ভারতের সাহিত্যে আদি শঙ্করাচার্য্য(জীবনী ও কথা)


ধর্ম ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কবিতা রচনা করে গেছেন বলেই ভারতের অনেক কবি অমর হয়ে আছেন। খণ্ড-কাব্য, মহাকাব্য প্রভৃতির আলোচনা প্রসঙ্গে যাঁদের নাম উল্লেখ করা যায় তাঁরা সকলেই অসাধারণ প্রতিভা-প্রভাবে সেই বিষয়ে চির-যশস্বী হয়ে আছেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মপ্রাণতার জন্য-নীতিপরায়ণতার জন্য আরও অসংখ্য কবি যে অমর হয়ে থাকবেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খণ্ড-কাব্য রচনায় কৃতিত্ব প্রসঙ্গে পূর্বে ভত্তৃহরির নাম উল্লেখ আমরা সবাই জানি। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে, আরও অধিক প্রতিভাসম্পন্ন আর এক মহাপুরুষের নাম খণ্ড-কাব্য প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। সে মহাপুরুষ-শ্ৰীশ্ৰীশঙ্করাচার্য্য। তিনি যেমন দর্শন শাস্ত্র আলোচনায় অলৌকিক প্রতিভা প্রকাশ করে গেছেন, তত্বকথা মূলক খণ্ড-কবিতা রচনায়ও তার তেমনি অসাধারণ শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। ভর্ত্তৃহরি যে সুরে যে গান গেয়েছিলেন, সে বিবেক-বৈরাগ্য-মূলক সঙ্গীতে শঙ্করাচার্য্যের সমকক্ষ বোধ হয় দ্বিতীয় কাউকে দেখা যায় না। তাঁহার মোহমুদগর-সংসার মোহ নাশের অমোঘ অস্ত্র-স্বরূপ। ভর্ত্তৃহরির বৈরাগ্যশতকে যে ভাব অঙ্কুরিত মুকুলিত, মোহমুদগরে তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত। ভর্ত্তৃহরি স্ত্রীর প্রতি বিরাগ-বশতঃ বলেছিলেন, তার কথা স্মরণ করতেও হৃদয় যাতনায় অস্থির হয়; তার দর্শনে উন্মত্ততা বৃদ্ধি পায়; তার স্পর্শে জ্ঞান লোপপ্রাপ্ত হয়। জানি-না, কেমন করে তার প্রতি ভালবাসা আসে ? কিন্তু শঙ্করাচাৰ্য্য বললেন, ‘কেই বা স্ত্রী, কেই বা পুত্র -এ সংসারে কেউ তোমার আপনার নয়! এই বুঝে তত্ত্ব-চিন্তায় রত হও। ভর্ত্তৃহরি স্ত্রীর ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছিলেন; শঙ্করাচাৰ্য্য সংসারের আত্মীয়-স্বজনের ব্যবহারে ব্যথিত হয়ে, ঐ বৈরাগ্য-বাণী ঘোষণা করে গেছেন। তার আত্মীয়-স্বজন তার প্রতি কি দুৰ্ব্ব্যবহারই না করেছিলেন। জ্ঞাতিদের চক্রান্তে সৰ্বস্বান্ত হয়ে শঙ্করাচার্য্যকে গৃহত্যাগী হতে হয়। সংসারে একমাত্র জননী তার আশাপথ চেয়ে দিনযাপন করতেছিলেন। সহসা জননী পীড়িত হলেন। প্রতিবেশিরা আত্মীয়-স্বজনেরা কেউই চেয়ে দেখলেন না। জননীর মৃত্যুর ঠিক আগে কি জানি প্রাণ কেমন করে উঠেছিল; তাই শঙ্করাচাৰ্য্য গৃহে ফিরে আসেন। গৃহে প্রত্যাবৃত্ত হয়ে যে দৃশ্য অবলোকন করেন, তাতে প্রাণে মর্মভেদী যাতনা অনুভূত হয়। জননী একাকিনী আসন্ন মৃত্যু শয্যাশায়িনী!-নিকটে গণ্ডুষ-জল-দানের কেউ নেই। আত্মীয়রা দুর হতে উপেক্ষার হাসি হাসছেন। এমন অবস্থায় পুত্রের কোলে মাথা রেখে শঙ্কর-জননী লোকান্তর-গামিনী হলেন। ক্ষোভে, বিষাদে, বিষম আত্মগ্লানিতে শঙ্করের হৃদয় সন্তপ্ত হল। অসহায় একাকী আপন গৃহ-প্রাঙ্গণে তিনি জননীর সৎকার-কাৰ্য্য সমাপন করলেন। তার পর অশ্রুভরা চোখে জননী জন্মভূমির নিকট চিরতরে বিদায় নিলেন। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি বিরক্তি-বশতঃ নয়; কিসে জীবের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করতে পারেন, কিসে মানুষের আত্মপর-ভেদ জ্ঞানের অবসান হয়,-তাহারই উপায় অনুসন্ধানে শঙ্কর সংসার ত্যাগ করলেন। যে সময় এই বৈরাগ্য উপস্থিত হয়, সেই সময়ই তিনি মোহমুদগর রচনা করেছিলেন।

সংসার-ত্যাগী হয়ে দেশ-দশান্তরে পরিভ্রমণ শেষে শঙ্কর বেদান্ত-ভাষ্য, গীতা ভাষ্য প্রভৃতি বহু গ্ৰন্থ রচনা করেন। জ্যোতিষ-শাস্ত্রে ও তিনি অসাধারণ পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। এই অবস্থায় কাশীধামে এক মহাপুরুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। মহাপুরুষ বুঝতে পারেন, শঙ্কর উন্নতির মার্গে উপস্থিত হয়েছেন বটে; কিন্তু শ্রেষ্ঠ-স্থান লাভ করবার পক্ষে তখনও সামান্য অন্তরায় আছে। এই বুঝে, জ্যোতিষ সম্বন্ধে শঙ্করাচার্য্যের একটু অহমিকার ভাব দেখে, মহাপুরুষ জ্যোতিষ-সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধানে শঙ্করচার্য্যকে এক সমস্যায় ফেলেন। মহাপুরুষ আপনার একজন শিষ্যের ভাগ্য-গণনার জন্য শঙ্করাচাৰ্য্যকে অনুরোধ করেন; শঙ্করাচাৰ্য্য, শিষ্যের মৃত্যুর দিন নিৰ্দ্ধারণ করে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হবে বলে দেন। মহাপুরুষ সেই নিদিষ্ট দিনে যোগবলে শিষ্যের চৈতন্য হরণ করেন, এবং তাকে মাটির ভিতর পুথে রাখেন। শঙ্করের গণনা-মতে বজ্ৰ যথানির্দিষ্ট কালে যথানির্দিষ্ট স্থানে শিষ্যের উপর পতিত হয়। কিন্তু চৈতন্য হীন দেহে বজ্রের ক্রিয়া হয় না। মহাপুরুষ পরিশেষে যোগবলে শিষ্যকে জাগিয়ে তুলেন। এই ঘটনায় শঙ্করাচার্য্য বিস্মিত হন। অঙ্গীকার-মতে শঙ্করাচার্য্যের গ্রন্থ-সমূহ গঙ্গার জলে নিক্ষিপ্ত হয়। সঞ্চিত-ধন গ্ৰন্থরত্ব বিসর্জন দিয়ে, শঙ্করাচার্য্য বড়ই ম্ৰিয়মাণ হন। মহাপুরুষ তা বুঝতে পেরে, শঙ্করাচাৰ্য্যকে গঙ্গা তীরে গিয়া গঙ্গাদেবীর নিকট প্রার্থনা জানাতে বলেন। সেই প্রার্থনার ফলে গ্রন্থগুলি তরঙ্গের সাথে তীরে উপনীত হয়। শঙ্করাচার্য্যের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। মহাপুরুষ তখন, শঙ্করাচার্য্যকে কর্ম ও আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধে উপদেশ দেন। শঙ্করাচাৰ্য্য তাতে বুঝতে পারেন, মায়াই সকল অনিষ্টের মূলাধার। তখন গ্রন্থগুলি পুনরায় নিজেই জলমধ্যে নিক্ষেপ করেন; বিদ্যার অভিমান, জ্ঞানের অভিমান, ধর্মের অভিমান-সকলই সেই সঙ্গে সঙ্গে বিসর্জিত হয়। এর পরই শঙ্করাচাৰ্য্য অদ্বৈত-জ্ঞান লাভ করেন। বত্রিশ বৎসর বয়সে কেদারনাথ তীর্থে শঙ্করাচাৰ্য্য দেহরক্ষা করেছিলেন। কেরল-দেশের অন্তর্গত চিদম্বর তাহার জন্মস্থান বলেই পরিচিত। পণ্ডিতদের গবেষণা অনুসারে ৭৮৮ খৃষ্টাব্দ তাহার জন্ম-বর্ষ বলে নিৰ্দ্ধারিত হয়েছে। অল্পদিন মাত্র ইহসংসারে অবস্থান করে শঙ্করাচার্য্য অবিনশ্বর কীৰ্ত্তি-স্মৃতি রেখে গেছেন। বিকৃত বৌদ্ধ ধর্মের কবল হতে তিনি ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের পুনরুদ্ধার সাধন করেন। কর্ম মধ্যে তার বিভূতি প্রকাশ পায়; তিনি শঙ্করাবতার শঙ্কর বলেই সম পূজিত হন। শঙ্করাচার্য্যের জীবনী-সম্বন্ধে সাধারণ দৃষ্টিতে নানা মত প্রচারিত আছে। কিন্তু একটু অনুসন্ধান করলে তার জীবনের নানা রহস্যময় কাহিনী অবগত হওয়া যায়। শঙ্করাচার্য্যের জীবন-কাহিনী অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তার অসংখ্য জীবনচরিত বিরচিত হয়েছে। তার সমস্তই লোকোত্তর চরিত্রের বহু তথ্য নিহিত আছে। দুর অতীত কালে সংস্কৃত-ভাষায় তাহার যে সকল জীবনচরিত দেখা যায়, তারমধ্যে শঙ্করদিগ্বিজয় (আনন্দগিরি কৃত), শঙ্করবিজয় (চিদ্ধিলাস যতি বিরচিত), সংক্ষেপ শঙ্করবিজয় (মাধবাচাৰ্য্য কৃত), লঘু শঙ্করবিজয় (নীলকণ্ঠ, সদানন্দ, ব্রহ্মানন্দ প্রভৃতি বিরচিত), শঙ্করাভ্যুদয় (তিরুমল্ল দীক্ষিত প্রণীত), শঙ্করবিজয়-সংগ্রহ (পুরুষোত্তম ভারতী বিরচিত) বিশেষ প্রসিদ্ধ। এই বিভিন্ন জীবনচরিতের আলোচনায় শঙ্করের জীবনের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ পরিদৃশ্যমান হয়।

সুত্র- পৃথিবীর ইতিহাস চতুর্থ খণ্ড।

সংকলনে- কৃষ্ণকমল।

Advertisements

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


ভ্রমণপিপাসু সাহিত্যিক এবং সম্পাদক
সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (জন্মঃ- ১৮৩৪ – মৃত্যুঃ- ১৮ এপ্রিল, ১৮৯৯ )

ভ্রমণপ্রিয় মানুষ যারা পাহাড় আর সাগরের প্রেমে মজেছেন তারা সকলেই বলে থাকেন যে পাহাড় বা সাগর তাদের নীরবে আহবান করে তার বুকে বারে বারে। বিশেষ করে এই দুই জায়গার একঘেয়ে রুপ, স্থিরতা সত্ত্বেও এক অজানা মায়ার টান অনুভব করেন অনেক নাবিক, অনেক পর্বতারোহী। এই মায়ার খেলা যুগ থেকে যুগান্তরে চলে এসেছে। পালামৌ গল্পে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমনই মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ার অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন। যদিও এই ভ্রমণ কাহিনী যতটা না ভ্রমণ কাহিনী, তার চেয়ে মানবিক উপাখ্যানের গল্প হিসেবেই ধরা দিবে পাঠকের হৃদয়ে। কিন্তু বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে “পালামৌ” এর নাম স্বগর্বে উচ্চারিত হয়ে এসেছে এর প্রকাশের পর থেকে। আর তাই এর পুরো কৃতিত্ব দিতে হবে লেখক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার নৈহাটি’র কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হুগলীর তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ওনার মধ্যমানুজ অর্থাৎ আপন ভ্রাতা। মেদেনীপুর জেলা স্কুল এবং হুগলী কলেজে শিক্ষা জীবন শেষে তিনি “বর্ধমান কমিশনার অফিস” এ কেরানী হিসেবে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। বঙ্গাব্দ ১২৮৪ থেকে ১২৮৯ সাল পর্যন্ত উনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রবর্তিত “বঙ্গদর্শন” পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৮৯৯ সালে এই অসীম প্রতিভাধর কিন্তু অনালোচিত লেখক মৃত্যুবরণ করেন।

“পালামৌ” সর্বপ্রথম ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রমথনাথ বসু ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। মোট ছয় কিস্তিতে প্রকাশিত এই লেখা পরবর্তীতে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। তৎকালীন লেফটেন্যাণ্ট গভর্নর তাকে বিহারের ‘পালামৌ’ এলাকায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দান করেন। আর এই পদে দু’বছর কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন নিজ আবাসে; অতঃপর অনেক বছর পর সেই দুই বছরের স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিয়েই আমাদের আজকের “পালামৌ”। তো শুরুতে যে কথাটি বলেছিলাম পাহাড় আর সাগরের জাদুর হাতছানির কথা। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও পড়েছিলেন পাহাড়ের প্রেমে। তার জবানীতে শুনুন, “নিত্য অপরাহ্ণে আমি লাতেহার পাহাড়ের ক্রোড়ে গিয়ে বসিতাম, তাবুতে শত কার্য থাকিলেও আমি তাহা ফেলিয়া যাইতাম। চারটা বাজিলে আমি অস্থির হইতাম; কেন তাহা কখনো ভাবিতাম না; পাহাড়ে কিছুই নূতন নাই, কাহারো সহিত সাক্ষাৎ হইবে না, গল্প হইবে না, তথাপি কেন আমাকে সেখানে যাইতে হইত জানি না। এখন দেখি এ বেগ আমার একার নহে। যে সময় উঠানে ছায়া পড়ে, নিত্য সে সময় কূলবঁধুর মন মাতিয়ে ওঠে, জল আনিতে যাবে; জল আছে বলিলে তাহারা জল ফেলিয়া জল আনিতে যাবে; জলে যে যাইতে পাইল না, সে অভাগিনী। সে গৃহে বসিয়া দেখে উঠানে ছায়া পড়িতেছে, আকাশে ছায়া পড়িতেছে, পৃথিবীর রং ফিরিতেছে, বাহির হইয়া সে তাহা দেখিতে পারিল না, তাহার কত দুঃখ। বোধহয় আমিও পৃথিবীর রং ফেরা দেখিতে যাইতাম। কিন্তু আর একটু আছে, সেই নির্জন কোনে মনকে একা পাইতাম, বালকের ন্যায় মনের সহিত ক্রীড়া করিতাম…”

এভাবেই লেখকের প্রকৃতিপ্রেমের প্রকাশ পুরো পালামৌ উপাখ্যান জুড়ে। মূলত বিহারের সেই পাহাড়ি অঞ্চলের কোল উপজাতি এবং তাদের জীবনাচার; তার সান্নিধ্যে লেখকের যাপিত জীবনের দিনলিপির একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপজীব্য করে গড়ে উঠেছে এই “পালামৌ” ভ্রমণ সাহিত্যটি। এটা যতটা না ভ্রমণ সাহিত্য হিসেবে মনে হয়েছে, তার চেয়ে একটা উপজাতির জীবন উপাখ্যান হিসেবে ধরা দেয় পাঠকের কাছে। তবে লেখকের প্রকৃতির রুপসুধা পাণের নিজস্ব ধারা লেখক তার জবানীতে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন ঠিক এইভাবে,

“আমি কখনো কবির চোখে রূপ দেখি না, চিরকাল বালকের মতো রূপ দেখিয়া থাকি। আমি যাহা দেখি তাহাকে বুঝাতে পারি না। রূপ যে কি জিনিস, রূপের আকার কি, শরীরের কোন কোন স্থানে তাহার বাসা, এই সকল বার্তা আমাদের বঙ্গ কবিরা বিশেষ জানেন, এই জন্য তাহাঁরা অঙ্গ বাছিয়া বাছিয়া বর্ণনা করিতে পারেন, দুর্ভাগ্যবশত আমি তাহা পারি না। তাহার কারণ, আমি কখনো অঙ্গ বাছিয়া রূপ তল্লাশ করি নাই। আমি যে প্রকারে রূপ দেখি নির্লজ্জ হইয়া তাহা বলিতে পারি…” হুমম… বস মানুষ!
আসলে এই ছোট্ট ভ্রমণ কাহিনী ধারাবাহিকভাবে ছয় পর্বে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েই প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। তিনি তার লেখনী দিয়ে ভালই একটা নাড়া দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে। তাই আমি নিজে আর না লিখে বরং সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এবং তার “পালামৌ” সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব মতামত শুনুন,

পালামৌ ও সঞ্জীবচন্দ্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা

“কোনো কোনো ক্ষমতাশালী লেখকের প্রতিভায় কী একটি গ্রহদোষে অসম্পূর্ণতার অভিশাপ থাকিয়ে যায়’ তাহাঁরা অনেক লিখিলেও মনে হয় তাঁহাদের সব লেখা শেষ হয় নাই। তাঁহাদের প্রতিভাকে আমরা সসংলগ্ন আকারবদ্ধভাবে পাই না; বুঝিতে পাড়ি তাহার মধ্যে বৃহত্তর মহত্ত্বের অনেক উপাদান ছিল, কেবল সেই সংযোজনা ছিল না যাহার প্রভাবে সে আপনাকে সর্বসাধারণের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়ে প্রকাশ ও প্রমাণ করিতে পারে।

সঞ্জীবচন্দ্রের প্রতিভা পূর্বোক্ত শ্রেণীর। তাঁহার রচনা হইতে অনুভব করা যায় তাঁহার প্রতিভার অভাব ছিল না, কিন্তু সেই প্রতিভাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত কোরিয়া যাইতে পারেন নাই। তাঁহার হাতের কাজ দেখিলে মনে হয়, তিনি যতটা কাজে দেখাইয়াছেন তাঁহার সাধ্য তদপেক্ষা অনেক অধিক ছিল। তাঁহার মধ্যে যে পরিমাণে ক্ষমতা ছিল সে পরিমাণে উদ্যম ছিল না।

তাঁহার প্রতিভার ঐশ্বর্য ছিল কিন্তু গৃহিণীপনা ছিল না। ভালো গৃহিণীপনায় স্বল্পকেও যথেষ্ট করিয়া তুলিতে পারে; যতটুকু আছে তাহার যথাযোগ্য বিধান করিতে পারিলে তাহার দ্বারা প্রচুর ফল পাওয়া গিয়া থাকে। কিন্তু অনেক থাকিলেও উপযুক্ত গৃহিণীপনার অভাবে সে ঐশ্বর্য ব্যর্থ হইয়া যায়; সে-স্থলে অনেক জিনিস ফেলাছড়া যায় অথচ অল্প জিনিসই কাজে আসে। তাঁহার অপেক্ষা অল্প ক্ষমতা লইয়া অনেকে যে পরিমাণে সাহিত্যের অভাব মোচন করিয়াছেন তিনি প্রচুর ক্ষমতা সত্ত্বেও তাহা পারেন নাই; তাহার কারণ সঞ্জীবের প্রতিভা ধনী, কিন্তু গৃহিণী নহে। ………………………………………………

‘পালামৌ’ সঞ্জীবের রচিত একটি রমণীয় ভ্রমণবৃত্তান্ত। ইহাতে সৌন্দর্য যথেষ্ট আছে, কিন্তু পড়িতে পড়িতে প্রতিপদে মনে হয় লেখক যথোচিত যত্নসহকারে লেখেন নাই। ইহার রচনার মধ্যে অনেকটা পরিমাণে আলস্য ও অবহেলা জড়িত আছে, এবং তাহা রচয়িতারও অগোচর ছিল না। বঙ্কিমবাবুর রচনায় যেখানেই দুর্বলতার লক্ষণ আছে সেইখানেই তিনি পাঠকগণকে চোখ রাঙাইয়া দাবাইয়া রাখিবার চেষ্টা করিয়াছেন-সঞ্জীববাবু অনুরূপ স্থলে অপরাধ স্বীকার করিয়াছেন, কিন্তু সেটা কেবল পাঠকদের মুখ বন্ধ করিবার জন্য- তাহার মধ্যে অনুতাপ নাই এবং ভবিষ্যতে যে সতর্ক হইবেন কথার ভাবেও তাহাও মনে হয় না। তিনি যেন পাঠকদিগকে বলিয়া রাখিয়াছেন, ‘দেখো বাপু, আমি আপন ইচ্ছায় যাহা দতেছি তাহাই গ্রহণ করো, বেশি মাত্রায় কিছু প্রত্যাশা করিয়ো না।’

‘পালামৌ’ – ভ্রমণবৃত্তান্ত তিনি যে ছাঁদে লিখিয়াছেন, তাহাতে প্রসঙ্গক্রমে আশপাশের নানা কথা আসিতে পারে – কিন্তু তবু তাহার মধ্যেও নির্বাচন এবং পরিমাণ সামঞ্জস্যের আবশ্যকতা আছে। যে সকল কথা আসিবে তাহারা আপনি আসিয়া পড়িবে, অথচ কথার স্রোতকে বাধা দিবে না। ঝর্ণা যখন চলে তখন যে পাথরগুলোকে স্রোতের মুখে ঠেলিয়া লইতে পারে তাহাকেই বহন করিয়া লয়, যাহাকে অবাধে লঙ্ঘন করিতে পারে তাহাকে নিমগ্ন করিয়া চলে, আর যে পাথরটা বহন বা লঙ্ঘন – যোগ্য নহে’ তাহাকে অনায়াসে পাশ কাটাইয়া যায়। সঞ্জীববাবুর এই ভ্রমণকাহিনীর মধ্যে এমন অনেক বক্তৃতা আসিয়া পড়িয়াছে যাহা পাশ কাটাইবার যোগ্য, যাহাতে রসের ব্যাঘাত করিয়াছে এবং লেখকও অবশেষে বলিয়াছেন, ‘এখন এ- সকল কচকচি যাক।’ কিন্তু এই- সকল কচকচিগুলিকে সযত্নে বর্জন করিবার উপযোগী সতর্ক উদ্যম তাঁহার স্বভাবতই ছিল না। যে কথা যেখানে আসিয়া পড়িয়াছে অনাবশ্যক হইলেও সে কথা সেইখানেই রহিয়া গিয়াছে। যেজন্য সঞ্জীবের প্রতিভা সাধারণের নিকট প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারে নাই আমরা উপরে তাঁহার কারণ ও উদাহরণ দেখাইতেছিলাম, আবার যেজন্য সঞ্জীবের প্রতিভা ভাবুকের নিকট সমাদরের যোগ্য তাহার কারণও যথেষ্ট আছে।

‘পালামৌ’ – ভ্রমণবৃত্তান্তের মধ্যে সৌন্দর্যের প্রতি সঞ্জীবচন্দ্রের যে একটি অকৃত্রিম সজাগ অনুরাগ প্রকাশ পাইয়াছে এমন সচরাচর বাংলা লেখকদের মধ্যে দেখা যায় না। সাধারণত আমাদের জাতির মধ্যে একটি বিজ্ঞবার্ধক্যের লক্ষণ আছে-আমাদের চক্ষে সমস্ত জগৎ যেন জরাজীর্ণ হইয়া গিয়াছে। সৌন্দর্যের মায়া- আবরণ যেন বিস্রস্ত হইয়াছে, এবং বিশ্বসংসারের অনাদি প্রাচীনতা পৃথিবীর মধ্যে কেবল আমাদের নিকটই ধরা পড়িয়াছে। সেইজন্য অশনবসন ছন্দভাষা আচারব্যাবহার বাসস্থান সর্বত্রই সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের এমন সুগভীর অবহেলা। কিন্তু সঞ্জীবের অন্তরে সেই জরার রাজত্ব ছিল না। তিনি যেন একটি নূতনসৃষ্ট জগতের মধ্যে একজোড়া নূতন চক্ষু লইয়া ভ্রমণ করিতেছেন।

‘পালামৌ’তে সঞ্জীবচন্দ্র যে বিশেষ কোনো কৌতূহলজনক নতূন কিছু দেখিয়াছেন, অথবা পুঙ্খনাপুঙ্খরূপে কিছু বর্ণনা করিয়াছেন তাহা নহে, কিন্তু সর্বত্রই ভালোবাসিবার ও ভালো লাগিবার একটা ক্ষমতা দেখাইয়াছেন …’
এভাবে প্রায় দশ-বারো পাতার রিভিউ লিখছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর “পালামৌ” নিয়ে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় এই ভ্রমণ সাহিত্য তৎকালীন সাহিত্য অঙ্গনে বেশ ভালোই ঝড় তুলেছিল।

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়


দেশপ্রেমিক কবি
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্মঃ- ১৭ এপ্রিল, ১৮৩৮ – মৃত্যুঃ- ২৪ মে, ১৯০৩)

মধুসূদনের পরবর্তী কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে হেমচন্দ্র সে সময় সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন। বাংলা মহাকাব্যের ধারায় তাঁর বিশেষ দান হচ্ছে স্বদেশ প্রেমের উত্তেজনা সঞ্চার।
হুগলির গুলিটা গ্রামে মাতামহের বাড়িতে তাঁর জন্ম। পিতার আর্থিক দৈন্যের কারণে মাতামহের সহায়তায় তিনি কলকাতার খিদিরপুর বাঙ্গালা স্কুলে পড়ালেখা শুরু করেন। কিন্তু মাতামহের মৃত্যুর পর কিছুদিন তাঁর পড়াশোনা বন্ধ থাকে। পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারীর প্রচেষ্টায় তিনি ইংরেজি শেখেন এবং ১৮৫৩ সালে হিন্দু স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখান থেকে জুনিয়র ও সিনিয়র উভয় পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি লাভ করেন। বৃত্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অর্থাভাবে তাঁর লেখাপড়া পুনরায় বন্ধ হয়ে যায় এবং কিছুদিন তিনি চাকরি করতে বাধ্য হন। ১৮৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি বিএ পাস করেন। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ব্যাচের গ্রাজুয়েটদের অন্যতম। ১৮৬১ সালে তিনি এলএল এবং ১৮৬৬ সালে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন।

গ্রাজুয়েট হওয়ার আগে মিলিটারি অডিটর-জেনারেল অফিসে কেরানি পদে চাকরির মধ্য দিয়ে হেমচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি কিছুদিন ক্যালকাটা ট্রেনিং অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন এবং ১৮৬২ সালে মুন্সেফ হন। এ পদে কয়েকমাস চাকরি করার পর পুনরায় তিনি ওকালতিতে ফিরে আসেন এবং ১৮৯০ সালে সরকারি উকিল নিযুক্ত হন। কর্মজীবনে হেমচন্দ্র আইনজীবী হিসেবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

হেমচন্দ্রের প্রধান পরিচয় একজন দেশপ্রেমিক কবি হিসেবে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের আদর্শে তিনি তাঁর রচনায় দেশপ্রেমকে তুলে ধরেন। ১৮৭২ সালের জুলাই মাসে এডুকেশন গেজেট-এ তাঁর ‘ভারতসঙ্গীত’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রতি রুষ্ট হন, এমনকি পত্রিকার সম্পাদক ভূদেব মুখোপাধ্যায়কেও এজন্য জবাবদিহি করতে হয়। এ কবিতায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ভারতবাসীদের আহবান জানান। কবিতাটি দীর্ঘকাল বঙ্গের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় আসীন ছিল। তাঁর ‘ভারতবিলাপ’, ‘কালচক্র’, ‘রিপন উৎসব’, ‘ভারতের নিদ্রাভঙ্গ’ প্রভৃতি রচনায়ও স্বদেশপ্রেমের কথা ব্যক্ত হয়েছে।
হেমচন্দ্রের রচনায় নারীমুক্তির বিষয়টিও ব্যক্ত হয়েছে। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি তৎকালে বিধবাদের প্রতি সমাজের নির্দয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হেনেছিলেন। এ বিষয়ে রচিত তাঁর ‘কুলীন মহিলা বিলাপ’ কবিতাটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহরোধ আন্দোলনের সহায়ক হয়েছিল। তাঁর রচনায় বাংলাদেশ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মিলিত বাসভূমিরূপে চিত্রিত হয়েছে। তিনি সাহিত্যের মধ্য দিয়ে অখন্ড ভারতের স্বাধীন ও সংহতিপূর্ণ রূপ কামনা করেছিলেন।

হেমচন্দ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চিন্তাতরঙ্গিণী ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা হচ্ছে বৃত্রসংহার (২ খন্ড, ১৮৭৫-৭) মহাকাব্য। মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে মূলত সমসাময়িক সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষিত হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে কাব্যটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং কবি হিসেবে হেমচন্দ্রের যা খ্যাতি তা মূলত এ কাব্যের জন্যই। হেমচন্দ্রের অপর বিশিষ্ট কাব্য বীরবাহু কাব্য (১৮৬৪) দেশপ্রেম ও গোত্রপ্রীতির পরিচয় সম্বলিত একখানা আখ্যানধর্মী রচনা। তাঁর অপরাপর উল্লেখযোগ্য রচনা হলো: আশাকানন (১৮৭৬), ছায়াময়ী (১৮৮০), দশমহাবিদ্যা (১৮৮২), চিত্তবিকাশ (১৮৯৮) ইত্যাদি।

হেমচন্দ্রের কবিপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কবিতাবলী (২ খন্ড, ১৮৭০-৮০)। এটি তাঁর খন্ডকবিতার সংকলন। ‘জীবনসঙ্গীত’, ‘গঙ্গার উৎপত্তি’, ‘পদ্মের মৃণাল’, ‘ভারতকাহিনী’, ‘অশোকতরু’ প্রভৃতি খন্ডকবিতা তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি। এগুলির ভাব-ভাষা-ছন্দ শাশ্বত আবেদনময়। এসব খন্ডকবিতায় ইংরেজি কাব্যের ছায়া থাকলেও মাধুর্য এবং রসসৃষ্টির দিক থেকে তা বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে।

হেমচন্দ্র বেশ কিছু ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেন। সেসবের মধ্যে শেক্সপীয়রের টেম্পেস্ট (নলিনী বসন্ত, ১৮৭০) ও রোমিও-জুলিয়েট (১৮৯৫) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি বেশ কিছু ইংরেজি কবিতারও বঙ্গানুবাদ করেন।

হেমচন্দ্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি যেমন গুরুগম্ভীর আখ্যায়িকা কাব্য রচনা করেছিলেন তেমনি আবার সহজ সুরের খন্ডকবিতা, ওজস্বিনী স্বদেশসঙ্গীত এবং লঘু সাময়িকী কবিতাও রচনা করেছিলেন। শিল্প ও সাহিত্যসহ জ্ঞানের অন্যান্য অনেক বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন গুণী ব্যক্তি হিসেবে সমকালে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর শেষজীবন ছিল খুবই বেদনাময়। তিনি একসময় অন্ধ হয়ে যান এবং অর্থনৈতিক নানা প্রকার অসুবিধার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়। ১৯০৩ সালের ২৪ মে খিদিরপুরে নিঃসহায় ও নিঃস্ব অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ভারত সঙ্গীত
“বাজ রে শিঙ্গা বাজ এই রবে,
শুনিয়া ভারতে জাগুক সবে,
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে,
সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে
ভারত শুধু কি ঘুমায়ে রবে?”

জন্মভূমি
মাগো ওমা জন্মভূমি !
আরো কত কাল তুমি,
এ বয়সে পরাধীনা হয়ে কাল যাপিবে |
পাষণ্ড যবনদল
বল আর কত কাল,
নির্দয় নিষ্ঠুর মনে নিপীড়ন করিবে ||
কতই ঘুমাবে মাগো,
জাগো গো মা জাগো জাগো,
কেঁদে সারা হয় কন্যা পুত্র সকলে |
ধুলায় ধূসর কায়,
ভূমি গড়াগড়ি যায়,
একবার কোলে কর, ডাকি গো মা, মা বলে ||
কাহার জননী হয়ে,
কারে আছ কোলে লয়ে,
স্বীয় সুতে ঠেলে ফেলে কার সুতে পালিছ ?
কারে দুগ্ধ কর দান,
ও নহে তব সন্তান,
দুগ্ধ দিয়ে গৃহমাঝে কালসর্প পুষিছ ||
মোরে দিলে বনবাস,
প্রিয়ে আছে কার পাশ,
হায় কত পীড়া পাও, হে সুধাংশু-বদনে !
কোথা বসো, কোথা যাও,
কিবা পর কিবা খাও,
হায় পুনঃ কতদিনে জুড়াইব নয়নে ||

পরশমণি
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন ?
অই যে অবনীতলে পরশমাণিক জ্বলে
বিধাতা-নির্মিত চারু মানব-নয়ন।
পরশমণির সনে লৌহ-অঙ্গ-পরশনে,
সে লৌহ কাঞ্চন হয় প্রবাদ-বচন,—
এ মণি পরশ যায়, মানিক ঝলসে তায়,
বরিষে কিরণধারা নিখিল ভূবন।

কবির কল্পিত নিধি মানবে দিয়াছে বিধি,
ইহার পরশগুণে মানব-বদন
দেব তুল্য রূপ ধরি’ আছে ধরা আলো করি’,
মাটির অঙ্গেতে মাখা সোনার কিরণ |

পরশমণি যদি অলীক হইত,
কোথা বা এ শশধর, কোথা বা ভানুর কর,
কোথা বা নক্ষত্র-শোভা গগনে ফুটিত ?
কে রাখিত চিত্র করে চাঁদের জোছনা ধ’রে

তরঙ্গে মেঘের অঙ্গে এমন মাখায় ?
কে বা এই সুশীতল বিমল গঙ্গার জল
ভারত-ভূষণ করি রাখিত ছড়ায়ে ?
কে দেখা’ত তরুকুল, নানা এঙ্গে নানা ফুল,

মরাল, হরিণ,মৃগে পৃথিবী শোভিয়া ?
ইন্দ্রধনু-আলো তুলে সাজায়ে বিহঙ্গ-কুলে,
কে রাখিত শিখি পুঞ্জে শশাঙ্ক আঁকিয়া ?
দিয়াছে বিধাতা যাই এ পরশমণি—

স্রগের উপমাস্থল হয়েছে এ মহীতল,
সুখের আকর তাই হয়েছে ধরণী !
কি আছে ধরণীর অঙ্গে, নয়নমণির সঙ্গে
না হয় মানব চিত্তে আনন্দদায়িনী !

নদীজলে মীন খেলে, বিটপীতে পাতা হেলে,
চরে বালুকণা ফুটে, তৃণেতে হিমানী,
পক্ষী পাখে উড়ে যায়, কীটেরা শ্রেণীতে ধায়,
কঙ্করে তুষার পড়ে, ঝিনুক চিক্কণী |

তাতেও আনন্দ হয়— অরণ্য কুজ্ঝটিময়,
জ্বলন্ত বিদ্যুত্লতা, তমিস্রা রজনী |
অপূর্ব মাণিক এই পরশ-কাঞ্চন !
জননী-বদন-ইন্দু জগতে করুণা-সিন্ধু

দয়াল পিতার মুখ, জায়ার বদন |
শত শশি-রশ্মিমাখা চারু ইন্দীবর-আঁকা
পুত্রের অধর-ওষ্ঠ, নলিন আনন ;
সোদরের সুকোমল, স্বসা-মুখ নিরমল,

পবিত্র প্রণয়পাত্র, গৃহির কাঞ্চন—
এই মণি পরশনে হয় সুখ দরশনে,
মানব-জনম সার, সফল জীবন |—
কে বলে পরশমণি অলীক স্বপন ?


লিখেছেন- প্রতাপ চন্দ্র সাহা।

রসরাজ অমৃতলাল বসু


নাট্যকার, সঙ্গীতকার ও অভিনেতা
রসরাজ অমৃতলাল বসু ( জন্মঃ- ১৭ এপ্রিল, ১৮৫৩ – মৃত্যুঃ- ২ জুলাই, ১৯২৯ )

তিনি ছিলেন নাট্যকার, নাট্যসংগঠক ও অভিনেতা। পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে তাঁর জন্ম। উনিশ শতকে সাধারণ বাংলা রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, অমৃতলাল বসু ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি কলকাতার জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রান্স পাস (১৮৬৯) করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। দুবছর ডাক্তারি পড়ার পর কাশী গিয়ে তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা প্রণালী শিক্ষা করেন এবং কলকাতায় কিছুদিন এর চর্চাও করেন। এ ছাড়া তিনি কিছুকাল স্কুলে শিক্ষকতা, পোর্টব্লেয়ারে সরকারি চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন এবং পুলিশ বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু থিয়েটারের প্রতি আকর্ষণহেতু কোনো পেশায় স্থায়ী হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি নাটক রচনা ও অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন এবং কালক্রমে একজন অভিনেতা, মঞ্চাধ্যক্ষ, নাটক ও গান রচয়িতা হিসেবে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন।
অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফির সহযোগিতায় অমৃতলাল ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারে মঞ্চস্থ নীলদর্পণ নাটকে সৈরিন্ধ্রীর ভূমিকায় প্রথম অভিনয়ে অবতীর্ণ হন। পর্যায়ক্রমে নাট্যসম্রাট গিরিশচন্দ্র ঘোষের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা জন্মে। ১৮৭৫ সালে তিনি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের ম্যানেজার নিযুক্ত হন। প্রিন্স অব ওয়েলসের (সপ্তম এডওয়ার্ড) কলকাতায় আগমন ও জনৈক রাজভক্তের চাটুকারিতাকে ব্যঙ্গ করে লেখা গজদানগদ ও যুবরাজ প্রহসনে অভিনয়ের কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন জারি করে। ১৮৮৮ সালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার ভেঙ্গে যাওয়ার পর অমৃতলাল স্টার থিয়েটারে যোগ দেন এবং দীর্ঘ ২৫ বছর এর সঙ্গে যুক্ত থেকে বহু নাটকের অভিনয় ও পরিচালনায় অংশগ্রহণ করেন।
বাংলা নাট্যসাহিত্যে নাট্যকার হিসেবেও অমৃতলালের নাম সগৌরবে উচ্চারিত হয়। নাটক, প্রহসন ও নকশা জাতীয় তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশ। সেগুলির মধ্যে তিলতর্পণ (১৮৮১), বিবাহ বিভ্রাট (১৮৮৪), তরুবালা (১৮৯১), কালাপানি (১৮৯২), বাবু (১৮৯৩), বিমাতা (১৮৯৩), আদর্শ বন্ধু (১৯০০), অবতার (১৯০২), চোরের উপর বাটপাড়ি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রহসন ও ব্যঙ্গ রচনাতেই অধিক সফল হয়েছেন। সমকালের নাগরিক ও গ্রামীণ সমাজের নানা দিক নিয়ে এসব ব্যঙ্গাত্মক নাটক রচিত হয়। এর জন্য তিনি সমাজের এক শ্রেণির প্রশংসা এবং অপর শ্রেণির নিন্দার ভাগী হন। তিনি রঙ্গ-ব্যঙ্গমূলক নাটক রচনা ও তাতে অভিনয় করে সুধীসমাজ কর্তৃক ‘রসরাজ’ উপাধিতে ভূষিত হন। পুরাতন প্রসঙ্গ, পুরাতন পঞ্জিকা ও ভুবনমোহন নিয়োগী নামে তাঁর তিনটি আত্মস্মৃতিমূলক রচনা আছে। অমৃতলাল কবিতা ও গল্প-উপন্যাসও রচনা করেছেন। প্রথম দিকে কবির লড়াইয়ের কবিতা ও হাফ-আখড়াই গান লিখেও তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন।
থিয়েটার জগতের বাইরেও অমৃতলালের পদচারণা ছিল। স্যার সুরেন্দ্রনাথের সহকর্মীরূপে, স্বদেশী যুগের কর্মী এবং বাগ্মী হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। শ্যামবাজার অ্যাংলো-ভার্নাকুলার স্কুলের সেক্রেটারি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতি এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সভ্য ছিলেন অমৃতলাল। তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী’ পদকে ভূষিত করে। ১৯২৯ সালের ২ জুলাই অমৃতলালের মৃত্যু হয়।

উল্লেখযোগ্য নাটক
তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশ এবং তার মধ্যে নাটক চৌত্রিশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ
তরুবালা
বিমাতা বা বিজয়বসন্ত
হরিশচন্দ্র
আদর্শ বন্ধু
প্রহসন রচনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তার কয়েকটি প্রহসনের নাম:
তাজ্জব ব্যাপার
কালাপানি
বাবু
একাকার
চোরের উপর বাটপারি
তিলতর্পণ
ডিসমিশ
চাটুজ্যে ও বাঁড়ুজ্যে


লিখেছেন- প্রতাপ চন্দ্র সাহা।