সাত সাতটা জিনিস—যা পেলে কখনও ফেলে দেবেন না



ইন্দ্রাণী ঘোষ অক্টোবর

ভাবছেন নাকি, এ আবার কি মহা ফ্যাসাদে পড়লাম রে বাবা! সাত সাতটা জিনিস যা আপনার জীবনে যদি আসে কখনও, তাহলে ফেলতেও পারবেন না, ওগরাতেও পারবেন না! জাস্ট কথাটি না বলে খপাৎ করে গিলে নিতে হবে? না জানি সে কেমন ঘোরতর ভয়াবহ জিনিস! এও আবার হয় নাকি? হয় হয়। এ আজব দুনিয়ায় সবই হয়। থাক বাবা। আর বেশী ভ্যানতাড়া করব না। শেষে কৌতূহলে আপনার পেটের ভেতর গুড়গুড় করতে থাকবে। তাই এবার শুনেই নিন সেই আজব সাতটি জিনিসের নাম।

সাত সাতটা জিনিস
‘মনু স্মৃতি’র নির্দেশ
আজ্ঞে হ্যাঁ। ‘মনু স্মৃতি’। হিন্দুরা কিন্তু এই ‘মনু স্মৃতি’কে দিব্যি মান্য টান্য করেন। ‘মনু স্মৃতি’ যে সে জিনিস নয়। বহু প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দুধর্মের যাবতীয় আচারবিধির দায়িত্ব তার ওপরই। তা এহেন ‘মনু স্মৃতি’রই একটি শ্লোকে আছে নাকি সে কথা। ‘স্ত্রীয় রত্নায়াথো বিদ্যা ধর্ম শৌচম সুভাষিতম বিবিধানি চ শিল্পানি সমাদেয়ানি সর্বথ’। অর্থাৎ আপনার জীবনের কোনো পর্যায়ে যদি কোনোভাবে, হতে পারে অচেনা কোনো লোকের কাছ থেকে, বা অন্য কোনো উপায়ে যদি সোনাদানা, জ্ঞান, ধর্ম, পবিত্রতা বা শুচিতা, উপদেশ, কোনো শিল্পদ্রব্য আর নারী পান, তাহলে তা ফেলে দেবেন না। যেন তেন প্রকারেণ নিয়েই ছাড়বেন।

টাকা আমার টাকা ওগো
এটা অবশ্য শুধু মনুর যুগের লোকজনই মানতেন না। এখনও এই কথাটি এক্কেবারে খাঁটি সত্য কথা। মনুর যুগে না-হয় রাজা-রাজড়া বা দেব-দেবীর আশীর্বাদে স্বর্গ থেকে ধনরত্ন বর্ষিত হতো। সে ছিল সত্যযুগ বা ত্রেতাযুগ। এখন ঘোর কলি। সে রাজাও নেই যার হাত দিয়ে মুঠো মুঠো মোহর গলবে, আর সেই দেব-দেবীতে আমার-আপনার ভক্তিও নেই। এখন টাকা আছে। টাকা উপায়ের হাজারো উপায়ও আছে। কেউ ঘুষ-টুশ দিচ্ছে নাকি? আরে ভাই। লজ্জা কীসের? মনু বলেছেন, নিয়েই ফেলুন না। শুধু চোখ-কান খোলা রাখবেন। আর টাকা তো টাকাই। সে সাদাই হোক। আর কালো!

জ্ঞান চাই? জ্ঞান?
জ্ঞান চাই?


হুম। এটা একটু সিরিয়াস জিনিস বটে। জ্ঞান। ছোটবেলায় পড়েছিলেন তো ‘জ্ঞানই পরম সত্য’ মার্কা বাণী? ইতিহাস বইতে পড়েও তো ছেন, যে জ্ঞানের জন্য সক্রেটিস, গ্যালিলিও কিই না করেছিলেন! নানা, বালাই ষাট। আপনাকে আমরা অদ্দুর যেতে বলছি না। আপনি জ্ঞানের জন্য প্রাণ বিসর্জন করলে কলিকালের আর বাকি রইলো টা কি? তবে হ্যাঁ। একটা কথা বলব, ছোট্ট পরামর্শ। জানেনই তো পুরনো চাল ভাতে বাড়ার মতো জ্ঞানও রাখলে বাড়ে। আর জ্ঞানের কোনো শেষও নেই। যে যাই করে ফেলুক না কেন, আপনার জ্ঞান কিন্তু আপনারই থাকবে। তাই গোটা জীবনটা পড়ে আছে। বিনা টেনশনে জ্ঞানলাভ করতে থাকুন। ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন।

‘ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে’
এই ধর্ম মানে মনু অবশ্য রিলিজিয়ন বলেন নি। তাঁর কাছে এই ধর্ম মানে ছিল মানুষের ভেতরকার ধর্ম। যাকে খাঁটি বাংলায় বলে মানবধর্ম বা মানুষ হয়ে ওঠার ধর্ম। তা যেখানেই পারবেন না কেন, এই জিনিসটি ছাড়বেন না। যথার্থ মানুষ হবার ধর্মকে অবিশ্যি ছাড়াও যায় না। আর স্বয়ং গান্ধারীই যখন অতো বড় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ছেলেকে বাদ দিয়ে ধর্মের পক্ষে ছিলেন, তখন আপনি তো কোন ছাড়!

সে ছিল পরম পবিত্র
পবিত্রতা বিষয়টাও একটু গুরুগম্ভীর জিনিস। এই পবিত্রতাও বাইরে থেকে আসে না। এ পবিত্রতাও মানুষের ভেতরকার ব্যাপার। দেখবেন এক একজনকে দেখলেই কেমন পবিত্র-শান্ত-শুদ্ধ ভাব জাগে না মনে? এ হচ্ছে তাই। তো এই পবিত্র পবিত্র ভাবটি ছাড়বেন না। ধরে রাখুন। অভ্যেস করুন ‘পবিত্র পবিত্র’ থাকার। দেখবেন কেমন একটা ‘সেন্ট লাইক’ ফিলিংস হচ্ছে!

উপদেশের বোঝা
ফ্রিয়ের বলে একে আবার অন্য জিনিসের মতো হেলাফেলা করবেন না। এ যে সে ফ্রি নয়। এ হল খাস উপদেশ। টাটকা তাজা, এক্কেবারে হাতে গরম। অন্য লোকের থেকে পেলে নিয়েই দেখুন না। এর মতো পরম সম্পদ আর হয় নাকি? কে জানে, জমাতে জমাতে আপনিও হয়তো একদিন উপদেশের আস্ত একটা বোঝা বানিয়ে ফেললেন!

শিল্পদ্রব্য
ভালো ভালো দামী জিনিস দিয়ে নিজের ঘর সাজানোর তাল করছেন নাকি? এই তো সুযোগ। উপহার দিন। উপহার নিনও। আর সেই তালিকায় যদি ঘর সাজানোর ভালোমন্দ শিল্পদ্রব্য থাকে? ব্যাস। লুফে নেবেন জাস্ট। আর যাই হোক, মনুর কথায় আপনার ভালো ভালো শিল্পদ্রব্যের অমন শখটি পূর্ণ হয়ে গেল—একি কম কথা?

নারী!
কি, শেষ ওভারে ক্লিন বোল্ড হয়ে গেলেন তো মনুর ট্যালেন্ট দেখে? আজ্ঞে আপনি ভুল শোনেননি। উনি কিন্তু নারীর কথাই বলেছেন। শুনুন কথা। যেখানে, যেভাবে, যে অবস্থাতেই মেয়ে পাবেন না কেন, সোজা নাকি তুলে নেবেন। তা মনুর দোষ নেই। সেকালে সের’মই ব্যাপার ছিল কিনা! আর মেয়েদের কবেই বা কে পাত্তা দিয়েছে! ভাবলে অবাক হবেন মনুর যুগে মেয়েদের নেহাতই বস্তু বলে ভাবা হতো! রাজ্য, সোনাদানা জয় করার পাশাপাশি সেকালে রাজারা মেয়েদেরও জয় করতেন! নয়তো কি আর মনু তাঁর এই পাওয়ার তালিকায় মেয়েদের রাখতেন? সে যাইহোক, আপনি কিন্তু আবার আনন্দে আত্মহারা হয়ে মেয়ে দেখলেই তুলে নেবেন না। এতে আপনারই বিপদ। হাজার হোক। এটা তো কলিকাল!

তাহলে মনুর অবাক লিস্টের ব্যাপার-স্যাপার দেখে কেমন লাগলো? আপডেটেড বলতে হবে কিন্তু মনুমশাইকে। কেমন দিব্য মাথা খাটিয়ে বের করেছেন! দেরী না করে আপনি দেখুন তো কোনটায় কোনটায় টিক মার্ক দেবেন? আর জানান ‘দাশবাস’কে।

Advertisements

মুখবন্ধ-০২ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


ভগবদ্‌গীতার মর্মোপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই আমাদের দেখতে হবে অর্জুন কিভাবে তা গ্রহণ করেছিলেন। ভগবদ্‌গীতার দশম অধ্যায়ে (১০/১২-১৪) তা বর্ণনা করা হয়েছে-

অর্জুন উবাচ

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্‌।

পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবজং বিভুম্॥

আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা।

অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে॥

সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।

ন হি তে ভগবন্ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ॥ 

অর্জুন বললেন-তুমিই পরম পুরুষোত্তম ভগবান, পরম ধাম, পরম পবিত্র ও পরব্রহ্ম। তুমিই শাশ্বত, দিব্য, আদি পুরুষ, অজ ও বিভু। নারদ, অসিত, দেব, ব্যাস আদি সমস্ত মহান ঋষিরাই তোমার এই তত্ত্ব প্রতিপন্ন করে গেছেন, আর এখন তুমি নিজেও তা আমার কাছে ব্যক্ত করছ। হে শ্রীকৃষ্ণ, তুমি আমাকে যা বলেছ তা আমি সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করেছি। হে ভগবান! দেব অথবা দানব কেউই তোমার তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না।”

পরম পুরুষোত্তম ভগবানের কাছে ভগবদ্‌গীতা শোনার পর অর্জুন বুঝতে পেরেছিলেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরং ব্রহ্ম অর্থাৎ পরব্রহ্ম। প্রতিটি জীবন ব্রহ্ম, কিন্তু পরম জীব অথবা পরম পুরুষোত্তম ভগবান হচ্ছে পরব্রহ্ম। পরং ধাম কথাটির অর্থ হচ্ছে তিনি সব কিছুর পরম আশ্রয় অথবা পরম ধাম। পবিত্রম্ মানে তিনি হচ্ছে বিশুদ্ধ অর্থাৎ জড় জগতের কোন রকম কলুষ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। পুরুষম্ কথাটির অর্থ হচ্ছে, তিনিই পরম ভোক্তা, শাশ্বতম্ অর্থ সনাতন, দিব্যম্ কথাটির অর্থ হচ্ছে অপ্রাকৃত; আদিদেবম্ অর্থ পরম পুরুষ ভগবান; অজম্‌ অর্থ জন্মরহিত এবং বিভুম্‌ শব্দটির অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ।

কেউ মনে করতে পারেন যে, অর্জুন যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের বন্ধু ছিলেন, তাই তিনি ভাবোচ্ছ্বসিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণের গুণকীর্তন করেছেন। কিন্তু ভগবদ্‌গীতার পাঠকের মন থেকে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য অর্জুন পরবর্তী শ্লোকে বলেছেন যে, নারদ, অসিত, দেবল বলে স্বীকার করেছেন। তাই অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন যে, তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথাকেই তিনি সম্পূর্ণ নির্ভুল বলে গ্রহণ করেন। সর্বমেতদ্‌ঋতং মন্যে-“তোমার প্রতিটি কথাই আমি পরম সত্য বলে গ্রহণ করি।” অর্জুন আরও বলেছেন যে, ভগবানের ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করা খুবই দুষ্কর এবং দেবতারাও তাঁর প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারেন না। এর অর্থ হচ্ছে যে, মানুষের চেয়ে উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত যে দেবতা, তাঁরাও ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে অক্ষম। তাই সাধারণ মানুষ ভগবানের ভক্ত না হলে কিভাবে তাঁকে উপলব্ধি করবে?

ভগবদ্‌গীতাকে তাই ভক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।

শ্রীকৃষ্ণকে কখনই আমাদের সমকক্ষ বলে মনে করা উচিত নয়। শ্রীকৃষ্ণকে একজন সাধারণ ব্যক্তি বলে মনে করা উচিত নয়, এমন কি তাঁকে একজন মহাপুরুষ বলেও মনে করা উচিত নয়। ভগবদ্‌গীতার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে হলে শ্রীকৃষ্ণকে পরম পুরুষোত্তম ভগবান বলে স্বীকার করে নিতেই হবে। সুতরাং ভগবদ্‌গীতার বিবৃতি অনুসারে কিংবা অর্জুনের অভিব্যক্তি অনুসরণে যিনি ভগবদ্‌গীতা বুঝতে চেষ্টা করছেন, তাঁকে শ্রীকৃষ্ণ যে পরম পুরুষোত্তম ভগবান, তা অন্তত তত্ত্বগতভাবে মেনে নিতে হবে এবং সেই রকম বিনম্র মনোভাব নিয়ে ভগবদ্‌গীতা উপলব্ধি করা সম্ভব। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ভগবদ্‌গীতা না পড়লে, তা বুঝতে পারা খুবই কঠিন, কারণ এই শাস্ত্রটি চিরকালই বিপুল রহস্যাবৃত।

ভগবদ্‌গীতা আসলে কি? ভগবদ্‌গীতার উদ্দেশ্য হচ্ছে অজ্ঞানতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মানুষকে উদ্ধার করা। প্রতিটি মানুষই নানাভাবে দুঃখকষ্ট পাচ্ছে, যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় অর্জুনও এক মহা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। অর্জুন ভগবানের কাছে আত্মসমর্পন করলেন এবং তার ফলে তখন ভগবান তাকেঁ গীতার তত্ত্বজ্ঞান দান করে মোহমুক্ত করলেন। এই জড় জগতে কেবল অর্জুনই নন, আমরা প্রত্যেকেই সর্বদাই উদ্বেগ-উঃকন্ঠায় জর্জরিত। এই জড় জগতের অনিত্য পরিবেশে আমাদের যে অস্তিত্ব, তা অস্তিত্বহীনের মতো। এই জড় অস্তিত্বের অনিত্যতা আমাদের ভীতি প্রদর্শন করে, কিন্তু তাতে ভীত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের অস্তিত্ব হচ্ছে নিত্য। কিন্তু যে-কোন কারণবশত আমরা অসৎ সত্তায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। অসৎ বলতে বোঝায় যার অস্তিত্ব নেই।

এই অনিত্য অস্তিত্বের ফলে মানুষ প্রতিনিয়ত দুঃখকষ্ট ভোগ করছে। কিন্তু সে এতই মোহাচ্ছন্ন যে, তার দুঃখকষ্ট সম্পর্কে সে মোটেই অবগত নয়। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কেবল দুই-একজন তাদের ক্লেশ-জর্জরিত অনিত্য অবস্থাকে উপলব্ধি করতে পেরে অনুসন্ধান করতে শুরু করে, “আমি কে?” “আমি কোথা থেকে এলাম?” “কেন আমি এই জটিল অবস্থায় পতিত হয়েছি?” মানষ যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মোহাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে উঠে তার দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন হয়ে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য অনুসন্ধান করছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে বুঝতেপারছে যে, সে দুঃখ-দুর্দশা চায় না, ততক্ষণ তাকে যথার্থ মানুষ বলে গণ্য করা চলে না। মানুষের মনুষ্যত্বের সূচনা তখনই হয়, যখন তার মনে এই সমস্ত প্রশ্ণের উদয হতে শুরু করে। ব্রহ্মসূত্রে এই অনুসন্ধানকে বলা হয় ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। মানব-জীবনে এই ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ব্যতীত আর সমস্ত কর্মকেই ব্যর্থ বা অর্থহীন বলে গণ্য করা হয়। তাই যারা ইতোমধ্যেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন, “আমি কে?” “আমি কোথা থেকে এলাম?” “আমি কেন কষ্ট পাচ্ছি?” “মৃত্যুর পরে আমি কোথায় যাব?” তাঁরাই ভগবদ্‌গীতার প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এই তত্ত্ব যিনি আন্তরিকভাবে অনুসন্ধান করেন, তিনি ভগবানের প্রতি অকৃত্রিম ভক্তি অর্জন করেন। অর্জুন ছিলেন এমনই একজন অনুসন্ধানী শিক্ষার্থী। 

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানব-জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করে দেবার জন্যই এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার তত্ত্বানুসন্ধানী মানুষের মধ্যে কোন ভাগ্যবান ব্যক্তি কেবল ভগবৎ-তত্ত্ব পূর্ণরূপে উপলব্ধি করে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হন এবং এমন মানুষের জন্যই ভগবান ভগবদ্‌গীতা শুনিয়েছেন। অজ্ঞতারূপ হিংস্র জন্তুটি আমাদের প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে, কিন্তু ভগবান করুণাময়, বিশেষ করে মানষের প্রতি তাঁর করুণা অপার। তাই তিনি তাঁর বন্ধু অর্জুনকে শিক্ষার্থীরূপে গ্রহণ করে ভগবদ্‌গীতার মাধ্যমে মানুষকে ভগবৎ-তত্ত্ব দান করে গেছেন।

অর্জুন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের সহচর, তাই জড় জগতের অজ্ঞতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না, কিন্তু ভগবানের ইচ্ছানুসারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সাময়িকভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যাতে তিনি তাঁর সেই কঙ্কটময় অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ভগবান আগামী দিনের মানুষের উদ্ধারের উপায়-স্বরূপ ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত ভগবদ্‌গীতা বর্ণনা করলেন। অপার করুণাময় ভগবান মানব-জীবনকে সার্থক করে তুলবার জন্য মানুষকে তার স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত করলেন, আর তাদের নির্দেশ দিলেন কিভাবে জীবন অতিবাহিত করা উচিত।

ভগবদ্‌গীতার বিষয়ববস্তুতে আমরা পাঁচটি মূল তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি। সর্বপ্রথমে ভগবানের স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে জীবের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ঈশ্বর আছেন এবং তিনিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ করছেন, আর জীব প্রতিনিয়তই তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। যদি কেউ বলে যে, সে কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না, সে মুক্ত, তা হলে বুঝতে হবে সে উন্মাদ। জীব সর্বদাই, বিশেষ করে বদ্ধ অবস্থায় সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রিত। তাই ভগবদ্‌গীতার পরম নিয়ন্তা ঈশ্বর ও সর্বদা নিয়ন্ত্রিত জীবের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচিত হয়েছে। তা ছাড়া প্রকৃতি (জড়া প্রকৃতি), কাল (সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব ও জড়া প্রকৃতির অভিব্যক্তির অস্তিত্বের স্থিতিকাল), এবং কর্মও (কার্যকলাপ) আলোচনা করা হয়েছে। ভৌতিক জগতের প্রকাশ বিভিন্ন কার্যকলাপে পরিপূর্ণ। সমস্ত জীবের বিভিন্ন কার্যকলাপে লিপ্ত। তাই ভগবদ্‌গীতা থেকে আমাদের জানতে হবে ভগবান কে? জীব কি? প্রকৃতি কি? ভৌতিক জগৎ কি? আর কিভাবে তা মহাকালের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং জীবের কার্যকলাপ কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভগবদ্‌গীতায় এই পাঁচটি বিষয়বস্তু আলোচনা করার মাধ্যমে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করা হয়েছে যে, ভগবান বা শ্রীকৃষ্ণ বা পরব্রহ্ম বা পরম নিয়ন্তা বা পরমাত্মা-যে নামেই তাঁকে সম্বোধন করা হোক, তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ। সকল জীবই পরম নিয়ন্তার মতোই গুণগতভাবে সমান। যেমন, জড়া প্রকৃতিজাত এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছু ভগবান নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা ভগবদ্‌গীতার শেষ অধ্যায়গুলিতে বর্ণনা করা হয়েছে। জড়া প্রকৃতি স্বাধীন নয়। পরমেশ্বরের নির্দেশে তাঁকে কাজ করতে হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ তাই বলেছেন, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচম্‌”এই জড়া প্রকৃতি আমার নির্দেশনায় ক্রিয়াশীল।” আমরা যখন ভৌতিক জগতে বিস্ময়কর কোন কিছু ঘটতে দেখি, তখন আমাদের বোঝা উচিত যে, এর পেছনে একজন নিয়ন্তা রয়েছেন। নিয়ন্ত্রিত না হলে কোন কিছুরই প্রকাশ হতে পারে না। যদি কেউ মনে করে যে, কোন পরিচালক ব্যতীতই প্রকৃতি পরিচালিত হচ্ছে, তবে তা শিশুসুলভ নির্বুদ্ধিতা। একটি শিশু যেমন একটি মোটর গাড়ি চলতে দেখে মনে করতে পারে যে, কোন ঘোড়া বা পশুর দ্বারা পরিচালিত না হয়ে মোটর গাড়িটি নিজে নিজে চলছে, কিন্তু পরিণত বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোন মানুষই মোটর গাড়ির কারিগরি ব্যবস্থার ব্যাপারটি জানে। সে জানে যে, একজন চালক কলকব্জা নাড়িয়ে সেই গাড়িটিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তেমনই, পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন এই ভৌতিক জগতের সমস্ত কিছুর পরিচালক। তাঁরই তত্ত্বাবধানে সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে।

জীব হচ্ছে ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ভগবদ্‌গীতাতে তার বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এক বিন্দু সমুদ্রের জল যেমন গুণগতভাবে সমস্ত সমুদ্রের জল থেকে অভিন্ন, এক কণা সোনাও যেমন সোনা ঠিক তেমনই জীব পরম নিয়ন্তা বা ঈশ্বর বা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপরিহার্য অংশ হবার ফলে, ভগবানের সমস্ত গুণই তার মধ্যে অনু পরিমাণে বিদ্যমান, কেন না প্রতিটি জীব ক্ষুদ্র ঈশ্বর, নিয়ন্ত্রণাধীন ঈশ্বর। আমরা প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করছি, যেমন এখন আমরা অন্তরিক্ষ অথবা অন্যান্য গ্রহ নিয়ন্ত্রিত করবার চেষ্টা করছি। এই প্রচেষ্টা স্বাভাবিক, কারণ কর্তৃত্ব করার এই গুণ শ্রীকৃষ্ণের মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব করার বাসনা আমাদের মনে থাকলেও আমাদের বোঝা উচিত যে, আমরা পরম নিয়ন্তা নই। ভগবদ্‌গীতাতে এর বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ক্রমশঃ

অমরনাথ মন্দির কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?


অমরনাথ যাত্রা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কিসের টানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্গম এই যাত্রা করেন? অমরনাথ হল হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এটি জম্মু কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি মূলত একটি গুহা। এবং চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়গুলি আবার বরফাবৃত। গ্রীষ্মকালে খুব কম সময়ের জন্যই এখানে যাওয়া সম্ভব হয়। কারণ বাকি সময় পুরো রাস্তাটি বরফে ঢাকা থাকে। এবং সেই সময় লক্ষ লক্ষ ভক্ত সেখানে  যাত্রা করে। কিন্তু দুর্গম এই পথ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সাধারন মানুষদের কাছে?অমরনাথের গুহার ভেতর জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে, আর সেই জল জমে জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারন করে। আর সেখানেই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ যাত্রা করেন। এবং এই শিবলিঙ্গে পূজা  দেন। বিভিন্ন পৌরাণিক ইতিহাস, মানুষের কিছু সাধারন বিশ্বাস তাদের এখানে বার বার টেনে আনে।

প্রচলিত আছে, বহুকাল আগে ভৃণ্ডমুনি সেখা অমরনাথ বা শিবকে দেখতে পান। তারপর থেকেই অমরনাথে যাত্রার প্রচার শুরু হতে থাকে। এবং তারপর থেকেই লক্ষ লক্ষ মানুষ অমরনাথে যাত্রা করতে শুরু করেন।

পুরাণে আছে, শিব পার্বতীকে অমরত্ব শিক্ষা প্রদানের জন্য, এই স্থানে নিয়ে এসেছিলেন। এবং কথিত আছে শিব তার সমস্ত ত্যাগ করেছিলেন অর্থাৎ তাঁর ষাঁড় নন্দি, তার শিরস্থ চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, জল, মৃত্তিকা এবং সর্পকুলকে বিভিন্ন  স্থানে রেখে আসেন অমরনাথ যাত্রা করার আগে। তাই এটি ভক্তদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ।

একটি কাহিনি প্রচলিত আছে, মহাদেব পার্বতীকে যখন অমরত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করছিলেন, তখন সেখানে কোন প্রানী ছিল না। শুধুমাত্র দুটি পায়রার ডিম ছিল। সেই দুটি নাকি এখনো দেখতে পাওয়া যায় ওখানে। এইসব গল্প কাহিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এইরকম গল্প কাহিনীর টানে মানুষ বার বার এখানে ছুটে আসেন।

সাধারন মানুষের একটি আধ্যাত্মিক টান রয়েছে এই তীর্থস্থানের প্রতি। তারা  মনে করেন অমরনাথের শিব লিঙ্গের দর্শন মানে, সাক্ষাৎ মহাদেবের দর্শন। এছাড়াও মানুষের গভীর বিশ্বাস, দুর্গম এই তীর্থস্থানে গেলে পূর্ণ অর্জন হয়। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সমস্ত অনৈতিক কাজের নিবৃত্তি সম্ভব। ভগবান শিব মানুষের অতিরিক্ত লালসা, এবং সেই লালসার ফলে হওয়া পাপকে ক্ষমা করে দেন। তাই সেই পূর্ণ অর্জনের জন্যই এত মানুষ যান সেখানে।

এই অমরনাথ যাত্রাকে সবাই অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। শিবরাত্রি ব্রত অত্যন্ত জনপ্রিয় সাধারন মানুষের কাছে। বেশির ভাগ বাঙালী শুধু বাঙালী নয় অন্যান্য ধর্মের মানুষও ঘটা করে শিবের পূজা করেন। অমরনাথের মত পবিত্র স্থানে গিয়ে সকলের ভগবান শিবকে দেখা এবং তার পূজা দেবার ইচ্ছা  প্রবল থাকে। তারা  মনে করেন ভগবানের কৃপাতেই সেই যাত্রা হয়। এবং সবার ভাগ্যে এই পবিত্র যাত্রা থাকে না। আর এই যাত্রা হলে জীবন সার্থক।  তাই অত্যন্ত দুর্গম পথ হলেও তারা যেতে চান। যানও অমরনাথ দর্শনে।

অমরনাথ হিন্দুদের পবিত্র স্থান হলেও ধর্ম  নিরপেক্ষ মানুষ এই যাত্রায় আপনি পাবেন। অমরনাথ যেতে হলে একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত গাড়ি যায়। এই গাড়ির অনেক ডাইভার মুসলিম। কেন এই কথা বলছি? আসলে জঙ্গি হামলা যেসময় হয়েছিল অমরনাথে, তখন এই মানুষগুলি জাত পাত ভেদাভেদ না করে বহু পর্যটকের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তারা হলেন সেলিম মির্জা , ইব্রাহিম।  অমরনাথ মানে শুধু হিন্দু মন্দির নয়। জাতিভেদ নির্বিশেষে মানুষের মিলনক্ষেত্র। তাই অমরনাথের মন্দিরের এত মাহাত্ম্য।

মুখবন্ধ-০১ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)



ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥
শ্রীচৈতন্যমনোহভীষ্টং স্থাপিতং যেন ভূতলে।
স্বয়ং রূপঃ কদা মহ্যং দদাতিদ স্বপদান্তিকম্॥

অজ্ঞতার গভীরতম অন্ধকারে আমার জন্ম হয়েছিলএবং আমার গুরুদেব জ্ঞানের আলোকবর্তিকা দিয়ে আমার চক্ষু উন্মীলিত করেছেন। তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রনতি নিবেদন করি।
শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রভুপাদ, যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অভিলাষ পূর্ণ করবার জন্য এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, আমি তাঁর শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় লাভ কবে করতে পারব?

বন্দেহহং শ্রীগুরোঃ শ্রীযুতপদকমলং শ্রীগুরূন্‌বৈষ্ণবাংশ্চ
শ্রীরূপং সাগ্রজাতং সহগণরঘুনাথান্বিতং তং সজীবম্।
সাদ্বৈতং সাবধূতং পরিজনসহিতং কৃষ্ণচৈতন্যদেবং
শ্রীরাধাকৃষ্ণপাদান্ সহগণললিতা-শ্রীবিশাখান্বিতাংশ্চ॥

আমি আমার গুরুদেবের পাদপদ্মে ও সমস্ত বৈষ্ণববৃন্দের শ্রীচরণে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আমি শ্রীরূপ গোস্বামী, তাঁর অগ্রজ শ্রীসনাতন গোস্বামী, শ্রীরঘুনাথ দাস, শ্রীরঘুনাথ ভ্ট্ট, শ্রীগোপাল ভট্ট ও শ্রীল জীব গোস্বামীর চরণকমলে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আমি শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, শ্রীনিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, শ্রীগদাধর, শ্রীবাস ও অন্যান্য পার্ষদবৃন্দের পাদপদ্মে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আমি শ্রীমতি ললিতা ও বিশাখা সহ শ্রীমতি রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণের চরণকমলে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধো দীনবন্ধো জগৎপতে।
গোপেশ গোপিকাকান্ত রাধাকান্ত নমোহস্তু তে॥

হে আমার প্রিয় কৃষ্ণ! তুমি করুণার সিন্ধু, তুমি দীনের বন্ধু, তুমি সমস্ত জগতের পতি, তুমি গোপীদের ঈশ্বর এবং শ্রীমতী রাধারাণীর প্রেমাস্পদ। আমি তোমার পাদপদ্মে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

তপ্তকাঞ্চনগৌরাঙ্গি রাধে বৃন্দাবনেশ্বরি।
বৃষভানুসুতে দেবি প্রণমামি হরিপ্রিয়ে॥

শ্রীমতী রাধারাণী যাঁর অঙ্গকান্তি তপ্তকাঞ্চনের মতো, যিনি বৃন্দাবনের ঈশ্বরী, যিনি মহারাজ বৃষভানর দুহিতা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী, তাঁর চরণকমলে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

বাঞ্চাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ।
পতিতানাঙ পাবনেভ্যো বৈষ্ণবেভ্যো নমো নমঃ॥

সমস্ত বৈষ্ণব-ভক্তবৃন্দ, যাঁরা বাঞ্ছাকল্পতরুর মতো সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে পারেন, যাঁরা কৃপার সাগর ও পতিতপাবন, তাঁদের চরণকমলে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।।

ভগবদ্গীতার আর এক নাম গীতোপনিষদ্‌। এটি বৈদিক দর্শনের সারমর্ম এবং বৈদিক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপনিষদ্‌। এই গীতোপনিষদ্‌ বা ভগবদ্‌গীতার বেশ কয়েকটি ইংরেজী ভাষ্য ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভগবদ্‌গীতার আরও একটি ইংরেজী ভাষ্যের কি দরকার? তাই ভগবদ্‌গীতার এই সংস্করণ সম্বন্ধে দুই-একটি কথা আমাকে বলতে হয়। ইদানীং একজন আমেরিকান ভদ্রমহিলা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ভগবদ্‌গীতার কোন ইংরেজী অনুবাদে ভগবদ্‌গীতার প্রকৃত ভাবকে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে?” আমেরিকাতে ভগবদ্‌গীতার বহু ইংরেজী সংস্করণ পাওয়া যায়, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি এমন একটি ভগবদ্‌গীতা পেলাম না যাতে ভগবদ্‌গীতার যথার্থ ভাবকে বজায় রেখে তাঁর অনুবাদ করা হয়েছে। শুধু আমেরিকাতেই নয়, ভারতবর্ষেও ভগবদ্‌গীতার ইংরেজী অনুবাদের সেই একই অবস্থা। তার কারণ হচ্ছে, ভাষ্যকারেরা ভগবদ্‌গীতার মূল ভাব বজান না রেখে তাঁদের নিজেদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে তার ব্যাখ্যা করেছেন।

ভগবদ্‌গীতাতেই ভগবদ্‌গীতার মূল ভাব ব্যক্ত হয়েছে। এটি ঠিক এই রকম-আমরা যখন কোন ঔষধ খাই, তখন যেমন আমরা আমাদের ইচ্ছামতো সেই ঔষধ খেতে পারি না, ডাক্তারের নির্দেশ বা ঔষধের শিশিতে দেওয়া নির্দেশ অনুসারে সেই ঔষধ খেতে হয়, তেমনই ভগবদ্‌গীতাকে গ্রহণ করতে হবে ঠিক যেভাবে তার বক্তা তাঁকে গ্রহণ করবার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। ভগবদ্‌গীতার বক্তা হচ্ছে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভগবদ্‌গীতার প্রতিটি পাতায় বলা হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

ভগবান্‌ শব্দটি অবশ্য কখনও কখনও কোন শক্তিমান পুরুষ অথবা কোন দেব-দেবীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়। এখানে ভগবান্‌ শব্দটির দ্বারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে মহাপুরুষ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের জ্ঞাত হোয়া উচিত যে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণই যে পরমেশ্বর তা স্বীকার করেছেন সমস্ত সত্যদ্রষ্টা ও ভগবৎ-তত্ত্ববেত্তা আচার্যেরা-যেমন, শঙ্করাচার্য, রামানুচার্য, মধ্বাচার্য, নিম্বাকাচার্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আদি ভারতে প্রতিটি মহাপুরুষ। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই ভগবদ্‌গীতাতে বলে গেছেন যে, তিনিই স্বয়ং ভগবান। ব্রহ্মসংহিতা ও সব কয়টি পুরাণে, বিশেষ করে ভাগবত-পুরাণ শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবানরূপে বর্ণনা করা হয়েছে (কৃষ্ণস্তু ভগবান্‌স্বয়ম্‌)। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেমনভাবে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, ঠিক তেমনভাবে ভগবদ্‌গীতাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

ভগবদ্‌গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে (৪/১-৩) ভগবান বলেছেন-

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবাহমব্যয়ম্‌।

বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীৎ॥

এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।

স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ॥

স এবায়াং ময়া তেঽদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।

ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্‌॥

এখানে ভগবান অর্জুনকে বলেছেন যে, এই যোগ ভগবদ্‌গীতা প্রথমে তিনি সূর্যদেবকে বলেন, সূর্যদেব তা বলেন মনুকে, মনু ইক্ষ্বাকুকে এবং এভাবে গুরুপরম্পরাক্রমে গুরুদেব থেকে শিষ্যতে এই জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত হয়ে আসছিল। কিন্তু এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে আমরা এই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তাই ভগবান কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে নিজে এসে আবার এই জ্ঞান অর্জুনের মাধ্যমে দান করলেন।

তিনি অর্জুনকে বললেন, “তুমি আমার ভক্ত ও সখা, তাই রহস্যাবৃত এই পরম জ্ঞান আমি তোমাকে দান করছি।” এই কথার তাৎপর্য হচ্ছে যে, ভগবদ্‌গীতার জ্ঞান কেবল ভগবানের ভক্তই আহরণ করতে পারে।  অধ্যাত্মবাদীদের সাধারণত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যথা-জ্ঞানী, যোগী ও ভক্ত, অথবা নির্বিশেষবাদী, ধ্যানী ও ভক্ত। এখানে ভগবান স্পষ্টভাবে অর্জুনকে বলেছেন যে, পূর্বের পরম্পরা নষ্ট হয়ে যাবার ফলে তিনি তাঁকে দিয়ে পুনরায় সেই পুরাতন যোগের প্রচার করলেন। তিনি চেয়েছিলেন যে, অর্জুন এই জ্ঞানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তার প্রচার করবে। আর এই কাজের জন্য তিনি অর্জুনকেই কেবল মনোনীত করলেন, কারণ অর্জুন ছিলেন তাঁর ভক্ত, তাঁর অন্তরঙ্গ সখা ও তাঁর প্রিয় শিষ্য। তাই ভগবানের ভক্ত না হলে অর্থাৎ ভক্তি ও ভালবাসার মাধ্যমে তাঁর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যে না এলে ভগবানের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারা সম্ভব নয়। তাই অর্জুনের গুণে গুণান্বিত মানুষেরাই কেবল ভগবদ্‌গীতাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

ভক্তির মাধ্যমে ভক্তের সঙ্গে ভগবানের যে প্রেম-মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠে, তারই আলোকে ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। এই সম্পর্কের ব্যাখ্যা করতে গেলে অনেক কথা বলতে হয়, তবে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ভক্ত ভগবানের সঙ্গে নিম্নলিখিত পাঁচটি সম্পর্কের যে কোন একটির দ্বারা যুক্ত থাকেন-

(১) নিষ্ক্রিয়ভাব ভক্ত হতে পারেন (শান্ত)

(২) সক্রিয়ভাবে ভক্ত হতে পারেন (দাস্য)

(৩) বন্ধুভাবে ভক্ত হতে পারেন (সখ্য)

(৪) অভিভাবক রূপে ভক্ত হতে পারেন (বাৎসল্য)

(৫) দাম্পত্য প্রেমিকরূপে ভক্ত হতে পারে (মাধুর্য)

অর্জুনের সঙ্গে ভগবানের সম্পর্কের রূপ ছিল সখ্য। অবশ্য শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে অর্জুনের যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তার সঙ্গে পার্থিব জগতের বন্ধুত্বের বিস্তর তফাৎ। এই সম্পর্ক হচ্ছে অপ্রাকৃত এবং জড় অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এর বিচার করা কখনই সম্ভব নয়। যে কোন লোকের পক্ষে এই বন্ধুত্বের আস্বাদন লাভ করা সম্ভব নয়, তবুও প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে ভগবানের সঙ্গে যুক্ত এবং এই সম্পর্কের প্রকাশ হয় ভক্তিযোগের পূর্ণতার মাধ্যমে। তবে আমাদের বর্তমান অবস্থায়, আমরা কেবল ভগবানকেই ভুলে যাইনি, সেই সঙ্গে ভুলে গেছি তাঁর সঙ্গে আমাদের চিরন্তন সম্পর্কের কথা। লক্ষ কোটি জীবের মধ্যে প্রতিটি জীবেরই ভগবানের সঙ্গে কোন না কোন রকমের শাশ্বত সম্পর্ক রয়েছে, এবং সেই সম্পর্ক হচ্ছে জীবের স্বরূপ। ভক্তিযোগের মাধ্যমে এই স্বরূপের প্রকাশ হয় এবং তাকে বলা হয় জীবের স্বরূপসিদ্ধি। অর্জুন ছিলেন ভগবানের ভক্ত এবং তাঁর সাথে ভগবানের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

ক্রমশঃ