শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার ভূমিকা (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা-ভূমিকা

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

ভূমিকা-সূচী

1) প্রস্তাবনা
2) গীতার মহিমা
3) গীতার প্রাচীনত্ব

3.1) গীতা ও বৌদ্ধধর্ম
3.2) গীতা ও মহাভারত

3.2.1) কালনির্ণয়ে জ্যোতিষশাস্ত্র

3.3) গীতা ও পতঞ্জলির যোগসূত্র
3.4) গীতা ও ব্রহ্মসূত্র
3.5) গীতা ও উপনিষদ্‌
3.6) গীতা ও শতপথ-ব্রাহ্মণ

4) গীতার ভাষা
5) গীতাসাহিত্য

6) গীতার ঐতিহাসিক সমালোচনা

6.1) গীতা মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত ?
6.2) গীতা মহাভারতের প্রকৃত অংশ

7) গীতার শ্লোকসংখ্যা

7.1) ব্যাসদেবের মত
7.2) শ্রীচৈতন্যদেবের মত
7.3) প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথি
7.4) কাশ্মীরী গীতা
7.5) শঙ্করাচার্যের মত
7.6) শুদ্ধ ধর্মমণ্ডল গীতা
7.7) আলবেরুনির মত
7.8) ফারসী ও আরবী অনুবাদ

8) গীতার বিবিধ ভারতীয় ব্যাখ্যা

8.1) অদ্বৈতবাদ
8.2) বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ
8.3) দ্বৈতবাদ
8.4) দ্বৈতাদ্বৈতবাদ
8.5) অন্যান্য ব্যাখ্যা
8.6) ত্যাগই গীতার বাণী

9) গীতার বৈদেশিক ব্যাখ্যা
10) গীতার প্রচার

10.1) ইংরেজী অনুবাদ
10.2) অন্যান্য বিদেশী ভাষায় অনুবাদ
10.3) বাংলায় অনুবাদ
10.4) গীতার অন্যান্য প্রচার

11) গীতা ও উপনিষদাবলী

11.1) উপনিষদ্‌ এবং গীতার শ্লোকে সাদৃশ্য
11.2) গীতা এবং ব্রহ্মতত্ত্ব
11.3) যুদ্ধক্ষেত্রে গীতা কিরূপে উপদিষ্ট হইল ?

12) গীতা ও ভাগবত
13) গীতার উদারতা
14) গীতায় আত্মার অমরত্ব
15) গীতায় অবতারবাদ
16) গীতোক্ত কর্মযোগ
17) বৌদ্ধধর্ম ও গীতা

17.1) যোগক্ষেম শব্দের ব্যবহার

18) গীতায় যোগচতুষ্টয়ের সমন্বয়

18.1) নিষ্কাম কর্মযোগ দ্বারা মুক্তি
18.2) জ্ঞানযোগ দ্বারা মুক্তি
18.3) ভক্তিযোগ দ্বারা মুক্তি
18.4) রাজযোগ দ্বারা মুক্তি

19) গীতাকবচ
20) গীতামাহাত্ম্য


1) প্রস্তাবনা

গীতা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ । গীতা যে শুধু হিন্দুধর্মের সকল সম্প্রদায় কর্তৃক সমাদৃত তাহা নহে, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অসংখ্য নরনারী শ্রদ্ধাভরে ইহা পাঠ করেন । জার্মান মনীষী উইলিয়াম ভন হামবোল্‌ট বলিয়াছেন, “গীতার মতো সুললিত, সত্য এবং সুগভীর তত্ত্বপূর্ণ পদ্যগ্রন্থ সম্ভবতঃ পৃথিবীর আর কোন ভাষায় নাই ।” পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছত্রিশটি ভাষায় আজ পর্যন্ত ইহার পঁচিশ শতাধিক সংস্করণ হইয়াছে । জার্মান, ফরাসী, ইংরেজী প্রভৃতি ইওরোপের প্রধান ভাষাসমূহে গীতার অনুবাদ বিদ্যমান । ১৭৮৫ খ্রীষ্টাব্দে গীতার প্রথম ইংরেজী অনুবাদ লণ্ডনে মুদ্রিত হয় । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রুশ ভাষায় গীতার অনুবাদ হইয়াছিল । প্রসিদ্ধ ইংরেজ মনীষী কার্লাইল বিখ্যাত মার্কিন মনীষী এমার্সনের সহিত সাক্ষাৎকালে তাঁহাকে একখানি গীতা উপহার দিয়াছিলেন । গীতার প্রভাব এমার্সনের সারগর্ভ রচনাবলীতে সুস্পষ্ট দেখা যায় । তিলক বলেন, “গীতার মতো অপূর্ব গ্রন্থ সংস্কৃত সাহিত্যে কেন, জগতের সাহিত্যে দুর্লভ ।”

2) গীতার মহিমা

স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, “উপনিষদ্‌ হইতে আধ্যাত্মিক তত্ত্বের কুসুমরাজি চয়ন করিয়া গীতারূপ এই সুদৃশ্য মাল্য গ্রথিত হইয়াছে ।”

মহাত্মা গান্ধী বলেন, “গীতা মানবের পারমার্থিক জননী । আমার গর্ভধারিণীর স্বর্গগমনের পর গীতা তাঁহার স্থান অধিকার করিয়াছে ।”

সমগ্র মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠ সূরিতাঁহার গীতাব্যাখ্যার প্রারম্ভে লিখিয়াছেন – ‘মহাভারতে সকল বেদের সারার্থ সংগৃহিত । আর সমগ্র মহাভারতের সারতত্ত্ব গীতায় বর্তমান । সেইজন্য গীতা সর্বশাস্ত্রময়ী । সকল শাস্ত্রের সার গীতায় নিহিত ।’

কেশব কাশ্মীরী সত্যই বলিয়াছেন – “শ্রীভগবান্‌ করুণাপূর্বক ভবসাগর পার হইবার জন্য গীতারূপ নৌকা সৃষ্টি করিয়াছেন । উহার সাহায্যে ভগবদ্ভক্তগণ অনায়াসে সংসার-সমুদ্র অতিক্রম করিতে পারিবেন ।”

বাংলার ভূতপূর্ব গবর্ণর লর্ড রোনাল্ডসের মতে গীতাতত্ত্বই ভারতীয় চিন্তার পূর্ণ পরিণতি ও সূক্ষ নির্যাস ।

মোগল সম্রাট্‌ শাজাহানের পুত্র দারাশিকোলিখিয়াছেন, “গীতা স্বর্গীয় আনন্দের অফুরন্ত উৎস । সর্বোচ্চ সত্যলাভের সুগম পথ গীতায় প্রদর্শিত । গীতায় পরমপুরুষের কথা বিবৃত ও ব্রহ্মবিদ্যা ব্যাখ্যাত । গীতা ইহলোক ও পরলোকের সুগভীর ও শ্রেষ্ঠ রহস্যের দ্বারোদ্ঘাটন করেন ।”

ইংরেজ মনীষী ডক্টর এল.ডি.বার্নেট বলেন, “লক্ষ লক্ষ লোক গীতা পড়িয়াছেন বা শুনিয়াছেন । সকলেই উহার পাঠে বা শ্রবণে বুঝিতে পারেন যে, ঈশ্বরলাভের দুর্গম পথে উহা শ্রেষ্ঠ সম্পদ ও সহচর । জীবনের প্রত্যেক কর্মকে অনাসক্তির অনলে শুদ্ধ করিয়া উপাসনায় পরিণত করার যে অপূর্ব কৌশল গীতা শিক্ষা দেয়, তাহা মানবের কর্মজীবনের অনন্য অবলম্বন ।”

শোনা যায়, জনৈক ফরাসী তত্ত্বপিপাসু দ্বাদশ বৎসর গীতার স্বাধ্যায় করিয়া বলিয়াছেন, “গীতাকে ধর্মজীবনের চিরসঙ্গী করিলে অন্য কোন ধর্মগ্রন্থপাঠের আবশ্যকতা থাকে না ।”

এক শত ষাট বৎসর পূর্বে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম গবর্ণরজেনারেল ওয়ারেন্‌ হেস্টিংস, চার্লস উইলকিন্স-কৃত গীতার ইংরেজী অনুবাদের ভূমিকায় লিখিয়াছেন – “গীতার প্রাচীনত্ব এবং যে পূজা উহা বহু শতাব্দী যাবৎ মনুষ্যজাতির এক বৃহদংশের নিকট হইতে পাইয়া আসিতেছে তাহার দ্বারা গীতা সাহিত্য-জগতে এক অভূতপূর্ব বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে । উহার সাহিত্যিক গুণাবলী জগতে অননুকরণীয় । গীতাপাঠে শুধু ইংরেজগণ কেন, সমগ্র বিশ্ববাসী উপকৃত হইবেন । গীতাধর্মের অনুশীলনে মাননজীবন শান্তিধামে পরিণত হইবে ।

গীতা হিন্দুদের নৈতিক উন্নতি, সাহিত্য-সৃষ্টি ও পৌরাণিক রহস্যভেদের আশ্চর্যজনক প্রামাণিক গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন । যদিও ইওরোপের সভ্যতা, ধরমাচরণ ও নৈতিক ব্যবহার গীতোক্ত শিক্ষা হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তথাপি উহা আমাদের ধর্মসাধনে ও নৈতিক কর্তব্যপালনে বিশেষ সহায়ক হইবে । যে সাধনতত্ত্বের বিষয়ে ইওরোপের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতকুল এবং সাধকগণ অজ্ঞ, ভারতের সেই সনাতন সাধনার কথা গীতা বলিয়াছেন । গীতার মৌলিকত্ব, ভাবের গভীরতা ও অভিনবত্ব, দার্শনিক তত্ত্বের উচ্চতা, বলিষ্ঠ যুক্তিতর্ক ও ব্যাখ্যা-কৌশল অপূর্ব ও অসাধারণ । গীতার উপদেশ খ্রীষ্টান ধর্মের মূলসূত্রগুলির প্রকৃত ও সরল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ।”

3) গীতার প্রাচীনত্ব

3.1) গীতা ও বৌদ্ধধর্ম :-

গীতা যে কত প্রাচীন সেই সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মধ্যে বিশেষ মতভেদ আছে । অনেকের মত – গীতা ভগবান্‌ বুদ্ধের পরবর্তী । ডাঃ লরিনসারের মতে গীতা বুদ্ধদেবের জন্মের অনেক পরে; এমন কি যীশুখ্রীষ্টের আবির্ভাবের কয়েক শতাব্দী পরে রচিত । মারাঠী পণ্ডিতটেলাং তাঁহার গীতার উপক্রমণিকায় লিখিয়াছেন যে, উহা খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীরও কিছু পূর্বে লিখিত এবং ডাঃ লরিনসারের অযৌক্তিক উক্তির তীব্র সমালোচনা করিয়াছেন ।

স্যার আর.জি.ভাণ্ডারকর তাঁহার “Vaisnavism and Saivism” (p.13) গ্রন্থে বলেন – “গীতাতে ব্যূহের কোন উল্লেখ নাই । সুতরাং ইহার জন্মতারিখ, শিলালিপি ও নির্দেশ পতঞ্জলির বহু পূর্বে অর্থাৎ গীতার উৎপত্তি খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর প্রারম্ভের পরে কিছুতেই নহে; তবে চতুর্থ শতাব্দীর কত পূর্বে ইহার জন্ম তাহা নিশ্চয় করা সুকঠিন । গীতা যখন রচিত হয়, তখন বাসুদেব ও নারায়ণ অভেদ-জ্ঞানে পূজিত বা বাসুদেব বিষ্ণুর অবতাররূপে গৃহীত হন নাই । গীতাতে [১০|২১] বিষ্ণুকে প্রধান আদিত্য বলা হইয়াছে, পরমপুরুষ বলা হয় নাই এবং দশম অধ্যায়ে বাসুদেবকে সীমান্বিতভাবে বিষ্ণু বলা হইয়াছে; প্রত্যেক শ্রেণী বা জাতির মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ তিনিই তাঁহার দিব্য বিভূতি, ‘তেজোহংশসম্ভবম্‌’ । সুতরাং মারাঠী পণ্ডিত ভাণ্ডারকরের মতে গীতার জন্ম অন্ততঃ খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে ।

জার্মান পণ্ডিত গার্বের মতে মূল গীতা খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে এবং গীতার আধুনিক কলেবর খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে উৎপন্ন ।

নবম শতাব্দীতে শঙ্করাচার্য গীতাভাষ্য রচনা করেন । পঞ্চম শতাব্দীতে আবির্ভূত মহাকবিকালিদাস গীতার বিষয় অবগত ছিলেন । কালিদাসের ‘রঘুবংশে’ [১০|৩১] একটি বাক্য আছে, যাহার সহিত গীতার একটি শ্লোকের [৩|২২] নিকট-সাদৃশ্য আছে । সপ্তম শতাব্দীতেবাণভট্ট তাঁহার গ্রন্থে গীতার উল্লেখ করিয়াছেন । খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে বহু পুরাণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অনুকরণে অন্যান্য গীতা সৃষ্টি করিয়াছেন । ভাসের ‘কর্ণভার’ নাটকে‘হতোহপি লভতে স্বর্গং জিত্বা তু লভতে যশঃ’ – এই বাক্যটি গীতার একটি শ্লোকের [২|৩৭]প্রথমার্ধের প্রতিধ্বনি মনে হয় । ভাসের আবির্ভাবকাল কখনও খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে, কখনও বা খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্দিষ্ট হয় । বোধায়নের (সম্ভবতঃ পঞ্চম শতাব্দীর) গৃহসূত্র ও পিতৃমেধসূত্রে গীতার শ্লোক উদ্ধৃত এবং বাসুদেবের উপাসনা বিবৃত আছে ।

ডাঃ সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন্‌ বলেন, গীতা খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে রচিত । ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের মতে গীতা বুদ্ধের পূর্ববর্তী কালে উৎপন্ন এবং উহা ভাগবত-ধর্মের প্রাচীনতম গ্রন্থ । ভাগবত-ধর্মের প্রাচীনত্ব তিলক, সেনার্টবুহ্‌লার কর্তৃক স্বীকৃত । বুহ্‌লার সাহেব বলেন যে, খ্রীষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে জৈনধর্মের আবির্ভাবের বহু পূর্বে ভাগবত-ধর্মের উৎপত্তি । ডাঃ দাশগুপ্ত আরও বলেন, “গীতাতে বৌদ্ধ মতের কোন প্রকার উল্লেখ নাই এবং উহার ভাষাও পাণিনীয় নহে । সুতরাং গীতা নিশ্চিতই বুদ্ধের পূর্বে রচিত, কিছুতেই বুদ্ধের পরবর্তী যুগের নহে ।”

কেহ কেহ গীতায় নির্বাণ-শব্দটি কয়েকবার উল্লিখিত দেখিয়া মত প্রকাশ করেন যে, গীতা বৌদ্ধযুগে সৃষ্ট; কিন্তু এই প্রকার যুক্তি নিতান্ত অগভীর ও অর্বাচীন । কারণ, নির্বাণ-শব্দটি বৌদ্ধদের নিজস্ব নহে, উহা গীতাতে পাঁচবার ব্যবহৃত হইয়াছে [২|৭২, ৫|২৪,২৫,২৬, ৬|১৫] । কিন্তু এই পাঁচটি শ্লোকে নির্বাণ-শব্দটি ব্রহ্ম-শব্দের সহিত সদা সংযুক্ত দৃষ্ট হয় । গীতায় ব্রহ্মনির্বাণের অর্থ ব্রাহ্মী স্থিতি, বৌদ্ধ নির্বাণের মতো ‘শূন্য’ নহে । সুতরাং বৌদ্ধগণই যে গীতা হইতে নির্বাণ-শব্দটি গ্রহণ করিয়াছেন – এই মতই অধিকতর সমীচীন মনে হয় । অতএব স্পষ্টই প্রতীত এবং প্রমাণিত হয় যে, গীতা ভগবান্‌ বুদ্ধের পূর্বে রচিত ।

3.2) গীতা ও মহাভারত :-

গীতাকে  মহাভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে ধরিলে উহার আরও প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হয় ।রমেশচন্দ্র দত্ত এবং প্র্যাট্‌ সাহেবের মতে মহাভারত খ্রীঃপূঃ ১২শ শতাব্দীতে রচিত । মহাভারতে অগ্নি, ইন্দ্রাদি বৈদিক দেবতার উপাসনা আছে । বৌদ্ধযুগে উক্ত মহাকাব্য প্রসিদ্ধ ছিল । উহাতে বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে কোন প্রকার উল্লেখ না থাকায় ম্যাক্‌ডোনেল বলেম, “মহাভারতের আদিম আকৃতি অন্ততঃ খ্রীঃপূঃ ৫ম শতাব্দীতে উৎপন্ন ।” আশ্বলায়নসূত্রে মহাভারতের উল্লেখ আছে ।গুপ্তরাজগণের শিলালিপিতে মহাভারতের নাম স্পষ্টভাবে উল্লিখিত । কবি ভাস তাঁহার বহু রচনার ঘটনা মহাভারত হইতে গ্রহণ করিয়াছেন । অশ্বঘোষ তাঁহার ‘বুদ্ধচরিত’ ও ‘সৌন্দরনন্দ’ কাব্যে মহাভারতের উল্লেখ করিয়াছেন । বুহ্‌লার ও কির্‌স্টে (Buhler & Kirste) তাঁহাদের ‘Contributions to the Study of the Mahabharat’ নামক গ্রন্থে বলেন যে, মহাভারতের যে আকার বর্তমানে দৃষ্ট হয়, তাহা খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকে বিজ্ঞাত এবং ৫ম শতকে প্রায় একই প্রকার ছিল । উহার কিয়দংশ পুরাণের যুগে রচিত । ডাঃ রাধাকৃষ্ণনের মতে মহাভারত অন্ততঃ খ্রীঃপূঃ ৫ম শতাব্দীতে উহার বর্তমান আকার লাভ করিয়াছিল । সম্ভবতঃ উহার মৌলিক আকৃতি খ্রীঃপূঃ ১১শ শতকে উৎপন্ন ।

3.2.1) মহাভারত ও গীতার কালনির্ণয়ে জ্যোতিষশাস্ত্র :-

মহাভারত যত প্রাচীন, গীতাও তত প্রাচীন । ১৯৪৪ খ্রীঃ এপ্রিল মাসে কাশীতে যে নিখিল ভারত প্রাচ্য সম্মেলন হইয়াছিল তাহাতে তিনজন জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত গীতার কালনির্ণয়বিষয়ক তিনটি প্রবন্ধ পাঠ করেন ।মিঃ কারান্তিকর বলেন খ্রীঃপূঃ ১৯৩১ অব্দে গীতোক্ত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হইয়াছিল । ডাঃ দফ্‌তরীর মতে খ্রীঃপূঃ ১১৬২ এবং অধ্যাপক সেনগুপ্তের মতে খ্রীঃপূঃ ২৫৬৬ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কাল ।

লোকমান্য তিলক ‘মাসানাং মার্গশীর্ষোহহম্‌’[১০|৩৫] – গীতার এই শ্লোকাংশ জ্যোতিষশাস্ত্রের দিক হইতে আলোচনা করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, খ্রীষ্টজন্মের ১৪০০ বৎসর পূর্বে গীতা রচিত হইয়াছিল ।

3.3) গীতা ও পতঞ্জলির যোগসূত্র :-

‘যোগ’ শব্দটি  উভয় গ্রন্থে ব্যবহৃত হইলেও পতঞ্জলির যোগশব্দ অপেক্ষা গীতার যোগশব্দ অধিকতর ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত । যোগসূত্রের ৭০টি সূত্রের মধ্যে ১২টি সূত্রের শব্দপ্রয়োগে এবং গীতার শব্দপ্রয়োগে সমতা পরিলক্ষিত হয় । ইহাতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, গীতা পতঞ্জলিসূত্র অপেক্ষা প্রাচীনতর । পতঞ্জলি পাণিনীয় সূত্রের ভাষ্যকার, সুতরাং পাণিনির পরবর্তী । পতঞ্জলি পাণিনির ১০০ বা ১৫০ বৎসর পরবর্তী । পাণিনির সময় খ্রীঃপূঃ  ৮০০ হইতে খ্রীঃপূঃ ৫০০ বৎসরের মধ্যে ।

3.4) গীতা ও ব্রহ্মসূত্র :-

গীতায় ‘ব্রহ্মসূত্র’ শব্দটির প্রয়োগ দেখিয়া কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন, গীতা ব্রহ্মসূত্রের পরবর্তী । কিন্তু ব্রহ্মসূত্রের মধ্যে বৌদ্ধমতের উল্লেখ থাকায় ব্রহ্মসূত্রের সময়  খ্রীঃপূঃ ২৫০ অব্দ বলা যাইতে পারে । সুতরাং পূর্বোক্ত যুক্তির কোন সারবত্তা নাই ।

3.5) গীতা ও উপনিষদ্‌ :-

মিঃ টেলাঙ্গ এবং অন্যান্য পণ্ডিত গীতা এবং মুণ্ডক ও শ্বেতাশ্বতরাদি উপনিষদের ভাবসাদৃশ্য এবং অনেক স্থলে ভাষাসাদৃশ্য লক্ষ্য করিয়া অনুমান করেন যে, গীতা এবং মুণ্ডক ও শ্বেতাশ্বতরাদি উপনিষদ্‌ সমসাময়িক । মুণ্ডক উপনিষদে ‘অষ্টাদশোক্তমবরং যেষু কর্ম’ [১|২|৭]মন্ত্রাংশে সম্ভবতঃ অষ্টাদশ অধ্যায়াত্মক কোন গ্রন্থকে লক্ষ্য করিয়াছে । গীতা এবং মুণ্ডক উপনিষদে ‘অবরং কর্ম’ শব্দের প্রয়োগ আছে । ইহা হইতে মনে হয়, গীতা ও মুণ্ডক উপনিষদ্‌ সমসাময়িক । শ্রুতির ও স্মৃতির মধ্যবর্তী যুগে উপনিষৎসমূহ রচিত । ‘গীতাসূপনিষৎসু’বাক্যেও গীতা উপনিষদ্‌রূপে অভিহিত ।

3.6) গীতা ও শতপথ-ব্রাহ্মণ :-

পণ্ডিতগণের মতে শতপথ-ব্রাহ্মণ শ্রুতির সময়ের শেষভাগে রচিত । ‘কৃত্তিকাঃ প্রাচৈঃ দিশৈঃ ন চ্যবন্তে’ এই বাক্য হইতে মিঃ বৈদ্যপ্রমাণ করিয়াছেন যে, শতপথ-ব্রাহ্মণ খ্রীষ্টজন্মের অন্ততঃ তিন হাজার বর্ষ পূর্বে রচিত । এইরূপে মিঃ বৈদ্য এবং অধ্যাপক ভি.বি.আঠাওয়ালে বহু অকাট্য যুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন, গীতা খ্রীঃপূঃ তিন হাজার বর্ষ পূর্বে রচিত ।

4) গীতার ভাষা

গীতার ভাষা প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য । গীতার সংস্কৃত সরল ও সাবলীল । তাহাতে অতি প্রাচীন শব্দের প্রয়োগে ব্যাকরণের সূত্র লঙ্ঘিত হইলেও মনে হয়, গীতার সময় সংস্কৃত প্রচলিত ভাষা ছিল, কেবলমাত্র পণ্ডিতগণের ভাষা ছিল না । কবিত্ব ও দার্শনিকতার এমন অপূর্ব সম্মিলন কুত্রাপি দেখা যায় না । সুমিষ্ট ও সরল সংস্কৃতে শ্লোকগুলি রচিত এবং কয়েকবার পাঠেই কণ্ঠস্থ হইয়া যায় । জীবন্ত ভাবটি ভাষার পাতলা আবরণ ভেদ করিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে । ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের মতে গীতার ভাষা বিস্তরশঃ অপাণিনীয় ও অপ্রচলিত (archaic)  এবং ভাষাভঙ্গীও অত্যন্ত প্রাচীন । গীতায় যে-সকল অপাণিনীয় বা আর্ষপ্রয়োগ আছে, তিনি তাঁহার নিম্নলিখিত তালিকা দিয়াছেন –

‘যুধ্য’ স্থলে ‘যুধ্যস্ব’ [৩|৩০]

‘নিবৎস্যসি’ স্থলে ‘নিবসিষ্যসি’ [১২|৮]

‘মা শোচীঃ’ স্থলে ‘মা শুচঃ’ [১৬|৫]

‘যমঃ সংযচ্ছতাম্‌’ স্থলে যমঃ সংযমতাম্‌’ [১০|২৯]

‘প্রিয়ায়া অহর্সি’ স্থলে প্রিয়ায়ার্হসি’ [১১|৪৪]

‘সেনান্যাম্‌’ স্থলে ‘সেনানীনাম্‌’ [১০|২৪]

আত্মনেপদী ধাতুর পরস্মৈপদী-রূপে ব্যবহারঃ-

যত্‌ [৬|৩৬, ৭|৩, ৯|১৪, ১৫|১১]রম্‌ [১০|৯]বিজ্‌ [৫|২০]

পরস্মৈপদী ধাতুর আত্মনেপদী-রূপে ব্যবহারঃ-

কাঙ্ক্ষ্‌ [১|৩১]ব্রজ্‌ [২|৫৪]বিশ্‌ [১৮|৫৫]ইঙ্গ্‌ [৬|১৯, ১৪|২৩]

আর্ষ সন্ধি – ‘হে সখেতি’ [৩|১০]

‘শক্লোষি’ স্থলে ‘শকস্যে’ [১১|৮, মহাভারতের টীকাকার নীলকণ্ঠ]
‘ইমং মহিমানং’ স্থলে ‘ইদং মহিমানং [১১|৪১, মধুসূদন সরস্বতী]
‘নমস্কৃত্য’ স্থলে ‘নমস্কৃত্বা [১১|৩৫, মধুসূদন সরস্বতী]
‘ইমং ধর্মং’ স্থলে ‘ধর্মস্যাস্য [১১|৩৫, মধুসূদন সরস্বতী]

এইরূপ প্রায় ৩২টি আর্ষপ্রয়োগ গীতাতে আছে । ভাণ্ডারকর স্মৃতিগ্রন্থে (Commemoration Volume)প্রকাশিত শ্রী ভি.কে.রাজয়াডে উক্ত প্রকার অশুদ্ধির বহু দৃষ্টান্ত দিয়াছেন । এই প্রকার ভাষাগত অনিয়মের দ্বারা গীতার প্রাচীনত্বই প্রমাণিত হয় । পাণিনীয় ব্যাকরণের সূত্র“বাসুদেবার্জুনাভ্যাম্‌ বুঞ” [৪|৩৯৮] হইতে মনে হয়, পাণিনি মহাভারতীয় আখ্যায়িকার সহিত পরিচিত ছিলেন । সুতরাং গীতা যে পাণিনীয় ব্যাকরণের পূর্ববর্তী ইহা নিঃসন্দেহ এবং উহাতে অপাণিনীয় প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী ।

গীতার [৩|১৯,৩৬] শ্লোকদ্বয়ে পুরুষ শব্দে (দীর্ঘ) ঊকারের ব্যবহার দৃষ্ট হয় । গীতার বোধায়নভাষ্যের হস্তলিখিত পুঁথির মতে ‘ছন্দের অনুরোধে উক্ত (দীর্ঘ) ঊকার ব্যবহৃত’ । আবার ‘পুরুষ’ শব্দ যে অপাণিনীয় নহে, তাহা পাণিনিকৃত অষ্টাধ্যায়ীর সূত্র [৬|৩|১৩৭] হইতে জানা যায় ।

5) গীতাসাহিত্য

গীতার উপর বহু ভাষ্য ও টীকাদি (১৫-১৬টি) লিখিত হইয়াছে । গীতার শঙ্করভাষ্যইপ্রাচীনতম প্রাপ্ত ভাষ্য । শঙ্করের পূর্বেও যে গীতার ভাষ্যাদি রচিত হইয়াছিল, তাহার স্পষ্ট উল্লেখ দেখা যায় । গীতার শঙ্করভাষ্যের টীকায়[২|১০] আনন্দজ্ঞান গিরি বলেন, বেদান্তসূত্রের টীকাকার বোধায়ন গীতার উপর একটি বৃত্তি রচনা করিয়াছিলেন; কিন্তু উহা এখন পাওয়া যায় না । বোধায়নকে এইজন্য বৃত্তিকার বলা হয় ।

শঙ্করভাষ্য হিন্দী, মারাঠী, বাংলা, ইংরেজী, জার্মান প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হইয়াছে । শঙ্করভাষ্যের উপর আনন্দগিরি এবং রামানন্দ-কৃত যথাক্রমে ‘বিবরণ’ ও ‘ব্যাখ্যা’ নামক টীকাদ্বয় আছে । শঙ্করের পরে গীতার উপর ভাষ্যাদি রচনা কিছুকালের জন্য বন্ধ ছিল, মনে হয় ।

মধ্বাচার্য (আনন্দতীর্থ) ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে গীতাভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন, তাহার উপর জয়তীর্থকৃত ‘প্রমেয়দীপিকা’ নামক টীকা আছে । মধ্বাচার্য-কৃত ‘ভগবদ্‌গীতা-তাৎপর্য-নির্ণয়’র উপর জয়তীর্থ ‘ন্যায়দীপিকা’ নামক টীকা লিখিয়াছেন ।

রামানুজাচার্য (ব্রহ্মসূত্রের ‘শ্রীভাষ্য’-রচয়িতা) একাদশ শতাব্দীতে বিশিষ্টাদ্বৈত-মতানুযায়ী যে গীতাভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন, তাহার উপর বেঙ্কটনাথের (বেদান্তাচার্যের) ‘তাৎপর্য-চন্দ্রিকা’ নামক টীকা আছে ।

রামানুজ-গুরু যামুনাচার্য-কৃত ১০ম শতাব্দিতে রচিত ‘গীতার্থ-সংগ্রহে’র উপর নিগমান্ত মহাদেশিকের ‘গীতার্থ-সংগ্রহ-রক্ষণ’ এবং ১৪শ শতাব্দীর বরাবর মুনি-কৃত ‘গীতার্থ-সংগ্রহদীপিকা’ নামক টীকাদ্বয় বর্তমান । উল্লিখিত দ্বিতীয় টীকাটি কাঞ্জিভরম্‌ সুদর্শন প্রেস হইতে প্রকাশিত ।

যামুনাচার্য নামধারী দুই ব্যাক্তির গীতার উপর গদ্যে ও পদ্যে দুইটি টীকা পাওয়া যায় । গদ্য টীকাকার যামুনাচার্য বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী হইলেও রামানুজের গুরু নহেন । এই গদ্য টীকাটি কাঞ্জিভরম্‌ সুদর্শন প্রেস হইতে প্রকাশিত । উহাতে অন্বয়মুখে সরল পদার্থ দেওয়া আছে ।

বোম্বাই নির্ণয় সাগর প্রেস হইতে অষ্টভাষ্য-টীকা সম্বলিত যে গীতা প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে শঙ্করভাষ্যের ব্যাখ্যা ‘ভাষ্যোৎকর্ষদীপিকা’ এবং মধুসূদন সরস্বতীরটীকার ব্যাখ্যা ‘গূঢ়ার্থ-দীপিকা-তত্ত্বালোক’ (মৈথিলী পণ্ডিত শ্রীধর্মদত্ত শর্মা-কৃত) আছে ।

একমাত্র ভারতীয় ভাষা মারাঠীতে গীতার উপর দুইটি প্রসিদ্ধ টীকা আছে – (i) মহারাষ্ট্রের ধর্মগুরু জ্ঞানেশ্বর-রচিত, (ii)বালগঙ্গাধর তিলক-কৃত ‘গীতারহস্য’

তিলকের ‘গীতারহস্য’ এবং শ্রীঅরবিন্দের‘গীতানিবন্ধনিচয়’ বর্তমান যুগের দুইটি শ্রেষ্ঠ ভাষ্য । উভয় ভাষ্যই বাংলা ও হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হইয়াছে ।

বর্ণানুক্রমে টীকাকারগণ :-

অভিনব গুপ্ত ও নৃসিংহ ঠাকুরের ‘ভগবদ্‌গীতার্থ-সংগ্রহ’
আনন্দগিরি – ‘গীতা-ভাষ্য-বিবেচন’, ‘গীতাশয়’

কল্যাণভট্ট – ‘রসিক-রঞ্জিনী’
কেশবকাশ্মীরী‌ (নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের) – ‘গীতা-তত্ত্ব-প্রকাশিকা’
কৈবল্যানন্দ সরস্বতী – ‘ভগবদ্‌গীতা-সার’
কৃষ্ণ-ভট্ট বিদ্যাধিরাজ (মধ্বাচার্যের শিষ্য, চতুর্দশ শতাব্দী) – ‘গীতা টীকা’

গোকুলচন্দ্র – ‘ভগবদ্‌গীতার্থ-সার’
গৌরগোবিন্দ রায় (ব্রাহ্ম সমাজের) – ‘গীতা-প্রপূর্তি’

নরহরি – ‘ভগবদ্‌গীতা-সার-সংগ্রহ’
নীলকণ্ঠ (গোবিন্দ সূরির পুত্র) – ‘ভাবদীপিকা’

প্রত্যক্ষ দেবজটাচার্য – ”ভগবদ্‌গীতার্থ-সংগ্রহ-টীকা’

বলদেব বিদ্যাভূষণ – ‘গীতা-ভূষণ-ভাষ্য’
বল্লভাচার্য – ‘গীতার্থ-বিবরণ’; তৎপুত্র-কৃত ‘গীতাতাৎপর্য’
বাদিরাজ – ‘ভগবদ্‌গীতা-লক্ষাভরণ’
বিঠ্‌ঠল দীক্ষিত – ‘ভগবদ্‌গীতা-হেতু-নির্ণয়’
বিশ্বনাথ চক্রবর্তী – ‘সারার্থবর্ষিণী’

জগদ্ধর – ‘ভগবদ্‌গীতা-প্রদীপ’
জয়রাম – ‘গীতাসারার্থ-সংগ্রহ’

দত্তাত্রেয় – ‘প্রবোধ-চন্দ্রিকা’

মথুরানন্দ -‘ভগবদ্‌গীতাপ্রকাশ’
মধুসূদন সরস্বতী – ‘গূঢ়ার্থদীপিকা’ (শব্দের সরলার্থ সহ)
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী – গুজরাটীতে গান্ধীভাষ্য

রাঘবেন্দ্র স্বামী (সুধীন্দ্র যতির শিষ্য, সপ্তদশ শতাব্দী) – ‘গীতা-বিবৃতি’, ‘গীতা-সংগ্রহ’, ‘গীতার্থ-বিবরণ’
রাজানক (শৈবমতাবলম্বী) ও রামকণ্ঠ-কৃত ‘সর্বতোভদ্র’

শ্রীধরস্বামী – ‘সুবোধিনী’
শ্রীমৎ হনুমান্‌-কৃত গীতার ‘পৈশাচভাষ্য’
শ্রীপুরুষোত্তম – ‘অমৃত-তরঙ্গিণী’

সদানন্দ ব্যাস – ‘ভাব-প্রকাশ’
সূর্যপণ্ডিত -‘পরমার্থপ্রপা’

এতদ্ব্যতীত নিম্বার্ক, শঙ্করানন্দ, বিজ্ঞানভিক্ষু, কেশব ভট্ট, ব্রহ্মানন্দ গিরি, রামকৃষ্ণ, মুকুন্দদাস, রামনারায়ণ, অর্জুন মিশ্র, জনার্দন ভট্ট, দেববোধ, দেবস্বামী, নন্দকিশোর, নারায়ণ সর্বজ্ঞ, পরমানন্দ ভট্টাচার্য, যজ্ঞনারায়ণ, রত্নগর্ভ, লক্ষণ ভট্ট, শ্রীনিবাসাচার্য, বিমল বোধ, মধ্য মন্দির, বরদরাজ ব্যাসতীর্থ, সত্যাভিনব যতি, কৃষ্ণাচার্য, বিদ্যাধিরাজ, জয়রাম জয়তীর্থ, বৈশম্পায়ন, আজ্ঞেশ্বরপাল প্রমুখ অনেকেই গীতার উপর টীকাদি লিখিয়াছেন ।

6) গীতার ঐতিহাসিক সমালোচনা

6.1) গীতা মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত ?

আধুনিক পণ্ডিতগণ বাইবেলের ন্যায় গীতারও উচ্চতর বা ঐতিহাসিক সমালোচনা (higher or historical criticism) করিয়াছেন । জার্মান পণ্ডিত গার্বে সর্বপ্রথম গীতার ঐতিহাসিক সমালোচনা ও গবেষণা আরম্ভ করেন । ইনিই প্রথম জার্মান ভাষায় গীতার অনুবাদও প্রচার করিয়াছেন । উক্ত সমালোচনার স্থলে টালবয়েজ হুইলার, ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত প্রমুখ পণ্ডিতগণ বলেন যে, গীতা একখানি স্বতন্ত্র গ্রন্থ এবং মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত । গার্বের শিষ্য জার্মান সংস্কৃতজ্ঞ ডাঃ রুডল্‌ফ অটো গীতার উচ্চতর সমালোচনা করিয়া জার্মান ভাষায় যে বৃহৎ গ্রন্থ লিখিয়াছেন তাহার নাম ‘The Original Gita’; বইখানি ইংরেজী ভাষায়ও অনুদিত হইয়াছে । অটো সাহেবের মতে গীতায় কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধ-বিষয়ক আখ্যায়িকা-অংশটি মহাভারতের প্রকৃত অংশ । এই আখ্যায়িকা-অংশ ১২৮টি শ্লোকের অনধিক, কিন্তু তিনি বলেন – ভক্তি, যোগ, জ্ঞান, কর্ম প্রভৃতি-সম্বন্ধীয় গীতার উপদেশগুলির পৃথক পৃথক গ্রন্থ এবং শ্রীকৃষ্ণের বাণীরূপে প্রচলিত করিবার উদ্দেশ্যেই মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে । সুতরাং এইগুলি প্রক্ষিপ্ত ।

6.2) গীতা মহাভারতের প্রকৃত অংশ

কিন্তু বালগঙ্গাধর তিলক এবং ডাঃ সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন । তাঁহারা বলেন, সমগ্র গীতাই মহাভারতের প্রকৃত অংশ । কারণ, প্রথমতঃ গীতা ও মহাভারতের অন্যান্য অংশের মধ্যে ভাষার নিকট সাদৃশ্য আছে এবং দ্বিতীয়তঃ মহাভারতের অন্যান্য পর্বে গীতার উল্লেখ আছে । ভিষ্মপর্বের ২৫ হইতে ৪২ অধ্যায়ই ভগবদ্‌গীতা । কিন্তু শান্তি ও অশ্বমেধ পর্বে এবং অন্যান্য বহু স্থলে ব্যাসদেব ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণের মুখ-নিঃসৃত ভগবদ্‌গীতার সুস্পষ্ট উল্লেখ করিয়াছেন । ইহা হইতে নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয় যে, গীতা মহাভারতের প্রকৃত অংশ, প্রক্ষিপ্ত নহে । অটো সাহেবের পক্ষে কোন বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এপর্যন্ত পাওয়া যায় নাই ।

7) গীতার শ্লোকসংখ্যা

গীতার শ্লোকসংখ্যা-সম্বন্ধে বিভিন্ন মত আছে । গীতার শ্লোকসংখ্যা সাত শত বলিয়াই এতকাল পাঠকসাধারণ অবগত আছেন ।শঙ্করাচার্য হইতে আরম্ভ করিয়া করিয়া অদ্যাবধি সকল ভাষ্যকার, টীকাকার ও ব্যাখ্যাকারই গীতার উক্ত শ্লোকসংখ্যা নির্বিবাদে গ্রহণ করিয়াছেন । কিন্তু বর্তমান যুগের আধুনিক গবেষণাসমূহের অভিনব আবিষ্কার এই যে, গীতার বর্তমান আকারটি অঙ্গহীন ও অসম্পূর্ণ এবং উহার শ্লোকসংখ্যা ৭৪৫, ৭০০ নহে । ব্যাসদেবের বাক্যই এই মতের প্রথম ও প্রধান সমর্থক :-

7.1) ব্যাসদেবের মত

শ্রীকৃষ্ণকথিত শ্লোক ৬২০ + অর্জুনকথিত শ্লোক ৫৭ + সঞ্জয়কথিত শ্লোক ৬৭ + ধৃতরাষ্ট্রকথিত শ্লোক ১ = ৭৪৫ শ্লোকসংযুক্ত ব্যাসদেব কথিত গীতা  [মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, ৪৩|৭]

षट्शतानि सविंशानि श्लोकानां प्राह केशवः । अर्जुनः सप्तपञ्चाशत्सप्तषष्टिं तु सञ्जयः ॥ धृतराष्ट्रः श्लोकमेकं गीताया मानमुच्यते । [Mahabharata, Bhisma Parva, 43|4]

ষট্শতানি সবিংশানি শ্লোকানাং প্রাহ কেশবঃ । অর্জুনঃ সপ্তপঞ্চাশৎসপ্তষষ্টিং তু সঞ্জয়ঃ ॥ ধৃতরাষ্ট্রঃ শ্লোকমেকং গীতায়া মানমুচ্যতে । [মহাভারত, ভীষ্মপর্ব, ৪৩|৪]

শ্রীকৃষ্ণকথিত শ্লোক ৫৭৫ + অর্জুনকথিত শ্লোক ৮৪ + সঞ্জয়কথিত শ্লোক ৪০ + ধৃতরাষ্ট্রকথিত শ্লোক ১ = ৭০০ শ্লোকসংযুক্ত প্রচলিত গীতা

7.2) শ্রীচৈতন্যদেবের মত

শ্রীচৈতন্যদেব তাঁহার প্রিয়শিষ্য গদাধরেরলিখিত গীতায় নিজহস্তে শ্লোকসংখ্যার মান লিখিবার সময় মহাভারতের উক্ত শ্লোকটি উদ্ধৃত করিয়াছিলেন । মহাপ্রভুর এই পুঁথি এখনও ভরতপুরে (মুর্শিদাবাদ) গদাধরের শ্রীপাটে রক্ষিত আছে এবং ইহা লইয়া আলোচনাও হইয়াছে ।

7.3) প্রাচীন হস্তলিখিত পুঁথি

কাথিয়াবাড়স্থ গণ্ডাল স্টেটের রাজবৈদ্যজীবরাম কালিদাস শাস্ত্রী সুরাট ও কাশী হইতে দুইটি প্রাচীন ভূর্জপত্রে হস্তলিখিত পুঁথি সংগ্রহ করিয়াছেন যাহা পুস্তকাকারে গণ্ডাল রসশালা ঔষধাশ্রম হইতে প্রকাশিত হইয়াছে । ১১৭৯ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত সুরাট থেকে সংগৃহীত গীতা অধিকাংশ স্থলে কাশ্মীরী গীতার অনুরূপ । ইহাতে প্রচলিত গীতা হইতে ২১টি নূতন ও অধিক শ্লোক এবং ২৫০টি পাঠান্তর পরিদৃষ্ট হয় । ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দে লিখিত কাশী থেকে সংগৃহীত গীতায় ৭৪৫টি শ্লোক আছে । এই গীতাদ্বয়ের প্রকাশের পর দেশি, বিদেশি গীতাবিদ্‌গণের মধ্যে গীতার শ্লোকসংখ্যা-সম্বন্ধে গভীর জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হইয়াছে । ৭৪৫টি শ্লোকসংযুক্ত গীতা ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও প্রকাশিত হইয়াছে, যদিও পাঠকসাধারণের ইহা অবিদিত ।

7.4) কাশ্মীরী গীতা

শ্রীনগর হইতে অভিনবগুপ্তাচার্যের টীকা-সম্বলিত যে কাশ্মীরী গীতার সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে তাহাতে ৭৪৫টি শ্লোক আছে । পুণার আনন্দাশ্রম হইতে প্রকাশিত ও রাজনক রামকবি-কৃত গীতার ‘সর্বতোভদ্র’ নামক টীকা এবং পুণার ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল ইন্সটিটিউট হইতে প্রকাশিত গীতাও কাশ্মীরী গীতাকেই অনুসরণ করিয়াছে । কাশ্মীরী গীতা হস্তলখিত পুঁথির আকারে বহু শতাব্দী যাবৎ প্রচলিত ছিল; এমন কি, শঙ্করাচার্যের সময়েও ছিল ।

7.5) শঙ্করাচার্যের মত

কিন্তু দক্ষিণ ভারতে কাশ্মীরী গীতার প্রচার ছিল না বলিয়া সম্ভবতঃ উহা শঙ্করাচার্যের দৃষ্টিগোচর হয় নাই । সেই যুগে এখনকার মতো যাতায়াতের, মুদ্রাযন্ত্রের বা ডাকের কোন সুবিধা না থাকায় এক প্রদেশের হস্তলিখিত পুঁথি অন্য প্রদেশে তেমন যাতায়াত করিতে পারিত না । তাই শঙ্করাচার্য গীতার শ্লোকসংখ্যা সাত শত বলিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় । যাহার ফলে তাঁহার পরবর্তী ভাষ্যকার ও টীকারগণও এই শ্লোকসংখ্যার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করিতে সাহসী হন নাই । কিন্তু তিনিও তাঁহার ভাষ্যে ১|১ শ্লোকের কোন উল্লেখ করেন নাই ও ১৩|১ শ্লোকও অব্যাখ্যাত রাখিয়াছেন । অর্থাৎ তিনিও উক্ত শ্লোকদ্বয় গ্রহণ করেন নাই ।

শঙ্করাচার্যের পূর্বেও ৭৪৫ শ্লোকযুক্ত গীতার উপর বহু টীকা ছিল । কিন্তু মধ্যযুগে ধর্মান্ধ মুসলমানদিগের হাতে সংস্কৃত সাহিত্যের যে দুর্গতি হইয়াছিল তাহার ফলে অধিকাংশ হস্তলখিত পুঁথি বিনষ্ট হইয়াছে ।

7.6) শুদ্ধ ধর্মমণ্ডল গীতা

মাদ্রাজের শুদ্ধ ধর্মমণ্ডল হইতে যে গীতা মুদ্রিত হইয়াছে তাহার শ্লোকসংখ্যাও ৭৪৫ । তবে উক্ত গীতাতে প্রচলিত গীতা হইতে ৩৭টি শ্লোক বাদ দিয়া মহাভারতের উদ্যোগ, অনুশাসন ও শান্তিপর্ব হইতে ৮২টি শ্লোক যথেচ্ছভাবে গ্রহণপূর্বক গীতার শ্লোকসংখ্যাও ৭৪৫ করা হইয়াছে । এতদ্ব্যতীত এই গীতায় ২৬টি অধ্যায় আছে । আদ্য ও অন্ত্য অধ্যায়ের বিশেষ নাম এবং অবশিষ্ট ২৪টি অধ্যায়ের প্রত্যেকটিতে ২৪টি শ্লোক আছে ।

7.7) আলবেরুনির মত

একাদশ শতকে বিখ্যাত মুসলমান ঐতিহাসিকআলবেরুনি তাঁহার আরবী গ্রন্থে গীতার শ্লোকসংখ্যা সাত শতের অধিক ধরিয়াছেন । তিনি নিজেও সংস্কৃতবিদ্‌ ছিলেন এবং তাঁহার গ্রন্থে যে সকল শ্লোক উদ্ধার করিয়াছিলেন তাহা প্রচলিত গীতায় নাই ।

7.8) ফারসী ও আরবী অনুবাদ

সম্রাট্‌ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল এবং তাঁহার ভ্রাতা ফৈজী গীতার যে দুইটি ফারসী অনুবাদ করিয়াছিলেন তাহার একটিতে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে – ‘সম্রাটের আদেশে গীতার ৭৪০ শ্লোকের ফারসী অনুবাদ সমাপ্ত হইল ।’ গীতার আবুল ফজল-কৃত ফারসী অনুবাদ লণ্ডনস্থিত ইণ্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে অদ্যাপি রক্ষিত আছে । ফৈজীকৃত ফারসী অনুবাদ লাহোর, এলাহাবাদ, জয়পুর ও জলন্ধর প্রভৃতি স্থান হইতে বহুবার মুদ্রিত হইয়াছে । শাহ আলি দাস্তগীর-কৃত গীতার ফারসী অনুবাদের হস্তলিখিত পুঁথি কাশী মহারাজার গ্রন্থাগারে আজও রক্ষিত আছে । মোগল সম্রাটগণের আমলে গীতার একটি আরবী তর্জমা হইয়াছিল । তদুনাযায়ীও গীতার শ্লোকসংখ্যা ৭৪৫ ।

8) গীতার বিবিধ ভারতীয় ব্যাখ্যা

প্রত্যেক ভাষ্যকার ও টীকাকার স্ব স্ব ধর্মমত অনুযায়ী গীতার ব্যাখ্যা করিয়াছেন । বৃত্তিকার বোধায়নের মতে জ্ঞান ও কর্মের সমুচ্চয়ই গীতার প্রতিপাদ্য; পৃথগ্‌ভাবে কোনটাই মোক্ষদায়ক নহে ।

8.1) অদ্বৈতবাদ

শঙ্করাচার্য সমুচ্চয়বাদ খণ্ডনপূর্বক অদ্বৈতবেদান্তানুযায়ী গীতাভাষ্য লিখিয়াছেন । তিনি বলেন, ‘গীতার সিদ্ধান্ত এই যে, কেবলমাত্র তত্ত্বজ্ঞানেই মুক্তিলাভ হয়, জ্ঞান ও কর্মের সমুচ্চয়ের ফলে নহে ।’ তাঁহার মতে ব্রহ্মাত্মৈক্যদর্শনরূপ জ্ঞান দ্বারা অজ্ঞান বিনাশপূর্বক নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি, ব্রাহ্মীস্থিতি বা ব্রহ্মনির্বাণলাভই গীতার উপদেশ । অজ্ঞানই দ্বৈতভাব-উৎপাদক । এই দ্বৈতভাব হইতেই সকল কর্ম হয় । দ্বৈতভাব-নাশান্তে নিষ্ক্রিয় আত্মায় প্রতিষ্ঠিত হইলেই সর্বকর্মসন্ন্যাস হয় । নিষ্কাম কর্মের দ্বারা চিত্ত শুদ্ধ হইলে মেঘমুক্ত সূর্যের ন্যায় আত্মজ্ঞান প্রকাশিত হয় । আত্মজ্ঞানলাভ হইলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি অর্থাৎ কর্মত্যাগ হয় । মধুসূদন সরস্বতী, আনন্দগিরি, শঙ্করানন্দ প্রভৃতি বহু টীকাকার শঙ্করের পদানুবর্তী ।

8.2) বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ

রামানুজাচার্য স্বীয় গুরু যামুনাচার্যের মতই তাঁহার গীতাভাষ্যে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন । তাঁহার মতে জীব (চিৎ), জগৎ (অচিৎ) ও ব্রহ্ম – এই তিনটি তত্ত্ব স্বতন্ত্র হইলেও ব্রহ্ম জগৎ ও জীববিশিষ্ট । তাঁহার মতে ব্রহ্মের সঙ্গে জীব ও জগতের স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ না থাকিলেও স্বগতভেদ অবশ্য স্বীকার্য । তাঁহার দার্শনিক মত বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ ও তিনি ভক্তিধর্মের প্রচারক । তিনি বলেন, ‘বর্ণাশ্রমধর্ম অবশ্য পালনীয় ।’ কারণ সকল শাস্ত্র এই বিষয়ে একমত –‘একশাস্ত্রার্থতয়ানুষ্ঠেয়ম্‌’ । ফলাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন করিয়া ঈশ্বরকে প্রসন্ন করিবার জন্য বর্ণাশ্রমধর্ম অনুষ্ঠিত হইলে ‘ভাবসংশুদ্ধি’ হয় এবং মানুষ জ্ঞানের অধিকারী হয় ।

8.3) দ্বৈতবাদ

দ্বৈতবাদী ও ভক্তিমার্গের আচার্য মধ্বাচার্যমায়াবাদ খণ্ডনপূর্বক পরব্রহ্মের সহিত জীবসমূহের নিত্য ভেদ প্রতিষ্ঠা করেন । বল্লভাচার্যের মতে ব্রহ্ম ও মুক্ত জীব মূলতঃ অভেদ হইলেও জীব ব্রহ্মের অংশ, মায়া ঈশ্বরের শক্তিমাত্র, জগৎপ্রপঞ্চ মিথ্যা নহে এবং ভগবৎকৃপাই তাঁহাকে লাভ করিবার একমাত্র পন্থা ।

8.4) দ্বৈতাদ্বৈতবাদ

দ্বৈতাদ্বৈতবাদী নিম্বার্কের মতে জীবসমূহ ও জগৎ সূক্ষরূপে ঈশ্বরের বিরাট শরীরে অবস্থিত ।

8.5) অন্যান্য ব্যাখ্যা

জ্ঞানেশ্বর পাতঞ্জল যোগকেই গীতার শিক্ষা বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন ।

অভিনবগুপ্তের মতে গীতা আধ্যাত্মিক অর্থে পরিপূর্ণ । তিনি বলেন, ধর্মক্ষেত্র শব্দের অর্থ নবদ্বারবিশিষ্ট দেহ, মামকাঃ শব্দের অর্থ প্রজ্ঞালব্দ চিন্তা; ধৃতরাষ্ট্র, কৌরবগণ ও পাণ্ডবগণ কাল্পনিক বস্তু, জড়দেহবান ব্যক্তি নহেন ।

মধুসূদন সরস্বতীর ‘গূঢ়ার্থদীপিকা’ নামক পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত গীতার টীকা পণ্ডিত ভূতনাথ সপ্ততীর্থ কর্তৃক বাংলায় অনূদিত হইয়াছে । তাঁহার মতে বেদের যেমন কর্ম, উপাসনা ও জ্ঞান – এই কাণ্ডত্রয় আছে, অষ্টাদশাধ্যায়ী গীতা তেমনি কাণ্ডত্রয়াত্মিকা । উহার ১ম ষট্‌কে জীবের স্বরূপ (ত্বং পদার্থ = জীবাত্মা), ২য় ষট্‌কে ব্রহ্মের স্বরূপ (তৎ পদার্থ = পরমাত্মা) ও ৩য় ষট্‌কে জীব(ত্বং) ও ব্রহ্মের(তৎ) অভেদতত্ত্ব (অসি = হও) প্রতিপন্ন হইয়াছে ।

তত্ত্বমসি = ত্বং + তৎ + অসি
(টীকাকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : মধুসূদন শঙ্করপন্থী অদ্বৈতবাদী ও চৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন । ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া গ্রামে তাঁহার জন্ম হয় । ইনি সন্ন্যাসগ্রহণপূর্বক কাশীধামস্থ গোপাল মঠে বাস করিতেন । ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’ নামক তাঁহার বেদান্তগ্রন্থ ভারত-বিখ্যাত ।)

ভাষ্যকার যামুনাচার্যের মতে গীতার প্রথম ছয় অধ্যায়ে ভক্তিলাভের উপায়স্বরূপ ভাগবত জ্ঞানের স্বরূপ নির্ণীত হইয়াছে; দ্বিতীয় ছয় অধ্যায়ে ভক্তি ও উপাসনা-সহায়ে লব্ধব্য ভাগবত স্বরূপ বর্ণিত এবং বাকি ছয় অধ্যায়ে পূর্বোক্ত বিষয়দ্বয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ।

রামানুজের গুরু যামুন তাঁহার গীতাগ্রন্থে বলেন যে, নারায়ণই পরব্রহ্ম; একমাত্র ভক্তি দ্বারাই সেই নারায়ণকে প্রাপ্ত হওয়া যায়; স্বধর্মানুষ্ঠান, সম্যক শাস্ত্রজ্ঞান এবং তীব্র বৈরাগ্য দ্বারা ঈশ্বরভক্তি লাভ হয় ।

নিগমান্ত মহাদেশিকের মতে নিষ্কাম কর্ম পরোক্ষভাবে জ্ঞানোৎপত্তি দ্বারা এবং সাক্ষাৎভাবে আত্মানুভূতি-প্রদানে সমর্থ ।

শ্রীঅরবিন্দ পুরুষোত্তমবাদী । তাঁহার গীতাব্যাখ্যার মূল রচনা প্রথমে ইংরেজীতে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় এবং পরে উহা বাংলা, হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হইয়াছে । গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে যে পুরুষোত্তমযোগ বর্ণিত, তিনি তাহাই অবলম্বনপূর্বক স্বীয় দর্শন ব্যাখ্যা করিয়াছেন । তাঁহার মতে এই জীব ও জগৎ ক্ষর পুরুষ, কূটস্থা প্রকৃতি অক্ষর পুরুষ এবং এই উভয় পুরুষের অতীত যে ঈশ্বর তিনি উত্তম পুরুষ বা পুরুষোত্তম । ‘পরমাত্মাই পুরুষোত্তমনামে শাস্ত্রে অভিহিত । সেই পরমাত্মা বিশ্বপ্রপঞ্চে প্রবিষ্ট ও পরিব্যাপ্ত ।’ -[গীতা ১৫|১৭]

বালগঙ্গাধর তিলক বলেন – ‘নিষ্কাম কর্মই গীতার ধর্ম; যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং পূর্ণ আত্মজ্ঞান সত্ত্বেও নিষ্কাম কর্ম অনুষ্ঠান ও প্রচার করিয়াছেন ।’

শ্রীধরস্বামী তাঁহার গীতার টীকায় জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি প্রচার করিলেও জ্ঞান অপেক্ষা ভক্তির প্রাধান্য স্বীকার করিয়াছেন । তাঁহার মতে জ্ঞান ও ভক্তি স্বরূপতঃ এক হইলেও ভক্তিই মুক্তিদাত্রী ।

শ্রীবিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মতে গীতাশাস্ত্র সর্ববেদ-তাৎপর্য-পর্যবসিতার্থ রত্ন দ্বারা অলঙ্কৃত; ইহার অষ্টাদশ অধ্যায়ে অষ্টাদশ বিদ্যা-পরিপূরিত । গীতার প্রথম ছয় অধ্যায়ে নিষ্কাম কর্মযোগ, দ্বিতীয় ছয় অধ্যায়ে ভক্তিযোগ এবং শেষ ছয় অধ্যায়ে জ্ঞানযোগ প্রদর্শিত । ভক্তিযোগ অতিশয় গূঢ় এবং কর্ম ও জ্ঞানের মূল কারণস্বরূপ; অতএব অতিশয় শ্রেষ্ঠ ও সর্ব দুর্লভ বলিয়া মধ্যবর্তী ছয় অধ্যায়ে সন্নিবিষ্ট । ভক্তিরহিত কর্ম ও জ্ঞান উভয়ই বৃথা । এইজন্য সাধকগণ কর্ম ও জ্ঞান উভয়কেই ভক্তিমিশ্রিত করিয়া সাধন করিতে বিধি প্রদান করিয়াছেন ।
(টীকাকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : বিশ্বনাথ বৈষ্ণব ধর্মের আচার্য, চৈতন্যপন্থী এবং অচিন্ত্যভেদাভেদবাদী ছিলেন । তাঁহার মতে শ্রীরাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির ভেদ-অভেদও অচিন্ত্য । ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে উনি নদীয়া জেলার কোন ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন । কোঙ্গলের শ্রীবর্ধন নামক স্থানে তৎপ্রতিষ্ঠিত মঠ অদ্যাপি বর্তমান । তিনি বহু সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন ।)

বলদেব বিদ্যাভূষণের মতে গীতোপনিষদে ঈশ্বর, জীব, প্রকৃতি, কাল ও কর্ম – এই পঞ্চ বিষয় বর্ণিত । তন্মধ্যে বিভুসংবিৎ ঈশ্বর, অণুসংবিৎ জীব, সত্ত্বাদিগুণত্রয়ের আশ্রয়রূপ দ্রব্য প্রকৃতি এবং ত্রিগুণশূন্য জড় দ্রব্য কাল । পুরুষত্বনিষ্পন্ন অদৃষ্টাদি শব্দবাচ্য কর্ম ইত্যাদি রূপে ঈশ্বরাদির লক্ষণ নিরূপিত হইয়াছে । তন্মধ্যে ঈশ্বরাদি চতুষ্টয় নিত্য বস্তু এবং জীবাদি চতুষ্টয় ঈশ্বর-বশীভূত । কর্ম প্রাগ্‌ভাবের ন্যায় অনাদি ও বিনাশী । সংবিৎস্বরূপ ঈশ্বর ও জীব উভয়েই সংবেত্তা (জ্ঞানাশ্রয়) ও অস্মদাদি-শব্দের প্রতিপাদ্য ।
(টীকাকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : ব্রহ্মসূত্রের গোবিন্দভাষ্যের রচয়িতা বলদেব বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর সুযোগ্য শিষ্য । ইনিও চৈতন্যপন্থী এবং অচিন্ত্যভেদাভেদবাদী ছিলেন ।)

8.6) ত্যাগই গীতার বাণী

আত্মজ্ঞানলাভের পর কর্মসন্ন্যাসের প্রকৃষ্ট প্রমাণ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অভূতপূর্ব জীবন । কর্মত্যাগ হইবার পর তিনি ‘গলিতহস্ত’ হইলেন, আর তর্পণাদি কর্ম করিতে পারিলেন না । পরাভক্তি লাভ হইবার পর তিনি আর বিধিপূর্বক জগন্মাতার পূজা ও উপবীত ধারণ করিতে সম্পূর্ণ অক্ষম হইলেন । শ্রীরামকৃষ্ণবলিতেন – “কয়েকবার ‘গীতা’ ‘গীতা’ উচ্চারণ করিলে যাহা হয় (অর্থাৎ ত্যাগী) তাহাই গীতার শিক্ষা ।” সকল কর্মের ফলাকাঙ্ক্ষা-ত্যাগই গীতার বাণী । ‘একমাত্র ত্যাগের দ্বারা অনেকে অমৃতত্ব লাভ করিয়াছিলেন’ – উপনিষদের এই মহতী বাণীই গীতায় বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যাত ।

জার্মান মনীষী গেটে বলিতেন, “তোমাকে সকল কর্ম এক সময় ত্যাগ করিতেই হইবে । এই সনাতন সঙ্গীত অনন্তকাল ধরিয়া আমাদের কর্ণে ধ্বনিত হইতেছে । সমগ্র জীবন প্রত্যেক ঘণ্টায় এই সঙ্গীত আমাদের কর্ণে প্রবেশ করিতেছে যদিও উহা আমরা শুনি না ।”

9) গীতার বৈদেশিক ব্যাখ্যা

গার্বে এবং হপ্‌কিন্‌স অনুমান করেন যে, অনেক লেখক বিভিন্ন শতাব্দীতে গীতায় স্ব স্ব রচনা সংযোজন করিয়াছেন । গার্বে বলেন, “গীতার মৌলিক আকারটি খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে সাংখ্যযোগের ভিত্তিতে রচিত, কিন্তু খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে পুনরায় উহা উপনিষদুক্ত অদ্বৈতবাদের গ্রন্থরূপে গৃহীত ও পরিবর্তিত হয় ।” গার্বে ‘Indian Antiquary’-তে (December 1918)  লিখিয়াছেন, ‘গীতায় সগুণ ও নির্গুণ উপাসনাকে সমান স্থান দেওয়া হইয়াছে । উভয় উপাসনার কোনটিকে উচ্চ বা নীচ বলা হয় নাই । স্থানে স্থানে উভয়ের প্রভেদও অস্বীকৃত হইয়াছে । দুইটি মতের এইরূপ অপূর্ব সমন্বয় বা সামঞ্জস্যই গীতার বৈশিষ্ট্য ।’ গার্বে আরও বলেন, “গীতোক্ত দার্শনিক তত্ত্বের সম্পূর্ণ ভিত্তি প্রায় সাংখ্যযোগের উপর প্রতিষ্ঠিত । সাংখ্যযোগই গীতায় প্রথম স্থান অধিকার করিয়াছে; দ্বিতীয় স্থান মাত্র বেদান্ত-কর্তৃক অধিকৃত । বেদান্ত শব্দটি ‘বেদান্তকৃৎ’-রূপে মাত্র একবার গীতায় উক্ত [১৫|১৫] । কিন্তু সাংখ্য ও যোগের প্রায়শঃই উল্লেখ দৃষ্ট হয় । আর উপর্যুক্ত বেদান্ত শব্দটিও উপনিষদের অর্থে ব্যবহৃত । প্রাচীন ও নবীন দর্শনের অসমঞ্জস সমাবেশ গীতাতে দেখা যায় । বেদান্তের ধারাটি গীতায় আধুনিক, মৌলিক নহে । দার্শনিক বা ধর্মীয় যে দৃষ্টিতেই গীতাকে বিচার করা যায়, উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত সমীচীন মনে হয় ।”

হপ্‌কিন্‌স বলেন, “পরবর্তী কালের কোন বিষ্ণু-উপাসনা-মূলক উপনিষদ্‌কে কৃষ্ণভাবোদ্দীপক গ্রন্থে পরিণত করিয়া গীতা উৎপন্ন হইয়াছে ।” হোল্‌জমানের মতে কোন বেদান্ত-গ্রন্থকে বিষ্ণুভক্তি-প্রচারের উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত করিয়া গীতা সৃষ্ট হইয়াছে ।বেরিডেল কীথ বলেন, “শ্বেতাশ্বতরের ন্যায় গীতা পূর্বে একখানি উপনিষদ্‌ ছিল । পরে উহা কৃষ্ণোপাসনার গ্রন্থরূপে পরিবর্তিত ।” বার্নেটেরধারণা যে, গীতাকারের যত্নে বিভিন্ন ধর্মমত সুশৃঙ্খলভাবে সমঞ্জস হইয়াছিল । পল ডয়সনবলেন, “উপনিষদুক্ত অদ্বৈতবাদের অধঃপতনের যুগে গীতা এক বিকৃত সৃষ্টি । উক্ত যুগে আস্তিকতা ধীরে ধীরে নাস্তিকতায় পরিবর্তিত হইতেছিল ।” সেনেটের মতে স্বতঃসিদ্ধ বা স্বাভাবিক সমন্বয়সাধনই (spontaneous syncretism) গীতার মুখ্য উদ্দেশ্য । চার্লস জনস্টন বলেন, “ভগবদ্‌গীতা সেই বেদসরোবর, যাহার স্বচ্ছ ও শুদ্ধ সলিল ভারত-ভারতীর দারুণ সংঘর্ষের সঙ্গে যুগে যুগে ভারতেতিহাসরূপ অরণ্যের মধ্য দিয়া বেদরূপ হিমালয়ের অগম্য শৃঙ্গ হইতে প্রবাহিত ও সঞ্চিত ।”

10) গীতার প্রচার

ভারতে এবং ভারতেতর বহু দেশে গীতার খুব প্রচার হইয়াছে । বাংলা ভাষায় উহার অনেক অনুবাদ ও সংস্করণ হইয়াছে ও হইতেছে । এতদ্ব্যতীত মারাঠী, গুজরাটী, হিন্দী, উড়িয়া, আসামী, তেলেগু, তামিল, মালয়ালম্‌, কানাড়ী, মেবারী, মারোয়াড়ী, সিন্ধী, গুরুমুখী, উর্দু, খাসিয়া, ফারসী, গাড়োয়ালী, নেপালী প্রভৃতি ভারতের প্রায় সকল ভাষায় গীতার অসংখ্য অনুবাদ ও সংস্করণ হইয়াছে । গোরক্ষপুর গীতা প্রেস হইতে প্রকাশিত হিন্দী গীতার কয়েক লক্ষ খণ্ড বিক্রীত হইয়াছে ।

কলিকাতায় বাঁশতলা গলিস্থিত গীতা লাইব্রেরিতে এপর্যন্ত পৃথিবীর ছত্রিশটি ভাষায় গীতার যে পঁচিশ শতাধিক সংস্করণ হইয়াছে তাহার মধ্যে সাতাশটি ভাষায় প্রায় এগার শত সংস্করণের নমুনা-গীতা সংগৃহীত আছে । গীতা-প্রেমিকের এইগুলি অবশ্য দর্শনীয় ।

10.1) ইংরেজী অনুবাদ

রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী স্বরূপানন্দ, স্বামী পরমানন্দ, স্বামী প্রভবানন্দস্বামী নিখিলানন্দ-কৃত গীতার ইংরেজী অনুবাদ দেশে ও বিদেশে বিশেষ খ্যাতিলাভ করিয়াছে । কোন কোন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামী স্বরূপানন্দের গীতা পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্বাচিত হইয়াছে । স্বামী প্রভবানন্দ ইংরেজ কবিক্রীস্টোফার ঈশারউডের সহযোগে গদ্যে ও পদ্যে গীতার ইংরেজী অনুবাদ করিয়াছেন । বিখ্যাত ইংরেজ মনীষী অলডাশ হাক্সলীইহাতে একটি মনোজ্ঞ ভূমিকায় লিখিয়াছেন, ‘জগতে যে সনাতন দর্শন আবিষ্কৃত হইয়াছে, উহার প্রাঞ্জলতম ও পূর্ণতম সংক্ষিপ্তসার গীতায় আছে । শুধু ভারতীয়গণের জন্য নহে, সমগ্র মানবজাতির জন্য উহার স্থায়ী মূল্য আছে । সনাতন দর্শনের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক বিবৃতি ভগবদ্‌গীতা দিয়াছেন ।’ মাদ্রাজ রামকৃষ্ণ মঠ হইতে উক্ত গীতার একটি ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে ।

স্যার চার্লস্‌ উইলকিন্স-কৃত গীতার ইংরেজী অনুবাদ ১৭৮৫ খ্রীঃ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক লণ্ডন হইতে প্রকাশিত হয় । ইহাতে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেলওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক লিখিত ভূমিকা আছে । ইহাই বিদেশীয় ভাষায় মূদ্রিত ও অনূদিত সর্বপ্রথম ভারতীয় গ্রন্থ ও গীতার প্রথম ইংরেজী অনুবাদ ।

এ্যানি বেসান্ত কর্তৃক অনূদিত ইংরেজী গীতার লক্ষাধিক কপি বিক্রীত হইয়াছে । এ ছাড়া স্যার এডুইন আরনল্‌ড-কৃত গীতার পদ্যানুবাদ; জন ডেভিস্‌, অধ্যাপক ফ্রাঙ্কলিন এডগার্টন, হোলডেন, এডোয়ার্ড সাম্ফশন, উইলিয়াম কিউ. জাজ, চার্লস্‌ জনস্টোন, রেভারেণ্ড আর. ডি. গ্রিফিথ, রাইডার এফ্‌. টী. ব্রুকস্‌, ই. ওয়াশবার্ণ হপ্‌কিন্স প্রভৃতি-কৃত গীতার ইংরেজি গদ্যানুবাদ বিশেষ প্রচলিত ।

10.2) অন্যান্য বিদেশী ভাষায় অনুবাদ

ফরাসী অনুবাদ : আন্না কামেস্কী, এমিল বার্ণফ, এ. এন্ডিউড শুল্‌ফ

জার্মান অনুবাদ : গদ্যে – রিচার্ড গার্বে, পল ডয়সন, লিওপল্‌ড ফন শ্রেডার; পদ্যে – ফ্রাঙ্ক হার্টম্যান ও থিওডর স্প্রিংম্যান

ল্যাটিন অনুবাদ : আগাস্টাস গিলেলমাস শ্লেগেল

ইটালিয়ান অনুবাদ : এন. ডি. ফ্লোরেন্স

সুইডিশ অনুবাদ : নিনো রুনেবার্গ, উইলিয়াম জাজ ও ফ্রাঞ্জ লেক্ষাউ

রাশিয়ান অনুবাদ : ম্যাঞ্জিয়ারলি ও কামেস্কী

ডাচ্‌ অনুবাদ : ল্যাবার্টন ও ডাঃ জে. ডবলিউ. বৈশেডাইন

স্পানিশ অনুবাদ : এ. ত্রিমিশভ ও জে. আর. বোরেল

বোহেমিয়ান অনুবাদ : ডাঃ এ. হটিম্যান

হাঙ্গেরিয়ান অনুবাদ : লেগ্রাডি ন্যম্‌দা কন্যুকিয়াডো

জাপানী অনুবাদ : অধ্যাপক জে. তাকাকুশু

তিব্বতী অনুবাদ : জনৈক লামা

10.3) বাংলায় অনুবাদ

রামদয়াল মজুমদার, দামোদর মুখোপাধ্যায়, দেবেন্দ্রবিজয় বসু, রাজেন্দ্রনাথ ঘোষ, কৃষ্ণানন্দ স্বামী, অবিনাশ শর্ম ও জগদীশচন্দ্র ঘোষ-কৃত গীতার বাংলায় অনুবাদ প্রসিদ্ধ । পণ্ডিত প্রমথনাথ, পণ্ডিত ভূতনাথ সপ্ততীর্থ ও পণ্ডিত পার্বতীচরণ যথাক্রমে গীতার শাঙ্করভাষ্য, গূঢ়ার্থদীপিকা ও সুবোধিনী টীকার বঙ্গানুবাদ করিয়া অমর হইয়াছেন । বাংলায় গীতায় বহু পকেট-সংস্করণ আছে ।

10.4) গীতার অন্যান্য প্রচার

শ্রীশ্রীচণ্ডীর ন্যায় গীতারও অখণ্ড পাঠ হইয়া থাকে । কোথাও কোথাও গীতার নিত্য পাঠ হয় । সুর-তান-লয়-যোগে বহুস্থানে গীতা গীত হয় । ইহার পাঠে মহাশান্তি ও স্বস্ত্যয়ন হয় । বিশ্বষতঃ বিশ্বরূপদর্শন (১১শ) অধ্যায় (যাহা ব্রহ্ম অধ্যায়রূপে বর্ণিত) শুচি, অশুচি, সর্বাবস্থায় পাঠ করা যায় । লাহোর, করাচি প্রভৃতি শহরে ‘গীতা-হল্‌’ নির্মিত হইয়াছিল । মহারাষ্ট্রে গীতার জ্ঞানেশ্বরী ব্যাখ্যা শুনিবার জন্য সহস্র সহস্র নরনারীর সমাগম হয় । বরোদা ও আমেদাবাদে যে বিশাল ‘গীতা মন্দির’ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহাতে গীতাদেবীর মূর্তি নিত্য পূজিত হয় । বাঙ্গালোরে জনৈকা স্ত্রীভক্ত গীতার সকল শ্লোক কাপড়ের উপর রেশমের সেলাই দ্বারা লিখিয়াছেন । উক্ত গ্রন্থখানি দেখিবার সৌভাগ্য আমাদের হইয়াছে । অনেক পণ্ডিত এখনও আছেন যাঁহাদের সমগ্র গীতা কণ্ঠস্থ । কোন কোন কলেজে গীতা পাঠ্যপুস্তকরূপে পঠিত হয় ।

11) গীতা ও উপনিষদাবলী

গীতা একটি উপনিষদ্‌ । প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে বেদ-ব্যাস গীতাকে উপনিষদ্‌ বলিয়াছেন । উপনিষদ্‌-তত্ত্বই গীতায় পত্রপুষ্পে শোভিত ও পরিবর্ধিত । উপনিষদ্‌রূপ গাভীসমূহের দুগ্ধই এই গীতামৃত [গীতার ধ্যান, ৪] । উপনিষদের নিগূঢ় নির্যাস শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের জন্য গীতামৃতরূপে পরিণত করিয়াছেন ।

উপনিষদ্‌সমূহের ন্যায় গীতাও কম্বুকণ্ঠে আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্মতত্ত্ব ঘোষণা করিয়াছেন । ব্রহ্মতত্ত্বের এমন সুললিত ও সহজবোধ্য ব্যাখ্যা অন্য কোন গ্রন্থে দেখা যায় না । শঙ্করাচার্যসেইজন্য তাঁহার উপনিষদ্‌ ও গীতার ভাষ্যে একই তত্ত্ব প্রচার করিয়াছেন । অদ্বৈতনিষ্ঠ প্রস্থানত্রয়ের মধ্যে গীতা অন্যতম ।

11.1) উপনিষদ্‌ এবং গীতার শ্লোকে সাদৃশ্য

উপনিষদের কয়েকটি শ্লোক গীতায় কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত আকারে পাওয়া যায় । উদাহরণস্বরূপ নিম্নে কিছু সমানার্থক শ্লোক উদ্ধৃত করা হইল । আরও সাদৃশ্যযুক্ত শ্লোক উদ্ধৃত করা যাইতে পারে । অতএব গীতাপাঠ করিলেই উপনিষদ্‌পাঠ হয় । গীতা উপনিষদের শ্রেষ্ঠ ভাষ্য ।

কঠোপনিষদের ১|২|১৫ : গীতার ৮|১১
কঠোপনিষদের ২|৭,১৫,১৮-১৯ : গীতার ৮|১১, ২|২০, ২|১৯
ঈশোপনিষদের ৫ : গীতার ১৩|১৬ ও ৬|২৯
মুণ্ডক উপনিষদের ২|১|২ : গীতার ১৩|১৫

11.2) গীতা এবং ব্রহ্মতত্ত্ব

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্তে অর্জুন গীতার উপদেশ বিস্মৃত হওয়ায় পুনর্বার উহা প্রার্থনা করিলে ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন – “যে ব্রহ্মতত্ত্ব তোমাকে পূর্বে যোগযুক্ত হইয়া বলিয়াছিলাম, তাহা সম্পূর্ণরূপে পুনরায় বলা অসম্ভব ।”[মহাভারত, অশ্বমেধ পর্ব, ১৬শ অধ্যায়]

বেদতুল্য গীতার ভাগবত বাণী নিত্য ও অপৌরুষেয় । গীতা পঞ্চম বেদ । গীতাতত্ত্ব ও বেদবাণী অভেদ । সেইজন্য স্বামী বিবেকানন্দবলিয়াছেন যে, গীতা বেদের সর্বোত্তম ভাষ্য । গীতা ব্রহ্মযোগ-শাস্ত্র ও অদ্বৈতামৃতবর্ষিণী । ব্রহ্মবিদ্যাই গীতার প্রতিপাদ্য তত্ত্ব । গীতায় ব্রহ্মযোগ বিবৃত । ব্রাহ্মীস্থিতি বা ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করা, গুণাতীত যোগারূঢ় বা স্থিতপ্রজ্ঞ হওয়াই গীতার উপদেশ ।

11.3) যুদ্ধক্ষেত্রে গীতা কিরূপে উপদিষ্ট হইল ?

ইহা অসম্ভব নহে । ইতিহাসে দৃষ্টান্ত আছে । রোমান সম্রাট্‌ মার্কাস্‌ অরেলিয়াস যে যুদ্ধে যাইয়া নিহত হন, সেই যুদ্ধে যাইবার পূর্বে তিনি তিন দিবস স্বীয় রাজধানীর বিদ্বদ্‌বর্গকে প্রাসাদে আহ্বানপূর্বক দর্শনালোচনা করিয়াছিলেন ।

12) গীতা ও ভাগবত

গীতা ও ভাগবতে একই তত্ত্ব উপদিষ্ট । উভয় গ্রন্থে একই অবতারের উপদেশ প্রবিবৃত । গীতার বক্তা কুরুক্ষেত্রের শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীমদ্‌ভাগবতে বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের বাণী গ্রথিত । গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে এবং ভাগবতের একাদশ স্কন্ধে জ্ঞানযোগ বর্ণিত । গীতার দ্বাদশ অধ্যায়ে এবং ভাগবতের দশম স্কন্ধে ভক্তিযোগ বিবৃত । উভয় গ্রন্থেই সমানভাবে জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি ও যোগতত্ত্ব স্থান পাইয়াছে ।
“অব্যভিচারিণী ভক্তি দ্বারা ত্রিগুণাতীত হওয়া যায়” [গীতা ১৪|২৬]
“আত্মারাম মুনিগণ অহৈতকী ভক্তি লাভ করেন” [ভাগবত]

আবার গীতার ন্যায় ভাগবতেও আত্মতত্ত্ব উপদিষ্ট । ভাগবতের ১২শ স্কন্ধের শেষেশুকদেব রাজা পরীক্ষিৎকে আত্মজ্ঞানের উপদেশ দিতেছেন । ভাগবতের বেদস্তুতিতে আছে – “আত্মতত্ত্ব প্রকাশের জন্যই ভগবান্‌ মানবরূপে অবতীর্ণ হন ।” গীতার মতে যুগে যুগে অবতার আগমন করেন । ভাগবতেও উক্ত হইয়াছে ‘অবতার অসংখ্য’ ।

গীতায় শ্রীভগবান্‌ ভক্তকে সর্বধর্ম পরিত্যাগ পূর্বক তাঁহার শরণাগত হইবার জন্য উপদেশ দিয়াছেন [১৮|৬৬] । তদ্রূপ শ্রীমদ্‌ভাগবতেও আছে “সর্বপ্রযত্নে সকল প্রাণীর আত্মস্বরূপ আমার শরণাগত হও । তাহা হইলে আমার দ্বারা অকুতোভয় (সর্বত্র নির্ভয়) হইবে [১১|১২|১৫] ।” শরণাগতি দ্বারাই ভক্ত অভয় লাভ করেন । শ্রীশ্রীচণ্ডীর অন্তে মেধা ঋষিও রাজা সুরথকেভবভয়নাশের জন্য পরমেশ্বরী ভগবতীর শরণাগত হইতে বলিতেছেন ।

13) গীতার উদারতা

গীতা সার্বজনীন ধর্মগ্রন্থ । গীতা সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের, সকল শ্রেণীর ধর্মগ্রন্থ হইবার যোগ্য । গীতাশাস্ত্রে কোন ‘গোড়ামি’ বা সংকীর্ণতা স্থান পায় নাই ।

“যে যেভাবে আমায় আরাধনা করে, আমি সেই ভাবে তাহাকে কৃপা করি । সকল ধর্মপিপাসু মৎপথেই বিচরণ করিতেছে ।” [৪|১১]

“যাহারা ঈশ্বরের যে কোন রূপ শ্রদ্ধাপূর্বক অর্চনা করিতে ইচ্ছা করে, আমি তাহাদিগকে সেই মূর্তিতে ভক্তি ও বিশ্বাস প্রদান করি ।” [৭|২১]

“যাহারা শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া অন্য দেবতা উপাসনা করে, তাহারাও অবিধিপূর্বক আমারই উপাসনা করে ।” [৯|২৩]

এইরূপ সার্বজনীনতা ও উদারতা অন্য ধর্মগ্রন্থে দুষ্প্রাপ্য । ভগবানের অসংখ্য নাম ও অসংখ্য রূপ । তাঁহার যে কোন একটি নামে ও রূপে আমাদের নিষ্ঠা হইলেই মুক্তি করতলগত হইবে । নিষ্ঠাপূর্বক তাঁহার একটি নাম জপ ও একটি রূপ ধ্যান করিলেই মোক্ষলাভ হয় । অপরের ইষ্টকে শ্রদ্ধা করা ইষ্টনিষ্ঠার একটি প্রধান সাধন । অপরের ইষ্টকে অশ্রদ্ধা করা অনুচিত । কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, রাজযোগ ও জ্ঞানযোগ প্রত্যেকটি অন্যনিরপেক্ষ স্বতন্ত্র মুক্তি-মার্গ, এই ভাবটি গীতার কয়েকটি শ্লোকে পরিস্ফুট হইয়াছে । স্বামী বিবেকানন্দ গীতার উক্ত বৈশিষ্ট্য মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়াছেন । রুচির বৈচিত্রহেতু ঋজু, কুটিল যে পথে মানুষ চলুক না কেন, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা থাকিলে সাধকের ঈশ্বরলাভ হইবেই । ভগবান্‌ শ্রীরামকৃষ্ণ তাই বলিতেন, “যত মত তত পথ” । এক-একটি ধর্মমত যে ঈশ্বরলাভের ভিন্ন ভিন্ন পথ, তাহা তিনি তাঁহার অভূতপূর্ব ও অলৌকিক জীবনে সাধন করিয়া দেখাইয়াছেন ।

14) গীতায় আত্মার অমরত্ব

কুরুক্ষেত্রে অর্জুন আত্মীয়বর্গকে যুদ্ধার্থে উপস্থিত দেখিয়া দুঃখিত হইলেন । তিনি স্বজনগণকে বিনাশপূর্বক রাজ্যলাভের ইচ্ছা ত্যাগ করিলেন । তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের মৃত্যুভয় দূর করিবার জন্য তাঁহাকে আত্মার অমরত্ব শিক্ষা দিলেন । শ্রীভগবান্‌ বলিলেন – “এই নরপতিগণ ও আমরা পূর্বে ছিলাম না, বা পরে থাকিব না – ইহা সত্য নহে ।” অর্থাৎ আমরা ও ইহারা আত্মারূপে জন্মের পূর্বেও ছিলাম এবং মৃত্যুর পরেও থাকিব । আত্মার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই; আত্মা অমর । মানুষ দেহমাত্র নহে । মানুষ আত্মাই । দেহের জন্ম বা মৃত্যু হয় । মৃত্যু আত্মাকে স্পর্শ করিতে পারে না । মৃত্যুতে স্থূল দেহের ধ্বংশ হয় মাত্র । “বস্ত্র জীর্ণ হইলে যেমন উহা পরিত্যাগ করিয়া আমরা নূতন বস্ত্র পরিধান করি, তেমনি আত্মা ভগ্ন ও জীর্ণ দেহ ত্যাগ করিয়া নূতন দেহ গ্রহণ করে [২|২২] ।” মৃত্যুর পরে পুনর্জন্ম হয়; পুনর্জন্ম দেহান্তরপ্রাপ্তি মাত্র । কৌমার, যৌবন ও জরার ন্যায় মৃত্যুও দেহের একটি অবস্থামাত্র । “আত্মাকে মৃত্যু বিনাশ করিতে পারে না, অস্ত্র ছেদন করিতে পারে না, অগ্নি দগ্ধ করিতে পারে না, জল সিক্ত করিতে পারে না এবং বায়ু শুষ্ক করিতে পারে না [২|২৩] ।” ইহাই গীতার প্রথম ও প্রধান শিক্ষা ।

আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস করিলে অর্জুনের ন্যায় আমাদেরও মৃত্যুভয় বিদুরিত হইবে, শোক অন্তর্হিত হইবে । শ্রীমদ্‌ভাগবতের ১২শ স্কন্ধেশুকদেব রাজা পরীক্ষিৎকে মৃত্যুভয় দূর করিবার জন্য আত্মজ্ঞানের উপদেশ দিবার উদ্দেশ্যে বলিতেছেন, “আত্মা দেহ হইতে পৃথক্‌ । তুমি অমর আত্মা – এই জ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুভীতি যাইবে না ।”

গ্রীসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী সক্রেটিস আত্মজ্ঞান লাভ করিয়া মৃত্যুঞ্জয় হইয়াছিলেন । মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইয়া শেষ জীবনে তিনি যখন কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন, তখন তাঁহার জনৈক শিষ্য তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “মৃত্যুর পর আপনার দেহ কিভাবে সৎকার করিব ?” সক্রেটিস তদুত্তরে বলিয়াছিলেন, “আমার দেহের সৎকার যেভাবে ইচ্ছা করিও, তবে ইহা নিশ্চিত জানিও যে, এই দেহ সক্রেটিস নহে ।”

জন্মের পূর্বে যে আমরা ছিলাম এবং মৃত্যুর পরেও থাকিব, বিনষ্ট হইব না – এই ধারণা আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের হৃদয়ে বিদ্যমান । মন একটু অন্তর্মুখীন ও একাগ্র হইলেই উক্ত সত্য প্রতিভাত হয় । ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বার্ট্রাণ্ড রাসেল(Bertrand Russel) তাঁহার নবম বা দশমবর্ষীয় পুত্রকে খ্রীষ্টান ধর্মের একটি তত্ত্ব শিক্ষা দিবার উদ্দেশ্যে বলিলেন, “মিশরের পিরামিড যখন নির্মিত হয়, তখন তোমার অস্তিত্ব ছিল না । জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তোমার অস্তিত্ব আসিয়াছে ।” (খ্রীষ্টানগণ জন্মান্তরে বিশ্বাসী নহেন ।) পুত্র পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, “সে (পুত্র) তখন কি করিতেছিল ?” পিতা তাহাকে বারবার বলা সত্ত্বেও বালক কিছুতেই তাহার জন্মের পূর্বের অনস্তিত্ব বিশ্বাস করিতে পারিল না । মানুষ দেহাতিরিক্ত আত্মা, সুতরাং কিরূপে এইরূপ বিশ্বাস করা সম্ভব ?

দেহবুদ্ধির প্রাবল্যহেতু আত্মবুদ্ধি সম্প্রতি অন্তর্হিত হইয়াছে । আত্মবুদ্ধি বৃদ্ধির সঙ্গেই ক্ষুধাতৃষ্ণা, জন্মমৃত্যু, জরাব্যাধি প্রভৃতি জড়ধর্মের অধীনতা দূর হয়; সকল দুর্বলতা, দূঃখ ও দৈন্য পলায়ন করে; মানব মৃত্যুঞ্জয় ও মহাবীর হয় ।

15) গীতায় অবতারবাদ

শ্রীমদ্‌ভাগবতের ন্যায় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাও অবতারবাদ প্রচার করেন । সম্ভবতঃ সর্বপ্রথম গীতাতেই অবতার-তত্ত্ব সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত ।  গীতায় [৪|৭-৯] ভগবান্‌ স্বয়ং বলিয়াছেন –

“যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের উত্থান হয় তখনই আমি অবতীর্ণ হই । সাধুরক্ষা, দুষ্টবিনাশ ও ধর্মস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে নরদেহ ধারণ করি ।”

অবতারে বিশ্বাস হইলে মুক্তিলাভ হয়, আর পুনর্জন্ম হয় না । শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাই বলিতেন, “অবতারে বিশ্বাস পূর্ণ জ্ঞানের লক্ষণ ।” মূঢ়গণই মনুষ্যতনুধারী ভগবানে বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারে না । অবতারবাদেই ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত ।

অবতার মায়ামনুষ্য । তিনি মায়াধীশ; জীবের ন্যায় মায়াধীন নহেন । তিনি যেন দেহবান্‌ হন, যেন জাত হন । অবতার নরদেহধারী ভগবান্‌ । দেহধারণকালে তিনি তাঁহার ভাগবতস্বরূপ বিস্মৃত হন না । অবতার দেব-মানব, ‘নির্গুণ গুণময়’, ‘নিরঞ্জন নররূপধর’ ।

দেবত্ব ও মানবত্বের অপূর্ব মিলন অবতারে দৃষ্ট হয় । ভক্তিতে মানবের অন্তর্নিহিত দেবত্ব প্রস্ফুটিত হয় । ঈশ্বর ও মানবের মিলনভূমি এই অবতার । অবতারকে দর্শন করিলেই ঈশ্বরদর্শন করা হয় । অবতারগণের জন্ম অলৌকিক; কারণ তাঁহারা জীবের ন্যায় কর্মাধীন নহেন । ঈশ্বরের নরলীলাই সর্বোত্তম । অবতারের লীলাস্মরণ, তাঁহার নামজপ ও তাঁহার মূর্তিধ্যানই ধর্মজীবনের প্রধান সাধন । এইজন্য ভগবান্‌ অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখাইলেন ।

নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্ম কিরূপে সাকার ও সগুণ হন, কিরূপে রক্তমাংসের শরীরে আবির্ভূত হন – এই গভীর রহস্য দুর্ভেদ্য । অবতারকে আশ্রয় করিলে ধর্মসাধন সহজ হইয়া যায় । বিশ্বরূপ দর্শনান্তে শ্রীকৃষ্ণে অর্জুনের ভগবদ্বুদ্ধি আসা মাত্র অর্জুনের মোহরাত্রি অতীত হইল । যীশুখ্রীষ্টের অবতারত্বে বিশ্বাস আসিতেই সল পলে পরিণত হইলেন । মানবের দেবত্ব এবং ভগবানের মানবত্ব প্রকটিত হয় অবতারবাদে । অবতারকে চিন্তা করিলেই ঈশ্বরকে চিন্তা করা হয় । বেদে অবতারবাদ ব্যক্ত হয় নাই । পরবর্তী যুগে ভক্তিধর্মের উৎপত্তির সঙ্গে অবতারবাদ উৎপন্ন হয় । পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মে উক্ত মত কোন-না-কোন প্রকারে বিকশিত হইয়াছে ।

16) গীতোক্ত কর্মযোগ

নিষ্কাম কর্মযোগই গীতার শ্রেষ্ঠ বাণী । বর্ণধর্ম ও আশ্রমধর্ম অনাসক্তভাবে পালন করিলে ভগবদ্দর্শন হয় । অনাসক্ত হইয়া কর্তব্য কর্ম করিলে ক্রমে ক্রমে চিত্তশুদ্ধি ও পরে জ্ঞান লাভ হয় ।

মহাভারতে [১২|১৮|৩১] অর্জুন বলিতেছেন – “যে অনাসক্ত বন্ধনহীন পুরুষ শত্রু-মিত্রে সমদর্শী এবং সক্তবৎ ব্যবহারশীল হন, তিনি মুক্ত । হে মহীপতে ইহাই গীতোক্ত মুক্তির আদর্শ ।”

যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতিতে [৩|২০৪-০৫] সন্ন্যাসীর অবস্থা বর্ণনান্তে কথিত আছে, ‘সত্যশীল, জ্ঞাননিষ্ঠ গৃহী সন্ন্যাসগ্রহণ না করিয়াও মুক্তিলাভ করেন ।’

গান্ধীজীর মতে গীতায় অনাসক্তিযোগ কথিত । অনাসক্তি যতই মনে দৃঢ়মূল হইবে, ততই চিত্ত শুদ্ধ হইবে, ততই আধ্যাত্মিক তত্ত্বের আস্বাদ পাওয়া যাইবে ।

গীতা কর্ম ত্যাগ করিতে উপদেশ দেন নাই; কর্মে অনাসক্তি, কর্মফলত্যাগই গীতার মহীয়সী বাণী । জগতের অন্য কোন ধর্মগ্রন্থ এত মুক্তকণ্ঠে এই অদ্ভুত তত্ত্ব প্রচার করেন নাই । সচন্দন পুষ্প ভগবানের চরণে অর্পণ করিলে যেমন পূজা হয়, তেমনি স্ব স্ব কর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করিলেও তাঁহার উপাসনা হয় । নিষ্কাম কর্মও এক প্রকার ঈশ্বরারাধনা ।

স্বামী বিবেকানন্দ বলিতেন, “বুদ্ধদেব ধ্যানের দ্বারা ও যীশুখ্রীষ্ট প্রার্থনার দ্বারা যে আধ্যাত্মিক অবস্থা ও দিব্যভাব লাভ করিয়াছিলেন, অনাসক্ত কর্মী নিষ্কাম কর্মের দ্বারাও সেই উচ্চাবস্থা লাভ করিবেন ।” তাই স্বামীজী কর্মসঙ্কুল বর্তমান যুগে নারায়ণজ্ঞানে জীবসেবা ধর্মের প্রধান অঙ্গরূপে প্রবর্তন করিলেন ।

চৈনিক ঋষি লাউৎজে (Laozi also Lao-Tzu or Lao-Tze) প্রাচীন চীনে wa wei wei বা নিষ্কাম কর্মযোগ শিক্ষা দিয়াছেন । লাউৎজে তাঁহার ‘তাও তে-কিং’ (Tao Te Ching) নামক জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থে বলেন – “অনাসক্ত মানবই জগতে পূর্ণ স্বাধীনতা ও শান্তি উপভোগ করিতে সমর্থ । তিনি জগতে বাস করিয়াও জগদতীত হন ।”

প্রসিদ্ধ ইংরেজ মনীষী অলডাশ্‌ হাক্সলী (Aldous Huxley) তাঁহার “Ends and Means” নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন যুগে প্রচলিত আদর্শ মানবের বহু সংজ্ঞা সমালোচনাপূর্বক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে, গীতোক্ত অনাসক্ত মানবই আদর্শ পুরুষ । যিনি যত অনাসক্ত তিনি তত উন্নত ।

ফরাসী দেশের ভূতপূর্ব প্রধান মন্ত্রী ক্লেম্যান্সো(Georges Benjamin Clemenceau) বলিয়াছেন – গীতোক্ত কর্ম-কৌশল যদি জানিতাম তাহা হইলে আমার কর্ম-জীবন ধর্ম-জীবনে পরিণত হইত । খ্রীষ্টান সাধক ব্রাদার লরেন্সনিষ্কামভাবে পাচকের কর্ম করিয়াই সর্বত্র ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করিয়াছিলেন ।

ব্যাধগীতাতে আছে যে, ব্যাধ মাংসবিক্রয়রূপ স্বীয় বর্ণধর্ম অনাসক্তভাবে পালন করিয়াই আত্মজ্ঞান-লাভ করিয়াছিলেন । মহাভারতে দেখা যায়, অনাসক্তচিত্তে পতিসেবা দ্বারাই সতীসাধ্বী স্ত্রীর জ্ঞান-চক্ষু উন্মীলিত হইয়াছিল । অনাসক্তভাবে স্বধর্মপালনই শ্রেষ্ঠ সাধনা । সকল সময়ে সকল অবস্থায় অনাসক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হইলে মানুষ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় ।

17) বৌদ্ধধর্ম ও গীতা

ডাঃ রাধাকৃষ্ণনের মতে “গীতার প্রভাব পুরাকালে চীন ও জাপান পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল । মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রধান গ্রন্থদ্বয় ‘মহাযানশ্রদ্ধোৎপত্তি’ এবং ‘সদ্ধর্মপুণ্ডরীক’ গীতাতত্ত্বের নিকট গভীরভাবে ঋণী ।” হিন্দুধর্মে গীতা যে স্থান অধিকার করিয়াছে, বৌদ্ধধর্মে ধম্মপদও সেই স্থান পাইয়াছে । ধম্মপদ ও গীতার মধ্যে ভাবসাদৃশ পরিলক্ষিত হয় ।

17.1) যোগক্ষেম শব্দের ব্যবহার

যে ভক্ত অনন্যচিত্ত হইয়া নিরন্তর ঈশ্বরের উপাসনা করেন, ঈশ্বর স্বয়ং তাঁহার যোগক্ষেমবহন করেন [গীতা ৯|২২] ।

সেই সকল সতত চেষ্টাশীল এবং নিত্য দৃঢ়পরাক্রম ধ্যানিগণ পরম শান্তি (যোগক্‌খেমং)-রূপ নির্বাণ লাভ করেন [ধম্মপদ, অপ্পমাদো বগ্‌গো, ৩] ।

মন্দবুদ্ধিগণ শ্রেয় (যোগক্ষেমাদ্‌) অপেক্ষা প্রেয়কে বরণ করেন [কঠোপনিষদ, ১|২|২] ।

ব্রহ্মই যোগক্ষেমরূপে প্রাণাপানে অবস্থিত[তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ৩|১০|২] ।

যোগক্ষেম শব্দটি গভীর অর্থপূর্ণ । যোগ অপ্রাপ্ত বস্তুর প্রাপ্তি এবং ক্ষেম প্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ ।শঙ্করমতে যোগক্ষেম আহারাদি সকল প্রয়োজনীয় বস্তু । শ্রীধর শব্দটি ‘মুক্তি’ অর্থে ব্যাখ্যা করিয়াছেন । ধম্মপদ-মতে যোগক্‌খেমং=যোগক্ষেম=মুক্তি । শ্রীধর ও ধম্মপদ এক অর্থেই যোগক্ষেম শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন । শব্দটি অতি প্রাচীন, সম্ভবতঃ উপনিষৎ ও গীতা হইতে উহা ধম্মপদে গৃহীত ।

18) গীতায় যোগচতুষ্টয়ের সমন্বয়

গীতায় যে ধর্ম-সমন্বয় ধ্বনিত হইয়াছে, তাহা ধর্মেতিহাসে অপূর্ব । (নিষ্কাম) কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ ও রাজযোগ – এই চারটি অন্যনিরপেক্ষ মোক্ষমার্গের এরূপ অপূর্ব সমন্বয় অন্য শাস্ত্রে নাই । শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী – “যত মত তত পথ” গীতাতেই ব্যাখ্যাত । পূজ্যপাদস্বামী জগদানন্দজী যখন আমার গীতাখানি সংশোধন করিতেছিলেন তখন তিনি গীতার এই সমন্বয়-সূত্রটি আমাকে ধরাইয়া দেন ।

18.1) নিষ্কাম কর্মযোগ দ্বারা মুক্তি

শ্রীভগবান অর্জুনকে বলিতেছেন [৩|১৯] – সেই হেতু সদা অনাসক্ত হইয়া কর্তব্য কর্ম অনুষ্ঠান কর । মানুষ অনাসক্ত হইয়া কর্ম করিলে পরম পদ প্রাপ্ত হয় ।

18.2) জ্ঞানযোগ দ্বারা মুক্তি

শ্রীভগবান বলিতেছেন [১২|৩-৪] – যাঁহারা ইন্দ্রিয়সমূহ সংযত করিয়া এবং সর্বত্র সমবুদ্ধি ও সদা সর্বভূতের হিতে রত হইয়া অক্ষর, অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল, নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহারা আমাকেই প্রাপ্ত হন ।

18.3) ভক্তিযোগ দ্বারা মুক্তি

শ্রীভগবান বলিতেছেন [১১|৫৪] – কেবলমাত্র অনন্যা ভক্তি দ্বারাই আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে, প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ করিতে এবং আমাতে বিলয়রূপ মোক্ষলাভ করিতে ভক্তগণ সমর্থ হয় ।

18.4) রাজযোগ দ্বারা মুক্তি

শ্রীভগবান বলিতেছেন [৫|২৭,২৮] – বাহ্য বিষয় মন হইতে বাহির করিয়া দৃষ্টি ভ্রূযুগলের মধ্যে স্থির করিয়া নাসিকার মধ্যে বিচরণশীল প্রাণ ও অপান বায়ুর ঊর্ধ্ব ও অধোগতি রোধ করিয়া এবং ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সংযমপূর্বক ইচ্ছা, ভয় ও ক্রোধশূন্য হইয়া যে মুনি সর্বদা বিরাজ করেন তিনি জীবন্মুক্ত ।

19) গীতাকবচ

শ্রীশ্রীচণ্ডীর যেমন কবচ আছে, গীতারও তদ্রূপ কবচ আছে । যেমন দেবীকবচ পাঠান্তে চণ্ডীপাঠ বিহিত, সেইরূপ গীতাকবচ পাঠান্তে গীতাপাঠ করিতে হয় । বার্ণেল সাহেবের ক্যাটালগ [১১৪৬নং, ১৮৬ পৃঃ] অনুসারে তাঞ্জোরের মহারাজা সরফৌজির সরস্বতীমহল গ্রন্থাগারে তেলেগু অক্ষরে লিখিত পুঁথিতে একটি গীতাকবচ আছে [‘শ্রীভারতী’ পত্রিকায় – ২য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা – শ্রীজিতেন্দ্রনাথ বসু কর্তৃক প্রকাশিত] ।

যাহা ধারণ করিলে শত্রু-নিক্ষিপ্ত অস্ত্রশস্ত্রাদি হইতে আত্মরক্ষা করা যায়, তাহাকে কবচ বলে । যিনি গীতাতত্ত্বে প্রবেশ করিতে অগ্রসর হন, তাঁহার বাহ্য ও আভ্যন্তর নানা প্রবল শত্রু থাকে । ইহাদের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য গীতাকবচ অবশ্য ধারণীয় । গীতাকবচে ষড়ঙ্গ রক্ষা করিবার বিধি ও কৌশল বিশেষভাবে উল্লিখিত আছে । উক্ত কবচের বৈশিষ্ট এই যে, ইহাতে গীতার ছয়টি মূল শ্লোক উল্লিখিত । বিশদ

20) গীতামাহাত্ম্য

সাধারণতঃ দুইটি গীতামাহাত্ম্য দেখা যায় । তন্মধ্যে যেটি বৃহত্তর সেটি বৈষ্ণবীয় তন্ত্রসারেউক্ত । ইহাতে ৮৪টি শ্লোক আছে । স্বামী কৃষ্ণানন্দ কর্তৃক সম্পাদিত গীতায় উক্ত মাহাত্ম্য সানুবাদ প্রদত্ত । আর যেটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এবং ২৩টি শ্লোকে সমাপ্ত, সেটি অনুবাদ সহিত এই গীতায় দেওয়া হইয়াছে । উক্ত মাহাত্ম্যটি কাহারো কাহারো মতে বরাহপুরাণোক্তবোম্বাই নির্ণয়সাগর প্রেস হইতে প্রকাশিত এবং বহুটিকাসমন্বিত গীতার মত এইরূপ । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, উক্ত প্রেস হইতে প্রকাশিত বরাহপুরাণে এই গীতামাহাত্ম্য নাই ।মহাভারতে এবং স্কন্দপুরাণে দুইটি গীতামাহাত্ম্য পাওয়া যায় । কিন্তু সেগুলি প্রচলিত নহে । হরি ওঁ । বিশদ


*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.
Headings were later added by rk for clarity. ‘গীতার বাঙ্গালী টীকাকারগণ’ শীর্ষক অংশটি ‘গীতার বিবিধ ভারতীয় ব্যাখ্যা’র সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে ।


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।

Advertisements

মহাভারতের মহারণ্যে – ১.৩


বিশেষভাবে লক্ষ করলে আরো একটা বিষয় বিস্ময়ের উদ্রেক করে। মহাভারতে যে সব ঘটনার সমাবেশে সে সব ব্যক্তিকে পাপিষ্ঠ বা মহাত্মা আখ্যা দেওয়া হয়েছে, এবং সহস্র বৎসর যাবৎ প্রচারের দ্বারা আমাদের মনে যে বিশ্বাসটিকে হৃদয়ের নিগূঢ় নিবাসে প্রোথিত করা হয়েছে, এবং যে যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলা হয়েছে, তা বড়ই বিভ্রান্তিকর। চার দশকেরও অধিককাল ধরে নিবিষ্টচিত্তে কালীপ্রসন্ন সিংহের সম্পূর্ণ মহাভারত পাঠ করে সাহিত্য হিশাবে তা যতোই মনোমুগ্ধকর বলে মনে করেছি, ততোটাই উদ্রান্ত বোধ করেছি ধর্মাধর্মের অবিচার দেখে। যুদ্ধ যে ভাবে আগত হলো, তখন যে সব ঘটনা ঘটেছে, সেই সব ঘটনা যদি স্তরে স্তরে সাজিয়ে ক্রমান্বয়ে বর্ণনা সমেত পাঠকদের নিকট তুলে ধরি, বিচক্ষণ এবং সংস্কারহীন বিবেচনার দ্বারা বিশ্লেষণ করলে তারা আমার বিচারকে অগ্রাহ্য করবেন এমন মনে হয় না।

মনোযোগ সহকারে মহাভারতের সমগ্র ঘটনাপ্রবাহে অবগাহন করলে তীরভূমির উচ্ছসিত ফেনা পার হয়ে মধ্যসমুদ্রে পৌছানোমাত্র দেখা যায়, বংশের স্থাপয়িত্রী ভরতমাতা শকুন্তলার পরেই এই বংশে যে রমণী প্রধান চরিত্র হিশাবে সগৌরবে সম্মুখে এসে দণ্ডায়মান হলেন সেই সত্যবতীই এই কাহিনীর নায়িকা। মহাযুদ্ধের সূচনা তিনিই করে গেছেন। পৌত্র বিদুর গোয়েন্দার কাজ করে তা অব্যাহত রেখেছেন, দ্বৈপায়ন পুরোহিত হয়ে তার প্রতিবিধান করেছেন, আর সত্যবতী তাঁর অসামান্য চাতুর্যে ঘুড়ির সুতোটি তাঁদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে লাটাইটা রেখেছেন স্বীয় হস্তে। প্রথম থেকে ধরলে এক নম্বর ঘটনাই বিদুরের জন্ম। তারপরেই পাণ্ডু ও তার কনিষ্ঠা পত্নী মাদ্রীর মৃত্যু।

ততোদিনে সত্যবতী বয়স্ক হয়েছেন, ভীষ্মের চালনায় ধৃতরাষ্ট্র মর্যাদার সঙ্গে রাজত্ব করছেন। পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্রই জ্যেষ্ঠ। তিনি অন্ধ, সেজন্য প্রথমে পাণ্ডুই রাজ্যের ভার গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কিয়ৎকালের মধ্যেই নিজেকে নিস্ফল জ্ঞানে মনের দুঃখে রাজ্যের ভার ধৃতরাষ্ট্রের হস্তে সমর্পণ করে, তার দুই পত্নী কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে হিমালয়ের শৃঙ্গে শৃঙ্গে বিহার করতে চলে যান। বিদুর মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন। খোঁজ খবর রাখতেন, পাণ্ডুও জানাতেন। বিদুর অবশ্য পাণ্ডুর জন্য যেতেন না। যেতেন কুন্তীর জন্য। কুন্তীর সঙ্গে তার একটা গোপন সম্পর্ক ছিলো। বিদুরের লোভ ছিলো অপরিমিত এবং স্পর্ধা ছিলো সমুদ্রসদৃশ। সবাই জানেন, সত্যবতীর কুমারীকালের কলঙ্ক, বিকটগন্ধ বিকটাকৃতি দ্বৈপায়নের সঙ্গে দ্বিতীয়বার শয্যাগ্রহণের অনিবার্য অনিচ্ছাতেই অম্বা ও অম্বালিকা নিজেরা উপস্থিত না হয়ে একজন সুন্দরী দাসীকে রানী সাজিয়ে ছল করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দ্বৈপায়নের সঙ্গে সংগত হতে।

দ্বৈপায়ন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরেও তিনি দাসীর সঙ্গে সংগত হওয়া থেকে নিবৃত্ত হননি। ক্রুদ্ধ হয়ে স্থানও ত্যাগ করেননি, অপমানিত হয়ে অভিশাপও দেননি। সেই সংগমের ফলই এই বিদুর। বিদুরকেও যে ভীষ্ম পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে একইভাবে মানুষ করে তুলেছিলেন, সেটাও নিশ্চয়ই সত্যবতীর অনুজ্ঞাক্রমে। কেননা, সত্যবতী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভীষ্ম স্বতন্ত্রভাবে কিছুই করেন না, বা করতে পারেন না। সেটা হয়তো নিয়মও নয়। ভীষ্ম তার বিমাতার নির্দেশেই চলেন। নচেৎ বিদুর কী অধিকারে রাজপুত্রদের সঙ্গে একইভাবে বড়ো হয়ে উঠলেন?

অতঃপর, বলা যায় বেশ একটু দেরিতেই, পাণ্ডু রাজ্যত্যাগ করে যাবার অনেক পরে, যৌবনের প্রান্তে এসে ধৃতরাষ্ট্রের একটি সবল সুস্থ পুত্র জন্মগ্রহণ করে বংশ রক্ষার বাতিটি প্রজ্বলিত করলো। আমরা জানি না, এই পুত্র কার গর্ভজাত। রাজবাটির মহিলামহলের কোন অংশের কোন আঁতুড় ঘরে জন্ম নিলো। শুধু এটা জানি, মাতা যিনিই হোন, পিতা প্রকৃতই ধৃতরাষ্ট্র। অর্থাৎ এই পুত্র ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠপুত্র এবং ধৃতরাষ্ট্রের পরে মহারাজা শান্তনুর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবার প্রথম অধিকারী।

ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র জন্মেছে জেনেই সহসা বিদুর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। বরং উল্টোটাই আমরা ভেবেছিলাম। সন্তানের পিতা এবং পিতৃব্য দুজনেই যেখানে প্রতিবন্ধী সেই ক্ষেত্রে এই রকম একটি সর্বাঙ্গসুন্দর বলিষ্ঠ শিশুর জন্ম নিশ্চয়ই অতিশয় সুখপ্রদ ঘটনা। গর্ভ যারই হোক বীজ তো ধৃতরাষ্ট্রেরই ধৃতরাষ্ট্র সত্যবতীর পুত্রের পুত্র, আর এই শিশু হলো দ্বৈপায়নের পুত্রের পুত্র। অবশ্যই সত্যবতীর রক্ত তার দেহে বহমান। সত্যবতীর কী প্রতিক্রিয়া হলো তা অবিদিত রইলো। রচয়িতা আমাদের অন্যত্র নিয়ে এলেন। মহিলামহলের দৃশ্য আমরা দেখতে পেলাম না।

যে কোনো ঘটনাবলীই, কেউ লিখেই প্রকাশ করুন বা বলেই প্রকাশ করুন, নিজস্ব ইচ্ছে বা মতামতটাকেই রচয়িতা বিশেষভাবে ব্যক্ত করেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটলো না। এঁরা, অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু, দ্বৈপায়নের রক্তে জন্মালেও তার কেউ না। দুজনেই বিচিত্রবীর্যের পুত্র। হলোই বা ক্ষেত্ৰজ, কিন্তু যে পুত্রটি জন্মালো সে বিচিত্রবীর্যরই পৌত্র। দ্বৈপায়নের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যে একটিমাত্র পুত্র তার, তার নাম বিদুর বিদুরকে তিনি ভালোবাসেন, বিদুরের কল্যাণ চান। দাসীর গর্ভজাত অবৈধ পুত্র বলে সে যে শান্তনুর সিংহাসনের অধিকারী হতে পারলো না, সেটা হয়তো পুত্রের মতো তার হৃদয়কেও ব্যথিত এবং রুষ্ট করেছিলো। সে জন্যই হয়তো মহাভারত নামের গ্রন্থটি পূর্বাপরই অতিশয় পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। এজন্যই ভরতবংশের পুত্র পাত্র মিত্ৰ সুহৃদ সকলকেই দোষী সাব্যস্ত করে তথাকথিত পাণ্ডবগণকে তুলে ধরে জিতিয়ে দেবার চেষ্টায় অক্লান্ত।

ধৃতরাষ্ট্রকে বিদুর বললেন, ‘এই পুত্র জন্মিয়েই অতি কর্কশস্বরে কেঁদে উঠেছে। চারদিকে সব অমঙ্গলের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে মহারাজ! যদি রাজ্যের মঙ্গল চান এই মুহুর্তে ঐ পাপাত্মা দুৰ্যোধনকে হত্যা করুন। সদ্যোজাত শিশুর নাম তখনি ‘পাপাত্মা দুৰ্যোধন হয়ে গেলো! এই কীর্তি বিদুরের, যিনি সদ্যোজাত শিশুর বিরুদ্ধে ক্রমাগত ধৃতরাষ্ট্রকে উত্তেজিত করতে লাগলেন, এবং পুনঃপুন বলতে লাগলেন, “ঐ দুরতাঁকে এই মুহুর্তে নিধন করুন। বিদুর কখন কোথায় শিশুর এই কর্কশ ক্ৰন্দন শুনতে পেলেন জানি না। সেকালের নিয়ম অনুসারে সন্তান জন্মানোর জন্যে রক্ষিত পৃথক ঘর পুরুষ মহলের অনেক দূরে থাকতো। সেটা একটা আলাদা জগৎ।

শিশুর ক্রন্দন কর্কশ অথবা কোমল এই নালিশ কিন্তু পরিবারের আর কারো কাছে শোনা গেলো না, কেবলমাত্র বিদুরই শিশুকে তৎক্ষণাৎ নিহত করবার জন্য অতিরিক্ত অস্থির বোধ করতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, কিন্তু বধির নন। তিনি শুনেছেন বলে মনে হলো না। না হােক, বিদুর তো শুনেছেন, সেটাই সত্য। যারা শুনেছেন এমন দু’চারজন লোকও তিনি বাইরে থেকে সংগ্ৰহ করে নিয়ে এলেন। কিন্ত খুব বেশি পেলেন না। সত্যবতীর নিকট থেকেও খবরটা আনতে পারলেন না। অথচ এমন মনে হতে লাগলো বিদুর কোনো দৈববাণী শুনেছেন যে এই শিশুকে ধ্বংস না করলে এই মুহুর্তে সারা জগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। ধৃতরাষ্ট্র সম্ভবত তখনো ততোটা সম্মোহিত হননি যে বিদুরের এই নির্দেশ স্বেচ্ছায় মান্য করবেন। অথবা, হাজার হোক শিশুটি তার প্রথম পুত্র, এবং অতি কামনার ধন, সুতরাং এই একটি স্থানে তিনি তাঁর পিতৃত্বকে কলঙ্কিত করতে পারলেন না। এবং বিদুরের এমন নৃশংস হয়ে ওঠার কারণটা ঠিক কী আমরাও বুঝে উঠতে পারলাম না। বোঝা গেল তার অনেক পরে।

সেই সময়ে কুন্তীও গর্ভবতী ছিলেন। সেই পুত্রের নামই যুধিষ্ঠির যুধিষ্ঠিরের জন্ম তখনো হয়নি বলেই বিদুর দুৰ্যোধনকে হত্যা করবার জন্য এত অস্থির ছিলেন। মহাভারতে এ কথা স্পষ্ট করে বলা না হলেও একের পর এক ঘটনা আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে এই পুত্র বিদুরের ঔরসেই কুন্তীর গর্ভজাত পুত্র। সেই পুত্র যদি এখনো না জন্মে থাকে, তাহলে জ্যেষ্ঠ হিশেবে তার সিংহাসন প্রাপ্তির আশা দুরাশা মাত্র। তদ্ব্যতীত, সেই পুত্র কেবলমাত্র জ্যেষ্ঠ হলেই তো হবে না, তাঁকে পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ হিশাবে প্রমাণ করার দায়ও আছে। যে কারণে দ্বৈপায়নের পুত্র হয়েও তিনি রাজা হতে পারেননি, সেই একই কারণ তো তার পুত্রের উপরও বর্ষিত হবে। ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু যেহেতু বিচিত্রবীর্যের পত্নীদের গর্ভজাত, সেজন্য তাঁরা প্রতিবন্ধী হয়েও রাজা হলেন, আর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ পুত্র হয়েও কোনো দাবিদাওয়ার অধিকারী হলেন না। অথচ অজ্ঞান বয়স থেকে তাঁকে রাজপুত্রদের সঙ্গে একইভাবে ভীষ্ম মানুষ করে তুলেছেন। সবাই এক পিতার সন্তান হলেও বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্ৰজ নন বলেই দাসীপুত্রের পরিচয় তার মিটলো না। ঈর্ষার দংশন তাঁকে দগ্ধ করলো। দ্বৈপায়নের উৎপাদিত বিষবৃক্ষের অঙ্কুরটি তখন বৃক্ষ হয়ে উঠতে আর বেশি দেরি করলো না।

ধৃতরাষ্ট্র শত পুত্রের পিতা হলেন, কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয়টিই ছিলো কুরুকুলের প্রধান চরিত্র। এখানেও একটা লক্ষ করবার বিষয় আছে। প্রথম পুত্রটির নাম হলো দুর্যোধন, দ্বিতীয়টির দুঃশাসন। কেউ কারো সন্তানের নাম কি দুর্যোধন বা দুঃশাসন রাখতে পারে? বিশেষত যারা আকাঙ্ক্ষার সন্তান এবং যুবরাজ? পরবর্তী জীবনে হয়তো কেউ দুর্জন হতে পারে, কিন্তু জন্মানো মাত্রই তো সেটা প্রকট হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব অসম্ভবের প্রশ্নই থাকে না এ ব্যাপারে। যা থাকে তার নাম ইচ্ছে। সেজন্য নামকরণে সর্বদাই দু’র পরিবর্তে ‘সু’ থাকে। এবার দুর্যোধনকে যদি আমরা সূৰ্যধন ভাবি, আর দুঃশাসনকে সুশাসন, সেটাই স্বাভাবিক মনে হয় না? ‘সু’টাকে ‘দু’ বলে প্রচার বিদুরের দ্বারাই সাধিত হয়েছে। তবে ‘সু’ ই হোক বা ‘দু’ ই হোক, বিদুরকে হতাশ করে দুৰ্যোধন শশিকলার ন্যায় বৃদ্ধি পেতে লাগলেন, দেশেরও কোনো ক্ষতি হলো না। তার শ্যামল দেহে চন্দ্রবংশীয় রক্ত না থাকলেও পিতামহী অম্বিকার কারণে কিছুটা অন্তত ক্ষত্রিয় রক্ত প্রবাহমান ছিলো। তদুপরি, আবাল্য গঙ্গাপুত্র দেবব্রতর শিক্ষায় থেকে রাজোচিত নিয়ম কানুনের সঙ্গে তাঁর সম্যক পরিচয় ঘটেছিল। বিদ্যায় বুদ্ধিতে অস্ত্রচালনায় যথার্থই পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। সাহস স্বাস্থ্য বিচার বিবেচনা ব্যবহার সমস্ত দিক থেকে তিনি ভবিষ্যৎ রাজার প্রতীক হিশেবে অতি উপযুক্ত ছিলেন। তাঁকে সেই হিশেবেই গণ্য করে সমগ্র দেশবাসী অতি উল্লসিত হয়েছিলো। সর্বসম্মতিক্রমে দুর্যোধনের যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হবার প্রস্তুতিপর্ব যখন সমাপ্তির পথে, এই সময়েই হঠাৎ কুন্তী এতোকাল বাদে পাঁচটি জটবন্ধলধারী পুত্র সমভিব্যাহারে হস্তিনাপুরে এসে উপস্থিত হলেন। জানা গেলো, জটবন্ধলধারী ওই কিশোররা পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ পুত্ৰ! তিনটি কুন্তীর গর্ভজাত, দুটি মাদ্রীর গর্ভজাত। জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোলো, মধ্যম ভীমের বয়স পনেরো, কনিষ্ঠ অৰ্জুন চোদ্দো। এই তিনজন তাঁর, মানে কুন্তীর, অন্য দুজন, নকুল সহদেবের বয়স তেরো, ওরা মাদ্রীর যমজ পুত্র।

পাণ্ডুর সঙ্গে কুন্তীর কুলপ্রথা অনুযায়ী বিবাহ হয়নি। কুরুবংশের নিয়ম অনুসারে মাল্যদানের পরে কন্যাকে স্বগৃহে নিয়ে এসে অনুষ্ঠান করতে হয়। কুন্তী নিজেই স্বয়ংবর সভায় পাণ্ডুর গলায় মাল্যদান করেছিলেন। পরে শান্তনুনন্দন ভীষ্ম প্রথামতো মদ্রকন্যা মাদ্রীকে নিয়ে এসে পাণ্ডুকে দ্বিতীয়বার বিবাহ দেন। সন্তান জন্ম দেবার ক্ষমতা ছিলো না পাণ্ডুর। সেই দুঃখে কবে তিনি চলে গেছেন ধৃতরাষ্ট্রের হস্তে সমস্ত সম্পত্তি সমর্পণ করে তার ঠিক নেই। এতো কাল বাদে পাঁচটি কিশোরকে দেখে এবং পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ শুনে যেমন নগরবাসীরা বিস্মিত হলো, তেমনি পরিবারের আর সকলেও কম বিস্মিত হলো না। প্রথমে ভাবলো, এঁরা কারা? তারপর পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ পুত্র শুনে ভাবলো এতো বড় বড় সব ছেলে, কিন্তু এদের কথা এতো দিনের মধ্যেও তারা ঘুণাক্ষরেও জানলো না কেন? জানতে হলো তার মৃত্যুর পরে? নগরবাসীরা বলতে লাগলো, পাণ্ডু তো অনেকদিন পূর্বেই মারা গেছেন, তার কোনো পুত্র আছে বলে তো শুনিনি। তবে এঁরা কী করে কুরুবংশের হবে? সাক্ষী কে? পাণ্ডুও মৃত, মাদ্রীও মৃত।

পাণ্ডু কবে মারা গেলেন তারও কোনো নির্দিষ্ট সময় জানা যায় না। হিমালয় শৃঙ্গ থেকে কয়েকজন মুনি কুন্তীদের পৌঁছে দিতে এসেছিলেন, তারা কোনো আতিথেয়তা গ্রহণ না করেই সংক্ষেপে দু’চারটা কথা বলে চলে গেলেন। তারা পাণ্ডু ও মাদ্রীর সতেরো দিনের মৃতদেহ বহন করে এনেছিলেন। সেখানে তারা জলও স্পর্শ করলেন না।

কুন্তী বললেন, জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির ধর্মের পুত্র, মধ্যম ভীম পবনপুত্র, কনিষ্ঠ অৰ্জুন ইন্দ্ৰপুত্র আর নকুল সহদেব অশ্বিনীকুমারের যমজ সন্তান। স্বামী ব্যতীত আরো তিনটি প্রার্থিত পুরুষের অঙ্কশায়িনী হয়ে কুন্তী এই তিনটির জন্ম দিয়েছেন এবং সূর্যের অঙ্কশায়িনী হয়ে কুমারী অবস্থায় জন্ম দিয়েছিলেন কর্ণকে। এই রহস্যজনক পাঁচটি জটবন্ধলধারী কিশোরকে নিয়ে কুন্তী যখন হস্তিনাপুরে এসে পৌঁছলেন, এবং নানাজনে নানা কথা বলতে শুরু করলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেলো সেই সমালোচনার উপর যবনিকা নেমে এসেছে। সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে, সব নিন্দা অগ্রাহ্য করে, ঐ পাঁচটি বালককে রাজবাটী থেকেই পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজপুত্র ঘোষণা করে, রাজবাড়ির শিক্ষাদীক্ষা বিষয়ে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররা যে গুরুর কাছে যে পাঠ নিচ্ছে এই পাঁচটি বালককেও যেন সেই শিক্ষাদীক্ষার পাঠ সেই গুরুর কাছেই দেওয়া হয়, এ হুকুমটি জারি করা হলো। এর পরে এই পঞ্চভ্রাতা কুরুবংশেরই বংশধর হিশেবে গণ্য হয়ে রাজবাড়ির শিক্ষাদীক্ষা সহবতের অন্তর্গত হলো। হস্তিনাপুরবাসীরা জানলো পাণ্ডুর এই ক্ষেত্ৰজ পুত্ররা তাদেরই পুত্র মিত্র শিষ্য সুহৃদ ও ভ্রাতা স্বরূপ। অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রও জানলেন তাদের যেন তিনি পুত্রজ্ঞানেই গ্রহণ করেন।

এখন কথা হচ্ছে এতো অল্প সময়ের মধ্যে এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত এমন সহজে নেওয়া কার দ্বারা সম্ভব হলো? কাজটা যিনিই করুন, যিনিই বলুন, সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটা হচ্ছে সকলের মুখ বন্ধ করার মুখ্য ব্যক্তিটি কে? রচয়িতা সে নামটি ঘোষণা করেননি। না করলেও এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না, যার ইচ্ছেতে দ্বিধাহীনভাবে দ্বৈপায়ন এসে এই প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন, তার হুকুমই তামিল করলেন ভীষ্ম। সত্যবতী তখন রানীপদবাচ্য না থাকলেও, সমস্ত আদেশ নির্দেশ তিনিই দিয়ে থাকেন। কর্মচারীরা সেটা পালন করে। তার মধ্যে প্রধান ব্যক্তি ভীষ্ম। দ্বৈপায়ন সত্যবতীর নাম উল্লেখ না করলেও, হুকুমটা ঐ বড় তরফ থেকেই যে এসেছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। যুধিষ্ঠির যে বিদুরের পুত্র সে খবরটা নিশ্চয়ই তিনি জেনেছিলেন। তিনি প্রচ্ছন্নই রইলেন, সকলে এটা ভীমের আদেশ বলেই মেনে নিলো। ভীষ্ম যা বলেন সেটাই সকলে নিদ্বিধায় মেনে নিতে অভ্যস্ত। এ কথাও তারা জানেন, সত্যবতীর অমত থাকলে, এবং তিনি গ্রহণযোগ্য মনে না করলে, ভীষ্মও সেটা বলবেন না। সুতরাং সেই বাক্যকেই ধ্রুব বাক্য হিশেবে গ্রহণ করে মুহুর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেলো সন্দেহের ফিশফিশানি।

কিন্তু সকলের মন থেকেই যে সেটা মুছে গেলো সেটা ঠিক নয়। বিশেষভাবে কুন্তী যখন বললেন, দুর্যোধনের বয়স পনেরো, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোলো। সুতরাং এই কুলে পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ হিশেবে যুধিষ্ঠিরই জ্যেষ্ঠ। তখন কিন্তু অনেকেই এই আকস্মিক ঘটনাকে সন্দেহের উৰ্দ্ধে ঠাঁই দিতে পারলেন না। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, বিদুরের বুদ্ধিকেই সর্বাধিক বলে গণ্য করেন, সুতরাং এ ব্যাপারে বিদুরের মতামতই তার মতামত। তদুপরি সত্যবতী এবং ভীষ্ম যা মেনে নিয়েছেন তার উপরে আর কারো কোনো মতামতের প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু স্বাধীনচিত্ত দুৰ্যোধন, মাতৃস্নেহ বঞ্চিত দুর্যোধন, ভীমের আদর্শে গঠিত যুবরাজ দুৰ্যোধন, অবশ্যই এই স্বীকৃতিকে সুনজরে দেখলেন না। এই পাঁচটি পুত্রের ব্যবহারে তাদের মধ্যে কুরুকুলোচিত এক বিন্দু সংস্কৃতি আছে বলে মনে হয়নি তাঁর। কুন্তীকে তিনি এই প্রথম দেখলেন। বিদুরের ব্যাপারটাই সব চাইতে বেশি আশ্চর্য করলো তাঁকে। তিনি কুন্তীকে নিয়ে যেমন ব্যস্ত, পুত্রদের নিয়ে ততোধিক। দুর্যোধনকে বিদুর কোনোদিনই সহ্য করতে পারতেন না। কিন্তু এই ছেলেদের বেলায় তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। দুর্যোধন ভেবে পেলেন না, এতো স্নেহ এই মনুষ্যটির হৃদয়ে এতোদিন কোথায় লুক্কায়িত ছিলো! একজন মানুষের কী করে এরকম দুই চেহারা হতে পারে। তিনি কুন্তীকে যে ভাবে সদাসুখী রাখতে ব্যস্ত, সেই ব্যস্ততা যাকে নিয়ত দেখেন সেই ভ্রাতৃবধূ গান্ধারীর প্রতি কখনো দেখা যায়নি, এমনকি এতো ঘনিষ্ঠতা নিজ স্ত্রীর সঙ্গেও দেখা যায় না।

কুন্তী বলেছেন, যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোলো। তার প্রমাণ কী? তদ্ব্যতীত, এই ছেলেদের পাণ্ডুর মৃত্যুর পরে কেন কুরুকুলের পুত্র মিত্র ভ্রাতা বলে প্রকাশ করা হলো? এতোগুলো বছর কাটলো, তখন কেন জানা গেলো না পাণ্ডু একজন দুজন নয়, পাঁচ পাঁচটি ক্ষেত্ৰজ পুত্রের পিতা হয়েছেন! তবে কি পাণ্ডুর মৃত্যু না হলে ক্ষেত্ৰজ বলা সম্ভব ছিলো না?

এতোগুলো সম্ভাব্য অসম্ভাব্য চিন্তাকে বিন্দুবৎ গ্রাহ্য না করে, এবং পরিবারের নিয়মকে উপেক্ষা করে, কিছুই না জেনে, না শুনে সত্যবতীর এই আপাত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। এর মধ্য দিয়ে তার চরিত্রের কঠিন কত্রীত্ব আবারও উদঘাটিত সত্যবতী এখন যে শুধু রানী নন তা-ই নয়, রাজমাতাও নন। বলা যায়, সাধারণ নিয়ম অনুসারে কেউ নন। স্বামীর মৃত্যুর পরে তখনকার মহিলাদের বানপ্রস্থ নেওয়াই ধর্ম ছিলো। তা তিনি নেননি। এই না-নেওয়ার মধ্যেও তার লক্ষ্যপূরণের ইঙ্গিত আছে। আসলে কিছুই তিনি পরোয়া করেন না। তার মনের পর্দা এই সব ক্ষুদ্র নিন্দাপ্রশংসার অনেক উপরে বাধা। তার ইচ্ছে তার, তার ধর্ম তার, তার সিদ্ধান্তও তারই। স্বকীয়তায় তিনি অনন্যা। কোনো কোনো মানুষ এই ধরনের ব্যক্তিত্ব নিয়ে জন্মায়। তাছাড়া, সত্যবতী তথাকথিত বড়ো বংশের কন্যা নন, সেটাই তার আশীৰ্বাদ। লজ্জা, সংকোচ, কুষ্ঠার বিলাস এই সুন্দরী, কৃষ্ণকায়া, খেটে-খাওয়া নিষাদকন্যার থাকাটাই অস্বাভাবিক।

যদি বলি দুর্যোধন স্বভাবতই কিছুটা সংযত এবং সহিষ্ণু চরিত্রের মানুষ তাহলে শতকরা একশোজনই হয়তো অট্টহাস্য করে উঠবেন। কেননা, কেবলমাত্র শুনে শুনে, প্রচারের মহিমায়, তার উল্টো কথাটাই সকলে বিশ্বাস করে এসেছেন সহস্ৰ সহস্র বছর যাবৎ জন্মমুহূর্ত থেকেই বিদুর বলে আসছেন, কেন দুর্যোধনকে মেরে ফেলা হলো না। পাণ্ডবরা এসে পৌঁছনোমাত্রই বলতে শুরু করছেন, দুৰ্যোধন রাজ্যলোভী, পাপাত্মা অসূয়াবিষে আক্রান্ত, দুর্মুখ অর্থাৎ যাকে আমরা সর্বরকমেই একটা ঘৃণ্য চরিত্র বলে ভাবি, সেইসব বিশেষণেই তাঁকে দ্বৈপায়ণ বিদুরের মুখ দিয়ে বিভূষিত করেছেন। যতোদিন দুর্যোধন অবোধ বালক ছিলেন, এসব উক্তির অর্থ তার বোধগম্য হয়নি। বড়ো হবার পরে যখন বুঝতে পেরেছেন, কী করে সহ্য করেছেন সেটা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। বিদুর দাসীপুত্র, তিনি রাজপুত্র। বিদুরের স্পর্ধার এবং ঈর্ষার কোনো তুলনা ছিলো না। যখন এসব বিশেষণ দুৰ্যোধনের বুদ্ধির অন্তর্গত হয়েছে, প্রকৃত ক্ষত্রিয় হলে এসব দুর্নামের মূল্য দিতে বিদুরের জিহ্বা তিনি তন্মুহূর্তেই তরবারির আঘাতে চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দিতেন। এসব অকারণ মিথ্যা আখ্যা সহ্য করবার মতো সংযম কোনো মানুষেরই থাকে না, থাকা সম্ভব নয়। জন্মানোমাত্রই কেন মেরে ফেলা হলো না, এমন একটি তীব্র বাক্য যে কোনো মানুষকে বিকৃত করে দিতে পারে। দুৰ্যোধনের পিতা ধৃতরাষ্ট্রই বা কেন প্রতিবাদ করেননি কে জানে! ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ, কিন্তু বধির নন, তথাপি স্বীয় পুত্র বিষয়ে এসব আখ্যা তাঁকে স্পর্শ করেনি কেন? তাহলে বিদুর কখনোই সাহস পেতেন না এই অন্যায় প্রচার চালাতে। ধৃতরাষ্ট্র প্রায় নির্বোধের মতো বিদুরের বুদ্ধি অনুসারে চলতেন, বলতেন। হয়তো পিতার উপর অভিমানবশতই বিদুরকে উচিত শিক্ষা দেবার চাইতে উপেক্ষাই সঙ্গত মনে করেছেন দুর্যোধন।

এই প্রসঙ্গে আরো একটা প্রশ্ন উত্থাপন না করে পারছি না। সেটা হলো ধৃতরাষ্ট্ৰই তো জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, অন্ধ বিধেয় মাত্রই কিয়ৎকালের জন্য পাণ্ডু রাজা হয়েছিলেন। বহু বৎসর তিনি আর প্রত্যাবৃত হননি। রাজা থাকাকালীনও তাঁর মৃত্যু হয়নি। তবে কী কারণে তার জ্যেষ্ঠ ক্ষেত্ৰজ নামধারী যুধিষ্ঠির রাজা হবেন? রাজত্বভার ধৃতরাষ্ট্রের উপর, তার পুত্রদেরই জনপদবাসী রাজপুত্র হিশেবে গণ্য করেন। তদুপরি, সেই পুত্রেরা তার ঔরসতাজ পুত্র, ক্ষেত্ৰজ নয়।

পরিবারে মহারাজা শান্তনুও জ্যেষ্ঠ ছিলেন না। তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাও রাজত্বের ভার শান্তনুর হস্তেই সমর্পণ করে গৃহত্যাগ করেন। তাদের তিন ভ্রাতার মধ্যে শান্তনু মধ্যম ভ্রাতা। কনিষ্ঠভ্রাতা বল্কীক তার পুত্র পৌত্ৰাদি নিয়ে রাজপরিবারেই বাস করছিলেন। দেবব্রত গঙ্গার অষ্টম গর্ভের সন্তান। নিশ্চয়ই পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র নন। কিন্তু সেখানে কনিষ্ঠ ভ্রাতার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সিংহাসনের দাবিদার হিশেবে দেখানো হয়নি। কিন্তু এখানে কেন সেই প্রশ্ন উঠলো?

শান্তনু এবং তাঁর পুত্র দেবব্রত বিষয়েও একটা গল্প তৈরি করেছেন রচয়িতা। শান্তনু যখন গঙ্গার প্রণয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে তার পাণিপ্রার্থী হলেন, গঙ্গাও একটা শর্ত করেছিলেন বিবাহের পূর্বে। তিনি বলেছিলেন, “আমি যা করবো, তা শুভই হোক, অশুভই হোক, তুমি কখনো জিজ্ঞাসা করতে পারবে না। জিজ্ঞাসা করলেই আমি তোমাকে পরিত্যাগ করে চলে যাবো। শান্তনু তাতেই রাজি হয়েছিলেন। বিবাহের পরে গঙ্গা যখন পুত্রবতী হলেন, জন্মানো মাত্রই সে ছেলেকে তিনি নিজের হাতে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে এলেন। দ্বিতীয় পুত্রের বেলায়ও অনুরূপ কাৰ্যই করলেন। তৃতীয় পুত্রের বেলায়ও ঠিক তাই হলো। এক এক করে যখন সাতটি পুত্রকে একই ভাবে তিনি জলাঞ্জলি দিলেন, অষ্টমবারে আর শান্তনু নিজেকে সম্বরণ করতে পারলেন না। বললেন, ‘তুমি কি মানবী না আর কিছু? এভাবে এতোগুলো ছেলেকে জলে ডুবিয়ে মারলে মা হয়ে?”

বলা মাত্রই গঙ্গা শান্তনুকে পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। বলে গেলেন, ‘তোমার অষ্টম সন্তানটিকে আমি জলে ফেলবো না, কথা দিলাম।’

আসল উপাখ্যানটি এই। একদা বসুগণ পত্নীসহ বশিষ্ঠের তপোবনে বিহার করতে এসেছিলেন। বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীকে দেখে কোনো বসুর পত্নী তাঁকে নিয়ে যান। বশিষ্ঠ আশ্রমে ফিরে এসে দেখেন নন্দিনী নেই। তখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দেন, যারা আমার ধেনুকে নিয়েছে তারা মর্ত্যে মনুষ্য যোনিতে জন্মগ্রহণ করবেন। বসুরা তখন ব্যাকুল হয়ে অনেক অনুনয় বিনয় করাতে বশিষ্ঠ প্রসন্ন হন, এবং বলেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা এক বৎসর পরে শাপমুক্ত হবে, কিন্তু পত্নীর জেদে যে বসু নন্দিনীকে নিয়ে যায়, সে বসু নিজের কর্মফলে দীর্ঘকাল মনুষ্যলোকে বাস করবে।’

গঙ্গা বললেন, “মহারাজ অভিশপ্ত বসুগণের অনুরোধেই তোমাকে বিবাহ করেছি এবং তাদের প্রসব করে জলে নিক্ষেপ করেছি। তবে এই অষ্টম পুত্রটি বেঁচে থাকবে এবং মনুষ্যলোকের অধিবাসী হবে। মৃত্যুর পরে স্বৰ্গলোক প্রাপ্ত হবে।’ এই দেবব্রতই সেই অষ্টম বসু।

এই গল্প এখানে অবান্তর, তথাপি তখনকার লোকেদের বিশ্বাস যে অতিমাত্রায় সরল ছিলো সেটাই জানানো। অবশ্য এখনো বহু মানুষ অশিক্ষার অন্ধকার হেতু সেই সব বিশ্বাস থেকে যে মুক্তি পেয়েছে তা নয়। তাবিজ কবচ তো আছেই। আর আছে মানুষকে ভগবান বানিয়ে সেই পায়েই নিজেকে উৎসর্গ করা। মহারাজা শান্তনুর পত্নী গঙ্গাকে যে গোপনে তার সাতটি পুত্রকে জলে নিক্ষেপ করতে হয়েছে, বাস্তবানুগ ব্যাখ্যা করলে তার প্রকৃত অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে সম্ভবত দেহের কোনো দোষে গঙ্গার সন্তানরা মৃত অবস্থাতেই জন্মাতো। সেটা গোপন করতেই এই গল্পের উৎপত্তি। তখনকার দিনে পুত্রের জন্য যে হাহাকার ছিল (এখনও কম নয়) তাতে কোনো মহিলার সব সন্তানই যদি নষ্ট হয়ে যেতো, তাঁকে অবশ্যই মানবী না বলে পিশাচী বা ডাকিনী যোগিনী বলে হত্যা করা হতো, কিংবা তাড়িয়ে দেওয়া হতো। নিম্নবর্গের মধ্যে এবং আদিবাসীদের মধ্যে এখনো তার চলন ফুরিয়ে যায়নি।

মহাভারতের মহারণ্যে – ১.২


শকুন্তলার আরো কয়েক প্রজন্ম পরে পুনরায় যে রমণী সেই বংশে বিবাহিত হয়ে এসে খ্যাতির আসনে উপবিষ্ট হলেন তিনি সত্যবতী। শকুন্তলার পুত্র ভরত থেকে যে বংশ ভরতবংশ নামে খ্যাত তার একচ্ছত্র সম্রাজী সত্যবতীর মানসতাও শকুন্তলার সমগোত্রীয়, জন্মরহস্যও। সাহস এবং ব্যক্তিত্বের কোনো অভাব ছিলো না সত্যবতীর। যা চেয়েছিলেন তা সম্পন্ন করেই সংসার ত্যাগ করেছিলেন। দ্বৈপায়ন ওই একটি চরিত্রের উপর যথাসম্ভব কম আলো ফেললেও তিনি জানতেন ইনিই এই আখ্যায়িকার আসল নায়িকা, আর তিনি নিজে তার প্রধান পুরোহিত। নামত ভরতবংশের কাহিনী হলেও, আসল আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে সত্যবতী-দ্বৈপায়নই রয়েছেন।

রাজা শান্তনু সত্যবতীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন। এবং তা তিনি হতেই পারেন। তবে অবশ্যই তিনি তাঁকে ধীবরপল্লীতে দেখেননি। ধীবরপল্লী কখনো রাজামহারাজাদের ভ্রমণস্থল হতে পারে না। এখানে রচয়িতা পুনরায় একটি রূপকথার আবরণ ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, একদা পরাশর মুনি নৌকা পার হবার সময়ে সত্যবতীর দেহের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ধীবরকন্যার দেহ থেকে সঙ্গমের পূর্বে মৎস্যগন্ধ দূর করে নিয়েছিলেন। সত্যবতীর দেহ তখন সুগন্ধে পরিপুত হয়। এবং সেই সুগন্ধ চিরস্থায়ী হয়। সুগন্ধ এমন যে বহুদূর থেকেও বাতাসে ছড়িয়ে পড়তো।

একদিন শিকার করতে বেরিয়ে মহারাজা শান্তনু যমুনাতীরে এসে বাতাসে ভেসে আসা এক অতি সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে সহসা সত্যবতীকে দেখতে পান এবং সেই সুগন্ধে যতো আকৃষ্ট হয়েছিলেন, ততোধিক আকৃষ্ট হন সত্যবতীকে দেখে। শান্তনুর মতো একজন সৎচরিত্র রাজা, যিনি তার প্রথমা পত্নী গঙ্গাকে হারিয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করে ছত্রিশ বছর বনে বনে ঘুরে বেরিয়েছেন, যিনি পরম প্রাজ্ঞ, পরম ধার্মিক, পরম ধীমান বলে বর্ণিত, যিনি দেবর্ষি ও রাজর্ষিগণের সম্মানভাজন, যার ধাৰ্মিকতা দেখে অন্যান্য নৃপতিরা তাঁকে সম্রাটপদে অভিষিক্ত করেছিলেন, সমগ্র পৃথিবীর যিনি অধিপতি হবার যোগ্য সেই বিশুদ্ধ কুলীন কুরুপতির পক্ষে মুহুর্তে সত্যবতীর প্রতি এতোটা আকৃষ্ট হওয়া যেমন আশ্চর্য, তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য ঘটনা সেই কন্যার পাণিপ্রার্থী হয়ে সেই ধীবরের কুটিরপ্রাঙ্গণে গিয়ে দাড়ানো। ধীবর মানেই নিষাদ। সুতরাং অন্ত্যজ ও অস্পৃশ্য। নীচজাতি বা অন্ত্যজদের প্রতি উচ্চজাতির কী ধরনের মনোভাব ছিলো তা শাস্ত্রে, মহাপুরাণে, মহাকাব্যে, কোথাও অপ্রকট নয়। সেই জন্যই বিস্মিত হতে হয়, কেবলমাত্র সুগন্ধই তাঁকে এই আঙিনায় এসে দাঁড় করিয়ে দিলো?

যে করেই হোক, সত্যবতী তাঁকে যে যথেষ্ট সম্মোহিত করতে পেরেছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একজন ধীবরের পাটনী কন্যার জন্য স্বয়ং সম্রাট এসে দাঁড়িয়েছিলেন এর চেয়ে বড়ো সৌভাগ্য সেই পরিবার আর কী ভাবতে পারে! কিন্তু তারা তা পারলেন, এবং সত্যবতীর পিতা তৎক্ষণাৎ একটি শর্ত রক্ষার দাবী রাখলেন। সেই শর্ত রক্ষায় রাজি না হতে পারায় শান্তনুকে প্রত্যাখ্যানও করলেন।

পিতাকে বিষন্ন দেখে এবং তার কারণ জেনে পুত্র দেবব্রত, পিতার প্রিয়চিকীয়ঁ পুত্র দেবব্রত, সব শর্ত পালনে সম্মত হয়ে সত্যবতীকে নিয়ে এলেন পিতার কাছে। সত্যবতীর দূরদর্শিতা প্রথম থেকেই সীমাহীন। সেজন্যই, কেবলমাত্র তার গর্ভজাত পুত্রই যে সিংহাসনে বসবে সেই শর্তেই থেমে না থেকে, দেবব্রতর সন্তানও যাতে সিংহাসনের দাবিদার না হতে পারে তেমন প্রতিজ্ঞাই করিয়ে নিলেন দেবব্রতকে দিয়ে। দেবব্রত সেই শর্ত মেনে নিয়ে ঘোষণা করলেন, তিনি কখনো বিবাহ করবেন না।

সেই থেকেই তার ‘ভীষ্ম’ আখ্যা লাভ। কিন্তু এর মানে কি এই নয় যে শান্তনুর মৃত্যুর পরে সত্যবতী স্বীয় বংশ ভিন্ন অন্য কোনো রক্তের চিহ্ন রাখবেন না?

তাই হলো। আঁটঘাঁট বেঁধেই তিনি এসেছিলেন এই প্রাসাদের সর্বময়ী কত্রী হয়ে রূপেগুণে ঈর্ষাযোগ্য মহাভারতের শ্রেষ্ঠ আর্য যুবকটিকে সেই কারণেই তার স্বার্থসিদ্ধির বলি হতে হলো। মহাভারতের অজস্র ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এটা এমন একটি ঘটনা যার গুরুত্ব দ্বৈপায়ন তেমনভাবে না দিলেও, তার ফলাফল সুদূরপ্রসারী, এবং তাৎপর্য গভীর।

আমরা দেখতে পেলাম, যে সত্যবতী দেবব্রতর জীবনকে সমস্ত দিক থেকে পঙ্গু করে সমগ্র সুখের সুবর্ণ ফটকটি বন্ধ করে দিলেন, পরবর্তীকালে দেবব্রত সেই সত্যবতীরই একান্ত অনুগত একজন আজ্ঞাপালনের বাহকমাত্র। এসব অকল্পনীয় ঘটনা পড়তে পড়তে মনে হয় ভাগ্য আর পুরষকারের মধ্যে ভাগ্যই প্রধান ভাগ্যচক্রের ঘূর্ণায়মান চক্রটিকেই বড়ো আসন দিতে হয়। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, এই কাহিনীর নায়িকা সত্যবতীর ইচ্ছা নামের তরণীটিকে যিনি অবিরাম অনুকূল বায়ুপ্রবাহে বাহিত হবার সুযোগ দিয়েছেন তার নাম ‘ভীষ্ম’ আখ্যাধারী দেবব্রত। তিনি তার ত্যাগ ও ঔদার্যের বিনিময়ে এই নিষাদ রমণীটিকে কুরুকুলের মহারানীর সিংহাসনে বসিয়ে পিতাকে সন্তষ্ট করেই ক্ষান্ত হননি, তার সুখের জন্য নিজেকেও উৎসর্গ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, সত্যবতী দেবব্রতকে অগ্রবর্তী করেই সমগ্র কার্য, যা যা তিনি সম্পন্ন করতে সংকল্প করেছিলেন, সবই নির্বিবাদে সমাধা করতে সক্ষম হয়েছেন।

মহারাজা শান্তনুর সঙ্গে সত্যবতীর বিবাহের পরে অবশ্য অনতিদীর্ঘকালের মধ্যেই দেখা গেলো দেবব্রত যেন মুছে গেছেন সব কিছু থেকে। সেটা তার স্বীয় সুখের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে আচ্ছন্ন দেখেই নিজেকে নিজে সরিয়ে নিয়েছিলেন, অথবা দ্বৈপায়ন আর তাঁকে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই বোধেই পরিত্যাগ করেছিলেন, জানি না। কিন্তু শান্তনুর ইহলীলা সংবরণের অচিরকালের মধ্যেই দেখা গেলো আবার তিনি রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ। এবং তার কারণও সত্যবতীই।

শান্তনুর ঔরসে সত্যবতীর গর্ভে যে দুটি পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিলো তার একজন তখনো বালক, অন্যজন অযোগ্য। এই অবস্থাতেই ছেলেদের রেখে শান্তনু লোকান্তরিত হন। সত্যবতী তার বড়ো পুত্রটিকে রাজপদে বসান। চিত্রাঙ্গদ অতিশয় বলবান ছিলেন, অত্যন্ত দাম্ভিকও ছিলেন। সকলকেই নগণ্য জ্ঞান করতেন। একদিন গন্ধৰ্বরাজ বললেন, ‘সবাইকেই নিকৃষ্ট ভাবো, আমার নাম আর তোমার নাম এক। তুমিও চিত্রাঙ্গদ, আমিও চিত্রাঙ্গদ। আমার সঙ্গে যুদ্ধ করো, দেখি কে জয়ী হয়।’ আস্ফালন করে গন্ধর্বরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর অহংকারই তাঁকে নিহত করলো। নিজের পুত্রকে চিনতে সত্যবতীর দেরি হয়নি, এবং সেই কারণেই তিনি বুঝেছিলেন, এই পুত্রকে যদি কোনো দক্ষ শাসক পরিচালনা না করেন তবে রাজত্ব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। স্বভাবতই, দেবব্রত ব্যতীত সুচারুরূপে এই রাজ্য শাসন আর কারো দ্বারা সম্ভব নয়। অতএব সত্যবতী বাধ্য হয়েই পিছন থেকে রাজ্য চালনার গুরুভার তার হস্তে ন্যস্ত করলেন। চিত্রাঙ্গদের মৃত্যুর পর অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে পুনর্বার সেই পুতুল নিয়েই সত্যবতীর অনুজ্ঞাক্রমে রাজ্য পরিচালনা করতে লাগলেন ভীষ্ম।

সত্যবতী স্বীয় স্বার্থের প্রয়োজনে দেবব্রতকে ডেকে আনলেও দেবব্রতর বাধ্য হবার কোনো দায় ছিলো না। রাজত্ব যেন কোনোক্রমেই গঙ্গাপুত্র দেবব্রতর, অথবা তার বংশধরদের হস্তগত না হয়, সেজন্য সত্যবতী দেবব্রতকে দিয়ে যা যা প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, তারপরে দেবব্রত কেন নতমস্তকে সত্যবতীর নির্দেশ শিরোধার্য করে নিলেন তার কোনো কারণ দেখতে পাই না। তবে কি যে মোহিনী মায়ায় মহারাজা শান্তনু আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই মোহিনী মায়ায় সত্যবতী। তার পুত্র দেবব্রতকেও বন্দী করেছিলেন? সত্যবতী তাঁকে যে-ভাবে ব্যবহার করেছেন, এবং ওইরকম একটি কনককান্তি দ্বিতীয়রহিত বীর যুবক যে-রকম মন্ত্রমুগ্ধের মতো ব্যবহৃত হয়েছেন, দুয়ের চেহারা একে অন্যের পরিপূরক। জানতে ইচ্ছে হয় সত্যবতী বিষয়ে দেবব্রতর অন্তরে কী চেতনা কাজ করতো। কেন তিনি তার জীবন যৌবন ক্ষমতা এই হস্তিনাপুরের অভ্যন্তরে নিঃশেষ করলেন? তদ্ব্যতীত, পিতার মৃত্যু পর্যন্তই বা কেন এমন নিঃশব্দে আত্মগোপন করে রইলেন?

কুরুকুলের ভাগ্যদোষে শেষ পর্যন্ত সত্যবতীর সব আকাজক্ষা পূরণের প্রধান সহায় হলেন দেবব্রত। সত্যবতী যদি যন্ত্রী হন, দেবব্রত তাহলে যন্ত্র। আর এই যন্ত্রের যন্ত্রী হয়ে সত্যবতী। অতঃপর যে সুর বাজাতে সক্ষম হয়েছেন সেই সুরেই রচিত হয়েছে এ কাহিনী। এই পুস্তক। যে পুস্তকের নাম মহাভারত যে পুস্তককে বলা হয় পঞ্চম বেদ। তপোবনে সনাতন বেদশাস্ত্রের সারোদ্ধার করে এ পবিত্র গ্রন্থের জন্ম। যে গ্রন্থের যুদ্ধকে বলা হয় ধর্মযুদ্ধ। এবং যার তুল্য মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না।

পতির মৃত্যুতে সত্যবতী যে খুব কাতর হয়ে পড়েছিলেন এমন মনে হয় না। মহাভারতের নিয়ম অনুযায়ী আরম্ভ করলে শেষ হতে চায় না এই রকম কোনো বিলাপপূৰ্ণ শোকের চিত্র সত্যবতীর আচরণে দেখানো হয়নি। এমন কি দুই পুত্রকে হারিয়ে তার মাতৃহৃদয়ও যে খুব ভেঙে পড়েছিলো এমন আলেখ্যও রচয়িতা আমাদের প্রত্যক্ষ করাননি। তিনি যে কারণে ভেঙে পড়লেন তা হচ্ছে তার বংশরক্ষা। দুটি পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠটি তো বিবাহের পূর্বেই মারা যায়। কনিষ্ঠটি দুই মহিষীর ভর্তা হয়েও কারো গর্ভেই কোনো বীজ বপন করতে পারলো না।

বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পরে তাঁর পত্মীদের গর্ভে যখন পুত্রোৎপাদনের প্রশ্ন তুললেন সত্যবতী, তখন তিনি ভীষ্মকেই প্রথম অনুরোধ করেছিলেন। সেটা লোক দেখানো। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন, যে প্রতিজ্ঞা করে দেবব্রত ভীষ্ম হয়েছেন সে প্রতিজ্ঞা তিনি কখনোই লঙ্ঘন করবেন না। বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে ভীষ্মকে তিনি একটু সন্দেহের চোখেই দেখতেন। কিন্তু সে ভয় তার অচিরেই মুছে যায়। এই মানুষকে চিনতে খেটে খাওয়া নিষাদকন্যা সত্যবতীর বেশি দেরি হয়নি। বিশ্বাস না করলে পুত্রদের হয়ে সাম্রাজ্য পরিচালনার ভার তিনি কখনোই তার উপরে ন্যস্ত করতেন না। ভীষ্ম বললেন, “আপনি আমাকে অপত্যোৎপাদন বিষয়ে যে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন তা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে। আর দারপরিগ্রহ বিষয়েও পূর্বে যা সংকল্প করানো হয়েছিলো তা-ও নিশ্চয়ই ভুলে যাননি।’

ভীষ্ম পুনরায় বলেছিলেন, ‘পরশুরাম যখন একুশবার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন, তখন ক্ষত্রিয় রমণীরা ব্রাহ্মণ সহযোগেই পুত্রবতী হয়ে পুনরায় ক্ষত্রিয়কুল বৃদ্ধি করেছিলেন, সে ভাবেও আপনি বংশরক্ষা করতে পারেন। ভীমের মনে হয়েছিলো বংশরক্ষার সেটাই একমাত্র শুদ্ধ উপায়। তাই সেই পরামর্শই তিনি তাঁকে দিয়েছিলেন। দেখা গেলো সে উপায়টা সত্যবতী গ্রহণ করলেন। অনতিবিলম্বেই তিনি তাঁর কুমারী জীবনের পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ণকে আহ্বান করলেন। বোঝা গেলো ছেলের সঙ্গে তিনি সংশ্রব বহির্ভূত ছিলেন না।

পুত্রও এসে গেলেন তৎক্ষণাৎ, এবং মাতৃআজ্ঞা পালনে রত হতে বিলম্ব করলেন না। সদ্য স্বামী বিয়োগে শোকার্ত বধু দুটি দ্বৈপায়নের বিকট মূর্তি দেখে ও বীভৎস গন্ধে একজন ভয়ে দুচোখ বুজে এবং অন্যজন ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে মৃতের মতো পড়ে থেকে শ্বশ্রীমাতার নির্দেশ পালনে বাধ্য হলেন। স্বীয় পুত্রের দ্বারাই সত্যবতী স্বীয় পুত্রের বধু দুটির গর্ভোৎপাদন করালেন। এতোদিন কেন তিনি ইতস্তত করছিলেন সে কারণটা বোধগম্য হলো। এই উৎপাদন রুচিসম্মত নয়, শাস্ত্রসম্মত নয়, ধর্মসংগতও নয়। তদ্ব্যতীত, স্বামীর ইচ্ছেতে তার স্ত্রীর গর্ভে অন্যের ঔরসজাত সন্তানেরা ক্ষেত্ৰজ পুত্র হিশেবে তখনকার সমাজে স্থান পেলেও শাশুড়ির ইচ্ছেতে পুত্রবধূদের গর্ভে পুত্রোৎপাদনের নজির মহাভারতে অন্য কোথাও নেই। এবং কার দ্বারা উৎপাদন? যে তাদের কেউ নয়। যাঁর মাতা তাদের শ্বশ্রীমাতা হবার বহুপূর্বেই এই সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। দ্বৈপায়ন নিজে কালো, তার মাতা কালো, তার পিতা কালো, সুতরাং এই তিনজনের একজনও যে আর্য নন, সে বিষয়ে কোনো তর্ক নেই। উপরন্তু দ্বৈপায়ন তাঁর মাতার বৈধ-সন্তান নন।

যে মেয়ে দুটি সত্যবতীর পুত্রের নিকট আত্মদান করতে বাধ্য হয়েছিলো, সে মেয়ে দুটিও শান্তনুর রক্তসম্পর্কিত কেউ নয়। সত্যবতী শান্তনুর বংশের জন্য বিচলিত ছিলেন না। ছিলেন স্বীয় বংশ বিস্তারের জন্য। অতএব ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুও এ বংশের কেউ নয়। সত্যবতীর অনুরোধে ভীষ্ম তার ব্রহ্মচর্য বিসর্জন দিতে অস্বীকার করলেও দ্বৈপায়ন নিজের ব্রহ্মচর্য বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেননি। অসহায় এবং শোকার্ত বধু দুটির উপরে তিনি বা তার মাতা কেউ সুবিচার করেছেন বলে মনে হয় না। আমরা ধর্মত জানি অনিচ্ছুক রমণীতে সংগত হওয়ার নাম বলাৎকার। সত্যবতী তার কানীন পুত্রকে দিয়ে বিচিত্রবীর্যের দুই পত্নীর উপর সেটাই করিয়েছেন। দুই বধূর গর্ভে দুটি পুত্রই প্রতিবন্ধী কেন হলো? তার কারণ হিসাবেও বধূদেরই দোষী সাব্যস্ত করা হলো। বলা হলো, একজন ভয়ে পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিলো তাই পাণ্ডু পাণ্ডুর হয়ে জন্ম নিয়েছেন। অন্য বধু চোখ বুজে ছিলো বলে ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছেন।

এই বধু দুটির বেদনা নিয়ে কোনো হা হুতাশ নেই কোথাও অন্য পুত্র বিদুর দ্বৈপায়নেরই পুত্র, কিন্তু মাতা রাজবাটীর একটি দাসী। রাজবাটীর দাসীটির নিকট দ্বৈপায়ন দ্বৈপায়ন বলে নন, সত্যবতীর পুত্র বলেই মহার্ঘ। অপরপক্ষে, দাসী হয়ে রানীর পুত্রকে শয্যায় পাওয়া, রানীর পুত্রবধূদেরও যিনি শয্যাসঙ্গী হয়েছেন তাঁকে পাওয়া, কম সম্মানের কথা নয়। চেহারা যেমনি হোক সেই সম্মান সে সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলো। একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম হলো সেই মিলনের ফলে, যার পিতামহী স্বয়ং সত্যবতী।

বলাই বাহুল্য, শান্তনুর পুত্র বিচিত্রবীর্যের বধূদ্বয়ের গর্ভে দুটি প্রতিবন্ধী পুত্রকে জন্ম দিয়ে দ্বৈপায়ন নিজেকে পিতা বলে ভাবেননি। কেননা তারা বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রজ। সেই পুত্রদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকা নিয়ম নয়। সে দুটি প্রতিবন্ধী পুত্রের পিতার নাম দ্বৈপায়ন নয়, বিচিত্রবীর্য। তাই তার স্নেহও রাজকন্যাদের দুই পুত্রের চেয়ে দাসীপুত্রের প্রতিই বেশি ছিলো। তদ্ব্যতীত, রাজকন্যা দুটি যে তাঁকে অতিশয় অনিচ্ছা এবং ঘৃণার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলো যে বিষয়েও তিনি অবহিত ছিলেন। আবার ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের অপেক্ষা পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ নামধারী পুত্রদের প্রতিই তিনি বেশি আসক্ত ছিলেন। তার মধ্যে যেটি বড়, যার নাম যুধিষ্ঠির, সে ছেলে যে বিদুরের ঔরসে কুন্তীর গর্ভজাত অবৈধ পুত্র সেটা অন্যদের কাছে গোপন থাকলেও তিনি নিজে তা জানতেন বলেই মনে হয়।

দেখা যাচ্ছে, অসিতাঙ্গ ও অবৈধ সন্তানদের প্রতি দ্বৈপায়নের একটা বিশেষ আকর্ষণ, তাদের যে কোনো প্রকারে হোক জিতিয়ে দিতে তিনি আগ্রহী। তার সংকলনে তিনিই সমাজের নিয়ামক। তার বাক্যই চরম বাক্য। তার বিধানই বিধান। নিজেকে তিনি নিজেই স্রষ্টা হিশেবে দেখিয়েছেন। অনেক সময়ে গ্রীক নাটকের বিবেকের মতো হঠাৎ হঠাৎ উপস্থিত হয়ে তিনি সত্য উদঘাটন করেন। কিন্তু তার বিধানে কর্ণ অপাঙক্তেয়। কর্ণকে তার জন্মকলঙ্কের লজ্জা থেকে তিনি মুক্ত করেন না। পুত্রবধূ কুন্তীকে এ ব্যাপারে অভয়দান করেন না। শুধু যে কর্ণের প্রতিই তিনি নির্মম তাই নয়, ভীমের প্রতিও খুব প্রণয়শীল মনে হয় না। ভীষ্মকে শেষ পর্যন্ত আমরা যে একজন বৃদ্ধ রাজকর্মচারী ব্যতীত আর বিশেষ কিছুই মনে করি না, সেই ছবিও সচেতনভাবে তারই অঙ্কন। তিনিই এই ছবিটি কাহিনীর বিভিন্ন পর্বে বার বার দেখিয়ে এতেই আমাদের এমন অভ্যস্ত করেছেন যে পিতার প্রিয়চিকীর্ঘ হয়ে নিজের জীবন যৌবন উৎসর্গ করবার মাহাত্য তাঁকে মহাত্মায় পরিণত হতে দিলো না। সেই উৎসর্গিত অসাধারণ একটি ব্যক্তিত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে প্রায় স্মরণাতীত একটি সাধারণ মানুষে পরিণত হলো।

সত্যবতীর দূরদর্শিতার আয়নায় প্রথম থেকে শেষ ছবিটির পর্যন্ত ছায়া প্রতিফলিত হয়েছিলো। তাঁর এই অবৈধ পুত্র রাজা হবেন না সেটা সত্য। কিন্তু তার পুত্র পৌত্ৰাদি তো হতে পারে? সেটাই বা কম কী? তাই সেই ব্যবস্থাই পাকা করে ফেললেন রাজপুত্রদের অকালমৃত্যুর পর। পর্বত বন সমাকীর্ণ, সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হয়ে ধর্মানুসারে প্রজাপালনে যিনি সক্ষম, যশ সত্য দম দান্ত তপস্যা ব্রহ্মচর্য দান ধ্যানে যিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁকেই হতে হলো কতগুলো অযোগ্য মানুষের হুকুম তামিলের দাস। শান্তনুর ঔরসে সত্যবতীর যে দুটি পুত্র ছিলো, একজন চিত্রাঙ্গদ, আর একজন বিচিত্রবীর্য, দুটি পুত্রই যথাক্রমে আস্ফালনে ও কামুকতায় সমান দক্ষ। সারা যৌবন ভীষ্মই বকলমে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব বহন করলেন, কিন্তু নামে এঁরাই রাজা। ঝুঁকি তার, উপভোগ ওঁদের যতোদিন জ্যেষ্ঠ চিত্রাঙ্গদ জীবিত ছিলেন, তিনিই ছিলেন রাজা। তাঁর মৃত্যুর পরে সত্যবতী ভীমের সাহায্যেই কনিষ্ঠ পুত্র বিচিত্রবীর্যকে সিংহাসনে বসালেন। ঠিক আগের মতোই ভীষ্ম তাঁর প্রজ্ঞাতা দিয়ে, বিচক্ষণতা দিয়ে, নির্বিঘ্নে রাজ্যচালনার চাকাটি তৈলাক্ত রাখতে লাগলেন।

বিচিত্রবীর্যের জন্য মহিষী দুটিকেও ভীষ্মই সংগ্রহ করে এনেছিলেন। যখন বিচিত্রবীর্য অবিবাহিত ছিলেন এবং যুবক হয়ে উঠছিলেন, এই সময়ে সংবাদ এলো কাশীরাজ তাঁর কন্যাদের স্বয়ংবর সভার আয়োজন করেছেন। তৎক্ষণাৎ সত্যবতীর অনুমোদন নিয়ে সেই কন্যাদের জয় করে আনতে চলে গেলেন ভীষ্ম। তার কি একবারও মনে হলো না, যিনি পাণিপ্রার্থী, এসব ক্ষেত্রে তারই যাওয়া উচিত? স্বয়ংবর সভায় কন্যা তার নির্বাচিত পাত্রকেই মাল্যদান করে, সেজন্য পাণিপ্রার্থীরাই যান। পরিবর্তে ভীষ্ম গিয়ে হাজির হলেন সেখানে এই বয়স্ক পাণিপ্রার্থটিকে দেখে অন্যান্য রাজনবর্গ পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে কিঞ্চিৎ ঠাট্টাতামাসাও করলেন। এই বয়সে বিয়ে করার শখ নিয়ে টিটকিরিও দিচ্ছিলেন।

প্রশ্নটা এই ভীমের মতো একজন প্রাজ্ঞ, বয়স্ক ব্যক্তি, শ্রেষ্ঠ ক্ষত্রিয় যোদ্ধা, যিনি বলেন, “আমি ত্ৰৈলোক্য পরিত্যাগ করতে পারি, ইন্দ্রতু পরিত্যাগ করতে পারি, এবং তদপেক্ষাও যদি কোনো অভীষ্টতম বস্তু থাকে তা-ও পরিত্যাগ করতে পারি, কিন্তু কদাচ সত্য পরিত্যাগ করতে পারি না। যদি পৃথিবী গন্ধ পরিত্যাগ করে, যদি সূর্য প্রভা পরিত্যাগ করে, জল যদি মধুর রস পরিত্যাগ করে, জ্যোতি যদি রূপ পরিত্যাগ করে, বায়ু যদি সর্পিলগুণ পরিত্যাগ করে, তথাপি আমি সত্য পরিত্যাগ করতে পারি না। সেই তিনিই যখন বর না হয়েও কন্যাদের রথে আরোহণ করিয়ে বলেন, ‘কেউ কন্যাদের বিচিত্র অলংকারে আচ্ছাদিত করে ধনদান পূর্বক গুণবান পাত্রে সমর্পণ করেন। কেউ কেউ দুটি গোরু দিয়ে পাত্রসাৎ করেন, কেউ বলপূর্বক বিবাহ করেন। কেউ কেউ প্রিয় সম্ভাষণে রমণীর মনোরঞ্জন পূর্বক তার পাণিপীড়ন করেন। পণ্ডিতেরা অষ্টবিধ বিবাহবিধি নির্দেশ করেছেন। স্বয়ংবর বিবাহবিধি উত্তম বিবাহের মধ্যে গণ্য। রাজারা স্বয়ংবর বিবাহকেই অধিক প্রশংসা করেন। ধর্মবাদীরা তার চেয়ে বেশী প্রশংসা করেন পরাক্রম প্রদর্শনপূর্বক অপহৃত কন্যার পাণিগ্রাহীকে। সুতরাং আমি এদের বলপূর্বক হরণ করলাম। আমি যুদ্ধার্থে প্রস্তুত। ইচ্ছেমতো তোমরা যুদ্ধ বা অন্য যে উপায়ে হোক এদের উদ্ধার সাধনে যত্নবান হতে পারো।’ এই ব্যবহার কি তার উপযুক্ত?

ভীষ্ম নিজে পাণিগ্রাহী নন, তথাপি এইরূপে এই উক্তি তার চরিত্রের পক্ষে অমৃতভাষণের তুল্যই অসংগত। এই উক্তি শ্রবণে, এই কর্ম দর্শনে, অন্যান্য নৃপতিরা ক্রোধে কম্পান্বিত কলেবর হয়ে দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করে সত্বর অলংকার উন্মোচন করে রাজসভায় একটা ভীষণ কলরোল শুরু করলেন। অতঃপর বহুসংখ্যক নৃপতিবর্গ ঘোরতর সংগ্রামে লিপ্ত হলেন। চতুর্দিক থেকে বিরোধীরা ভীষ্মকে ঘিরে ধরে ভীমের উপর অনবরত বাণ বর্ষণ করতে লাগলেন। কিন্তু ভীষ্ম রণনৈপুণ্যে সকলকে পরাস্ত করে কন্যাদের নিয়ে প্রস্থান করলেন। পথে শাল্ব সম্মুখীন হয়ে, ঈৰ্ষা এবং ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে, তিষ্ঠ তিষ্ঠ বলে পুনরায় ভীষ্মকে সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করলেন, এবং পরাস্ত ভূপতিবর্গ সাধুবাদ জানিয়ে শান্বকে খুব উৎসাহ দিতে লাগলেন। পুনরায় প্রজ্বলিত ভীষ্ম তার দিকে ধাবিত হয়ে তাঁকেও পরাভূত করলেন। কাশীপতির এই তিনটি কন্যাই সম্ভবত ভীমের এই যুদ্ধ-নৈপুণ্য দর্শনে মোহিত হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, বয়স যাই হোক, এরকম বীর পাণিগ্রাহী অবশ্যই বরণীয়। কিন্তু যখন দেখলেন পাণিগ্রহীতা তিনি নিজে নন, তখন তিন ভগ্নীর মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠা, তিনি বললেন, “আমি মনে মনে শাল্বকেই বরণ করেছি। একথা শুনে তাঁকে তার স্বেচ্ছানুরূপ কার্য করবার জন্য মুক্তি দিলেন দেবব্রত। তারপর বিমাতার সঙ্গে পরামর্শ করে অন্য দুটি কন্যা অম্বিকা ও অম্বালিকাকে বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিবাহ দিলেন।

বিচিত্রবীর্য রাজ্যপালনে অক্ষম হয়েও রাজা, স্বয়ংবরসভায় না গিয়েও বিজয়ী। অন্যের শৌর্যে বিজিত কন্যাদের সঙ্গে বিবাহিত হয়ে মহানন্দে সাত বৎসর নিরন্তর বিহার করে যৌবনকালেই যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে নিয়তিক্রমে তাঁকে শমনসদনে যেতে হলো। তারপরে কিছুকাল পর্যন্ত কোনো রাজা উপবিষ্ট ছিলেন না সিংহাসনে। সেই শূন্য সিংহাসন শূন্য রেখেই ভীষ্ম রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

শূন্য সিংহাসন পূর্ণ হতে বড়ো কম সময় লাগলো না। শিশুরা জন্ম নিলো, বড়ো হলো, তবে তো হস্তিনাপুরের রাজা হলো? কিন্তু সেখানেও বাধা। বড়ো পুত্রটি অন্ধ, ছোটো পুত্রটি পাণ্ডুর। সুতরাং আর একটি সুস্থ শিশু না জন্মালে চলে না। অতএব পুনরায় ব্যাসদেবের আবির্ভাব এবং সুস্ত শিশুর জন্ম দেবার আমন্ত্রণ এবং বিদুরের জন্ম। রাজকন্যাদের চালাকির ফলে বিদুর জন্ম নিলো রাজবাটীরই একটি সুন্দরী দাসীর গর্ভে। সে অবশ্য সুস্থ সন্তান এবং তার পিতা বিচিত্রবীর্য নন, একান্তভাবেই স্বয়ং ব্যাসদেব। কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মতো হলেও দ্বৈপায়ন বিদুরের পিতৃত্বকে অস্বীকার করলেন না। বিচিত্রবীর্যের পুত্ররা তার দ্বারা জন্মগ্রহণ করলেও তারা ক্ষেত্ৰজ বিচিত্ৰবীৰ্যই তাদের পিতা। প্রকৃতপক্ষে যে স্নেহ মমতা সন্তানের প্রতি প্রাকৃতিক ভাবেই পিতার বক্ষে জন্ম নেয়, সেটা এই ক্ষেত্রজদের প্রতি দ্বৈপায়নের ছিলো না। ক্ষেত্ৰজরাও নিজেদের বিচিত্রবীর্যের সন্তান হিশেবেই অজ্ঞান বয়স থেকে জানায় কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে পিতা ভাবার কোনো কারণ ঘটেনি। কিন্তু রাজকাৰ্য তো থেমে থাকে না। থাকেওনি।

হস্তিনাপুরের অধিবাসীরা ভীষ্মকে যথোচিত মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত। সুতরাং তাদের নিকট ভীমের কোনো কার্যই প্রতিবাদযোগ্য নয়। ভীষ্ম যা করেন তাই যে তাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য এ নিয়ে তারা বিন্দুমাত্র সংশয়ী নন। এদিকে সত্যবতীও জানেন তিনি যা করবেন তা-ই মেনে নেবেন ভীষ্ম। তিনি সশব্দেই বলুন, নিঃশব্দেই বলুন, সত্যবতীর কোনো ইচ্ছেকেই ভীষ্ম প্রতিরোধ করতে অক্ষম। নচেৎ কুমার কালের সন্তানটিকে রাজপুরীতে আহবান করে নিয়ে আসার সাহস তিনি পেতেন না। প্রত্যয় হয়, এই ধীবরকন্যাটিকে রাজবাটীতে আনয়ন করে পিতার হস্তে সমর্পণ করার পরে তিনিও সমৰ্পিত হয়ে গিয়েছিলেন। মহারাজা শান্তনুর একমাত্র কুলতিলক দেবব্রতকে আমরা যতোদিন দেবব্রতরূপে প্রত্যক্ষ করেছি, সমস্ত দিক বিবেচনা করলে তার তুল্য এমন সর্বগুণসম্পন্ন মহৎ চরিত্র মহাভারতে আর নেই। যে মুহুর্তে তিনি ভীষ্ম হলেন সেই মুহুর্ত থেকেই তার দুর্বার ব্যক্তিত্ব স্তিমিত হলো। কেন হলো? সত্যবতীই কি তা সমূলে উৎপাটিত করে সেই অনন্য ব্যক্তিটিকে একেবারে নিজের কুক্ষিগত করে ফেললেন? নচেৎ, আমন বিচিত্র বিশাল মহাদেশে তো একটাই সিংহাসন পাতা ছিলো না দেবব্রতর জন্য? যাকে সমরোদ্যত নিরীক্ষণ করলে শত্রুপক্ষ ‘সিংহভীত গো-পালের ন্যায় ভয়ে উদ্বেগে কম্পমান’ হয়, যিনি ক্রুদ্ধ হলে যে কুলোদ্ভবই হোক না কেন অচিরকালের মধ্যেই পঞ্চতৃপ্রাপ্ত হয়, যার শৌর্যবীর্য পরশুরাম অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, নীতি ও মেধায় যিনি অপ্রমেয়, কী করে তিনি অমন নিশ্চেষ্টভাবে বছরের পর বছর নিক্রিয় হয়ে বসে রইলেন? কখনো কোনো যুদ্ধ জয়ে যাননি, শিকারে যাননি, ভ্রমণে যাননি, কিছুই করেননি। না হয় পূর্ববৎ মাতামহ জহুমুনির আশ্রমেই প্রত্যাবৃত হতেন। জীবনের উৎকৃষ্ট সময়টা তো তিনি সেখানেই কাটিয়েছিলেন। পিতার কাছে যতোদিন কাটিয়েছেন, মাতার কাছে তার বহুগুণ বেশি সময় কাটিয়েছেন। আশ্রম জীবন তো তার কাছে অচিন্ত্যনীয় নয়। অন্তত অন্যের বশবর্তী হয়ে থাকা অপেক্ষা অবশ্যই সম্মানজনক। সত্যবতীর বংশধরদের জন্য সিংহাসন অটুট রাখার দায়িত্ব তো তার নয়। মনে হয় সত্যবতী কখন কী করাবেন, কী বলবেন, সেই অপেক্ষাতেই তিনি যেন সদাসচকিত। বলা যায় সত্যবতীর অঙ্গুলি হেলনেই তিনি উঠতেন বসতেন। তার নিজের কি কোনো আশা আকাজক্ষা বাঞ্ছা বাসনা কিছুই আলাদাভাবে ছিলো না? যে রমণী তাঁকে জাগতিক সর্বসুখে বঞ্চিত করেছেন, তার জন্য এমন আত্মবিসর্জন কী করে সম্ভব? কুরুকুলের এই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিই যাঁর আয়ত্তে তার তবে কাকে ভয়? কাকে লজ্জা? তার ইচ্ছেই চরম ইচ্ছে। সেজন্যই নিদ্বিধায় সত্যবতী নিজের কলঙ্কটিকে আহবান করে নিয়ে এলেন এই রাজপুরীতে। তিলতম লজ্জাও তাঁকে বিড়ম্বিত করলো না। যদি তা না আনতেন তা হলে কি বিদুরের মতো একটি ধূর্ত, অবৈধ, পরগাছার প্রবেশ ঘটতো এই সংসারে?

সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বিষয় এটাই, সত্যবতীর প্রতি মুগ্ধতাবশত ভীমের আনুগত্য যতটা সীমাহীন, ততোটাই কার্যকারণের অনধীন। কেবলমাত্র এই কারণেই তিনি যে স্বীয় সর্বনাশ ডেকে এনে সমগ্র কুরুকুলকেই নিশ্চিহ্ন করেছেন তা-ই নয়, সমগ্র দেশটাকেই প্রায় মনুষ্যহীন করে ভাসিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য পুস্তকটি অনেক স্থলেই অসঙ্গতি দোষে দুষ্ট। নিষাদ বালক একলব্যকে নিষাদ বলেই দ্রোণ শিষ্য হিশেবে গ্রহণ করতে পারলেন না, অথচ রাজ্যের যিনি প্রভু তিনি বিবাহ করলেন একজন ধীবরকন্যাকে ধীবররা যেখানে সকলেই নিষাদ। সঙ্গে সঙ্গে এই তথ্যটাও জানতে কৌতুহল হয়, দ্বৈপায়নের পিতা পরাশরমুনি যখন সত্যবতীর পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন, সত্যবতী তাঁকে কী কারণে প্রত্যাখ্যান করলেন? পরাশর অযোগ্য নন। তাঁকে গ্রহণ করলে অবৈধ পুত্রকে আর অবৈধ কলঙ্কে কলঙ্কিত থাকতে হতো না। সত্যবতীর চরিত্রেও কোনো কালো দাগ থাকতো না।

মহাভারতের মহারণ্যে – ১.১


মহাভারতের মহারণ্যে – প্রতিভা বসু

প্রথম পর্ব- 

মহর্ষি শৌনকের আশ্রমে পুরাণ-কথক সৌতি যেদিন এসে উপস্থিত হলেন, তার মুখ থেকেই ঋষিরা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত মহাভারত কথা শ্রবণ করলেন। এই গ্রন্থ ব্যাসদেবেরই ‘মনঃসাগর-সম্ভুত-অমৃত-নির্বিশেষ-গ্ৰন্থ’, যে গ্রন্থ ইতিহাস পুরাণের অনুসরণ ও ভূত ভবিষ্যৎ বতর্মান কালত্রয়ের সম্যক নিরুপণ, এবং জরা মৃত্যু ভয় ব্যাধি ভাব অভাব শুধু নয়, ইতিহাস ভূগোল দশর্ন পুরাণ, এমনকি যুদ্ধকৌশল ভূতত্ত্ব নৃতত্ত্ব ইত্যাদি সকল বিষয়ের বিবরণে সমৃদ্ধ।
তবে দ্বৈপায়ন কিন্তু মূলত একটি বিশেষ রাজত্বের বিশেষ বংশ নিয়েই উপাখ্যানটি রচনা করেছেন। সেই বংশের নাম ভরতবংশ। যে ভরতবংশের ইতিহাস তিনি আমাদের গোচরীভূত করেছেন, তার স্থাপয়িত্রী শকুন্তলা। শকুন্তলা আশ্রমনিবাসিনী ছিলেন। পুণ্যতোয়া মালিনী নদী বেষ্টিত, বহু বৃক্ষ সমাকীর্ণ আশ্রমটি ব্যতীত কিছুই তিনি দেখেননি। তিনি কণ্বমুনির পালিতা অতি সরলা এক কন্যা। রাজা দুষ্মন্ত শিকারে এসে অতি রমণীয় একটি বনে উপস্থিত হলেন। অনেক পশু বধ করে একাই ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে পড়েছিলেন। এই রমণীয় বনের মধ্যেই তিনি অতি মনোরম আশ্রমটি দেখতে পেলেন। আশ্রমটি দেখতে পেয়ে তিনি সেখানে প্রবিষ্ট হলেন এবং কুটিরটির নিকটে এসে উচ্চস্বরে ডেকে বললেন, ‘এখানে কে আছেন?’
লক্ষ্মীর মতো এক সুন্দরী কন্যা বেরিয়ে এসে রাজা দুষ্মন্তকে স্বাগত জানিয়ে অভ্যর্থনা করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী প্রয়োজন বলুন, আমার পিতা কণ্বমুনি ফল আহরণ করতে গেছেন, একটু অপেক্ষা করলেই তিনি এসে যাবেন।‘ রাজা দুষ্মন্ত বললেন, ‘আপনি কণ্বমুনির দুহিতা?’ কিন্তু তিনি তো উর্ধ্বরেতা তপস্বী। শকুন্তলা তখন তাঁকে তার জন্মবৃত্তান্ত বললেন। তারপর বললেন, ‘শরীরদাতা, প্রাণদাতা, অন্নদাতাঁকে শাস্ত্রমতে পিতা বলা হয়। মহারাজ! আমাকে কণ্বমুনির দুহিতা বলেই জানবেন।’ শকুন্তলা যখন কুটির থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন কোনো কথাবার্তা বলার পূর্বেই তাঁকে দেখে তৎক্ষণাৎ দুষ্মন্তের কামস্পৃহা প্রজ্বলিত হুতাশনের মতো লেলিহান হয়ে উঠেছিলো। তিনি বললেন, ‘তোমার লাবণ্যসলিলে আমি আকণ্ঠ মগ্ন। তোমার শরীরের উপর তোমার কর্তৃত্ব, তাই তুমি আত্মসমর্পণ না করলে তোমাকে পেতে পারছি না, তুমি প্রার্থনা পূরণ করো।’ তখন শকুন্তলার মতো একটি সরল মধুর অপাপবিদ্ধ আশ্রমকন্যার পক্ষে যা নিতান্তই অস্বাভাবিক, দেহ সমর্পণ করার পূর্বে তিনি কিন্তু সেই রকমই একটি প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলেন দুষ্মন্তকে দিয়ে। ঠিক সত্যবতীর মতো বললেন, ‘আপনার ঔরসে আমার গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে, আপনি বিদ্যমানে সে যুবরাজ হবে এবং অবিদ্যমানে রাজা হবে।’
দুষ্মন্ত বললেন, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়।’ তারপর গন্ধর্ব মতে বিবাহ করে শকুন্তলার সমর্পিত দেহ নিয়ে সঙ্গমক্রিয়া সম্পন্ন করে চলে গেলেন। বলে গেলেন, ‘আমি তোমাকে যোগ্য সমাদরে নিয়ে যাবার জন্য চতুরঙ্গিণী সেনা পাঠাবো, রানীর সম্মানে তুমি রাজভবনে প্রবিষ্ট হবে।’ ব্যাস, সেই যে গেলেন আর কোনো খবর নেই।
ইতিমধ্যে যথাসময়ে শকুন্তলার মহাপরাক্রান্ত, মহাবল, অলৌকিক গুণসম্পন্ন এক পুত্রের জন্ম হলো। এর পরের ঘটনায় আসবার পূর্বে একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করতে বলি। মহাভারতের সমস্ত বিখ্যাত কন্যার জন্মই রূপকথার আচ্ছাদনে আবৃত। ইন্দ্রের নির্দেশে বিশ্বামিত্রের তপোভঙ্গ করে তাঁর সঙ্গে সঙ্গমজাত কন্যাকে জন্মানো মাত্রই তার মাতা অপ্সরা মেনকা মালিনী নদীর তীরে হিংস্র জন্তু সমাকীর্ণ নির্জন বনে নিক্ষেপ করে চলে গেলেন। কণ্বমুনি নদীতে স্নান করতে গিয়ে দেখলেন পক্ষীরা একটি সদ্যোজাত শিশুকে জন্তু জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঘিরে বসে আছে। মুনি দয়াপরবশ হয়ে কন্যাটিকে এনে স্বীয় আশ্রমে স্বীয় কন্যার মতো পালন করতে লাগলেন। সত্যবতীর জন্মবৃত্তান্ত আরো অদ্ভুত। তিনি জন্মান মাছের পেটে। গল্পটা এই রাজা উপরিচর বসুর মৃগয়ায় গিয়ে বসন্তের শোভা নিরীক্ষণ করতে করতে স্ত্রীর জন্য কামনার উদ্রেক হয়। এবং সেই কারণে তার শুক্র স্থলিত হয়। সেই শুক্র গ্রহণ করে এক মৎসীরূপী অপ্সরা গর্ভবতী হয়। কন্যা জাত হবার পর সেই অপ্সরা শাপমুক্ত হয়ে আকাশপথে চলে গেলে মৎসীর গর্ভজাত কন্যাকে পালন করেন এক ধীবর। সেই থেকে ধীবরকন্যা রূপেই সত্যবতীর পরিচয় পঞ্চপাণ্ডববধূ দ্রৌপদী যজ্ঞবেদী থেকে উত্থিতা। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এই সব কন্যাদের জন্মবৃত্তান্ত কেন রহস্যাবৃত করেছিলেন, তখনকার সমাজে এই সব কন্যাদের প্রকৃত জন্মবৃত্তান্ত বলায় বাধা ছিলো বলেই কি তিনি অলৌকিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, সে কৌতুহল থেকেই যায়।
শকুন্তলার পুত্রের ছয় বৎসর বয়স হয়ে গেলেও যখন তার পিতা দুষ্মন্ত পত্নীকে সাড়ম্বরে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, কোনো খোঁজই আর নিলেন না, তখন কণ্বমুনি সপুত্র শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু রাজা তার পত্নী ও পুত্রকে গ্রহণ করলেন না। কটু ভর্ৎসনা করে সম্পর্ক অস্বীকার করলেন। তাঁকে বললেন, ‘স্ত্রীলোকেরা প্রায়ই মিথ্যেকথা বলে। কে তুমি দুষ্ট তাপসী? আমি তোমাকে চিনি না।’
সভাসদস্যদের সম্মুখে স্বামীর এই উক্তিতে শকুন্তলা প্রথমে স্তম্ভিত হলেও, পরে অপমানে লজ্জায় দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে রোষকষায়িত রক্তচক্ষুর দ্বারা অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে বললেন, জেনেশুনেও কেন অসংকোচে প্রাকৃতজনের মতো কথা বলছো জানি না। আমি যা বলেছি তা সত্য কি সত্য নয় সে বিষয়ে তোমার অন্তঃকরণই সাক্ষী। দুষ্মন্ত তখন শকুন্তলার মাতাকে অসতী এবং পিতাকে কামুক বলায় শকুন্তলা জ্বলে উঠে বললেন, ‘জন্মের বিচারে আমি তোমার চাইতে অনেক উৎকৃষ্ট। শূকর যেমন মিষ্টান্ন ত্যাগ করে পুরীষ গ্রহণ করে, ইতরজন তেমনই সত্যকে ত্যাগ করে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তোমার সহায়তা ছাড়াই আমার পুত্র পৃথিবীর সম্রাট হবে।’
এই সময়ে স্বর্গ থেকে দৈববাণী হলো (যা মহাভারতে সর্ব সময়েই হয়ে থাকে এবং লোকেরা সুবিধেমতো গ্রহণ করে বা করে না), শকুন্তলাকে অপমান করো না, তার সব কথাই সত্য। তার গর্ভজাত স্বীয় পুত্রকে তুমি প্রতিপালন করো। এবং যেহেতু আমাদের অনুরোধে এই পুত্রকে ভরণ করা হলো, তার নাম হোক ভরত।’ এই নাম থেকে ভরতবংশের উৎপত্তি। এই বংশ নিয়েই মহাভারত রচয়িতা সমস্ত আখ্যানটি রচনা করেছেন। দৈববাণী শুনে অমনি দুষ্মন্ত বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো আমি জানি। কিন্তু হঠাৎ তোমাকে গ্রহণ করলে লোকে আমাকে কী বলতো? এইজন্য এতোক্ষণ বিতণ্ডা করছিলাম তোমার সঙ্গে।’
আসলে শকুন্তলার অনবনত তেজ দেখে দুষ্মন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তদ্ব্যতীত, শকুন্তলা বলেছিলেন, ‘আমার পিতা কণ্বমুনি এসব কথা জানতে পারলে তোমার মস্তক বিদীর্ণ হবে।’ এ কথাও বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়ে কলঙ্কের ভয়ে বা লজ্জায় পিছিয়ে যাবার পাত্রী নয়। এ তাঁকে সহজে ছেড়ে দেবে না। কিন্তু শকুন্তলা যদি আশ্রমকন্যা না হতেন তবে কক্ষনো রাজাকে এ ভাবে শঙ্কিত করতে সাহস পেতেন না। যে বিবাহ দুষ্মন্ত কামবশত সকলের অজ্ঞাতে করে এসে মুখ মুছে বসেছিলেন, সেই বিবাহ কিছুতেই মেনে নিতেন না। কিন্তু শকুন্তলা আশ্রমের স্বাধীনতায় বর্ধিত বলেই আহত হলে আঘাত ফিরিয়ে দেবার মনের জোর তার ছিলো। তাই রাজসভায় দাঁড়িয়ে সভাসদদের সামনে একাধারে স্বামী এবং ওরকম এক পরাক্রান্ত রাজাকে এভাবে স্পষ্ট বাক্যে মিথ্যাবাদী দুরাচারী পাপিষ্ঠ থেকে শুরু করে তার মিথ্যাচারকে শূকরের বিষ্ঠাভক্ষণের সঙ্গে পর্যন্ত তুলনা করে তিরস্কার করতে পেরেছিলেন।

কৃতজ্ঞতায়- http://www.ebanglalibrary.com/mahabharata/%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A7%A7-%E0%A7%A8/