একাদশী ব্রত পালন করলে কি হয় ? এবং কেন পালন করবো?


“কৃষ্ণ ভূলি যেই জীব অনাদি বহির্মুখ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুঃখ।।”

শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে জীব অনাদিকাল ধরে জড়া প্রকৃতি প্রতি আকৃষ্ট রয়েছে। তাই ম‍ায়া তাকে এ জড় জগতে নানা প্রকার দুঃখ প্রদান করছে। পরম করুণাময় ভগবান কৃষ্ণস্মৃতি জাগরিত করতে মায়াগ্রস্ত জীবের কল্যাণে বেদপুরাণে আদি শ‍াস্ত্রগ্রন্থাবলী দান করেছেন। ভক্তি হচ্ছে ভগবানকে জানার ও ভগবৎ প্রীতি সাধনের একমাত্র সহজ উপায়।

শাস্ত্রে যে চৌষট্টি প্রকার ভক্ত্যাঙ্গের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একাদশী ব্রত সর্বত্তোম। শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ আদি নবধা ভক্তির পরই দশম ভক্ত্যাঙ্গরূপে একাদশীর স্থান। এই তিথিকে হরিবাসর বলা হয়। তাই ভক্তি লাভেচ্ছু সকলেরই একাদশী ব্রত পালনের পরম উপযোগিতার কথা বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। একাদশী তিথি সকলের অভীষ্ট প্রদানকারী। এই ব্রত পালনে সমস্ত প্রকার পাপ বিনষ্ট, সর্বসৌভাগ্য ও শ্রীকৃষ্ণের প্রীতি বিধান হয়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আট থেকে আশি বছর বয়স পর্যন্ত যে কোন ব্যক্তিরই ভক্তিসহকারে পবিত্র একাদশী ব্রত পালন করা কর্তব্য। সঙ্কটজনক অবস্থা বা জন্মমৃত্যুর অশৌচে কখনও একাদশী পরিত্যাগ করতে নেই। একাদশীতে শ্রাদ্ধ উপস্থিত হলে সেইদিন না করে দ্বাদশীতে শ্রাদ্ধ করা উচিত। শুধু বৈষ্ণবেরাই নয়, শিবের উপাসক, সূর্য-চন্দ্র-ইন্দ্রাদি যেকোন দেবোপাসক, সকলেরই কর্তব্য একাদশী ব্রত পালন করা। দুর্লভ মানবজীবন লাভ করেও এই ব্রত অনুষ্ঠান না করলে বহু দঃখে-কষ্টে চুরাশি লক্ষ যোনি ভ্রমণ করতে হয়। অহংকারবশত একাদশী ব্রত ত্যাগ করলে অশেষ যমযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। যে ব্যাক্তি এই ব্রতকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, জীবিত হয়েও সে মৃতের সমান।

কেউ যদি বলে “একাদশী পালনের দরকারটা কি?’’
সে নিশ্চয় কুম্ভপাক নরকের যাত্রী। যারা একাদশী পালনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে শনির কোপে তার‍া বিনষ্ট হয়। একাদশীকে উপেক্ষা করে তীর্থ স্নান আদি অন্য ব্রত পালনকারীর অবস্থা গাছের গোড়া কেটে পাতায় জল দানের মতোই। একাদশী বাদ দিয়ে যারা দেহধর্মে অধিক আগ্রহ দেখায়, ধর্মের নামে পাপরাশিতে তাদের উদর পূর্ণ হয়। কলহ-বিবাদের করেণেও একাদশী দিনে উপব‍াস করলে অজ্ঞাত সুকৃতি সঞ্চিত হয়। পুণ্য প্রদায়িনী সর্বশেষ্ঠ এই ব্রত শ্রীহরির অতি প্রিয়। একাদশী ব্রত পালনে যে ফল লাভ হয়, অশ্বমেধ, রাজসূয় ও বাজপেয় যজ্ঞদ্বারাও তা হয় না। দেবরাজ ইন্দ্রও যথাবিধি একাদশী পালনকারীকে সম্মান করেন। একাদশী ব্রতে ভাগবত শ্রবণে পৃথিবী দানের ফল লাভ হয়। অনাহারে থেকে হরিনাম, হরিকথা রাত্রিজাগরণে একাদশী পালন করা কর্তব্য। কেউ যদি একাদশী ব্রতে শুধু উপবাস করে তাতে বহু ফল পাওয়া যায়। শুদ্ধ ভক্তেরা এই দিনে একাদশ ইন্দ্রিয়কে শ্রীকৃষ্ণে সমর্পণ করেন।

একদশীতে শস্যমধ্যে সমস্ত পাপ অবস্থান করে। তাই চাল, ডাল, আটা, ময়দা, সুজি, সরিষা আদি জাতীয় খাদ্যদ্রব্য একদশী দিনে বর্জন করা উচিত। নির্জলা উপবাসে অসমর্থ ব্যক্তি জল,দুধ, ফল-মূল, এমনকি আলু, পেঁপে, কলা, ঘিয়ে বা বাদাম তেল অথবা সূর্যমুখী তেলে রান্না অনুকল্প প্রসাদ রূপে গ্রহন করতে পারেন। রবিশস্য (ধান, গম, ভূট্টা, ডাল, ও সরিষা) ও সোয়াবিন তেল অবশ্যই বর্জনীয়। দশমী বিদ্ধা একাদশীর দিন বাদ দিয়ে দ্বাদশী বিদ্ধা একাদশী ব্রত পালন করতে হয়। একাদশীতে সূর্যোদয়ের পূর্বে বা সূর্যোদয় কালে (1ঘন্টা 36 মিনিটের মধ্যে) যদি দশমি স্পর্শ হয়, তাকে দশমী বিদ্ধা বলে জেনে পরদিন একাদশীব্রত পালন করতে হয়। মহাদ্বাদশীর আগমন হলে একাদশীর উপবাস ব্রতটি মহাদ্বাদশীতেই করতে হয়। একাদশী ব্রত করে পরের দিন উপযুক্ত সময়ে শস্যজাতীয় প্রসাদ গ্রহণ করে পারণ করতে হয়। শাস্ত্রবিধি না মেনে নিজের মনগড়া একাদশী ব্রত করলে কোন ফল লাভ হয় না। একাদশী উপবাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরে ছাব্বিশটি একাদশী আসে। সাধারণত বার মাসে চব্বিশটি একাদশী। এইগুলি হচ্ছে– উৎপন্না, মোক্ষদা, সফলা, পুত্রদা, ষটতিলা, জয়া,বিজয়া, আমলকি, পাপমোচনী, কামদা, বরুথিনী, মোহিনী, অপরা, নির্জলা, যোগিনী, শয়ন, কামিক‍া, পবিত্রা, অন্নদা, পরিবর্তিনী বা পার্শ্ব, ইন্দিরা, পাশাঙ্কুশা, রমা এবং উত্থান।কিন্তু যে বৎসর পুরুষোত্তমাস, অধিমাস বা মলমাস থাকে, সেই বৎসর পদ্মিনী ও পরমা নামে আরও দুটি একাদশীর আবির্ভ‍াব হয়। যারা যথাবিধি একাদশী উপবাসে অসমর্থ অথবা ব্রতদিনে সাধুসঙ্গে হরিকথা শ্রবণে অসমর্থ, তারা এই একাদশী মাহাত্ম্য পাঠ কবা শ্রবণ করলে অসীম সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন।

Advertisements

একাদশী-কেন-আমরা-পরের-দিন-পালন-করি?


আমরা একাদশী পালন করি সূর্যোদয় থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত। রাত ১২ টা বা মধ্যরাত্রির হিসাব পাশ্চাত্য জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব অনুযায়ী; কিন্তু বৈদিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত থেকে হিসাব করতে হয়। সাধারণত তা সূর্যোদয় থেকেই হিসাব করা হয়। আমাদের হিসাবটি এরকমঃ একাদশী তিথির মধ্যে যদি সূর্যোদয় পড়ে, তাহলে ঐদিনই একাদশী পালন করতে হবে। আর যদি সূর্যোদয়ের পর (এক মিনিট পর হলেও) একাদশী তিথি শুরু হয় তাহলে তা পরের দিন পালন করতে হয়। আমাদের সকল বৈদিক উৎসবই এভাবে পালিত হয়ে আসছে। এটার মানে আমাদেরকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে একাদশী তিথির (নির্দিষ্ট সময় ব্যবধান) মধ্যে যেন সূর্যোদয় পড়ে। আমরা পাশ্চাত্য রীতি অনুসরণ করি না। তারা বড়দিন ২৫ ডিসেম্বর – নির্দিষ্ট দিনে পালন করে কিন্তু আমাদের জন্মাষ্টমীর জন্য ঐরকম নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই।

তিথির সূর্যোদয় নিয়মঃ

১। যদি একাদশী তিথিটি সূর্যোদয়ের পর শুরু হয়ে পরের দিন সূর্যোদয়ের পূর্বেই শেষ হয়ে যায় তাহলে তা পরের দিন পালন করতে হবে। একে উন্মীলনী মহাদ্বাদশী বলে।

২। যদি কোনো তিথিতে দুটি সূর্যোদয় পড়ে তাহলে তা আগের দিন পালন করতে হয় (একাদশী, অমাবস্যা, পূর্ণিমা ব্যতীত)।

৩। যদি একাদশী তিথি ব্রাহ্মমূহুর্তে (সূর্যোদয়ের ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট পূর্বে) তাহলে তা শুদ্ধ একাদশী। যদি তা সূর্যোদয়ের পরে শুরু হয়, তাহলে তা অপবিত্র একাদশী, এবং তা পরের দিন তথা দ্বাদশী বা মহাদ্বাদশীতে পালন করতে হয়।

৪। যদি দ্বাদশী সূর্যোদয়ের পর শুরু হয়ে পরের দিন (ত্রয়োদশী) সূর্যোদয়ের পূর্বে শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাকে ত্রিস্পর্শা মহাদ্বাদশী বলা হয়।

৫। যদি দ্বাদশীতে পরপর দুটি সূর্যোদয় পড়ে, তাহলে প্রথম দ্বাদশীতে উপবাস পালন করতে হয়। একে ব্যঞ্জুলী মহাদ্বাদশী বলে।

৬। যদি একাদশীর পরের অমাবস্যা বা পূর্ণিমাতে পরপর দুটি সূর্যোদয় পড়ে, তাহলে একে পক্ষ-বর্ধিনী মহাদ্বাদশী বলা হয়। (যেমন- পুরুষোত্তম মাসের পরমা একাদশী)

একাদশী তিথি কি? ড.শ্রীমন্ম মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজজীর অপূর্ব ব্যাখ্যা।


একাদশী তিথি কি? ড.শ্রীমন্ম মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজজীর অপূর্ব ব্যাখ্যা।


একাদশী তিথির আর এক নাম হরিবাসর। বাসর শব্দের দুইটা অর্থ। বাসর বলিতে ঘর বোঝায়। যেখানে বাস করা হয়। বাসর শব্দের অপর অর্থ দিন,দিবস।
হিন্দু শাস্ত্রে দুর্গার জন্য দিন আছে আশ্বিনী সপ্তমী অষ্টমী নবমী।মাকালীর জন্য দিন আছে অমাবস্যা,শিবের জন্য চতুর্দশী ,লক্ষীর জন্য পূর্ণিমা ইত্যাদি। জামাইয়ের জন্য দিন আছে ষষ্ঠী,ভাইর জন্য দিন আছে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। শ্রীহরির জন্য একটি বিশেষ দিন,তার নাম হরি বাসর-একাদশী। ঐদিন আমরা শ্রীহরির সঙ্গে এক ঘরে বাস করিব। মনটা হরির পাদপদ্মে হইতে কোথাও যেন না সরিয়া যায়-এইভাবে চলিব।
আমাদের নানা স্থানে চলিতে হয় প্রধানতঃ আহারের চিন্তায়। ঐদিন আহার বাদ দিলে অনেক চলাফিরা কমিয়া যায়,আমাদের ছুটাছুটি বাড়ে ইন্দ্রিয়ের চঞ্চলতা হেতু। ইন্দ্রিয় সংযত হলে চিত্ত স্থির হয় ছুটাছুটি কমিয়া যায়।
আমাদের ১১টা ইন্দ্রিয়।চক্ষু,কর্ণ,নাসিকা,জিহ্বা ও ত্বক-৫ টি জ্ঞানেন্দ্রিয়। বাক্,পাণি,পাদ,পায়ু ও উপস্থ-৫টি কর্মেন্দ্রিয়। আর অন্তরিন্দ্রিয় একটি মন। এই এগারটি ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখিয়া শ্রীহরির গৃহে তার সঙ্গে বাস করার জন্য একদিশী দিবস নির্দিষ্ট। হরি গৃহ কোথায় যেখানে হরিনাম ও হরিকথা কীর্তন পাঠ হয় সেই স্থানই হরির ঘর।
সুতরাং ঐদিন সর্বদা হরিনাম কীর্তন ও হরিকথা আলাপনে কাটিলে হরিসঙ্গে একঘরে বাস করা হয়,সুতরাং একদশী দিনে কর্তব্য আহার ত্যাগ করিয়া বা আহার সাধ্যমত কমাইয়া সারা-দিন-রাত ভগবান্ শ্রীহরির নামকীর্তন,গুণকীর্তন,লীলাকীর্তন ও শাস্ত্রগ্রন্থ পাঠ লইয়া অতিবাহিত করা।
এই অনুষ্ঠান সত্য ত্রেতা যুগ হইতে প্রবর্তিত আছে। কলিযুগে মহাপ্রভু গৌরাঙ্গদেব আসিয়া অদ্বৈত আচার্যের বাড়ি বিশেষভাবে একদশীর অনুষ্ঠান প্রবর্তণ করেন। সকল বৈষ্ণবগণ হরিবাসর কীর্তণ করেন।
শ্রীশ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দরের অবতার। তিনিও একদশীর অনুষ্ঠান করিয়াছেন।ও ভক্তদের করিতে আদেশ করিয়াছেন।

সুতরাং এই দিনে আমরা কৃষ্ণকথা,গৌরকথা,জগদ্বন্ধুসুন্দরের লীলা গাথা-কথা স্মরণে চিন্তনে আলোচনায় কাটাইব। ইহাতে আমারা আধ্যাত্মিক পথে শ্রীহরির দিকে অগ্রসর হইব। শুধু আমাদের কল্যাণ নহে গ্রামের কল্যাণরাজ্যের কল্যাণ,পুথিবীর সকল নরনারীর মহাকল্যাণ সাধিত হইবে। একাদশী তিথির জয় হউক্। জয় জগদ্বন্ধসুন্দরের জয় হউক।

শ্রীশ্রী পবিত্রারোপিণী একাদশী মাহাত্ম্য


– শ্রীশ্রী পবিত্রারোপিণী একাদশী মাহাত্ম্য –

শ্রীশ্রী পবিত্রারোপিণী একাদশী মাহাত্ম্য

একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন-হে প্রভু! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কি তা কৃপা করে আমাকে বলুন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন-হে মহারাজ! এখন আমি সেই পবিত্র ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করুন। যা শোনামাত্রই বাজপেয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়। প্রাচীন কালে দ্বাপর যুগের শুরুতে মহিজীৎ নামে এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তিনি মাহিস্মতি
নগরে রাজত্ব করতেন। কিন্তু দু:খের বিষয় এই যে তার মনে বিন্দুমাত্র সুখ-শান্তি ছিল না। কেননা তিনি ছিলেন অপুত্রক। ‘পুত্রহীনের ইহলোক পরলোক কোথাও সুখ হয় না’- এইরূপ চিন্তা করতে করতে বহুদিন কেটে গেল। কিন্তু তবুও পুত্রমুখ দর্শনে রাজা বঞ্চিতই রইলেন। নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভগা মনে করে রাজা চিন্তাগ্রস্থ হলেন। প্রজাদের সামনে গিয়ে বলতে লাগলেন-হে প্রজাবৃন্দ! তোমরা শোন। আমি এই জন্মে তো কোন পাপকাজ করিনি, অন্যায়ভাবে আমার রাজকোষ বৃদ্ধি করিনি, ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের সম্পদ কখনও গ্রহণ করিনি উপরন্তু প্রজাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেছি, ধর্ম অনুযায়ী পৃথিবী শাসন করেছি। দুষ্টদের যথানুরূপ দন্ড দিয়েছি, সজ্জন ব্যক্তিদের যথাযোগ্য সম্মান করতেও কখনও অবহেলা করিনি। তাই হে ব্রাহ্মণগণ, এই প্রকার ধর্মপথ অবলম্বন করা সত্ত্বেও কেন আমার পুত্র লাভ হল না, তা আপনারা কৃপা করে অনুসন্ধান করুন। রাজার এই প্রকার কাতর উক্তি শ্রবণে ব্যথিত রাজভক্ত পুরোহিত ব্রাহ্মণগণ রাজার
মঙ্গলের জন্য গভীর বনে ত্রিকালজ্ঞ মুনিঋষির কাছে যেতে মনস্থ করলেন। বনের মধ্যে ঋষিদের আশ্রমসকল দেখতে দেখতে তারা এক মুনির সন্ধান পেলেন। তিনি দীর্ঘায়ু, নীরোগ, নিরাহারে ঘোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। সর্বশাস্ত্র বিশারদ ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালজ্ঞ সেই মহামুনি লোমশ নামে পরিচিত। ব্রহ্মার এক কল্প অতিবাহিত হলে মুনিবরের গায়ের একটি লোম পরিত্যাক্ত হোত। এই কারণে এই মহামুনির নাম লোমশ। তাকে দেখে সকলেই ধন্য হলেন। তারা পরস্পর বলতে লাগলেন যে, আমাদের বহু জন্মের সৌভাগ্যের ফলে আজ আমরা এই মুনিবরের সাক্ষাৎ লাভ করলাম। তারপর ঋষিবর তাদের সম্বোধন করে বরলেন-কি কারণে আপনারা এখানে এসেছেন এবং কেনই বা আমার এত প্রশংসা করছেন, তা স্পষ্ট করে বলুন। আপনাদের যাতে মঙ্গল হয়, আমি নিশ্চয়ই তার চেষ্টা করব। ব্রাহ্মণেরা বললেন-হে ঋষিবর! আমরা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি আপনি তা কৃপা করে শুনুন। এ পৃথিবীতে আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আর কোথাও নেই। মহিজীৎ নামে এক রাজা নি:সন্তান হওয়ায় অতি দু:খে দিনযাপন করছে। আমরা তার প্রজা, তিনি আমাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেন।
কিন্তু তিনি পুত্রহীন বলে আমরাও সবাই মর্মাহত। তার দু:খ দূর করতে আমরা এই বনে প্রবেশ করেছি। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! রাজা যাতে পুত্রের মুখ দর্শন করতে পারেন, কৃপা করে তার কোন উপায় আমাদের বলুন। তাদের কথা শুনে মুনিবর ধ্যানমগ্ন হলেন। কিছু সময় পরে রাজার পূর্বজন্মবৃত্তান্ত বলতে লাগলেন। এই রাজা পূর্বজন্মে এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। একবার তিনি একটি অন্যায় কার্য করে ফেলেন। ব্যবসা
করবার জন্য তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত করতেন। এক সময় জৈষ্ঠ্য মাসে শুক্লপক্ষের দশমীর দিনে কোথাও যাওয়ার পথে তিনি অত্যন্ত তৃষ্ণার্থ হয়ে পড়েন। গ্রাম প্রান্তে একটি জলাশয় তিনি দেখতে পান। সেখানে জলপানের জন্য যান। একটি গাভী ও তার বাছুর সেখানে জলপান করছিল। তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজেই জলপান করতে লাগলেন। এই পাপকর্মের ফলে তিনি পুত্রসুখে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু পূর্বজন্মের কোন পুণ্যের ফলে তিনি এইরকম নিষ্কণ্টক রাজ্য লাভ করেছেন। হে মুনিবর! শাস্ত্রে আছে যে পুণ্য দ্বারা পাপক্ষয় হয়। তাই আপনি এমন একটি পুণ্যব্রতের উপদেশ করুন যাতে তার পারব্ধ পাপ দূর হয় এবং আপনার অনুগ্রহে তিনি পুত্রসন্তান লাভ করতে পারেন। লোমশ মুনি বললেন-শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পবিত্রারোপণী একাদশী ব্রত অভিষ্ট ফল প্রদান করে। আপনারা যথাবিধি তা সকলে পালন করুন। লোমশ মুনির উপদেশ শুনে আনন্দ চিত্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে তাঁরা রাজাকে সে সকল কথা জানালেন। তারপর সকলে মিলে মুনির নির্দেশ অনুসারে ব্রত পালন করলেন। তাদের সকলের পুণ্যফল রাজাকে প্রদান করলেন। সেই পুণ্য প্রভাবে রাজমহিষী গর্ভবতী হলেন। উপযুক্ত সময়ে বলিষ্ঠ, সর্বাঙ্গসুন্দর এক পুত্রসন্তানের জন্ম দান করলেন। ভবিষোত্তরপুরাণে এই মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। এই ব্রত মাহাত্ম্য যিনি পাঠ বা শ্রবণ করবেন তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন এবং পুত্রসুখ ভোগ করে অবশেষে দিব্যধাম প্রাপ্ত হবেন।

কৃষ্ণ কৃপাই জীবের মুক্তি √√√
░░জয় শ্রী কৃষ্ণ░░