স্বপ্রয়োজন-সিদ্ধির উপদেশ


আশ্লিষ্য বা পাদরতাং পিনষ্টু মাম্
অদর্শনান্মর্মহতাং করোতু বা ।
যথা তথা বা বিদধাতু লম্পটো
মৎপ্রাণনাথস্তু স এব নাপরঃ ॥ ৮ ॥
অনুবাদঃ শ্রীকৃষ্ণ আমায় ভালবেসে আলিঙ্গনই করুন, কিংবা তাঁর পদতলে পিষেই ফেলুন, আমাকে দেখা না দিয়ে আমার হৃদয়কে পুড়িয়ে ছারখারই করুন, সে লম্পট যা ইচ্ছা তাঁর তাই করুন, তথাপি তিনিই আমার প্রাণনাথ, আর কেহ নয় ।

অমৃত-প্রভা ভাষ্যঃ

এই শ্লোকেই ভক্তের ব্যাধির অব্যর্থ মহৌষধী । আমার অসীমকে সীমার মধ্যে পেয়েছি । তাই এই principle-কে সবসময় আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে । আমরা অসীমের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হতে যাচ্ছি, তখন একথাও মনে রাখতে হবে যে, তিনি প্রেমের, সৌন্দর্য্যের দেবতা হলেও তিনি অসীম । আমাদের কাছে তিনি এক, কিন্তু তাঁর ত’ আমাদের মত বহু ভক্ত, তিনি আমাদিগকে প্রেমে আলিঙ্গন, আদর করলেও আমরা তার উল্টোটার জন্যও প্রস্তুত থাকব । কৃষ্ণের আদর ও অনাদর—দুটোর জন্যই আমার নিজেকে প্রস্তুত রাখব; যে কোন বিপরীত ব্যবহার—অনভিপ্রেত ব্যবহার পাই, সবই সমানভাবে গ্রহণ করব ।
কৃষ্ণ কোন সময় উদাসীন হতে পারেন । তিনি আমাদের অনাদর করে যখন কোন পীড়া দেন তাতে তিনি যে নিকটতর তা বুঝতে হবে, কিন্তু যদি উদাসীনতা দেখান, তবে তা যথেষ্ট অসহ্য দণ্ড বলে মানতে হবে । ভক্ত তখন চিন্তা করে, কৃষ্ণ আমাকে এত এড়িয়ে যাচ্ছেন, এত অনাদর করছেন যে, বোধ হয় তিনি আমার সাথে কোন সম্পর্কই রাখতে চান না । তিনি কি আমাকে জানেন না ? আমি কি তাঁর পর ? তাঁর অজানা । তাঁর দণ্ডকেও তাঁর কৃপা বলে মাথা পেতে নেব । কিন্তু তাঁর উদাসীনতা ত’ অসহ্য!সবচেয়ে বেশী পীড়াদায়ক ।
ভক্তের বিরহবিধুর যন্ত্রণা এইখানেই শেষ হয় না । তা আরও গভীরভাবে তার মর্মস্থলে আঘাত হানে । কৃষ্ণ যখন আর কাউকে ভালবেসে আমার চক্ষের সামনেই আলিঙ্গন-চুম্বন করেন, তাতে একটুও দ্বিধা বোধ করেন না, তখন ভাবে এ ত’ আমারই দাবী; আমারই সামনে আর কেউ কেড়ে নেবে!—এই ভাবনাতেই তার দুঃখ-যন্ত্রণা আরও বাড়তে থাকে ।
এই ত’ প্রেমের রীতি, প্রেমের স্বভাব! প্রেমের রীতি সবই সহিতে পারে, কিন্তু উদাসীনতা তার অসহ্য । তবুও তা সহ্য করতেই হয় । গোড়া থেকেই আমাদের বুঝা দরকার যে, কৃষ্ণপ্রেমের অর্থই এই । সে ত’ Autocrat—স্বেচ্ছাচারী । সে ত’ প্রেমবিগ্রহ! আর প্রেম অর্থ দয়া justice নয় । প্রেমের রাজ্যে কোন নিয়ম খাটে না; There is no law there । তা জেনেই ত’ আমরা সেই কৃষ্ণপ্রেমকেই আমাদের সৌভাগ্য বলে বরণ করে নিয়েছি । তাই সেখানে justice আশা করার কোন মানে নাই । কৃষ্ণপ্রেমেও কোন শুদ্ধ আইনি বিধান নাই, তা ত’ স্বাধীন! তা যেখানে সেখানে যার তার প্রতি হয়ে যেতে পারে । তাই আমরা কিই বা দাবী, অধিকারটা সাব্যস্ত করব ?—আমাদের কোন অধিকারই ত’ সেখানে খাটে না!
সর্ব্বোচ্চ কৃষ্ণপ্রেমের রীতিটাই এই । এই প্রেম ত rate—ক্বচিৎ কারো ভাগ্যে ঘটে! তাই আমাদের দিক্ থেকে দ্বিধাহীন আশ্রয় নেওয়া, শরণাগতিই দরকার । এইটিই প্রকৃত প্রেম । এই প্রেমের জন্য সব কিছুকেই স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে । ‘Die to live’ যদি তোমার এই মনোভাব নিয়ে ভাল-মন্দ সবটাকেই স্বচ্ছন্দে, নির্বিকারে মেনে নিতে পার, তবে সেই exalted plane-এ পৌঁছাতে পারবে ।

প্রেম আইনের ঊর্দ্ধেঃ

ন্যায় আইনের গণ্ডীর ভিতর থাকে । দয়া বা করুণাবৃত্তিটি কিন্তু আইনের উপরে, প্রেম ত’ বটেই । প্রেম আইনের উপরে, আবার প্রেমেরও নিজস্ব আইন law আছে । শ্রীল রূপগোস্বামিপাদের এই শ্লোকটিতে এইটিই বলা হয়েছে—
বিরচয় ময়ি দণ্ডং দীনবন্ধো দয়াম্বা
গতিরিহ ন ভবত্তঃ কাচিদন্যা মমাস্তি ।
নিপততু শতকোটিনির্ভরং বা নবাম্ভস্
তদপি কিল পয়োদঃ স্তূয়তে চাতকেন ॥
চাতক পাখীর স্বভাব ত’ সকলেই জানে । সে বর্ষার জল ছাড়া অন্য কোন জলই খাবে না । সে জল নদীরই হোক বা পুকুরের হোক বা সমুদ্রেরই হোক । সে কেবল উপরের দিকে ঠোঁট মেলে বর্ষার জলবিন্দুকেই চায় । শ্রীল রূপ গোস্বামী এই উপমাটি দিয়ে ভক্তগণকে বলতে চান যে তাঁরা যেন কৃষ্ণপ্রেমের একবিন্দু ব্যতীত অন্য কোন প্রেমই না চান ।
ভক্ত প্রভুর কাছে প্রার্থনা জানায়, “তুমি পতিত জনের বন্ধু, তাই আমার আশাবন্ধ । তুমি কৃপাই কর, আর দণ্ডই দাও, আমার তোমার পাদপদ্ম ছাড়া অন্য কোন আশ্রয় নাই ।”
আমাদের শরণাগতি ঠিক ঐ চাতক পাখীর মত হওয়া চাই । তার ত’ কেবল দৃষ্টি আকাশ থেকে সেই বারিবিন্দুর জন্য, সে বারি প্রচুর এসে তার তৃষ্ণা দূর করুক, তাকে ভাসিয়ে দিক্, অথবা বজ্রপাত হয়ে সে ধ্বংসই হোক, তার কেবলই প্রার্থনা সেই বর্ষার বারিবিন্দু । কৃষ্ণের প্রতি আমাদের সেইরূপ মনোভাব হওয়া চাই । তিনি কৃপা করুন, আর নাই করুন, আমার একমাত্র পথ—তাঁর চরণেই শরণাগতি ।
এ প্রসঙ্গে আমার একটি শ্লোক মনে পড়ে । যখন শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে শ্রীরাধারাণী ও গোপীগণের সঙ্গে মিলিত হলেন, তখন তিনি নিজেকে তাঁদের কাছ থেকে এত দীর্ঘদিন দূরে রাখাতে তিনি যে ভয়ানক অন্যায় করেছেন, তা তাঁর অনুভব হল । তিনি তাতে নিজেকে এতটা অপরাধী মনে করলেন যে, শেষে তিনি শ্রীমতী রাধারাণীর পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলেন ।
একজন ভক্তকবি এই প্রসঙ্গটিকে একটি শ্লোকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন এবং শ্রীরূপ গোস্বামী স্বরচিত পদ্যাবলীতে উদ্ধার করেছেন । সে সময় কৃষ্ণ ভারতবর্ষের একছত্র সম্রাট, কিন্তু তিনি যখন বৃন্দাবনের মাঝে গোপীগণের কাছে এলেন তখন তিনি নিজেকে অত্যন্ত অপরাধী মনে করলেন, এবং অনুতপ্ত হয়ে নুয়ে পড়ে শ্রীরাধারাণীর পা ধরতে যাচ্ছেন এমন সময় শ্রীরাধারাণী পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “এ তুমি কি করছ ?আমার পা ছুঁতে যাচ্ছ কেন ? আশ্চর্য্য! তোমার কি আত্মবিস্মৃতি ঘটল!

“আমিই প্রকৃত অপরাধী”ঃ

“তুমি এ বিশ্বের স্রষ্টা—প্রভু । তোমার কার্য্যের ত’কোন কৈফিয়ৎই দাবী করা চলে না—তুমিই আমার প্রাণনাথ, আমার হৃদয় সর্বস্ব, আমি তোমার ক্রীতদাসী । হতে পারে তুমি কোন কারণে অন্যত্র ব্যস্ত ছিলে । তাতে কি ক্ষতি হল ? তোমার তাতে দোষটা কি ? তাতে কিছুই আসে যায় না । যাবতীয় শাস্ত্র ও সমাজ ত’ তোমাকে সে অধিকার দিয়েই আছে । তাতে কোন দোষও নাই, অপরাধও নাই । তুমি কিছুই অন্যায় কর নাই ।”
“আমিই প্রকৃত অপরাধী । নীচতা আমাতেই আছে । সব দোষই ত’ আমার । আমাদের এই বেদনাদায়ক বিচ্ছেদের জন্য তুমি দায়ী নও । কেনই তুমি নিজেকে এত দোষী বলে মনে করছ ? আমিই যে প্রকৃত অপরাধী, তার জ্বলন্ত প্রমাণই হচ্ছে যে তোমার বিচ্ছেদেও আমি বেঁচে আছি! তোমার বিরহে মরে যাই নাই ।
জগতে আমি মুখ দেখাচ্ছি! তাই তোমার প্রতি আমার প্রকৃত প্রেমই নাই । তোমার প্রেমের গাঢ়তা ত’ আমার নাই! তাই আমিই ত’ অপরাধী, তুমি নও । শাস্ত্রে নারীর পাতিব্রত্য ও সতীত্বের প্রশংসা করা হয়েছে । তাই এখনকার মিলনে আমারই ত’ তোমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়ার কথা । তোমার প্রতি যে আমার প্রেম নাই সেই জন্যই । আমি এখনও দেহ ধরে রয়েছি, লোককে মুখ দেখিয়ে বেড়াচ্ছি । সত্যিই ত আমি তোমার যোগ্য নই । তাই তুমিই আমায় ক্ষমা কর । আর তা না করে তুমি ক্ষমা চাইছ ?এ তো বড়ই বিপরীত কথা! এ কি ? তুমি এমন কোরো না ।”
কৃষ্ণের প্রতি আমাদের প্রেমের এই আদর্শই হওয়া চাই । সসীম আমরা অসীমের প্রতি এই রকমই ভাবধারা পোষণ করব ।
কোন সময় তিনি হয়ত আমাদিগের প্রতি কোন নজরই না দিতে পারেন; আমরা কিন্তু তাঁর প্রতি সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকব । এর কোন alternative নাই—বিকল্প নাই । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের উপদেশ দিয়ে বললেন যে, আমাদের কৃষ্ণের প্রতি ঐকান্তিক ভক্তি ব্যতীত অন্য পন্থা নাই, কারণ আমরা দীনাতিদীন, অতি নগণ্য এই-ই আমাদের বিচার ।
যদি আমরা এত বিরাট বস্তু পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজেদেরকে অবজ্ঞা করলে ত’কোন ক্ষতি নাই । নিজেকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া, নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেওয়ার চিত্তবৃত্তিই একমাত্র কাম্য । যুদ্ধের জন্য, দেশের জন্য যে সৈনিক নিজেকে প্রস্তুত করছে তার আবার বিলাস, সুখ-সুবিধার চিন্তা করার অবসর কোথায় ?
এই প্রসঙ্গে আমার মনে আছে, গান্ধীজী যখন অহিংসা সংগ্রামসেনা গঠন করলেন, তখন একজন স্বেচ্ছাসেবক চাইলেন, “আমাদের জন্য একটু চায়ের ব্যবস্থা করা যাক,” গান্ধীজী তাকে বললেন, “তোমার জন্য নদীর জল মাত্র যোগাড় করা যেতে পারে । কিন্তু চা নয় । যদি তাতেই তুমি রাজি, তবে চলে এস ।” সেই রকম আমরা যখন কৃষ্ণের বৃন্দাবন-লীলার পরিকর হওয়ার বাসনা রেখেছি, তখন কোন চুক্তি করা চলে না । তাহলেই আমরা শ্রীমন্মহাপ্রভুর “তৃণাদপি সুনীচেন” উপদেশের মর্ম্ম উপলব্ধি করতে পারব । আমাদের দিক্ থেকে কোন অনুযোগ বা শর্ত রাখা চলবে না । শুধুমাত্র নিজের বর্তমান জীবনের বাহ্যিক অবস্থাতেই নয়, এমন কি আমাদের নিত্য জীবনে আমাদের দিক থেকে সকল প্রকার অভিযোগ বা শর্তকে সযত্নে পরিহার করে চলতে হবে এবং আমরা অপরিহার্য্য-ভাবেই আমাদিগকে প্রভু নির্দেশিত বিধানই সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করব । কৃষ্ণ আমাদের আত্মসাৎ করুন আর নাই করুন, আমরা তাঁকেই চাইব । তাহলেই সাধনরাজ্যে আমাদের উন্নতি হবে ।
যে কোন উপায়েই হোক, যদি আমরা কৃষ্ণের সেবক-গোষ্ঠীতে প্রবেশ করতে পারি, তা হলে দেখতে পাব যে প্রায় প্রত্যেকেরই স্বভাব এই রকম । যখন তাঁরা মিলিত হন, তখন পরস্পর একে অন্যকে ঐ অবস্থায় সান্ত্বনা দিতে থাকেন । বিভিন্ন সেবা-সম্পর্কে একই স্বভাবের ভিন্ন ভিন্ন সেবকগোষ্ঠী রয়েছেন এবং তাঁরা কৃষ্ণকথা বলেই পরস্পরকে সান্ত্বনা দেন । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন,
মচ্চিত্তা মদ্গতপ্রাণা বোধয়ন্তঃ পরম্পরম্ ।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যন্তি চ রমন্তি চ ॥
আমার ভক্তগণ পরস্পর মিলিত হন, আমার কথা কীর্ত্তন করেন, এবং ভাব বিনিময় করে পরস্পরকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁরা এমনভাবে ব্যবহার করেন যাতে বুঝা যায়, তাঁরা আমার সম্বন্ধীয় আলাপেই বেঁচে থাকেন—এইটিই তাঁদের আহার । এইটিতেই তাঁরা সবচেয়ে বেশী আনন্দ পান এবং যখন তাঁরা আমার কথা বলেন, তাঁরা মনে করেন যেন তাঁরা আমার সঙ্গেই রয়েছেন ।
তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ ।
নশ্যামি আত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা ॥
“যখন আমার ভক্তগণ আমার বিরহে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েন, তখন তাঁদের নিকট হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে তাঁদের আমার সঙ্গদান করে তাঁদের তৃষ্ণা নিবারণ করি ।”

বেদনাতেও সুখানুভবঃ

শিক্ষাষ্টকের শেষ শ্লোকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আর একটি সুন্দর ও উচ্চতর সান্ত্বনার কথা প্রকট করেছেন । আর ঐ কথাটি শ্রীল কবিরাজ গোস্বামী বেশ ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন—
বাহ্যে বিষজ্বালা হয়ভিতরে আনন্দময়
কৃষ্ণপ্রেমের অদ্ভুত চরিত ।
ভয় পেওনা । বাহিরের দিক্ থেকে তোমরা অত্যন্ত তীব্র বিরহবেদনা অনুভব করতে পার; কিন্তু অন্তরে একপ্রকার অতুলনীয় রস, একটা সুখকর প্রশান্তি, আনন্দ অথবা ecstacy অনুভব করবে । বাহ্যে বিরহ জ্বালা, অন্তরে প্রেমসুখাস্বাদন ।
এই ভাবে আমরা শাস্ত্রের কথাতে পাই; আর নিজের অন্তরের অনুভবও ঐ সূক্ষ্মতম ব্যাপার অনুমোদন করে । ইংরাজী কবি সেলি (shelley) লিখেছেন—
“Our sincerest laughter
With some pain is fraught;
Our sweetest songs are those
That tell of saddest thought.”
যখনই আমরা কোন মহাকাব্যে নায়ক-নায়িকার নির্মম তীব্র বিরহগাথা শ্রবণ করি, তখন তাতে চোখে জল আসলেও তা এত মধুর যে তা শুনা বা পড়া বন্ধ করি না—এইটাই ঐ বিরহবেদনার চমৎকারিতা । যখন আমরা অন্তঃসত্ত্বা সীতাদেবীর নির্জন বনে নির্বাসনের দুঃখের কাহিনী পড়ি তখন আমরা চোখের জল ফেলি, কিন্তু পড়া ছাড়তে পারি না । দুঃখের মধ্যেও যে আনন্দ আছে, এই তার প্রমাণ ।
কৃষ্ণের কাছ থেকে বিরহ ঠিক এই প্রকার । কৃষ্ণপ্রেমের বিশেষত্ব এই প্রকার । বাইরে তীব্র বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা আগ্নেয়গিরির লাভার মত বয়ে যেতে থাকে, কিন্তু অন্তরে এক অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতি আসে । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই শ্লোকে তাই প্রকট করেছেন । তাঁর উপদেশ অনুসরণ করলে আমাদের ঐ প্রকার দুঃখানুভবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে । বৃন্দাবনে প্রবেশের এইটিই পাথেয় । আর যখন আমরা আমাদের মতই বিরহবিধুর আরও বহু ভক্তকে দেখব তখন আমাদের মর্মবেদনার অন্ত থাকবে না; সুখানুভবের সীমা থাকবে না । অন্যেরাও আমাদের সান্ত্বনা দিতে থাকবে । এই জন্যই ত’ ভয়ের কোন কারণ দেখি না । এসব সত্ত্বেও আমরা জানি সেই ধামই আমাদের নিত্য বাসস্থলী । আমরা স্বধামে—প্রভুর কাছেই ফিরে যেতে চাই ।
সেখানে আমরা বিদেশী নই । এখানেই আমরা বিদেশী । এখানে সকলেই আমাকে তার কাজেই লাগাতে চায় । কিন্তু বৃন্দাবন ধাম ত’ আমার নিজের বাসস্থান । সেখানেই ত’ আমার সব কিছু; অন্তরের শান্তি-তৃপ্তি সব সেইখানেই আছে । এখানে থেকে প্রকৃত সুখ-শান্তি কি বস্তু তা জানতেই পারি না । এইটাই এখানে আমাদের অসুবিধা । তাই আমরা কৃষ্ণচেতনায় যতখানি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকি, ততখানি প্রকৃত বাস্তব সুখের সন্ধান পেতে থাকি, সৌন্দর্য্য, আনন্দ ও চমৎকারিতার আস্বাদন পেতে থাকি—এইভাবেই আমরা উত্তরোত্তর উন্নতির পথে এগোতে থাকি । শ্রীল যমুনাচার্য্য বলেন—
যদবধি মম চেতঃ কৃষ্ণপাদারবিন্দে
নব-নব-রসধামন্যুদ্যতং রন্তুমাসীৎ ।
তদবধি বত নারীসঙ্গমে স্মর্য্যমাণে
ভবতি মুখবিকারঃ সুষ্ঠুনিষ্ঠীবনঞ্চ ॥
“ব্রজের কৃষ্ণপ্রেমের সন্ধান যতদিন পর্য্যন্ত পাই নাই ততদিন পর্য্যন্ত জগতের সুখটাই আমার কাছে খুবই মূল্যবান মনে হত, কিন্তু এখন মনে কোন জাগতিক সুখের কথা এলেই মনে বিকার আসে, ঘৃণায় থুথু ফেলতে ইচ্ছা করে ।”
তাই আমরা যখন কৃষ্ণপ্রেমরসের একবিন্দুর আস্বাদন পাই, তখন বুঝতে পারি জগতের যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ তার তুলনায় অতি তুচ্ছ, অতি হেয় মনে হয়, আবার তার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সেই ভূমিকায় যেতে পারলে জগতের কোন দুঃখ-যন্ত্রণাই তাতে বাধা দিতে পারে না ।
এর আর একটা দিকও আছে । যদিও আমাদের কৃষ্ণবিচ্ছেদ-দুঃখ সহনের জন্য উপদেশ দেওয়া যায়, কিন্তু আসলে তা দুঃখই নয় । কৃষ্ণ নিজেই বলেন—
“ময়ি তে তেষু চাপি অহম্”
আমি সব সময় আমার ভক্তগণের সঙ্গেই থাকি । যেখানেই একজন ঐকান্তিক ভক্ত থাকেন, কৃষ্ণ ছায়ার মত তার কাছে কাছেই থাকেন, যদিও তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় না । এইটিই ত’ কৃষ্ণের স্বভাব ।
অহং ভক্তপরাধীনো হ্যস্বতন্ত্র ইব দ্বিজ ।
সাধুভির্গ্রস্তহৃদয়ো ভক্তৈর্ভক্তজনপ্রিয়ঃ ॥
দুর্বাসাকে কৃষ্ণ বলেছেন, আমি ত’ আমার ভক্তেরই অধীন, দাস । ভক্তের ইচ্ছা ছাড়া কোন স্বঃতন্ত্রতাই আমার নাই । কারণ তারা আমাকে শুদ্ধাভক্তির দ্বারা বশ করে ফেলেছে । আমি সব সময় তাদের হৃদয়েই বাস করে থাকি । আমি শুধু ভক্তের অধীন নই, ভক্তের ভক্তগণেরও অধীন । আমার ভক্তের সেবক যারা, তারাও আমার ততখানি প্রিয় ।

কৃষ্ণ ত’ লাড্ডু নন!ঃ

আমরা কৃষ্ণের জন্য সবকিছু সহ্য করবার জন্য প্রস্তুত থাকব, এটা সত্যি, কিন্তু এতে নিরুৎসাহিত হওয়ার কিছু নাই । কৃষ্ণ প্রেমময়; আমাদের প্রতি তাঁর করুণার তুলনা নাই । তথাপি শ্রীমন্মহাপ্রভু আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, “তুমি কৃষ্ণকে পেতে চাও? কৃষ্ণ ত’ ময়রার দোকানের লাড্ডু নন যে কিনে টুপ্ করে গিলে ফেলবে! তুমি যখন সবচেয়ে সেরা জিনিষটা চাইছ, তখন তার জন্য সব কিছুতেই প্রস্তুত থাক ।”
সেই বেলায় ভক্তগণও আমাদের কাছে এসে বলেন, “ভয় কিসের ? আমরা ত’ তোমারই মত । চল আমরা একসঙ্গেই চলি, ভয় নাই, আমরা ত’ আছি ।” শাস্ত্র বলেন, কৃষ্ণের চেয়ে কৃষ্ণভক্তগণ আরও কৃপালু । তাই আমাদের আশা-ভরসা ত’ কৃষ্ণের ভক্তেরাই । আর কৃষ্ণ ত’ নিজেই বলেন,

“মদ্ভক্তানাং চ যে ভক্তা”

আমার ভক্তের ভক্তরাই আমার প্রকৃত ভক্ত ।
তাই সাধুসঙ্গই আমাদের সবচেয়ে বেশী মূল্যবান । কৃষ্ণের কাছে যেতে গেলে পথপদর্শক বা guide ত’ সাধুরাই ।

“সাধুসঙ্গ সাধুসঙ্গ সর্বশাস্ত্রে কয় ।
লবমাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়॥”

সমস্ত শাস্ত্রের সার কথাই হল সাধুসঙ্গ । এই সাধুসঙ্গের ফলে ভক্তিরাজ্যের সবকিছুই সহজে পাওয়া যায় । জীবনের চরমসিদ্ধিতে পৌঁছাতে গেলে সাধুসঙ্গই সহায়-সম্পদ ।
Advertisements

উন্নত অধিকারে বিপ্রলম্ভরস-বর্ণনা


যুগায়িতং নিমেষেণ চক্ষুষা প্রাবৃষায়িতম্ ।
শূন্যায়িতং জগৎ সর্ব্বং গোবিন্দবিরহেণ মে ॥ ৭ ॥
অনুবাদঃ হে গোবিন্দ! তোমার বিচ্ছেদে সমস্ত জগৎ শূন্য দেখছি । বরষার বারিধারার মত আমি চোখের জলে ভাসছি । তোমার বিরহে এক নিমেষেও যুগের মত মনে হয় ।

অমৃত-প্রভা ভাষ্যঃ

কেহ কেহ এই শ্লোকের অনুবাদে লিখেছেন, হে গোবিন্দ! তোমার বিরহে আমার এক নিমেষ একটি যুগের মত অর্থাৎ ১২ বৎসরের অধিক মনে হয় । ‘যুগ’ শব্দের অর্থ ১২ বর্ষ বলে উল্লেখ দেখা যায় । ভক্তগণের মধ্যে কেহ কেহ ‘যুগ’কে ১২ বর্ষ বলার যথার্থতা প্রতিপাদন করতে গিয়ে বলে থাকেন যে, শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীরাধাভাবভাবিত হয়ে বিপ্রলম্ভ-দশা ১২ বর্ষ ধরে প্রকট করার লীলা করেছিলেন । এও একপ্রকার ব্যাখ্যা । কিন্তু অন্য অর্থে যুগ বলতে millenium বা age অর্থাৎ চতুর্যুগের মত এক যুগ বা লক্ষ লক্ষ বৎসর বা অনন্ত কালও বুঝায় ।
শ্রীমন্মহাপ্রভু বলেন, এক নিমেষ এক যুগের মতই মনে হয় এবং আমার নয়ন থেকে বর্ষার ধারার মত অশ্রু ঝরে । বর্ষাঋতুতে অনেক প্লাবন হয়ে থাকে । আমার চক্ষেও সেইরকম প্লাবন আসায় দৃশ্য বস্তুও আমার চক্ষে অদৃশ্য হয়ে যায় । তাই আমি এমতাবস্থায় যেন কিছুই দেখতে পাই না । আমার দৃষ্টি তোমার প্রতি এতটা আকৃষ্ট হয়ে রয়েছে যে, আমি আমার চারপাশে অন্য কিছুই দেখতে পাই না । সবই শূন্য দেখায় । কারণ গোবিন্দ আমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছেন ।

শ্রীকৃষ্ণ—মূর্তিমান সৌন্দর্য্যঃ

“আমার এইরকম বিচিত্র অবস্থা হয়েছে, কোন কিছুতেই মন আর যায় না । আমার সমস্ত চিন্তা কেবল গোবিন্দকে নিয়ে এবং তা এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছে যে আমি আর যেন আমাতেই নাই, কোন জ্ঞানই নাই, কোন চিন্তাই আর মনে আসছে না । মন কোথায় চলে গিয়েছে—সেই অনন্তের পেছনে । যখন অনাবৃষ্টি হয়, তখন নদ, পুকুর সব শুকিয়ে যায় । জল বাষ্প হয়েই আকাশে উঠে যায় । কোথায়ও একবিন্দু জল পাওয়া যায় না ।
আমার অবস্থাও ঠিক তাই । আমার সমস্ত সুখচিন্তা শুকিয়ে গিয়েছে—সবই শূন্য দেখছি । আমার ইন্দ্রিয়, আমার মন—সব কিছুই সেই সর্বসৌন্দর্য্যের মূর্ত্তবিগ্রহ, সর্ব্বচমৎকারী, সর্বাকর্ষক শ্রীকৃষ্ণই আকর্ষণ করে নিয়েছেন । আর কখন কখন তাঁর একটু বিচ্ছেদ এক যুগ বলে মনে হয় । ভক্ত ভাবতে থাকে কতকাল ত’ কৃষ্ণকে দেখি নাই, কবে দেখেছি বলে মনেই হচ্ছে না । আবার কখনও একটু ক্ষীণ স্মৃতিও আসে—কৃষ্ণের সঙ্গে মিলন হয়েছিল; সে ত’ কবে! কতকাল পূর্বে, সে ত’ অনেক আগেকার কথা; তারপরে কত যুগ পেরিয়ে গেছে! হয়ত’ একটু আধটু মনে পড়ছে, কিন্তু তা বুঝি আর পাব না চিরকালের জন্য । ভক্ত এই রকমই হতাশা, disappointment ও despair-এর মধ্যে কাল কাটাতে থাকে ।
এইটিই হল পরজগতের standard, আমরা যেমন গ্রহ নক্ষত্রদের দূরত্ব light year দ্বারা মেপে থাকি, ঠিক সেই রকম পরজগতের temperament এই রকম standard-এ বিচার করতে হয় । এত বড় উচ্চদের বস্তু যা আমাদের অধিকারের অতীত তাঁকে নিয়ে অনুশীলন করার মত কি এতটা স্পর্ধা আমাদের আছে!
ভক্ত প্রথমেই ভেবেছিলেন, আমি যদি সেই ভূমিকায় যাই তবে আমার আশা পূর্ণ হবে । আমার পিয়াসার তৃপ্তি হবে এবং আমি কিছুটা শান্তি ও সোয়াস্তি পাব । কিন্তু তাঁর ভক্তির গাঢ়তা তাঁকে জীবনের এই রকম unexpected plane-এ নিয়ে যায় । কৃষ্ণপ্রেমের স্বভাবই এই যে সে প্রেমের একবিন্দু যখন রোগীকে দেওয়া যায়, রোগী হয়ত ভাবে, সে শান্তি পেয়েছে, কিন্তু আসলে রোগ ত’ বেড়েই যায় এবং সে একটা বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছায় ।
ভক্ত আরও ভাবতে থাকে, “ভক্তদের চক্ষে অশ্রুর ধারা, তাঁেদর রোমাঞ্চ ও বাক্ রুদ্ধ অবস্থা নামকীর্ত্তনের সময় দেখে আমি ত’ বিস্মিত হয়ে গেছি । ঐ অবস্থায় পৌঁছাবার জন্য আমারও মন চায়; কিন্তু ঐ অবস্থায় পৌঁছেও দেখতে পাই ঠিক তার উল্টোটা !”
কৃষ্ণের সাথে ঐ প্রেমসেবা ভূমিকায় পৌঁছেও ভক্ত বুঝতে পারে—এর ত’ শেষ নাই!বরং যতই তাঁর নিকটতর হই, ততই লালসা বেড়ে চলে—এর শেষ কোথায় ? যতই এগোই, ততই অতৃপ্তি—হায়! কিছুই পেলাম না! কিন্তু ফিরবার উপায় নাই । পেছনে পা ফেলা যায় না, কেবল এগোতে থাকে—এই ত’ প্রকৃত ভক্তের অবস্থা!
পথ দূরে, আরও দূরে । তখন হতাশা আসে, অমৃত আমার হাতের কাছেই, কিন্তু তার আস্বাদ পাই না, পেয়েও ধরতে পারি না—কিন্তু তার charm এমনিই, তাকে ছাড়াও যায় না, আর তার অভাবে নিমেষও যুগের মত মনে হয় ।

চক্ষের বারিধারাঃ

ভক্ত চিন্তা করে চলে, কত যুগ পেরিয়ে গেল । তবুও আমার অভাব ঘুচে না । পেতে চাই, কিন্তু পাই না—সময় বয়ে চলে । কাল অনন্ত; চক্ষের ধারা অনবরত বয়ে চলেছে—চক্ষের জলে বুক ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁকে ত’ ধরতে পারি না! তাই সব দিক্ শূন্য দেখছি, ভবিষ্যতেও হবে—এ ভরসাও পাই না, এই ব্যাধির উপশম হয় এমন কোন কিছুই ত’ দেখি না ।
কেই বা আমায় সান্ত্বনা দেবে ? সব পথই ত’ বন্ধ! কৃষ্ণের প্রেমপাশে বাঁধা পড়েছি!কেউ কি আছে ? আমাকে বাঁচাতে পারে! হায়! আমি যে শেষ হয়ে গেলাম! বাঁচাও আমাকে!
শ্রীমন্মহাপ্রভু বলেন, “আমরা যখন কৃষ্ণপ্রেমের একটুও স্বাদ পাই তখন আর তাকে ছাড়া যায় না, তৃষ্ণা বেড়েই চলে, তবুও তৃপ্তি হয় না । আপাতত এই রকম দুর্দ্দশাই ভোগ করি ।”
কৃষ্ণের তৃষ্ণা যার চিত্তে প্রবেশ করে তারই এই রকম অবস্থা হয় । তার চিত্ত সব কিছুই ছেড়ে দেয়, আবার সব কিছুতেই কেবল কৃষ্ণকেই—সমগ্র হৃদয় জুড়ে তখন কৃষ্ণই তাকে গ্রাস করে বসে ।
এই শ্লোকে শ্রীমন্মহাপ্রভু ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণচেতনার সিদ্ধিলাভের অবস্থাই বর্ণনা করছেন । ভক্তের কৃষ্ণকে পেয়েও না পাওয়ার যে বিরহ বেদনা তাই এই শ্লোকে প্রকটিত হয়েছে । ভক্ত সিদ্ধিলাভের যতই শীর্ষে আরোহণ করতে থাকেন ততই তাঁর আশা বাড়তে থাকে । ততই তিনি নিজেকে শূন্য, রিক্ত মনে করতে থাকেন । তাই শ্রীমন্মহাপ্রভু এই শ্লোকে আমাদের উপদেশ ছলে বলেছেন, “কৃষ্ণের প্রেমামৃতসাগর অগাধ, তার কূল-কিনারা নাই । তুমি ত’ মাত্র একবিন্দু! সাগরে ঢুকে পড়লে তোমার স্থিতি কোথায়, তাই ভাব!

কৃষ্ণসান্নিধ্যে স্বসৌভাগ্য বর্ণন ও সিদ্ধি-লালসা


নয়নং গলদশ্রুধারয়া
বদনং গদ্গদ্-রুদ্ধয়া গিরা ।
পুলকৈর্নিচিতং বপুঃ কদা
তব নামগ্রহণে ভবিষ্যতি ॥ ৬ ॥
অনুবাদঃ হে নাথ! এমন দিন কবে হবে—যখন তোমার নামকীর্ত্তন করতে করতে শ্রাবণের বারিধারার মত আমার চোখের জল নেমে আসবে! গলার স্বর প্রেমানন্দে কাঁপবে, শরীরে রোমাঞ্চ হবে!

অমৃত-প্রভা ভাষ্যঃ

এই শ্লোকেতে জানা যায়, ভক্তের প্রার্থনা পূরণ হয়েছে এবং তিনি কৃষ্ণের প্রেমের রাজ্যে একটি পদও পেয়েছেন । কিন্তু তাঁর ত আশার অন্ত নাই যদিও তিনি নিরাপদ অধিকারটুকু পেয়ে গিয়েছেন, তিনি এখন আবার পদোন্নতি চাইছেন । প্রথমে ত’ তিনি কৃষ্ণের শ্রীচরণের পদধূলির একটি কণামাত্র হতে চেয়েছিলেন তা ত’ মঞ্জুর হল; কৃষ্ণের পাদপদ্ম ধূলিকণার নিকট এসেই তাকে গ্রহণ করে নিল; তার পরেই ধূলিকণাটির এক অদ্ভুত পরিবর্ত্তন হল, যেন কেউ ম্যাজিকের ছড়িটি বুলিয়ে দিয়ে তার ঐ পরিবর্ত্তন করে ফেলল । এখন আরও বড়, আরও উচ্চতর দাবী আপনিতেই এসে পড়ল ।
ভক্ত চিন্তা করছে, “কি হল ? আমি ত’ কেবল তোমার পদধূলিকণা হতে চেয়েছিলাম!কিন্তু একি হল ? আমি ত’ কেবল একটি ধূলিকণা, আর তুমি ত’ সর্বেশ্বরেশ্বর পরতত্ত্ব; কিন্তু তোমার পাদপদ্ম স্পর্শমাত্রেই ঐ ধূলিকণাটাই এত বড় অচিন্ত্য বস্তু কি করে হয়ে গেল ? একি ? আমি যে একেবারে বদলে গেছি! এখন আমার আরও বড়, আরও নিবিড়তর সম্বন্ধ পাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে! প্রথমে আমি কেবল একটু ধূলিকণা হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার পদস্পর্শে সেই আশা আরও বেড়ে গিয়েছে—তাই এখন স্বাভাবিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে”—এইটাই হচ্ছে রাগমার্গ ।

প্রেমের রাজাঃ

সাহজিক আকর্ষণ কেবল কৃষ্ণেরই আছে—শ্রীনারায়ণস্বরূপে নাই, বা শ্রীরামস্বরূপে নাই । ‘কৃষ্ণ’ সেই প্রকাশ, manifestation যাঁকে প্রেম বা স্নেহের দ্বারা উপাসনা, ভজন করা চলে । কৃষ্ণই হচ্ছেন প্রেম ও আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু । ভক্তের সমগ্র ভক্তি, প্রেম কৃষ্ণের সম্বন্ধস্পর্শে আসা মাত্রই তার পরিবর্ত্তন, transformation হয়ে যায় এবং ভক্ত আরও নিবিড় সম্বন্ধ চায় এবং তা হয়েও যায় । সে এমন একটা স্তরে পৌঁছে যায় যে তার প্রার্থনা বদলে যায় । সে ভাবে একি হল ? আমি ত’ চোখের জল থামাতে পারি না! অনবরত বয়ে চলে! আর আমি যখন তোমার নামকীর্ত্তন করি তখন নিজেকে control করতে পারি না—সামলাতে পারি না! অন্তরে আর একটা কি ভাবাবেগ আসছে যাতে করে আমার সবই উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে—আমার সাধারণ আশা, আকাঙ্খা সবই গুলিয়ে যাচ্ছে! আমি যেন আর একটা plane-এ পৌঁছে গেছি মনে হচ্ছে! আমি কি করি ? কোথায় যাই ? আমি যেন আর কারও হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছি!

কৃষ্ণপাদপদ্ম—যাদুদণ্ডঃ

আমার আশা আমাকে আর কোথায় নিয়ে চলেছে! এখন আমি ত’ কেবল দূরে থেকে তোমার সেবা করতে চাই না, কারণ তোমার পাদপদ্মস্পর্শে আমার আশা আকাশ ছুঁয়েছে । আমি দেখছি এত সেবক, ভক্ত তোমার কত রকম সেবাই করে যাচ্ছে, তাই দেখে আমারও আশা বেড়ে যাচ্ছে ।
আমি এখন সেই plane-এ যেতে চাই যদিও তা থেকে আমি অনেক দূরে আছি । এখন আমার কাতর প্রর্থনা—আমাকে সেইখানেই নিয়ে যাও, তোমার চরণস্পর্শই ত’ আমার এ আশা জাগিয়ে তুলেছে । তুমিই আমাকে যেমন ইচ্ছা চালাও—যেমন ইচ্ছা খেলাও, আমি ত’ এটাই চাই । যখন আমি এই অনুভূতি নিয়ে শ্রীনাম ভজন ও কীর্ত্তন করি তখন লক্ষ্য করি যে আমার পূর্ব্বের ধারণা বা অনুভূতি সব পাল্টে গিয়েছে । তখন আমার এক নতুন শুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ত্ত অনুরাগের সুতীব্র লালসা জাগে । হে প্রভু! আমার একান্ত প্রার্থনা যে তুমি আমায় তোমার সেই দিব্য প্রেমের রাজ্যে তুলে নাও ।

স্বরূপ-জ্ঞান


অয়ি নন্দতনুজ! কিঙ্করং
পতিতং মাং বিষমে ভবাম্বুধৌ ।
কৃপয়া তব পাদপঙ্কজ-
স্থিতধূলীসদৃশং বিচিন্তয় ॥ ৫ ॥
অনুবাদঃ
হে নন্দতনুজ! আমি তোমার নিত্যদাস । তথাপি আমি নিজ কর্মদোষে এই জন্ম-মৃত্যুর সংসার-সাগরে নিমজ্জিত হয়েছি । এই পতিতাধমকে তুমি দাস বলে গ্রহণ কর এবং তোমার শ্রীচরণের একটি ধূলিকণারূপে মনে কর ।

অমৃত-প্রভা ভাষ্যঃ

এই শ্লোকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রার্থনা করেছেন, হে নাথ! আমার প্রতি কৃপা কর । আমি তোমার কৃপাকটাক্ষের পিয়াসী! আমি নিজের কি করে ভাল করতে হয় তাও জানি না । তাই তোমার করুণা চাই । কৃপা করে আশ্রয় দাও, তোমার প্রেমের রাজ্যে প্রবেশ করতে দাও । তুমিই ত আমার রক্ষাকর্ত্তা সর্বস্ব । আমি তোমার আশ্রয় চাই ।
তিনি কে ? আমরা ত ভগবানের কত প্রকার স্বরূপের কথা শাস্ত্রে শুনে থাকি । কিন্তু আমরা ভগবানের সেই মধুর, সুন্দর স্বরূপের কাছে এসেছি—কৃষ্ণের কাছে এসে গিয়েছি । সে কৃষ্ণ নন্দমহারাজের আদরের দুলাল । তিনি কেবল বৃন্দাবনেই থাকেন আর কোথাও ঐ মধুর হতে সুমধুর নন্দদুলালকে পাওয়া যায় না । এককালে মহান্ পণ্ডিত এবং শ্রেষ্ঠ ভক্তশিরোমণি শ্রীল রঘুপতি উপাধ্যায় মথুরাতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শনের জন্য এসেছিলেন । সেখানে উভয়ের মধ্যে ইষ্টগোষ্ঠীতে শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য ও মাধুর্য্যের আলোচনা হয়েছিল ।
শ্রীমন্ মহাপ্রভু জিজ্ঞাসা করলেন, “আমরা কাকে আমাদের ইষ্টদেব বলে আরাধনা করব ? জীবনের চরম লক্ষ্য কি ? ইত্যাদি ।
শ্রীরঘুপতি উপাধ্যায় উত্তরে বললেন,—
শ্রুতিমপরে স্মৃতিমিতরে ভারতমন্যে ভজন্তু ভবভীতাঃ ।
অহমিহ নন্দং বন্দে যস্যালিন্দে পরং ব্রহ্ম॥
জগতে যারা জন্ম-মৃত্যুভয়ে ভীত, তারা শ্রুতি বা বেদের নির্দেশে চলুক, অপরে মহাভারতাদি স্মৃতিশাস্ত্র অনুসরণ করুক, কিন্তু আমি সেই নন্দরাজার বন্দনা করি, যাঁর আঙ্গিনায় পরংব্রহ্ম ছোট শিশুটি হয়ে খেলা করেন ।
বর্ণাশ্রমধর্ম পালনকারীরা বৈদিক উপদেশ পালন করে সামাজিক জীবনযাপন করে । সাধারণ জনতা স্মৃতির অনুসরণ করে । এই ভাবে সকলেই ঈশ্বর সম্পর্ক রেখে দৈহিক কর্ত্তব্য পালন করে । আর যাঁরা জাগতিক কামনা-বাসনাকে জয় করে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করতে চায়, তারা উপনিষদের অনুসরণ করে । কিন্তু রঘুপতি উপাধ্যায় বলেন, আমি ঐ সবকে তোয়াক্কা করি না । আমি আমার হৃদয়ের প্রেমবৃত্তির অনুসরণ করব । মস্তিষ্ক-কসরতের কোন প্রয়োজন আমার নাই । আমার বিচারে বাস্তব শান্তি হৃদয়ের ব্যাপার, মস্তিষ্কের নয় । আর আমার হৃদয় কেবল নন্দমহারাজকেই চায় । শাস্ত্রে বলেন, “কৃষ্ণই পরাৎপর পরতত্ত্ব পরংব্রহ্ম, এবং সেই পরম্বহ্ম নন্দমহারাজের আঙ্গিনায় হামাগুড়ি দিয়ে খেলা করেন । আমি ত’ বাস্তব পরম সত্যস্বরূপকে সশরীরেই দেখতে পাই ।”
নন্দ কি করে পরতত্ত্ব পরংব্রহ্মকে এইভাবে বশ করলেন ? শ্রীমদ্ভাগবতের ১০।৮।৪৬ শ্লোকে ভক্তরাজ পরীক্ষিত মহারাজ অপূর্ব্ব বালক সাধু ব্রহ্মবিৎ শুকদেব গোস্বামীকে এই প্রশ্নই করেছিলেন,—
নন্দঃ কিমকরোদ্ ব্রহ্মন্ শ্রেয় এব মহোদয়ম্ ।
যশোদা বা মহাভাগা পপৌ যস্যাঃ স্তনং হরিঃ॥
হে ব্রহ্মজ্ঞ! আপনি ত’ সর্বদা ব্রহ্মানন্দে লীন । জগতের কোন জড় সত্তার বোধ আপনার নাই । কারণ আপনি সর্বদা ব্রহ্মানন্দে মগ্ন । জড় জগতের প্রতি আপনার চেতনা কখনও দৃক্পাতও করে না । আর আপনিই বলেন, কৃষ্ণই চরম পরম সত্যস্বরূপ । আমি একটা কথাই জিজ্ঞাসা করি প্রভো! নন্দ কি এমন সাধনা করেছিলেন, তিনি পরম সত্য স্বরূপের এমনকি পরিচয় পেয়েছিলেন যাতে সেই পরমপুরুষ তাঁর এতই আপন হয়ে গেলেন যে, তিনি তাঁর পুত্রত্ব স্বীকার করলেন, তাঁর আঙ্গিনায় হামাগুড়ি দিয়ে খেলা করলেন । মনে হয় তিনি নন্দমহারাজের একেবারে বশীভূত হয়ে গেলেন ?এ কি রকম ? এটা ত’ অত্যন্ত আশ্চর্য্যের বিষয়! এও কি সম্ভব ?
পরাৎপর পরমতত্ত্ব মা যশোদার স্তন্যপান করেন ?
যোগী, ঋষি, তপস্বী জ্ঞানীগণ বলেন যে, এক এক সময় তাঁরা উপাস্য তত্ত্বের ক্বচিৎ সাক্ষাৎ পেয়ে থাকেন সমাধি অবস্থায় । তারপরে হঠাৎ তাঁরা ফিরে আসেন । অধিক সময় ধরে তাঁরা সেই স্তরে থাকতে পারেন না । তাহলে সেই পরতত্ত্ব মা যশোদার কোলে বসে তাঁর স্তন্যপান করেন ? যদি এটা সত্য, আর এও যদি সম্ভব, তা হলে আমরা সেই সহজ পথটি বেছে নেবো না কেন—যাতে সেই পরংব্রহ্মের সঙ্গে আমাদের এতটা আত্মীয় সম্পর্ক হয়ে যেতে পারে ।
তাই রঘুপতি উপাধ্যায় তাঁর প্রার্থনায় দম্ভের সঙ্গে বলেন, আমি শাস্ত্রের এত শত সূক্ষ্ম চুলচেরা বিচারের গোলকধাঁধায় ঢুকতে চাই না । আমি মাত্র সেই নন্দ ও তাঁর পরিজনের কাছে শরণাগত হয়ে যাই—নন্দ যেখানে বড় কর্ত্তা গৃহের মধ্যে, তাঁদের পরিবারের একজন হয়ে যেতে চাই ।
শ্রুতি-স্মৃতি নির্দিষ্ট কর্ত্তব্য-কর্ম করলে উত্তম লোকে যাওয়া যায় । আর কর্ম যোগে ছেড়ে দিয়ে জ্ঞানমার্গে মুক্তির জন্য সাধনা করা যেতে পারে । কিন্তু যদি আরও উন্নততর স্তরের সাধু-গুরু—যেমন নন্দ মহারাজ ও তাঁর পরিবার—এঁদের একজন হয়ে গেলেই আমরা শরণাগতিদ্বারা সেই প্রেমের রাজ্যে পৌঁছে যেতে পারি ।
আমার সাধারণ জ্ঞান আমার পরমার্থ সম্পর্কে বিশ্বাস এই কথাই বলে, যদি সেই পরতত্ত্ব এতই দুর্লভ হয়েও তাঁকে বাস্তব, একেবারে ধরাছোঁয়ার মধ্যে আপনজনরূপে—হৃদয় নিয়ে পেতে পারি, তবে মিছিমিছি এই ঝামেলার মধ্যে যাওয়ার দরকারটাই কি ? যদি কেউ বলে যে, চিলে কানটা নিয়ে গেছে, তবে কানে হাত দিয়ে না দেখে চিলের পেছনে দৌড়াবার দরকার কি ? তাই যদি পরতত্ত্বকে এতই সহজে এতই আপন করে পাই তবে এখানে সেখানে দৌড়াবার দরকার কি ? যদি এটা জানতে পারি যে, ঐ দুর্লভ পরতত্ত্ব কৃপাকরে তাঁর যাবতীয় মাধুর্য্য ও চমৎকারিতা নিয়ে আমার এত নিকটতর হয়ে নেমে আসেন—যা সিদ্ধ মহাপুরুষগণ প্রত্যক্ষ অনুভব করেছেন, পেয়েছেন, তাহলে আমি আর সেই তপস্বী, নির্বিশেষবাদী জ্ঞানী ও ত্যাগী বৈরাগ্যবাদীদের মত মরীচিকার পেছনে শুধু দৌড়াদৌড়ি করি কি জন্যে ?
এটা ত’ সাধারণ জ্ঞান । ক্রান্তদর্শী মহাপুরুষগণ ও শাস্ত্র বলেন যে, নন্দনন্দন কৃষ্ণই পরংব্রহ্ম—এটি ত’ খুব সোজা কথা । আর আমরা যখন সেই সোজা কথাটা বুঝবার স্তরে পৌঁছে গেছি, তখন আমরা ত’ সোজাই কৃষ্ণকে বলতে পারি—হে নন্দ-নন্দন কৃষ্ণ! প্রেম রাজ্যের রাজা! আমি তোমারই প্রেম ও করুণা চাই । আমি তোমারই দাস । আমি ত বুঝেই রেখেছি—অনুভব করেছি, তোমার সাথে আমার স্নেহ-সম্বন্ধ আছেই । আমি তোমারই আশ্রয়ে আছি । কিন্তু অবস্থাগতিকে আমি এখন অসুবিধায় পড়ে গেছি । আমায় এমন কতকগুলি শত্রু ঘিরে রয়েছে, যারা কিছুতেই ছাড়ে না, তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়, সবসময় তোমার সেবা করি—এটা তারা চায় না—তোমার সেবায় নানপ্রকার বিঘ্ন ঘটায় । তবুও ত’ আমি জানি আমার অন্তরে তুমিই আমার প্রভু—তুমিই আমার সর্বস্ব । তোমার সঙ্গ না হলে আমার হৃদয় কিছুতেই শান্তি পাবে না । তাই তোমার কাছে আর্তি জানাই—তোমার কৃপা না হলে আমি এ দুর্দ্দৈব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারব না—এ বন্ধন আমার কাটবে না ।

আত্মার স্বরূপ—সূর্য্যের কিরণকণাসদৃশঃ

এখানে বলা হয়েছে “আমার মনে হয় আমি তোমার সঙ্গে নিত্যযুক্ত নই যদি তা হত, তা হলে, আমার এ বিচ্ছেদ অসম্ভব । আমি ত’ তোমার স্বাংশ অবতারও নই । অন্যান্য অবতারবর্গ কৃষ্ণের স্বাংশ, কিন্তু জীবাত্মা ত বিভিন্নাংশ । শ্রীমদ্ ভগবদ্ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে, জীব তাঁর নিত্য অংশ । কৃষ্ণের তটস্থা শক্তি থেকে জীবের উৎপত্তি ।
“কৃষ্ণের তটস্থা শক্তি ভেদাভেদ-প্রকাশ”
এবং জীব সূর্য্যের কিরণকণের মত, অতি সূক্ষ্ম পরমাণু সদৃশ কৃষ্ণ শক্তির অংশবিশেষ । কিন্তু এখানে ভক্ত বলেন, ‘আমি ত কিরণকণ সদৃশও নই, আমি তোমার পদধূলির একটি কণা, তোমার শ্রীঅঙ্গ-জ্যোতির একটি কণাসদৃশও আমি নই ।’ এইভাবে শ্রীমন্মহাপ্রভু আমাদের হয়ে বলতে চাইছেন যে, আমাদের প্রার্থনা এইরূপই হওয়া উচিত । আমি তোমার অচ্ছেদ্য অংশাংশ—এত বড় কথা বলার সাহস আমার নাই । আমি সত্যিই তোমা থেকে বিচ্যুত একটি ক্ষুদ্র ধূলিকণা, কিন্তু তবুও তোমার করুণাই আমি চাই । তাই আমার প্রতি দয়া কর । তোমার কাছে আমার এ দাবীকে একটা বিশেষ কৃপা বলেই স্বীকার কর । তোমার সাথে যে কোনও একটা সম্বন্ধ জুড়ে দিও, তা যতই ছোট হোক না কেন । কিছুই যদি না পার, তবে এইটুকু দয়াই কর! তোমার শ্রীচরণের একটা ধূলিকণাও করে নিও—এই আমার নিবেদন!