল্পাত্মক মন এবং নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি কামের আশ্রয় বলিয়া কথিত হয় । ইহাদিগের দ্বারা বিবেকজ্ঞান আবৃত করিয়া কাম দেহাভিমানী জীবকে ভ্রান্ত করে । ৪০
হে ভরতবংশশ্রেষ্ঠ, তুমি প্রথমে ইন্দ্রিয়দিগকে বশীভূত করিয়া জ্ঞান- ও বিজ্ঞান-নাশক পাপরূপ এই কামকে পরিহার কর । ৪১
স্থূল দেহ হইতে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ । ইন্দ্রিয় হইতে মন এবং মন হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ । যিনি দেহাদিবুদ্ধ্যন্ত সকলের অভ্যন্তরে অবস্থিত, তিনিই বুদ্ধির দ্রষ্টা শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত আত্মা । ৪২
হে অর্জুন, শুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা মনকে সমাহিত করিয়া বুদ্ধির দ্রষ্টা পরমাত্মাকে এইরূপে জানিয়াই অজ্ঞানমূলক দুর্জয় শত্রু কামকে জ্ঞান দ্বারা মূলোচ্ছেদপূর্বক বিনাশ কর । ৪৩
ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতে ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে কর্মযোগ নামক তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________
২) যজ্ঞাদি কাম্য কর্ম ও নিত্য কর্মসমূহ চিত্তশুদ্ধি দ্বারা আত্মজ্ঞান বা মোক্ষের সাধক হয় । কর্মনিষ্ঠা জ্ঞাননিষ্ঠার হেতু বলিয়া পরতন্ত্রভাবে মোক্ষের কারণ হয়, স্বতন্ত্রভাবে নহে ।
৮) বৈদিক কর্ম চতুর্বিধ – নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য ও নিষিদ্ধ
৯) যজ্ঞই বিষ্ণু, ঈশ্বর, কারণ বিষ্ণু বেদাধিপতি বা যজ্ঞাধিপতি
১২) অনিবেদিত অন্নব্যঞ্জনাদি অপবিত্র
১৩) পঞ্চযজ্ঞ = ঋষিযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ ও দেবযজ্ঞ
কণ্ডনী (উদুখল), উদকুন্তী, পেষণী, চুল্লী ও মার্জনী দ্বারা যে পঞ্চবিধ পাপ হয়, তাহা দূর করিবার জন্য এই পঞ্চ যজ্ঞের অনুষ্ঠান বিহিত । – [আনন্দগিরি]
২০) স্বামীজী বলিতেন – “কর্মযোগ অন্যনিরপেক্ষ মুক্তিমার্গ” । নিষ্কামকর্ম দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইলে মোক্ষ বা জ্ঞান লাভ হয় ।
লোকসংগ্রহ = মানুষকে অসৎ পথ হইতে নিবৃত্ত করা এবং সৎপথে বা স্বধর্মে প্রবৃত্ত করাই লোকসংগ্রহ । এই জন্য অবতার বা অবতারকল্প দেবমানবগণ যুগে যুগে ইহলোকে অবতীর্ণ হন ।
২৪) মূল শ্লোকে “বর্ণের” উল্লেখ নেই । [uploader’s comment]
২৭) লৌকিক কর্ম = অনিষিদ্ধ ও অবিহিত কর্ম
বৈদিক কর্ম = নিষিদ্ধ ও বিহিত কর্ম
অহংকার = শরীরেন্দ্রিয়াদিতে ‘আমি’ ও ‘আমার’ বোধ । শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, ‘আমি’ ও ‘আমার’ ভাবনাই অজ্ঞান ।
২৮) আমি আত্মা; ত্রিগুণের পরিণাম কার্যকারণ সংঘাত দেহেন্দ্রিয়াদি আমি নহি – ইহাই গুণ হইতে আত্মার বিভাগ । কর্ম আমার (আত্মার) নহে, দেহেন্দ্রিয়াদির – ইহাই কর্ম হইতে আত্মার বিভাগ । তত্তজ্ঞ গুণ ও কর্ম হইতে বিভক্ত (পৃথক) যে আত্মা তাহার সাক্ষাৎকার করেন ।
৩১) গুণে (ঈশ্বরে) দোষাবিষ্কার : আমাদিগকে ভগবান দুঃখাত্মক কর্মে প্রবৃত্ত করিয়াছেন, এইজন্য তিনি করুণাহীন ।
৩২) মূঢ় = কর্মজ্ঞানে, সগুণজ্ঞানে ও নির্গুণজ্ঞানে অযোগ্য
৩৩) প্রকৃতি = বর্তমান জন্মের আদিতে অভিব্যক্ত পূর্বজন্মকৃত ধর্মাধর্মাদির সংস্কারই প্রকৃতি । প্রাণিবর্গ প্রকৃতির বশবর্তী ।
৩৪)  রাগদ্বেষবশতঃ শাস্ত্রার্থ বিপরীতভাবে গৃহীত এবং পরধর্ম স্বধর্মরূপে প্রতিভাত হয় । কিন্তু পুরুষকার দ্বারা এদের সংযত করিলে মানুষের শাস্ত্রদৃষ্টি জন্মে এবং প্রকৃতির অধীন হয় না ।
৩৭) কাম কোন কারণবশতঃ প্রতিহত হইলেই ক্রোধরূপে পরিণত হয় । রজোগুণের অতীত ও সত্ত্বগুণে আরূঢ় না হইলে কামজয় বা ক্রোধজয় অসম্ভব ।
৩৯) জ্ঞানহীন ব্যক্তির নিকট কাম তৃষ্ণাকালে মিত্র ও তৃষ্ণাজনিত দুঃখকালে শত্রু । কাম্যবস্তুসমূহের উপভোগ দ্বারা কামনা কখনও নিবৃত্ত হয় না । ঘৃত প্রদান করিলে যেমন অগ্নি বর্ধিত হয়, সেইরূপ উপভোগের দ্বারা বাসনার বৃদ্ধি হয়; কেবল ত্যাগ দ্বারাই কামনার নিবৃত্তি হয় ।
৪১) জ্ঞান = শাস্ত্র ও গুরুর উপদেশজাত, বুদ্ধিগত
বিজ্ঞান = নিদিধ্যাসনজাত বা সাধনলব্ধ, স্বানুভূতজ্ঞান
৪২) ইন্দ্রিয় বাহ্য দেহ হইতে সূক্ষ, প্রকাশক, ব্যাপক ও অন্তঃস্থ বলিয়া শরীর হইতে শ্রেষ্ঠ । ইন্দ্রিয়াদির প্রবর্তকরূপে মন শ্রেষ্ঠ । বুদ্ধি নিশ্চয়াত্মিকা বলিয়া সঙ্কল্পাত্মক মন হইতে শ্রেষ্ঠ । পরমাত্মা বুদ্ধি হইতে শ্রেষ্ঠ ।
৪৩) ইন্দ্রিয়সংযমপূর্বক আত্মজ্ঞানলাভ দ্বারাই সম্পূর্ণ কামজয় সম্ভব হয়; অন্য উপায়ে অসম্ভব । – [আনন্দগিরি]
কামের আশ্রয় দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে আত্মা পৃথক – এই জ্ঞান যত দৃঢ় হইবে, কামের প্রভাব ততই কমিবে । দেহবুদ্ধিই কামের মূল – দেহবুদ্ধি যত ক্ষীণ হয়, কাম তত নিস্তেজ হয় । কাম ও ক্রোধ রজোগুণজাত । সুতরাং রজোগুণাতীত ও সত্ত্বগুণে সমারূঢ় হইলে কামজয় হয় ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।